শুক্রবার, ২৯ মে ২০২০, ০৪:৪৩ অপরাহ্ন

কুরআনের নুরে আলোকিত হোক জীবন

কুরআনের নুরে আলোকিত হোক জীবন

মুফতি নূর মুহাম্মদ রাহমানী

রমজান এবং কুরআন একটি অপরটির সাথে গভীর এবং অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক। মাহে রমজানে কুরআনকে সর্বকালের, সর্বদেশের, সর্বলোকের জীবনবিধান ও মুক্তির সনদ হিসেবে পাঠিয়ে আল্লাহ পাক ইরশাদ করেন, ‘রমজান মাস হলো সেই মাস, যে মাসে নাজিল করা হয়েছে কুরআন, যা মানুষের জন্য হেদায়েত এবং সত্যপথযাত্রীদের জন্য সুস্পষ্ট পথনির্দেশ আর ন্যায় ও অন্যায়ের মধ্যে পার্থক্য বিধানকারী। কাজেই তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি এ মাসটি পাবে, সে এ মাসের রোজা রাখবে।’ (সূরা বাকারা, আয়াত : ১৮৫)
ইমাম রাজি (রহ.) বলেন, রোজা এবং কুরআন নাজিলের মধ্যে গভীর সম্পর্ক। যখন এই মাসটিকে কুরআন নাজিলের সাথে খাস করা হলো তখন জরুরি ছিল এই মাসটি রোজার সাথেও খাস হবে। (তাফসিরে কাবির ৩/৯৮)
নবী হজরত মুসা (আ.)-কে যখন আল্লাহ তায়ালা কিতাব প্রদানের ইচ্ছা করলেন তখন তাকে এক মাস পর্যন্ত রোজা রাখার আদেশ দিয়েছেন। অতঃপর এর পরে দশদিন বৃদ্ধি করেন। তারপরে গিয়ে কালামে ইলাহি প্রদান করা হয়।
রমজানে নিহিত লাইলাতুল কদরে কুরআন অবতরণ : দুইবারে অবতীর্ণ হয়েছে কুরআন। প্রথমবার লওহে মাহফুয থেকে দুনিয়ার আসমানে। দ্বিতীয়বার আসমান হতে ২৩ বছরে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি প্রয়োজনানুসারে অল্প অল্প করে নাযিল হয়েছে। দুনোবারের অবতরণ শুরু হয়েছে কদরের রাতে। প্রথমটি সম্পর্কে আল্লাহ পাক বলেন, ‘নিশ্চয়ই আমি এটি (কুরআন) কদরের রাতে নাজিল করেছি।’ (সূরা কদর : ১) আর কদর রাতও মাহে রমজানেই নিহিত।
খতমে তারাবি কুরআন সংরক্ষণের অন্যতম মাধ্যম : কুরআন সংরক্ষণের দায়িত্ব আল্লাহ নিজেই নিয়ে ঘোষণা করেছেন, ‘নিশ্চয়ই আমিই কুরআন অবতীর্ণ করেছি এবং আমিই এর সংরক্ষণকারী।’ (সূরা হিজর : ৯)
আল্লাহ পাকের কুরআন সংরক্ষণের অন্যতম একটি পদ্ধতি হলো লক্ষ লক্ষ হাফেজের অন্তরে এ কুরআন প্রবিষ্টকরণ। এর পরিবর্তন-পরিবর্ধন কেউ করতে পারবে না। কেউ করতে চাইলে কোমলমতি ছোট হাফেজ ছেলেটিই ভুল ধরিয়ে দিতে পারবে। প্রতিবছর রমজানে তারাবি পড়ানোর জন্য হাফেজ ছেলেরা এ কুরআনকে আরও কণ্ঠস্থ করে। অনেকে আছে সারা বছর না পড়লেও অন্তত রমজানে তারাবির অসিলায় তারা খুব ভালোভাবে কুরআন মুখস্থের প্রতি গুরুত্ব দেয়।
রমজানে নবীজির কুরআন তিলাওয়াত : ইমাম জুহরি বলেন, রমজান হচ্ছে কুরআন তিলাওয়াত ও আহার বিতরণের মাস। (ইবনে আব্দুল বার, আততাহমিদ ৬/১১১) এজন্য রমজানের প্রতি রাতে হজরত জিবরাঈল (আ.) নবী কারিম (সা.)-এর খেদমতে হাজির হতেন এবং তাঁরা উভয়ই কুরআন তিলাওয়াত করে একে অপরকে শোনাতেন।’ (সহিহ বুখারি)
রাসূল (সা.) প্রিয়তম কন্যা ফাতেমা (রা.)-কে গোপনে জানালেন যে, জিবরাইল প্রতি বছর (রমজানে) আমাকে একবার কুরআন শোনাতেন এবং শুনতেন, এ বছর তিনি দুবার আমাকে শুনিয়েছেন-শুনেছেন। একে আমি আমার সময় সমাগত হওয়ার ইঙ্গিত বলে মনে করি। (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৩৬২৪)
রমজানে মনীষীদের কুরআন তিলাওয়াত : মনীষীবৃন্দও রমজানে কুরআন তিলাওয়াতে যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়েছেন। কতক মনীষী রমজানের মাত্র তিন রাতে পুরা কুরআন খতম করেছেন। কেউ কেউ আবার সপ্তাহে এক খতম করেছেন। আবার কেউ কেউ দশদিনে এক খতম করেছেন। (লাতাইফুল মাআরিফ ১/১১)
কুরআন তিলাওয়াতের ফজিলত : হাদিসে এসেছে, ‘যদি কেই আল্লাহর সঙ্গে বাক্যালাপ করার ইচ্ছা করে, তাহলে সে যেন কুরআন তিলাওয়াত করে।’
মহানবী (সা.) আরও ইরশাদ করেন, ‘যে ব্যক্তি কুরআনের একটি অক্ষর পাঠ করে, সে একটি নেকি পায়, আর প্রতিটি নেকি দশটি নেকির সমান।’ (সুনানে তিরমিজি)
রোজা ও কুরআন সুপারিশ করবে : নবীজি (সা.) বলেন, ‘প্রতিটি মাসেরই রয়েছে স্বতন্ত্র গৌরব ও মর্যাদা, আর মাহে রমজানের গৌরব ও অলংকার হচ্ছে রোজা ও কুরআন। এ দুইয়ের হক আদায়কারীদের জন্য রোজ হাশরে রোজা ও কুরআন আল্লাহর দরবারে সুপারিশ করবে। রোজা বলবে, ‘হে আমার রব! আমি তাকে দিনে পানাহার ও অশ্লীলতা থেকে বিরত রেখেছি, আমার তরফ থেকে তার জন্য সুপারিশ কবুল করুন।’ কুরআন বলবে, ‘হে আমার রব! আমি তাকে নিদ্রা থেকে বিরত রেখেছি, আমার তরফ থেকে তার জন্য সুপারিশ কবুল করুন।’ আল্লাহ তাদের সুপারিশ কবুল করবেন।’ (বাইহাকি; তাবরানি, মুসনাদে আহমদ)
কুরআন তিলাওয়াত রমজানের সুন্নত : রমজানের পাঁচটি সুন্নত। ১. সাহরি খাওয়া, ২. ইফতার করা, ৩. তারাবির নামাজ পড়া, ৪. কুরআন মাজিদ তিলাওয়াত করা, ৫. ইতিকাফ করা।
আসমানি গ্রন্থগুলোর অবতরণ রমজানে : আসমানি গ্রন্থগুলো রমজান মাসে অবতীর্ণ হয়েছে। রাসূল (সা.) বলেন, ‘রমজান মাসের পহেলা ইবরাহিম (আ.) সহিফা লাভ করেন, ৬ তারিখে মুসা (আ.) এর কাছে তাওরাত নাজিল হয়। দাউদ (আ.) এর কাছে পবিত্র জবুর নাজিল হয় এ পবিত্র মাসের ১২ তারিখে, আর ঈসা (আ.) পবিত্র ইঞ্জিল লাভ করেন এবং কুরআন নাজিল হয় রমজানের ২৪ তারিখে। (তাবরানি, হাদিস : ১৮৫; তাফসিরে তাবারি ২৪/৩৭৭)
তাকওয়া শেখায় রমজান ও কুরআন : রমজান ও কুরআন উভয়ের উদ্দেশ্যও এক। আর তা হলো তাকওয়া অর্জন। কুরআনে এসেছে, ‘তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করা হলো, যাতে তোমরা মুত্তাকি হতে পারো। (সূরা বাকারা, আয়াত : ১৮৩) কুরআন সমগ্র মানবজাতির জন্য নাজিল হলেও এর থেকে উপকৃত হবে কেবল মুত্তাকিরাই। আল্লাহ বলেন, ‘এটি আল্লাহর কিতাব। এতে কোনো সন্দেহ নেই, মুত্তাকিদের জন্য হিদায়াত। (সূরা বাকারা, আয়াত : ২)
রহমত বরকত নাজাতের মাস রমজান নদীর স্রোতের মতো শেষ হয়ে যাচ্ছে। তাই আমাদের কর্তব্য হবে যত বেশি পারা যায় কালামুল্লাহ শরিফের তিলাওয়াত করা। কুরআন শুদ্ধ না হলে শুদ্ধ করার চেষ্টা করা। সম্ভব হলে অনুবাদের সাহায্যে কুরআন বুঝার চেষ্টা করা। কুরআন থেকে শিক্ষা গ্রহণ করা এবং কুরআনময় জীবন গঠন করার প্রত্যয় গ্রহণ করা। আল্লাহ পাক আমাদের সহায় হোন!

লেখক : মুহাদ্দিস, জামিয়া আরাবিয়া দারুল উলূম বাগে জান্নাত, চাষাড়া, নারায়ণগঞ্জ

Facebook Comment





© All rights reserved © 2020 TabligNewsBD.Com
Design & Developed BY PopularServer.Com
error: Content is protected !!