বৃহস্পতিবার, ২৮ মে ২০২০, ১০:২২ অপরাহ্ন

আল- বিদা মাহে রমজান

 বিদায় মাহে রমজান:

সৈয়দ আনোয়ার আবদুল্লাহ

দেখতে দেখতে আমরা মাহে রমজানের শেষ প্রান্তে এসে পৌঁছেছি। আজ শেষ সেহরী খাব। রাত পোহালেই তিশ রমজান পূর্ণ হবে। এর মধ্য দিয়ে আমাদের কাছ থেকে বিদায় নেবে রহমত, মাগফিরাত ও মুক্তির মহান মাস পবিত্র রমজান। আল বিদা মাহে রমজান। আল বিদা মাহে রমজান। এখনো গোনাহকে মাফ করানোর বড় দুটি সময় আমাদের হাতে আছে। আসুন শেষ মুহুর্তে খালেছ দিলে তওবা করে নেই।

জীবন থেকে চলে যাচ্ছে এবারের রমজান, কি পেলাম আর কি হারালাম সেটি বিবেচনার সময় এসেছে এখন। আগামী বছরের রমজান মাসটি আমাদের ভাগ্যে জুটবে কিনা সেটি জানেন একমাত্র মহান রাব্বুল আ’লামিন। এই মোবারক মাসটি চলে গেল আমাদের জীবন থেকে-তা টেরই পেলাম না। জীবনের পদে পদে রমজান মাসের গুরুত্ব গেঁথে দিয়েছি কিনা, সেটির পরিচর্যা ও পর্যালোচনার সময় এসেছে এখন।

হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘যে মুসলমান রমজান মাস পেল, কিন্তু সারা বছরের গুনাহ মাফ করিয়ে নিতে পারল না, তার মতো হতভাগা আর নেই।’ [ইবনে মাযাহ]

হযরত ইনসান জাবের (রা) কর্তৃক বর্ণিত হাদীসে হুজুর (স) এরশাদ করেন, যখন মাহে রমজানের বিদায়ী মুহূর্ত আসে, তখন আসমান, জমিন এবং সমস্ত ফেরেশতারা আল্লাহর দরবারে অকাতরে কাঁদতে থাকেন। কারণ রমজান আরম্ভ হওয়ার সাথে সাথে আল্লাহ পাক আসমানের দরজা, জান্নাতের দরজা এবং রিজিকের দরজাগুলো খুলে দিয়েছেন। আসমানের ফেরেশতারা এই বলে কাঁদতে থাকে: আল বিদাউ আল বিদাউ ইয়া শাহারু রামাজান, আল বিদাউ আল বিদাউ ইয়া শাহরুল কোরআন… ।

রমজানের শেষ দিন ঈদ রাত ও ঈদগাহে যাওয়া পর্যন্ত আল্লাহ বান্দার গোনাহ মাফ করতে তাকেন। এখন এটিই সবচেয়ে বড় বিষয় আমার গোনাহ মাফ করাতে পেরেছি কী না। এখনে হাতে দুটি বড় সুযোগ আছে।

হজরত মুআজ ইবনে জাবাল (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি পাঁচ রাত জেগে থাকবে তার জন্য জান্নাত ওয়াজিব। সেই পাঁচটি রাত হলো-

এক. জিলহজ মাসের আট তারিখের রাত।
দুই. জিলহজের ৯ তারিখের রাত।
তিন. ঈদুল আজহার রাত।
চার. ঈদুল ফিতরের রাত।
পাঁচ. ১৫ শাবানের রাত।

হজরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, এমন পাঁচটি রাত আছে, যে রাতে কোনো দোয়া ফিরিয়ে দেওয়া হয় না। রাতগুলো হলো-
এক. জুমার রাত।
দুই. রজব মাসের প্রথম রাত।
তিন. শাবান মাসের ১৫ তারিখের রাত।
চার. ঈদুল ফিতরের রাত।
পাঁচ. ঈদুল আজহার রাত।

বর্ণিত হাদিসগুলোয় ঈদের রাতসহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ রাতগুলোর অন্যতম। ওপরে বর্ণিত হাদিসগুলো ছাড়াও আরও অসংখ্য হাদিসে ঈদের রাতে ইবাদতের গুরুত্ব ও ফজিলত বর্ণনা করা হয়েছে। বলা হয়েছে, যে দিন মানুষের অন্তর মারা যাবে, সেদিন ঈদের রাতের ইবাদতকারীর অন্তর মরবে না। হাদিসের মর্মার্থ তো এই, কেয়ামতে ভয়াবহ তাণ্ডবের সময় প্রতিটি মানুষের অন্তর যখন হাশরের ময়দানে ভয় আশঙ্কা অস্থিরতায় মৃতপ্রায় হয়ে থাকবে। মানুষের হুশ-জ্ঞান বলতে থাকবে না কিছু। ঈদের রাতে আমলকারীর হৃদয় তখনও সজীব ও সতেজ থাকবে। সেদিন তার অন্তর মারা পড়বে না। বরং থাকবে সদা প্রফুল্ল।

ঈদের রাতের বড় প্রাপ্তি হলো রমজান চলে যাবার পরেও বিশেষ মর্যাদায় , এ রাতে দোয়া কবুল করা হয়। কোনো দোয়া ফিরিয়ে দেওয়া হয় না। বরং আল্লাহতায়ালার দরবারে তা সরাসরি কবুল হয়। তাই আমরা আমাদের ইবাদতের সঙ্গে সঙ্গে ঈদের রাতে আল্লাহতায়ালার কাছে আমাদের প্রয়োজনগুলো চাইতে পারি। আল্লাহতায়ালার কাছে ক্ষমা কামনা, কবরের আজাব থেকে মুক্তি, জাহান্নামের আগুন থেকে রেহাই চেয়ে নিয়ে পরদিন সকালে একেবারে নিষ্পাপ মাসুম শিশুর মতো পবিত্র ঈদের মাঠে আল্লাহর পুরস্কার গ্রহণ এবং প্রতিদান লাভের শ্রেষ্ঠ সুযোগ অন্য কোনো রাতে আছে কি?

ঈদের রাত আমাদের জন্য, এই দুনিয়ার যাবতীয় কল্যাণ লাভ এবং মঙ্গল কামনা করার রাত, নিজের গোনাহ মাফ করানোর রাত। সেই সঙ্গে আজ রাত জাহান্নাম থেকে মুক্তি লাভের মহাসুযোগ প্রাপ্তির রাত।

এছাড়া ঈদুল ফিতরের সকালে আল্লাহ তাআলা সকল জনপদে ফেরেশতাদেরকে পাঠান, তারা প্রত্যেক রাস্তার মোড়ে মোড়ে দাঁড়ান। অতঃপর উচ্চস্বরে ঘোষণা করেন। যা জীন ও মানুষ ব্যতীত সকল প্রাণী শুনতে পায় : ‘হে মুহম্মদের উম্মত! তোমরা এক করুণাময় প্রতিপালকের দিকে বেরিয়ে এসো, যিনি পর্যাপ্ত পরিমাণে দান করেন এবং বড় বড় গোনাহ মাফ করেন।’

যখন বান্দারা ঈদের নামাজ আদায়ে ঈদগাহে সমবেত হয়, তখন আল্লাহ তাআলা ফেরেশতাদেরকে বলেন : ‘কোন শ্রমিক যখন তার কাজ সম্পন্ন করে, তখন তাকে কি প্রতিদান দেয়া উচিত?’ ফেরেশতারা বলেন- ‘হে আমাদের প্রভু, তার প্রতিদান এই যে, তার প্রাপ্য পুরোপুরিভাবে দেয়া হোক।’

আল্লাহ তাআলা বলেন : ‘তাহলে তোমাদেরকে সাক্ষী রেখে বলছি, আমি তাদের রমজানের রোজা ও রমজানের রাতের নামাজের প্রতিদান হিসেবে তাদের জন্য আমার ক্ষমা ও সন্তোষ ঘোষণা করলাম।’

আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন : ‘হে আমার বান্দারা, তোমরা আমার কাছে চাও। আমার সম্মান ও প্রতাপের শপথ, আজ তোমরা তোমাদের আখেরাতের সঞ্চয়ের জন্য যা কিছু চাইবে তা আমি দিব। আর দুনিয়ার জন্য যা কিছু চাইবে তাও আমি বিবেচনা করব। আমার মর্যাদার শপথ, আমি তোমাদের ভুল-ত্রুটি ক্ষমা করবো, যতক্ষণ তোমরা আমার দিকে মন নিবিষ্ট রাখবে। আমার সম্মান ও প্রতাপের শপথ, আমি তোমাদেরকে অপমানিত করবো না। তোমাদেরকে অপরাধীদের সামনে লাঞ্ছিত করবো না। তোমরা আমাকে সন্তুষ্ট করেছ, আমি তোমাদের উপর সন্তুষ্ট হয়েছি।’

এরপর ফেরেশতারা আনন্দিত হয় এবং রমজান শেষে এই উম্মতকে আল্লাহ তাআলা যা দান করেন, তাতে সন্তুষ্ট হয়ে যায়। (বায়হাকী)

Facebook Comment





© All rights reserved © 2020 TabligNewsBD.Com
Design & Developed BY PopularServer.Com
error: Content is protected !!