রবিবার, ২৮ Jun ২০২০, ০১:০৫ অপরাহ্ন

আদর্শ মাদরাসার রূপরেখা বা ইলম অর্জনের সুন্নত তরীকা

আদর্শ মাদরাসার রূপরেখা বা ইলম অর্জনের সুন্নত তরীকা

আদর্শ মাদরাসার রূপরেখা

বা

ইলম অর্জনের সুন্নত তরীকা 

মুফতি আযীমুদ্দীন

একজন সাধারণ মানুষের এমন প্রশ্নে আমি বিস্মিত হই যে,হজরত! ইলম শিখার সুন্নাত তরীকা কী?নামায ফরজ এবং এ ফরজ আদায়ের সুন্নাত তরীকা রয়েছে। ইলম শিক্ষা করাও ফরজ,তাহলে ইলম অর্জনের সুন্নাত তরীকা কী?অনেক হুজুরকে জিজ্ঞেস করেছি, সবাই এড়িয়ে গেছেন।

আমি বললাম,ভাই এ প্রশ্নের উত্তর দিলে আমাদের অস্তিত্ব থাকবেনা! বেদআতে হাসানার রেশমি জালে আমরা এমনভাবে আটকে গেছি যে,মূলকে বেমালুম ভুলে গেছি। মুফতী ফয়জুল্লাহ রহঃ সবসময় বলতেন,বেদআতে হাসানার শুরুটা ভাল মনে হলেও এর পরিণতি কখনো ভালো হয়না।

সাহাবায়ে কেরাম হুজুর সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছ থেকে যে তরীকায় ইলম শিখেছেন,ইলম অর্জনের সুন্নাত তরীকা এবং সর্বযুগে উন্নত পদ্ধতি সেটাই।

সাহাবায়ে কেরাম ইলম অর্জনের ক্ষেত্রে চার জিনিসকে সর্বপ্রথম নির্বাচন করতেন।
(১) রিজাল বা ব্যাক্তি।আমরা মাদরাসায় ইলম শিখতে যাই, উনারা বা-আমল,আহলুল্লাহকে নির্বাচন করে এমন “ব্যাক্তির”সোহবতে থেকে ইলম শিখতেন।
(২) জায়গা নির্বাচন।সাহাবায় কেরাম আমলের মা-হাওল অর্থাৎ মসজিদে ইলম শিখতেন।

আরও পড়ুন: একটি স্বপ্নের পথ চলাঃ মুফতী উসামা ইসলাম

(৩) সময় নির্বাচন। আমরা ইলম অর্জনের জন্য একটা বয়স এবং সে বয়সের পুরোটা সময় জীবন জগৎ থেকে একপ্রকার বিচ্ছিন্ন হয়ে ইলম অর্জন করি।নআর সাহাবায় কেরাম মাহদ সে লাহাদ, তথা বুঝতে শেখার পর থেকে মৃত্যু অবধি ইলম শিখা এবং শিখানো ছিল তাদের দৈনন্দিন জীবনের অপরিহার্য একটি অংশ।
(৪) তালীমের সাথে দাওয়াত ও আমলের সমন্বিত মেহনত।আমরা আগে শিখি, পরে আমলের ফিকির করি। সময় থাকলে,ভালো লাগলে তবলীগ করি।অথচ সাহাবায় কেরাম আমলকেই ইলম মনে করতেন।আর যা শিখতেন এবং যখন শিখতেন,তৎক্ষনাৎ তার তবলীগকে ফরজ মনে করতেন।

সাহাবা যুগে ইলম,আমল ও দাওয়াতের মধ্যে তালাযুম ছিল,অর্থাৎ তারা একটিকে আরেকটির জন্য সম্পূরক বা অপরিহার্য মনে করতেন।আমরা তা ভাগ করে ফেলেছি।ফলে ইলমওয়ালা তবলীগওয়ালাকে এবং কখনো তবলীগওয়ালা ইলমওয়ালাকে নিজের মোকাবেল মনে করছে।

এর কারণ,আমরা তালীমের সুন্নাত তরীকা থেকে যোজন যোজন দূরে সরে এসেছি।

আমাদের দাওয়াত ও ইবাদাতের সাথে তালীমের উপরও এ পরিমাণ রসম গালিব যে,আজ নকলকেই আমরা আসল মনে করছি।যুগের দোহাই দিয়ে নিত্যনতুন সংস্কারের তোড়ে বিলীন করে দিচ্ছি তালীমের ঐতিহ্য বা শাশ্বতধারা।

আমাদের কথাগুলো এজন্যই হয়ত অনেকের মনপুত হবেনা যে,কথাগুলো আকাবিরদের তরজের খেলাফ? আর সত্যি বলতে, আকাবির মানে আমরা থানভী রহঃ,সর্বোচ্চ হাজী এমদাদুল্লাহ মুহাজিরে মক্কী রহঃপর্যন্ত গিয়ে থেমে যাই। সাহাবায় কেরামকে আমরা সীমাহীন মহাব্বত করি,তবে তালীমের ক্ষেত্রে অনুসরণীয় বা অনুকরণসাধ্য আকাবির মনে করিনা। তাই কেয়ামত অত্যাসন্নের দোহাই দিয়ে অবলীলায় গা ভাসিয়ে দিচ্ছি রুসমিয়াতের গড্ডালিকাপ্রবাহে।

কেউ মূলধারার কথা বললে তাকে গলা টিপে ধরে কাফের,বাতিল? বানিয়ে দিচ্ছি ফতোয়া-সন্ত্রাসের অত্যাধুনিক অস্ত্র ধরে।

ক্বরনে আউওয়ালের তিন যুগে মানুষ তাদের আমলকে কোরআন সুন্নাহর সাথে মিলিয়ে দেখত যে,ঠিক আছে কি না?পরবর্তী যুগ থেকে মানুষ নিজেদের রুসমী আমলগুলোকে প্রমাণ করতে কোরআন হাদিসকে জোর করে টেনে ব্যবহার করতে শুরু করে।

আরও পড়ুন: ছাত্র ও অভিভাবকদের উদ্দেশ্যে মারকাজুল উলুম আশ শরীয়্যাহ’র বিশেষ নির্দেশনা

আজ আমরা ইতাআতের মাদরাসা তালাশ করি।আসলে এ নামের মাদরাসা হয়না। ইতাআততো একটি বিপ্লবী চিন্তাধারার নাম। হাজারো রসমিয়াতের স্রোতের বিরুদ্ধে সাহাবা আদর্শ বাস্তবায়নের বাস্তবমুখী পদক্ষেপের নাম।গতানুগতিক মাদরাসা থেকে বের হয়ে আলাদা কিছু করলেই সেটা ইতাআতের মাদরাসা হয়ে যায় না।

বাস্তবমুখী আমলী মাদরাসা করা যেমন জরুরী, মাদরাসাকে তরজে সাহাবার সাথে মিলানো তারচে বেশি জরুরী।

এ মুহুর্তে এমন মাদরাসা খোলাতো জিহাদের শামিল! আফসোস যে,কেউতো হিম্মতই করেনা।আর কেউ আশপাশের অভিযোগ,অনুযোগ ও অসহযোগিতার ফলে হিম্মত হারিয়ে ফেলে।
তাই আমাদেরকে জানতে হবে যে,আদর্শ মাদরাসার রূপরেখা কী?এবং কিভাবে ধীরে ধীরে সে এগোতে হবে।

এরজন্য জন্য সর্বপ্রথম আমাদেরকে
( ১)মসজিদ ভিত্তিক মাদরাসার প্ল্যান গ্রহণ করতে হবে,যেখানে অন্তত ক্লাসগুলো মসজিদে নেয়ার ব্যবস্হা থাকবে।হজরতজী বলেন,আজ মসজিদ থেকে তালীম বের হয়ে যাওয়ার কারণে তালীমের উপর রসম গালেব হয়ে গেছে।
(২)অনাবাসিকভাবে বাচ্চাদের পড়ার ব্যাপক সুযোগ তৈরী করতে হবে।বিশেষত ছোট বাচ্চাদের।
(৩)মাদরাসায় মাওলানা মুফতী নয়,বরং নবীর ওয়ারিস,ওলামায় হক্কানী বানানোর নিমিত্তে তালীম এবং তবলীগ,উভয়টিকে সমান গুরুত্ব দিয়ে উভয়টির জন্য সময় এবং সূচি তৈরি করতে হবে।
দৈনিক, সাপ্তাহিক, মাসিক এবং বাৎসরিক তবলীগের তরতীব বানাতে হবে। ইমান এবং তাকওয়া শিখার জন্য বড় ছাত্ররা মাসে তিনদিন সময় লাগালে,শবগুজারি করলে তালীমের অনেক বড় ক্ষতি হয়ে যাবে না,বরং ইলমের সহায়ক হবে।সাহাবাওয়ালা দাঈ আলেম পয়দা হবে।

আরও পড়ুন: মাদরাসার ছাত্রদের বিগড়ে যাওয়ার নেপথ্যের কারণ!

(৪)দাওয়াত এবং দাঈর তত্বাবধানে চলবে মাদরাসা। এর মানে এটা নয় যে আমরা একটি কমিটি গঠন করলাম, সুবিধা অসুবিধা দেখলাম,ব্যস। জিম্মাদারি খতম। বরং মসজিদওয়ার মশওয়ারা থেকে নির্বাচিত সাথী,যার মধ্যে দাওয়াতের ফিকির গালেব এবং মাদরাসার মেজাজও বুঝে,এমন সাথী সপ্তাহে অন্তত একবার তলাবাদের সামনে অল্পসময় বয়ান করবে। পারলে হালকা আপ্যায়নও করাবে, যাতে তলাবারা অধীর আগ্রহে সে দিনটির অপেক্ষায় থাকে।

এর সাথে সাথে একাধিক এমন জেনারেল সাবজেক্টের শিক্ষক নিয়োগ দিতে হবে,যারা ইতাআতে পরিপক্ব, সুদক্ষ এবং বাচ্চাদের দাওয়াতের জেহেন বানাতে পারে।

(৫)বাস্তবমুখী সিলেবাস তৈরী করে তলাবাদেরকে এমনভাবে গড়ে তুলতে হবে যে,তারা সমাজের নিম্ন থেকে সর্বোচ্চ পর্যায় পর্যন্ত অত্যন্ত দাপটের সাথে মাথা উচু করে দাওয়াতের ফেযা তৈরি করতে সক্ষম হয়।
(৬)এস্তেদাদ,এখলাস ও এস্তেগনার বুনিয়াদে মাদরাসা দাড় করাতে হবে। এর জন্য উচু মানসিকতা সম্পন্ন, এস্তেদাদ আসাতিযায় কেরামকে যথাযোগ্য মর্যাদার সাথে নিয়োগ দিতে হবে। প্রায়শই এমন শিক্ষক হয়ত পাওয়া যাবেনা,ফলে তাদের পাশে থেকে সময় দিয়ে গড়ে নিতে হবে। আমার এ ছোট্ট জীবনে অনেক সম্ভবনাকে আমি অংকুরেই ঝরে যেতে দেখেছি অদূরদর্শী মানুষের উপর্যুপরি অভিযোগের ফলে।আবার অনেককেই পেয়েছি,যারা গোবরেও পদ্মফুল ফুটিয়েছে অসীম সাধনার শক্তি দিয়ে।

আরও পড়ুন: জাতীয় কওমী মাদরাসা শিক্ষাবোর্ড গঠন ছিল; সময়ের দাবী : মাওলানা জিয়া বিন কাসেম

(৭)উন্নত পরিবেশ এবং বিস্তৃত পরিসরে মাদরাসার পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।
(৮)স্কুলের বাচ্চা এবং বয়স্কদেরও ফরজে আইন পরিমাণ ইলম শিখার ব্যবস্হা রাখতে হবে।
(৯)মাদরাসায় উৎসাহমূলোক প্রতিযোগিতার পরিবেশ তৈরি করতে হবে,যাতে তলাবারা ইলমকে বোঝা মনে না করে উপভোগ করতে পারে।
(১০)বাচ্চাদের তরবিয়তের জিম্মাদারি শুধু ওস্তাদকে নয়,গার্ডিয়ানকে বোঝাতে হবে।
যদি আমাদের এতায়াতের মাদরাসার লক্ষ্য এমন হয়, তাহলে আমাদের পথচলা নিরাপদ। অন্যথায় আবারো আমাদেরকে পদে পদে হোঁচট খেতে হবে।

আমাদের বোর্ড গঠনও যদি তালীমকে সাহাবাওয়ালা আদর্শের ভিত্তিতে দাড় করানোর লক্ষ্যে হয়ে থাকে, কামিয়াবি তার পদচুম্বন করতে বাধ্য।

আজ এ কথাগুলো হয়ত কঠিন মনে হবে,কিন্তু এটাই সহজ। কেননা প্রত্যেক কাজ তার নিজস্ব তরীকাতেই সহজ,দেখতে যত কঠিন মনে হোকনা কেনো? আর যদি আমরা গতানুগতিক ধারায় চলতে থাকি,বোর্ডের বিকল্প বোর্ড,বা সম্মিলিত একটি পরীক্ষা সর্বস্ব বোর্ড গঠনের চিন্তা নিয়ে এগোতে থাকি,তাহলে আমাদের ইতাআতের মাদরাসার তলাবারাও আগামীর পরীক্ষায় স্রোতের টানে ভেসে যাবে।শুধুই ভারি হবে দেমাগশুন্য, বাস্তববিমুখ দরবেশদের মিছিল। তাই আমাদেরকে বিষয়টি নিয়ে গভীরভাবে ভাবতে হবে এবং এগোতে হবে।
আল্লাহ আমাদের সহায় হোন,এবং আমাকে মাফ করে দেন!আমীন!!

লেখক: মুহতামিম: দারুল উলুম রাহমানীয়া সাভার, ইমাম কাকরাইল মসজিদ, অর্থ ও পরিকল্পনা পরিচালক : কেন্দ্রীয় কার্য নির্বাহী পরিষদ, জাতীয় কওমী মাদরাসা শিক্ষাবোর্ড।

একটি ঘোষনা: মাকতাবায়ে ইলিয়াস গ্রন্থসত্ত্ব সহ বিক্রি করা হবে

Facebook Comment





© All rights reserved © 2020 TabligNewsBD.Com
Design & Developed BY PopularServer.Com