সোমবার, ২৯ Jun ২০২০, ০১:১৭ পূর্বাহ্ন

মাওলানা মুহিউদ্দীন খান রহ.-এর অপ্রকাশিত আত্মজীবনী

মাওলানা মুহিউদ্দীন খান রহ.-এর অপ্রকাশিত আত্মজীবনী

আহমদ বদরুদ্দীন খান ।।

দুই হাজার তিন কিংবা চার সালের কোন এক সন্ধ্যা রাতে আমি আমার ছোট দুই সন্তানকে নিয়ে বাবার সাথে তাঁর শয়ন কক্ষে বসে গল্প করছিলাম, এমন সময় আমার মা পেরেশান অবস্থায় ঐ ঘরে প্রবেশ করে বাবার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, আমার বালিশের নিচে এক হাজার টাকা রাখা ছিল, সেটা এখন সেখানে আর খুঁজে পাচ্ছি না- আপনি কি সেই টাকাটা দেখেছেন? বাবা বললেন, না তো আমি দেখিনি! এ উত্তর শুনে আমার মা অনেকটা নিরাশ হয়ে বার বার অনুচ্চ স্বরে ‘লা ইলাহা ইল্লা আন্তা সুবহানাকা ইন্নি কুনতু মিনায জোয়ালেমীন’ এবং ‘ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন’ পড়তে লাগলেন। তাঁর এই পেরেশান ভাব দেখে আমি ও আমার বাচ্চারা হাসতে লাগলাম।

আমাদের সাথে বাবাও আমার মায়ের এই কান্ড দেখে মৃদু মৃদু হাসতে লাগলেন। আমাদের হাসি যেমন তেমন- বাবার হাসি দেখে আমার মা রাগে ক্ষোভে বাবাকে উদ্দেশ্য করে বললেন, আমার বিপদ দেখে আপনিও বাচ্চাদের মত হাসছেন? বাবা তখন আমার মাকে প্রবোধ দিয়ে বললেন, শোন! তুমি কি কখনো এই প্রবাদ বাক্যটি শোননি : ‘বিশ্বাসে মিলায় বস্তু তর্কে বহুদূর।’

অর্থাৎ, তুমি যে বিশ্বাস নিয়ে এই বিপদে আল্লাহ্ তা’আলাকে ডাকছো, তাতে করে আল্লাহ্ পাক তোমার সেই হারিয়ে যাওয়া টাকা অবশ্যই ফিরিয়ে দিবেন। অথবা অন্য কোন উপায়ে এই ক্ষতি পুষিয়ে দিবেন ইনশা আল্লাহ্। বাবার এ কথা শুনে মা ঐ সময়ের মত কিছুটা শান্তনা লাভ করলেন।

বাবা তখন হাসি থামিয়ে গাম্ভীর্যের সাথে আমার মাকে উদ্দেশ্য করে বললেন, শোন মুস্তফার মা! (উল্লেখ্য যে, বাবা আজীবন আমার মাকে তাঁর বড় সন্তান অর্থাৎ, আমার বড় ভাইয়ের মা- এই নামেই বেশী ডাকতেন) তোমার কি মনে নেই! সেই ১৯৫৯ সালের ট্রেনযাত্রায় টাকা ও টিকেট হারিয়ে যাওয়ার কথা?

অতঃপর এই দোয়ায়ে ইউনুসের বরকতে সেই বিপদের মুহুর্তে কি অলৌকিক ভাবে আল্লাহ্ পাক আমাদের সাহায্য করেছিলেন? কত বছর আগের কথা, কিন্তু জীবনে যত বার সে কথা আমার স্মরণ হয় ততবারই রাহমানুর রাহীম আল্লাহ তা’আলার প্রতি কৃতজ্ঞতায় আমার মাথা সেজদাবনত হয়ে আসে।

একথা শুনে আমি বেশ কৌতুহল নিয়ে বাবাকে জিজ্ঞেস করলাম, সেদিন কি হয়েছিল? বাবা তখন আল্লাহর প্রতি পরম কৃতজ্ঞতায় আপ্লুত কণ্ঠে বলতে লাগলেন, আমরা তখন নব-দম্পতি। তোমার মা সে বার জীবনে প্রথম বারের মত কোরবানীর ঈদ উপলক্ষ্যে শ্বশুর বাড়ী যাচ্ছে। ঈদের দু’দিন আগের ঘটনা।

ট্রেনে প্রচন্ড ভীড়। আমি আগেই দু’টো টিকেট করে রেখেছিলাম। পত্রিকা অফিসে চাকরীর বেতন, সেই সাথে টুক-টাক অনুবাদের সম্মানী এবং পাকিস্তান বেতারে পার্ট টাইম কাজ করে যা উপার্জন করেছি- তা থেকে সংসার খরচের টাকা বাদ দিয়ে বিগত ছয় মাসে যে টাকাটা জমিয়ে ছিলাম- আমার পাঞ্জাবীর পকেটে টিকেট এবং কোরবানীর গরু কেনা ও ঈদের অন্যান্য খরচ বাবদ সেই নগদ সাড়ে তিন হাজার টাকা।

কমলাপুর ষ্টেশনে যাত্রীদের ভীড় ঠেলে দু’টো ব্যাগ ও তোমার মাকে নিয়ে ট্রেনে উঠে নির্দিষ্ট আসনে গিয়ে বসলাম। বিবাহিত জীবনে প্রথম স্বস্ত্রীক ঈদ করতে গ্রামের বাড়ী যাচ্ছি। ঈদের এই ভীড়ের মধ্যেও ট্রেনের দু’টো টিকেট আলহামদুলিল্লাহ্ সংগ্রহ করতে পেরেছি। অতএব ঢাকা থেকে ট্রেন ছাড়ার পর অনেকটা ফুরফুরে মেযাজেই ভ্রমন করছিলাম।

ঘন্টা দেড়েক পর ট্রেন এসে যখন জয়দেবপুর জংশনে থামলো, আমার একটু ঝিমুনির মত এসেছিল। এমন সময় হঠাৎ, লক্ষ্য করলাম, যাত্রীদের মধ্যে এক ধরণের হুড়োহুড়ি লেগে গেছে। দাঁড়ানো যাত্রীদের অনেকেই আতঙ্কগ্রস্ত অবস্থায় এদিক-সেদিক ছুটোছুটি করছে। কেউ কেউ জানালা দিয়ে লাফিয়ে নামতে লাগলো।

আমি কিছু বুঝ উঠতে না পেরে পাশের যাত্রীকে জিজ্ঞেস করলাম, কি হয়েছে ভাই? সে ভদ্রলোক পাল্টা আমার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, মাওলানা সাহেব! আপনাদের টিকেট আছে তো? কারণ, মোবাইল কোর্ট রেড দিয়েছে, টিকেট না থাকলে কিন্তু কোমরে দড়ি দিয়ে আপনাদের স্বামী-স্ত্রী দু’জনকেই নিয়ে যাবে। অতঃপর জেল, জরিমানা দু’টোই ভোগ করতে হবে।

পাশের যাত্রীর মূখে একথা শুনে আমি পকেটে হাত দিয়ে দেখি আমার টিকেট এবং টাকা দু’টোই এই হুলোস্থুলের মধ্যে কোন ফাকে হাওয়া হয়ে গেছে। ভালো করে পাঞ্জাবীর সবগুলো পকেট হাতড়ে দেখলাম, না টাকা আর না টিকেট- কোথাও কিছু নেই। আমার আর বুঝতে বাকি রইল না যে, আমি পকেট কাটা চোরের নির্মম শিকারে পরিণত হয়েছি।

নতুন বউকে নিয়ে অপমানিত হওয়ার লজ্জা ও ভয়ে তখন আমার মূখ-চোখ রক্ত-শুন্য হয়ে গেলো। আমাদের সিটগুলো ছিল কম্পার্টমেন্টের মাঝামাঝি অবস্থানে। তাকিয়ে দেখলাম, চতুর্দিক থেকে ঘেরাও করে দরজার দিক থেকে পুলিশ, টিটি ও ম্যাজিস্ট্রেট একে একে যাত্রীদের টিকেট চেক করে এদিকে এগিয়ে আসছে। জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে দেখলাম, ইতোমধ্যেই বিনা টিকেটে ভ্রমনকারী যাত্রীদের অনেককেই ট্রেন থেকে নামিয়ে কোমরে দড়ি দিয়ে লাইন ধরে দাঁড় করিয়ে রাখা হয়েছে। আমি তখন এক মনে দোয়ায়ে ইউনুস ও ইন্নালিল্লাহ্ পড়ছি।

তোমার মা নেকাবের আড়াল থেকে আমার এই বিচলিত অবস্থা লক্ষ্য করে ঘটনা কিছুটা আচ করতে পেরে জিজ্ঞেস করল, কি হয়েছে আপনার? আমি সংক্ষেপে টাকা হারানোর কথা গোপন রেখে শুধু বললাম, টিকেট দুটো পকেটে রেখেছিলাম- কিন্তু এখন পাচ্ছি না। মনে হয় ট্রেনে উঠার সময় ভীড়ের চাপে কোথাও পড়ে গেছে। এরপর চোখ দুটো বন্ধ করে ইযযতের মালিক মহান আল্লাহর কাছে একটু অভিমান মিশ্রিত কণ্ঠে এই বলে প্রার্থনা করতে লাগলাম, হে আল্লাহ্! তুমি সবই জানো।

গত ছয় মাসে এই টাকা কয়টা আমি তোমার সন্তুষ্টির তরে কোরবানী করার উদ্দেশে কত কষ্ট স্বীকার করে করে সম্পূর্ণ হালাল উপায়ে উপার্জন করেছিলাম। তার চেয়ে বড় কথা টিকেট দুটোও চোরেরা নিয়ে গেল। অতএব হে ইযযত দেয়ার ও রক্ষা করার মালিক! এখন এই অপমানের হাত থেকে একমাত্র তুমিই আমাকে রক্ষা করতে পারো। কায়মনোবাক্যে এ প্রার্থনাটুকু শেষ করার পর তাকিয়ে দেখি টিটি ও ম্যাজিস্ট্রেট প্রায় আমাদের সামনে চলে এসেছে।

অতঃপর টিটি এসে আমার দিকে তাকিয়ে কর্কশ গলায় বলল, এই যে মাওলানা সাহেব! আপনাদের দু’জনের টিকেট দেখান! আমি তখন বোকার মত পাঞ্জাবীর পকেট হাতড়ে কিছুটা সময় ক্ষেপণ করতে লাগলাম আর মনে মনে আল্লাহ্কে ডাকতে লাগলাম।

এমন সময় তরুণ বয়সের ম্যাজিস্ট্রেট ভদ্রলোর এগিয়ে এসে আমাকে সালাম দিয়ে পূর্ব পরিচিত মানুষের মত হেসে জিজ্ঞেস করল, হুযুর! কেমন আছেন? ঈদ কি এবার স্বস্ত্রীক গ্রামের বাড়ীতে উদযাপন করবত যাচ্ছেন? অতঃপর আমি তার একথার কোন উত্তর দেয়ার আগেই ম্যাজিস্ট্রেট টিটিকে উদ্দেশ্য করে বললেন, আমি জানি উনার টিকেট আছে।

আপনি বরং সামনের যাত্রীদের টিকেট চেক করেন। এরপর আমাকে উদ্দেশ্য করে বললেন, আচ্ছা যাই মাওলানা সাহেব!, আমার জন্য খাস করে দোয়া করবেন। এই কথা বলে ম্যাজিস্ট্রেট চলে যাবার পর আমি চোখ বন্ধ করে মনে মনে আল্লাহর প্রতি শুকরিয়া জ্ঞাপন করতে লাগলাম। এমন সময় এই প্রচন্ড ভীড়ের মধ্যে ট্রেনের বাইরে থেকে একজন একটা ইনভেলাপ আমার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল, এই যে মাওলানা সাহেব! ভালোই হলো আপনাকে এখানে পেয়ে গেলাম।

এই নেন আপনার পাওনা টাকাটা রাখেন। এই বলে ইনভেলাপটা আমার হাতে ধরিয়ে দিয়ে কিছু বুঝে উঠার আগেই মুহুর্তের মধ্যে লোকটি ভীড়ের মধ্যে মিলিয়ে গেলো। আর ঠিক ঐ মুহুর্তে ট্রেনও পরবর্তী গন্তব্যের উদ্দেশে চলতে শুরু করল। এতো অল্প সময়ের ব্যবধানে ঘটনাগুলো একের পর এক ঘটে গেলো যে, পাশে বসা আমার স্ত্রী তো নয়ই- স্বয়ং আমিও কিছুই বুঝে উঠতে পারলাম না।

অতঃপর কিছুটা ধাতস্থ হয়ে আমি কাঁপা কাঁপা হাতে ইনভেলাপটা খুলে গুনে দেখলাম ভিতরে চকচকে নতুন পাঁচ’শ টাকার বারোটি নোট অর্থাৎ, ছয় হাজার টাকা রয়েছে। ঐ মুহুর্তে এই অভাবনীয় কান্ড কারখানা দেখে মহান মালিকের প্রতি কৃতজ্ঞতায় আমার ভিতরে আবেগের তুফান বইতে লাগলো।

অন্য দিকে বিস্ময়াভিভূত হয়ে ভাবতে লাগলাম, এই ম্যাজিস্ট্রেট ভদ্রলোককে তো আমি চিনি না। জীবনে কখনো দেখেছি বলেও মনে হয় না। আর বিগত তিন বছরের কর্ম জীবনে ছয় হাজার টাকা কাউকে কর্জ দিব দূরের কথা এক সাথে কামাইও তো করতে পারিনি। আর যে লোক আমাকে টাকা দিয়ে গেলো, তাকেও আমি জীবনে কখনো দেখিনি।

কোন ভাবেই কোন হিসেব মিলাতে পারছিলাম না, তবে ঐ মুহুর্তে বিশ্বাসের গভীর থেকে একটা উপলব্ধিই আমার সমস্ত সত্ত্বাকে ভীষণভাবে আলোড়িত করছিল। পবিত্র কোরআনের একটি আয়াত বার বার আমার কানে বাজছিল। যেখানে মহান রাব্বুল আলামীন তাঁর বিশ্বাসী বান্দাদের উদ্দেশে এরশাদ করেছেন : ٱدۡعُونِيٓ أَسۡتَجِبۡ لَكُمۡۚ (سُورَةُ غَافِرٍ : ٦٠( অর্থাৎ,“তোমরা আমাকে ডাক, আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দিব।” (সূরা আল মু’মীন : ৬০)

Facebook Comment





© All rights reserved © 2020 TabligNewsBD.Com
Design & Developed BY PopularServer.Com