সোমবার, ২৯ Jun ২০২০, ১২:৩৩ পূর্বাহ্ন

নবীজির হাস্য রসিকতা যেমন ছিল

নবীজির হাস্য রসিকতা যেমন ছিল

 মুফতি নূর মুহাম্মদ রাহমানী

 

বিনোদন, গল্প, চুটকি, রসিকতা, হাস্যরসবোধ মানুষের জন্মগত। মানুষমাত্রই কমবেশি সবাই রসিকতা করে।

ইসলাম মানুষের সুকুমারবৃত্তির ইতিবাচক বিকাশ ও কল্যাণকর প্রকাশ চায়, যা মঙ্গল বয়ে আনবে। এমন কোনো আনন্দ বা বিনোদনের অনুমতি দেয়নি যা অমঙ্গলের কারণ হবে।

ইসলাম শুধু এর অনুমতি দিয়েছে এমন নয় বরং ক্ষেত্রবিশেষে উৎসাহও দিয়েছে। কিন্তু বাড়াবাড়ি ও সীমালংঘন করতে নিষেধ করেছে।

আমাদের নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) নিজেই কখনো কখনো রসিকতা করেছেন। নবীজির রসিকতা ছিল বাস্তবসম্মত সত্য সুন্দর। এতে কারও মনে কষ্ট যেত না।

হজরত আনাস (রা.) বর্ণনা করেন যে, একবার এক ব্যক্তি এসে নবী কারিম (সা.) এর কাছে একটা বাহনজন্তু চাইল। রাসুল (সা.) বললেন, হাঁ, আমরা তোমাকে একটা উটনীর বাচ্চা দেব।

লোকটি বলল, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি উটনীর বাচ্চা দিয়ে কী করব? রাসুল (সা.) বললেন, আরে উটেরা সব উটনীদেরই বাচ্চা নয় কি? (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস : ৪৯৯৮)

নবীজির রসিকতা ছিল শিক্ষণীয়: কত সুন্দর প্রেমময়, আবেগময় ছিল আমার নবীর রসিকতা। তার রসিকতা দুঃখের ক্ষতে মহৌষধের কাজ দিত।

হজরত আনাস (রা.) বলেন, যাহির নামে এক গ্রাম্য সাহাবি গ্রামের বিভিন্ন জিনিস নবী (সা.)-কে হাদিয়া দিতেন। নবী (সা.)ও তাকে শহরের বিভিন্ন জিনিস দিয়ে বিদায় করতেন।

তিনি বলতেন, যাহির হল আমাদের গ্রাম। আমরা তার শহর। তিনি তাকে খুবই ভালোবাসতেন। তো একদিনের কথা। হজরত যাহির (রা.) বাজারে তার পণ্য বিক্রি করছিলেন। এ অবস্থায় নবীজি (সা.) সেখানে উপস্থিত। তিনি পেছন দিক থেকে প্রিয় সাহাবিকে জড়িয়ে ধরলেন।

হজরত যাহির তাকে দেখতে পাচ্ছিলেন না। তিনি (বিরক্ত হয়ে) বলে উঠলেন, এই কে? আমাকে ছেড়ে দাও। তারপর পিছন ফিরে তাকালেন। দেখলেন তিনি যে রাসুলুল্লাহ (সা.)।

(প্রিয় নবীর রসিকতা যে তার বুকের ভেতর ভালোবাসার কি ঝড় বইয়ে দিয়েছিল তা সহজেই অনুমেয়। সুতরাং সে ঝড়ের কবলে তিনি নিজেকে সপেঁই দিলেন)।

কালবিলম্ব না করে নিজেকে আরও পেছন দিকে নিয়ে যেতে থাকলেন। এভাবে একদম সেঁটে গেলেন পরম প্রিয়ের বুকের সঙ্গে। নবীজিও তাকে বুকে ধরে রাখলেন। তারপর রসিকতার মাত্রা যোগ করলেন। বললেন, কে কিনবে? এই গোলামটি বিক্রি করব।

হজরত যাহির দেখতে সুশ্রী ছিলেন না। বলে ওঠলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! দাম বড় সস্তা হবে। প্রিয় নবী (সান্তনা দিলেন এবং আসল কথাটিই) বললেন, কিন্তু আল্লাহর কাছে তুমি সস্তা নও। তার কাছে তোমার দাম অনেক।

রসিকতা একটি মোক্ষম দাওয়াই। এর দ্বারা মানব জীবনের বহু পারিপাশ্বিকতা সারিয়ে তোলা যায়। কোনো অনাকাঙ্খিত পরিবেশে যখন গুমোট ভাব দেখা দেয়, তাকে সহজ করার জন্য হালকা রসিকতা খুবই কার্যকর।

তবে এ ব্যাপারে মাত্রাজ্ঞানের পরিচয় দিতে হবে। রসিকতার যথাযথ প্রয়োগ করতে হবে। দিতে হবে সচেতনতার পরিচয়। মনে রাখতে হবে, অন্যকে আহত করে এমন কোনো রসিকতা সাম্যের ধর্ম ইসলাম অনুমোদন করে না।

মহান আল্লাহ বলেন, ‘হে মুমিনগণ! পুরুষরা যেন অপর পুরুষদেরকে উপহাস না করে। তারা (অর্থাৎ যাদেরকে উপহাস করা হচ্ছে, তারা) তাদের চেয়ে উত্তম হতে পারে। এবং নারীরাও যেন অপর নারীদেরকে উপহাস না করে। তারা (অর্থাৎ যে নারীদেরকে উপহাস করা হচ্ছে) তাদের চেয়ে উত্তম হতে পারে। তোমরা একে অন্যকে কটাক্ষ করো না এবং একে অন্যকে মন্দ উপাধিতে ডেকো না (এসব ফাসেকি কাজ। আর) ইমানের পরে ফাসেকি নামযুক্ত হওয়া বড় খারাপ কথা। যারা এসব থেকে বিরত না হবে তারাই জালেম।’ (সূরা হুজুরাত, আয়াত : ১১)

প্রায়ই আমাদের রসিকতা হয় লাগামহীন। হয় তাতে মিথ্যা কথা বলি, নয়ত কাউকে আহত করি। কাউকে সমাজের চোখে হেয় করি কিংবা বারবার এক কথা বলে বিরক্ত করি। এ সবই কবিরা গোনাহ। মহাপাপ।

এজন্যই এক হাদিসে আল্লাহর নবী (সা.) বলেছেন, ‘তোমার ভাইয়ের সঙ্গে বাকবিতণ্ডা করো না এবং তার সঙ্গে উপহাস করো না।’

তাই রসিকতাকে সব ধরনের ক্ষতি থেকে রক্ষা করে সুফলদায়ী করার জন্য কর্তব্য হবে স্থান কাল পাত্র বিবেচনা রেখে রসিকতা করা। ভাষা, পরিমাণ, বিষয়বস্তুর ধরন-ধারণ ইত্যাদিতে পরিমিতিবোধের পরিচয় দেওয়া।

এ সম্পর্কে বিখ্যাত সাহাবি হজরত সাঈদ ইবনুল আস (রা.) এর উক্তি প্রণিধানযোগ্য।

হজরত সাঈদ ইবনুল আস (রা.) নিজ ছেলেকে উপদেশ দিতে গিয়ে বলেন, বাছা! রসিকতায় পরিমিতিবোধের পরিচয় দিও। এতে বাড়াবাড়ি ভাবমূর্তি নষ্ট করে ও মূর্খদের অন্তরে ধৃষ্টতার জন্ম দেয়।

আবার এর অভাবে প্রিয়জনেরা তোমার থেকে দূরে সরে যাবে এবং সাথী-সঙ্গীরা তোমাকে নিয়ে অস্বস্তি বোধ করবে। (আদাবুদ দুনয়া ওয়াদ দীন, পৃ. ২৭১)

লেখক: মুহাদ্দিস জামিয়া আরাবিয়া দারুল উলূম বাগে জান্নাত, নবাব সলিমুল্লাহ রোড, চাষাড়া, নারায়ণগঞ্জ।

Facebook Comment





© All rights reserved © 2020 TabligNewsBD.Com
Design & Developed BY PopularServer.Com