শুক্রবার, ২৯ মে ২০২০, ০৪:০৫ অপরাহ্ন

মাওলানা যুবায়ের একদা আমাদের রাহবার ছিলেন

মাওলানা যুবায়ের একদা আমাদের রাহবার ছিলেন

শামীম হামিদী, অতিথি লেখক। তাবলীগ নিউজ বিডিডটকম। কাকরাইলের মাওলানা যুবায়ের সাহেব, একনামে যিনি পরিচিত। আমাদের প্রাক্তন মুরুব্বী। তাঁর থেকে দ্বীনের চলার পথে অনেক রাহবারী গ্রহণ করেছি এক সময়ে। মাওলানা সাদ সাহেবও আমার মুরুব্বী। তাঁর থেকেও দ্বীনের অনেক বড় বড় রাহবারী গ্রহণ করেছি। বরং বলতে পারি দ্বীন যতটুকু শিখেছি তার অর্ধেকের বেশী সাদ সাহেবের বিভিন্ন মুজাকারা থেকেই শিখেছি। দাওয়াতের এই মোবারক মেহনতের লাইনে নিজামুদ্দিনের অনুসরণ করি মারকাজ হিসাবে। পূর্ববর্তী আকাবিরগণ এই মারকাজ স্থাপন করেছেন। এ ব্যাপারে আগের তিন হজরতজী এবং মাওলানা যুবায়েরুল হাসান, শায়খুল হাদীস জাকারিয়া, মাওলানা আলী মিয়া নদভী, মাওলানা মনজুর নোমানী প্রমুখ আকাবির রহিমাহুমুল্লাহ এবং হাজী সাহেবের বিভিন্ন মালফুজাত দেখা যেতে পারে।

মাওলানা সাদ কান্ধলভী দা.বা.কে এই কাজের মুরুব্বী মানি আমির হিসাবে। কারণ তিনি পূর্ববর্তী আকাবিরদের মাসোয়ারা, তাবলীগের উসূল এবং সুন্নত তরীকা মেনেই যথাযথ ভাবে আমীর হয়েছেন। এটা কোন ব্যক্তিপূজা বা স্থানপূজা নয়। তিন জনের জামাত হলেও একজন আমীর নিযুক্ত করার হুকুম রয়েছে। আমীর মানা ওয়াজীব ঘোষণা করা হয়েছে। আমীর যে স্থান থেকে উম্মতের খিদমতের আঞ্জাম দেন তাকে শরীয়তের পরিভাষায় মারকাজ বলা হয়। সিয়াসী পরিভাষায় যা রাজধানী হিসাবে পরিচিত। এটা এক ভিন্ন আলোচনা। এ ব্যাপারে আলাদা পোস্ট হতে পারে।

এক বুজুর্গ-এর মোকাবেলায় আরেক বুজুর্গকে ছোট করতে চাই না। কারণ আমি নিজেকে তার যোগ্য মনে করি না। মূলতঃ তাঁদের দুইজনের কেউই আমার কাছে দ্বীনের দাওয়াত নিয়ে আসেননি। আমার কাছে প্রথম দাওয়াত নিয়ে এসেছিলেন মহল্লার পল্লী চিকিৎসক বাহাদুর ডাক্তার। এরপর একই মহল্লার ফরিদ কন্ট্রাক্টর এর হাত ধরে প্রথম ৩ দিনে যাওয়া। ভার্সিটিতে হলে এসে আমীর সাব জাকির ভাই, শামীমুল, জহুরুল ভাইয়ের হাত ধরে পুরাপুরি এই কাজের মধ্যে ঢুকা। এরপর হলের তৎকালীন আমীর সাহেব ইমরান ভাইয়ের মাধ্যমে টঙ্গী এস্তেমাতে আসা। ২০০৪ এর জানুয়ারিতে হয়তো হবে। একদিনের জন্যই আসা। শুক্রবার দিন। শুক্রবার নাকি সচরাচর সাদ সাহেব বয়ান করেন।

-সাদ সাহেব কে?
–সারা দুনিয়ার আমীর। আমাদের হলের আমীর যেমন ইমরান ভাই। তেমনি সাদ সাহেব সারা দুনিয়ার আমীর।
-আচ্ছা! আরব নাকি? তখনও ইসলাম বলতে আমি মক্কা মদিনাই বুঝতাম। তখনও দেওবন্দ নিজামুদ্দিন এগুলো সম্পর্কে কিছু শুনিনি।

–না আরবের নন। ভারতের। তবে সিদ্দিকী।
-সে কি জিনিস?
–আবুবকর রদিয়াল্লাহু আনহু- এর বংশধর।

ব্যাপক শ্রদ্ধাবোধ নিয়েই বিপুল উৎসাহ উদ্দীপনা নিয়ে অনেক কষ্টে সামনে গিয়ে বয়ান শুনলাম। কেমন শুনলাম সে গল্প পরে বলব। মিম্বরে দেখলাম পাশে একজন বসা।
-উনি কে?
–ও মা ! উনাকে চিন না! যুবায়ের সাহেব!
-হ্যাঁ কাকরাইলে বয়ান শুনেছি। কিন্তু সেখানে তো অন্যান্য মাহফিলের মত নাম বলে না। কেমনে চিনবো?

যাইহোক এতটুকু বুঝলাম যুবায়ের সাহেব বিরাট বুজুর্গ এবং বিরাট আলেম হবেন। তখনও আলেমের সংজ্ঞা ভালোভাবে জানতাম না। সারা দুনিয়ার আমীর সাহেবের পাশে বসে তাঁরই বয়ান অনুবাদ করেন। বিরাট বুজুর্গ এবং আলেম না হলে কি এটা সম্ভব।

এভাবেই যুবায়ের সাহেবকে চেনা এবং তাঁর প্রতি আমার ভালোবাসা ও শ্রদ্ধাবোধ। যুবায়ের সাহেবের নাম শুনলেই অন্তর একটা পবিত্র অনুভূতি ও তৃপ্তিতে ভরে উঠত। উনার বয়ান শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত তাকিয়ে তাকিয়ে শুনতাম। ভাবতাম কত বড় আল্লহর ওলী! সাদ সাহেব আধা ঘণ্টা ৪০ মিনিট কথা বলেন, তিনি হুবহু তরজমা করে দেন। তখন পর্যন্ত এটাই নেকগুমান ছিল যে তিনি হুবহু অনুবাদ করেন। এমন একজন বুজুর্গ আমাদের দেশে! গর্বে বুক ভরে উঠতো। তখনো বৈশ্বিক বা আলমী ফিকির গড়ে উঠেনি। বলা যায় খাঁটি দেশপ্রেমিক টাইপের ছিলাম।

যুবায়ের সাহেব একজন মুখলিস মানুষ। হায়াতুস সাহাবার ‘অনুবাদকের কথা’য় তিনি নিজেকে পরিচয় দিয়েছেন বান্দা যুবায়ের হিসাবে। তিনি নিজেকে কোথাও ‘মাওলানা’ পরিচয় দেননি। পাক ভারতের বুজুর্গগণ তাঁকে ‘ক্বারী সাহাব’ নামেই চিনেন। কাকরাইলেও তিনি ‘হাফেজ সাব হুজুর’ নামে পরিচিত। কি উস্তাদ, কি ছাত্র, কি তাঁর সহকর্মী সবাই ডাকতো ‘হাফেজ সাব হুজুর’। আমরা ভাবতাম এটা হযরতের বিনয়। বড়রা এমনই হন। তিনি বড় ইখলাসের পরিচয় দিয়েছেন।

একবার আমি কি কাজে কাকরাইলে গিয়েছিলাম। তখন উত্তর পাশে বড়দের কামরা ছিল। নীচে অজুখানা ছিল। আমি ওযু করছিলাম। আসরের কিছু আগে। উত্তর পাশের সিঁড়িতে এক মার্জিত যুবক পাহারায়। কি চেহারা, কি ভাষা, কি পোশাক আষাক! সব কিছুতেই মার্জিত রুচির ছাপ। তবে নতুন সাথী। ছোট ছোট দাঁড়ি। গায়ে নকশী সাদা পাঞ্জাবী। মনে হয় একমাসও হয়নি। হয়ত মাত্রই কাজে লেগেছে। জজবায় চলে এসেছে। এমন সময় যুবায়ের সাহেব উঠতে যাবেন, তখন ঐ নতুন সাথী খুব অমায়িক ভাষায় বলল, “জনাব! এই সিঁড়ি শুধুমাত্র মুরুব্বী এবং বিদেশী মেহমানদের জন্য। অন্যান্য মেহমানদের জন্য পূর্ব পাশের সিঁড়ি ব্যবহার করতে অনুরোধ করা হয়েছে।” আহারে বেচারা! নতুন সাথী! তখনও তাবলীগের ভাষা গুলো রপ্ত করতে পারেনি। ঘটনাটি এখনো আমার চোখের সামনে ভাসে। যুবায়ের সাহেব চুপচাপ পূর্ব দিকে হাঁটা দিলেন। এরপর একটা জটলার মত হয়। কিছুক্ষণ পরে ঐ সাথীকে প্রত্যাহার করা হয়। পরে ঢাকায় মাসওয়ারাতে ফয়সালা হয় ওখানে নতুন সাথী পাহারায় না দেয়া। কিন্তু আমার এমন একটা অনুভূতি হয়েছিলে যে মনে হচ্ছিলো যুবায়ের সাহেবের পায়ের তলায় চুমু খাই। কি ইখলাস! মাশাআল্লাহ।

অতিরিক্ত সম্মানের কারণেই কখনও যুবায়ের সাহেবের সাথে সরাসরি কথা বলার সুযোগ হয়নি। সত্যিকথা বলতে কি সাহস হয়নি। এত বড় বুজুর্গ! যদি কোন বেয়াদবি হয়! একবার মুশফিক স্যার ইস্যুতে কাকরাইলের মাসোয়ারায় আমাদের ডাক পড়েছিল। আমাদের ভার্সিটিতে প্রায় সব হলেই স্যার আসতেন। এটা নিয়েই ডাক। যুবায়ের সাহেবকে দেখেছিলাম স্যারের নামই শুনতে চাননা। আমাদের বেশ বকাবকি করলেন, স্যার কেন আসে? বেশ রাগান্বিত হয়ে গিয়েছিলেন। আমাদের ফারুক স্যার আমাদের ডিফেন্ড করার চেষ্টা করতে গিয়ে তিনিও ধমক খেলেন। সেই তুলনায় ওয়াসিফ ভাই অতো প্রতিক্রিয়া দেখান নি। তিনি শান্ত ভাবেই বলেছেন, “তোমরা তোমাদের মেহনত করবে। স্যারকে আনার দরকার নেই।” আমরা পরবর্তীতে স্যারকে আমাদের অপারগতা জানিয়ে দিয়েছিলাম। আমার জানামতে স্যার এরপর আর কখনো আমাদের ভার্সিটিতে যান নি। পরবর্তীতে যুবায়ের সাহেব স্যারকে কাকরাইলে আসাও নিষেধ করে দেন। তখনও ওয়াসিফ ভাই মানা করে ছিলেন। বলেছিলেন, উনি কাকরাইলে এসে চুপচাপ মেহনত করলে কি অসুবিধা। যুবায়ের সাব খুব কড়া ভাষায় বললেন, না সে আসবে না। কি কি যেন ফিৎনা হচ্ছে বলছিলেন। দূরে ছিলাম, পুরোটা ভালো ভাবে শুনিনি। পরে যুবায়ের সাহেবের অনুরোধে ওয়াসিফ ভাই এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করেন। যুবায়ের সাহেবকে সবাই পীরের মত সম্মান করলেও ওয়াসিফ ভাই ঢাকার সাথীদের খুব ম্যানেজ করতে পারতেন। এরপর মুশফিক স্যার নিজে নিজে জামাত বের করার চেষ্টা করেন। দেশের কোন মসজিদে তাঁর জামাত উঠতে দেয়া হয়নি। শেষ পর্যন্ত স্যার রুখে দাঁড়ান। যুবায়ের সাব এবং ওয়াসিফ ভাইয়ের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ এনে লিফলেট, প্রেস কনফারেন্স অনেক কিছু করেছেন। এ নিয়ে অনেক ফিৎনা হয়েছে। যুবায়ের সাহেবকে দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও অনিয়মের হোতা এবং ওয়াসিফ ভাইকে তাঁর পাণ্ডা হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছিলো সেসব লিফলেটে। স্যার সব কিছুর মূলে যুবায়ের সাহেবকে দোষারোপ করে বলেছিলেন, দুর্নীতি মূল সমস্যা নয়। মূল সমস্যা স্বজনপ্রীতি। যুবায়ের সাহেব কিভাবে তাঁর আত্মীয় ও কাছের লোকদের দ্বারা কাকরাইল মসজিদ ভরে ফেলেছিলেন সে সম্পর্কে বিস্তর অভিযোগ করে ছিলেন। আপাতত এসব থাক, এটা পরে আরেক পোস্টে আলাপ করা যাবে। স্যারের সাথে যুবায়ের সাহেবের কি সমস্যা আজ পর্যন্ত জানতে পারিনি। তবে যুবায়ের সাহেবের প্রতি আমার অপরিসীম ভালোবাসা বজায় ছিল। আসলে এখনো আছে।

নিয়তির পরিহাস! শত্রুর শত্রু বন্ধু থিওরিতে মুশফিক স্যারের ভক্তগণ এখন যুবায়ের সাহেবের পরম ভক্ত হয়ে গেছে। তাদের লিফলেটবাজি এখনো বহাল আছে। তবে সেখান থেকে যুবায়ের সাহেবের নাম উধাও হয়ে শুধু ওয়াসিফ ভাইয়ের নাম আছে। যুবায়ের সাহেবের ভক্তগণও মুশফিক স্যারের ভক্তদের প্রতি অনেক রহম দিল হয়ে গেছে। এবং মুশফিক স্যারের যাবতীয় ব্যাপারে যুবায়ের সাহেবকে নির্দোষ রেখে ওয়াসিফ ভাইয়ের উপরে যাবতীয় দোষ চাপাচ্ছে। এজন্য তারা ওয়াসিফ ভাইয়ের নেতৃত্ব লোভকেই দায়ী করছে। ওয়াসিফ ভাই নেতৃত্ব লোভী হলে এই আলমী শূরা হবার সুযোগ তিনি ছাড়তেন না। আর মুশফিক স্যারের ব্যাপারে যুবায়ের সাহেবও পুরাপুরি মুক্ত নন। ওই মজলিস গুলোতে আমি নিজেই হাজির ছিলাম।

যুবায়ের সাহেব নিজেও সাদ সাহেবের খুব অনুরক্ত ছিলেন। সাদ সাহেবের তুলনায় নিজেকে খুব হাকীর মনে করতেন। এটা তাঁর ইখলাস ও বিনয়ের কারণেই হয়তো হবে। বিভিন্ন সময়ে সাদ সাহেবের ইলম ও প্রজ্ঞার প্রশংসা করেছেন। একবার এক মুজাকারায় বলেছিলেন সাদ সাহেবের বয়ান অনুবাদ করতে গিয়ে তিনি হয়রান হয়ে যান। তিনি সব সময়ে আল্লাহ তায়ালার সাহায্য প্রার্থনা করতে থাকেন। এছাড়া অনুবাদের সময়েও দেখেছি কিছু কিছু ব্যাপারে বেশ হাসি মুখে উৎসাহ নিয়ে দুই একটি কথা বেশ জোর দিয়ে বলতেন। যেন সাদ সাহেবের বিশ্লেষণ ক্ষমতায় তিনি মুগ্ধ!

তিনি এত বছর ধরে সাদ সাহেবের বয়ানের তরজমা করে আসছেন। এখন সে সমস্ত ভুল ভ্রান্তি কথা উল্লেখ করে সাদ সাহেবকে তাড়িয়ে দিয়ে বিরাট ইসলামী দায়িত্ব পালনের তৃপ্তির ঢেকুর তোলা হচ্ছে, এমন বড় বড় ভুল, যার কারণে কিনা তাঁকে বয়কট করা যায়, অপমান করে তাড়িয়ে দেয়া যায় সেগুলো তো জুবায়ের সাহেবের চোখেই প্রথম পড়ার কথা। তাঁকে এতকাল সাদ সাহেবের প্রশংসাই করতে শুনলাম।

হঠাৎ ২০১৭ সাল থেকে কী হল বুঝলাম না। ২০১৪ সালের ইজতেমার পরে মাওলানা যুবায়েরুল হাসান রহমাতুল্লাহ আলাইহি ইন্তেকাল করেন। এরপর ২০১৫ সালেও দেখলাম যুবায়ের সাহেব সুন্দর ভাবে হাসিমুখে তরজমা করেছেন। সাদ সাহেবের সাথে সম্মানের সাথে আদবের সাথে আচরণ করেছেন। এরপর ২০১৫ সালে পাকিস্তানের ইস্তেমাতে তথাকথিত ‘আলমী শূরা’ বানানো হয়। ২০১৬ তেও তিনি হাসিমুখে বয়ান তরজমা করলেন। ২০১৬ পাকিস্তান এস্তেমাতেও তিনি ‘আলমী শূরা, অস্বীকার করেছেন এবং নিজামুদ্দিনের ইতায়াতের কথা জোর দিয়ে বলেছেন বলে ওয়াসিফ ভাই দাবি করেছেন। ‘তাবলীগের বর্তমান সংকট ও সাদ সাহেবের কিছু অজানা কথা’ নামক কিতাবে বিস্তারিত তথ্য প্রমাণ পেশ করা হয়েছে। ২০১৭ টঙ্গী এস্তেমাতে এক মাসোয়ারাতে সাদ সাহেবকে আমীর বানানো হয়। এরপরে ২২ জানুয়ারি জুবায়ের সাহেবের উপস্থিতিতে এক মজমায় ফারুক সাহেবের দস্তখতে একটা চিঠি ইস্যু করা হয়েছে, যা সারা দুনিয়ার জিম্মাদার সাথীদের নিকটে পাঠানো হয়। তখন যুবায়ের সাহেব নিজেই হাজির ছিলেন। এখন তাঁর কি হল জানি না। যুবায়ের সাহেবের কোন অসুবিধা বা আপত্তি বা কিছু বলার থাকলে তখনই বলতে পারতেন। অথবা কিছু পরে চিঠি দিয়েও নিজের অবস্থান পরিষ্কার করতে পারতেন। কিন্তু তা কোনোটাই করেন নি।

২০১৬ সালের শেষের দিকে সাদ সাহেবের কিছু কথার উপরে দ্বিমত পোষণ করে দেওবন্দ থেকে একটা ফতোয়া ইস্যু করা হয়। তখনও যুবায়ের সাহেব থেকে কিছু শুনিনি। ২০১৭ সালের পাকিস্তান ইজতেমা থেকে ফিরে তিনি সাদ সাহেবের বিরোধিতা শুরু করেন। জানি না! তখন তার কী অপারগতা  ছিল!

এরপর থেকে আমার সম্মানিত মুরুব্বী এবং অনানুষ্ঠানিক মুর্শিদ যুবায়ের সাহেবের আচরণ বড়ই বেদনাদায়ক। ২০১৭ সালের ৫ দিনের জোড়ে নিজামুদ্দিনের সাথীদের শরীক হতে দেয়া হয়নি। সাদ সাহেবের বিরুদ্ধে না হয় দেওবন্দের ফতোয়া আছে। তাঁদের কি সমস্যা ছিল? তাঁদের বিরুদ্ধে পূর্বের এমন কোন অভিযোগও নেই। তারা তো শুধু কাজের মুজাকারাই করতেন, যা আগে থেকে চলে আসছে। তাঁদের শরিক হতে দেয়া উচিত ছিল বলেই মনে করি। দেশের বরেণ্য আলেমরা তো জুবায়ের সাহেবের সাথেই ছিলেন। তাঁরাও শরিক হতেন, নিজামুদ্দিনের জামাতের বয়ানের তদারকি করতেন। ভুলের লিস্ট করে তাঁদের বলা যেত যে তোমরা এই এই ভুল করেছ, তাই পরে তোমরা আর আসতে পারবে না। অনেক নাটকের পরে নিজামুদ্দিনের জামাত শেষদিন শুধু দুআতে শরীক হতে চেয়েছিলেন। তাও ছলচাতুরী করে একদিন আগেই দুআ করে শেষ করা হয়েছে। যদি আমার হজরত যুবায়ের সাহেব হকের উপরেই থাকেন তাহলে এই ছলচাতুরির কি দরকার ছিল! হকওয়ালাদের জন্য কি আল্লাহই যথেষ্ঠ নন?

কিছুদিন আগে জুবায়ের সাহেবের দস্তখতসহ এক চিঠি এসেছিল। সেখানে দাবি করা হয়েছিল সাদ সাহেব টুরিস্ট ভিসায় বাংলাদেশ এসেছেন, যা পরবর্তীতে মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে। জুবায়ের সাহেব এই চিঠির কোন প্রতিবাদ করেন নি। এমনি আরো বিভিন্ন চিঠিতে তাঁর নামে ইস্যু করা হয়েছে যাতে প্রচুর মিথ্যা ও চাতুর্য্যপূর্ণ তথ্য ছিল। বিস্তারিত এই ক্ষুদ্র পরিসরে আলাপ করতে পারছি না। তা ছাড়া এটা যুবায়ের সাহেবের ইসলাহ বা তাঁর মানহানির কোন পোস্ট নয়। এই পোস্টের উদ্দেশ্য তাঁর ব্যাপারে আমার নিরপেক্ষ মতামত তুলে ধরা। আরো একটা চিঠিতে পরবর্তী ইজতেমা ও জোরের তারিখ ঘোষণা করে ইস্যু করা হয়। সেখানে ৭ জন শূরার দস্তখত ছিল। যুবায়ের সাহেবেরও দস্তখত ছিল। যে তারিখ ওই চিঠিতে উল্লেখ ছিল সেই তারিখে তিনি ঢাকাতেই ছিলেন না। বাহিরে এক এস্তেমাতে ছিলেন। আরো বিভিন্ন শূরার সাথীরা দাবি করেছেন তাঁদের থেকে আংশিক তথ্য দিয়ে দস্তখত নেয়া হয়েছে। যেমন মাওলানা মুজাম্মিলুল হক। তিনি পরবর্তীতে স্ট্যাম্প দলীল করে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করেন। আমার হজরত আজ পর্যন্ত ওই চিঠির প্রতিবাদ করেন নি। তার মানে আমরা যদি ধরে নিই তিনি ঐ মিথ্যার উপরেই এখনো অটল আছেন, তাহলে ভুল হবে না। ভাই ওয়াসিফ সাহেব এবং ঢাকার বিভিন্ন জিম্মাদার সাথীরা ওই চিঠির ভুল/মিথ্যা তথ্য এবং চাতুর্য্যপূর্ন তথ্য গুলো পরিষ্কার ভাষায় দেখিয়ে দিয়েছেন। এছাড়া ইজতেমার পূর্বে সরকারনিযুক্ত এক জামাত ভারত সফর করে সরকারের নিকট প্রতিবেদন পেশ করেন। আবার যুবায়ের সাহেব সাথীদের নিকটেও আলাদা ভাবে কারগুজারী শোনান। এই দুই রিপোর্ট ও কারগুজারীর মধ্যে যথেষ্ট ফারাক ছিল।  কিছু পূর্বে বর্ণিত কিতাবে বিস্তারিত উল্লেখ করা হয়েছে। ইজতেমার পরবর্তী কারগুজারিতেও তিনি জামাত সংখ্যা এবং বিদেশী উপস্থিতির যে পরিসংখ্যান দিয়েছেন তাতে সত্যের অনেক অপলাপ হয়েছে বলেই পরবর্তীতে প্রমাণিত হয়েছে। আরো পরের দিকে সরকারের কাছে এক আবেদনে ওয়াসিফ ভাইকে কাকরাইলে আসতে না দেয়ার আবেদন জানানো হয়। ঐ আবেদনে তাঁরও দস্তখত আছে। সেখানে কিছু পত্রিকা রিপোর্ট উল্লেখ করে ওয়াসিফ ভাইয়ের ব্যাপারে দুর্নীতির অভিযোগ আনেন। এই রিপোর্ট গুলো মুশফিক স্যারের অভিযোগের ভিত্তিতে করা হয়েছিল। মজার ব্যাপার হল সেই রিপোর্ট-এ যুবায়ের সাহেবের নামও আছে!

আমি জানিনা, হজরত হঠাৎ কেন পরিবর্তন হয়ে গেলেন। কেন নিজামুদ্দিনের বিপরীতে এই মিথ্যা ও ছলচাতুরির আশ্রয় নেয়া শুরু করলেন। সাদ সাহেবের কোন ভুল হলে তাকে ভুলই বলতে হবে কিন্তু পরবর্তী অসত্য ও ছলচাতুরি গুলোর কি ব্যাখ্যা।

তবে তাঁর উপর সম্মান এখনো হারাইনি। শুনেছি তিনি এস্তেমায়ি মজলিসে এসব ইখতিলাফ নিয়ে আলোচনা না করে ছয় নম্বরের মধ্যেই আলোচনা সীমিত রাখেন। ইনফারাদি ভাবে তিনি একাধিকবার সাদ সাহেবের প্রতি মুহাব্বত প্রকাশ করেছেন। আমিও যুবায়ের সাহেবকে মুহাব্বত করি। তাঁর সমালোচনার যোগ্যতা আমার নেই। কেউ সমালোচনা করলেও ব্যাথিত হই। কিন্তু নিজেকে তাঁর বর্তমান অবস্থার কোন ব্যাখ্যাও দিতে পারি না। হতে পারে তাঁর কোনো মজবুরি আসলেই আছে। অথবা হতে পারে এখানে তাঁর কোন হেকমত আছে। হতে পারে যখনই অনুকূল পরিবেশ আসবে তিনি তাঁর মজবুরির কারণ প্রকাশ করে রুজু করবেন। তাই আপাতত তাঁর জন্য দুআ কান্নাকাটি করাই শ্রেয় মনে করছি, যেমন আব্দুল্লাহ আন্দালুসী রহমাতুল্লাহ আলাইহির মুহিব্বীনরা করেছিলেন। তবে এই নাজুক অবস্থায় তাঁর কোন কথা বা সাক্ষ্যের উপর ভরসা রাখতে পারছি না।

Facebook Comment





© All rights reserved © 2020 TabligNewsBD.Com
Design & Developed BY PopularServer.Com
error: Content is protected !!