শনিবার, ২৭ Jun ২০২০, ১১:১৯ অপরাহ্ন

সংবাদ শিরোনাম ::
পাকিস্তানের শীর্ষ আলেম মুফতি নাঈমের ইন্তেকল হাটহাজারীর শুরার সিদ্ধান্ত ও আমার কিছু কথা : আবু রেজা নদভী এম পি উভয় আমাদের কাছে সম্মানীত : সৈয়দ মবনু তবলীগ আমাদের, হাটহাজারীও আমাদের  “আড়ালের সাতকাহন”” প্রসঙ্গ হাটহাজারী: অশালীন শব্দচর্চা ওয়ারাসাতুল আম্বিয়াদের ভাষা হতে পারে না আমরা কি আজীবন মসজিদ মাদ্রাসা নির্ভর থাকব? বাবুনগরীর অব্যাহতি নিয়ে আধা ঘণ্টার ব্যবধানে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য মুঈনে মুহতামীমের পদ থেকে আমি পদত্যাগ চাইনি : আল্লামা বাবুনগরী খাজা মঈনুদ্দীন চিশতি রহঃকে নিয়ে অবমাননায় নিন্দা সাইয়েদ আরশাদ মাদানির হাটহাজারী মাদরাসার শূরার বৈঠকে গুরুত্বপূর্ণ তিন সিদ্ধান্ত
আমরা কেন মৃত্যুকে ভয় করি? সৈয়দ মবনু’র কলাম

আমরা কেন মৃত্যুকে ভয় করি? সৈয়দ মবনু’র কলাম

আমরা কেন মৃত্যুকে ভয় করি?

-: সৈয়দ মবনু :-

আমরা কেন মৃত্যুকে ভয় করি? সহজ উত্তর; আমাদের ঈমানের দূর্বলতা। প্রশ্ন হলো; আমাদের ঈমান দূর্বল কেন? সহজ উত্তর; এক মন দিয়ে দুই জিনিষকে সমানভাবে ভালোবাসা যায় না। কিছুও কম-বেশ হয়। আমাদের মনে আল্লাহ এবং গায়রুল্লাহ অর্থাৎ দুনিয়ার মহব্বত এক সাথে কাজ করে। কিন্তু মনতো একটা, এক মনে সমান ওজন রাখা সম্ভব হয় না। আর আমাদের নফসে আম্মারা অর্থাৎ দুস্ট মন দুনিয়ার প্রতি বেশি আকর্ষিত হয়ে যায়। ফলে ধীরে ধীরে আমাদের ঈমান দূর্বল হতে থাকে।

হযরত রাসুল (স.) বলেছেন, তাঁর আখেরি জামানার উম্মত সংখ্যায় বেশি হওয়ার পরও যে দুটি কারণে পরাজিত হবে তা হলো; ‘দুনিয়ার মহব্বত এবং মৃত্যুর ভয়।’ আসুন আমরা নিজেদের মধ্যে গবেষণা করে দেখি। আচ্ছা দেখুন তো, আমাদের মৃত্যুর ভয়ের প্রধান কারণ কি দুনিয়ার মহব্বত নয়? আমরা কেউ চাই না দুনিয়া ছেড়ে চলে যেতে। কেন চাই না? এই প্রশ্নের উত্তরে কারণ কি আমাদের ঈমানের দূর্বলতা নয়? আমাদের যদি আল্লাহর প্রতি ঈমান পূর্ণাঙ্গরূপে থাকতো তবে বিশ্বাস করতাম; মৃত্যু হচ্ছে প্রাণীর জন্য আল্লাহর অনিবার্য একটি বিধান।

এই বিধান প্রাণীমাত্রই কেউ লংঘন করতে পারবে না। সবাইকে এর স্বাদ গ্রহণ করতেই হবে। এই বিধানের স্বাদ আল্লাহর নির্ধারিত সময় ছাড়া কেউ চাইলোও গ্রহণ করতে পারবে না। এ বিধানের নির্ধারিত সময়ে আমি যত সুরক্ষিত এবং সুদৃঢ় দুর্গেই অবস্থান করি না কেন কেউ আমি রক্ষা পাবোনা এবং কেউ আমাকে রক্ষা করতেও পারবে না। সাদ্দাদের মৃত্যু লেখা ছিলো তার তৈরিকৃত স্বর্গের চৌকাটে, তাই সে একটা প্রবেশের পর দ্বিতীয় পা প্রবেশ করার সুযোগ লাভ করেনি। মুসার মুখোমুখি ফেরাউনের মৃত্যু লেখা ছিলো নীল নদে, তাই তার বিশাল সৈন্যবাহিনী তাকে রক্ষা করতে পারেনি।

সুরক্ষিত এবং সুদৃঢ় দুর্গে অসংখ্য পাহড়াদার বেষ্টিত কতো রাজা-বাদশা মৃত্যু বরণ করেছেন, সেই হিসাব দীর্ঘ। আবার অরক্ষিত থেকে শত্রুর মুখোমুখি যুদ্ধের পরও অসংখ্য মানুষ তার নির্ধারিত সময় আসেনি বলে দীর্ঘদিন বেঁচে থেকেছেন। এখানে আমরা খালেদ বিন ওয়ালিদের কথা বলতে পারি, যাবে গোটা পৃথিবী যুদ্ধের জন্য সর্বশ্রেষ্ট সেনাপতি বলে স্বীকৃতি দিয়েছে। তিনি বাদ্ধক্যজনিত কারণে মৃত্যুর সময় আফসুস করে বলছেন, ‘জীবনে অনেক আশা ছিলো শাহাদতের মৃত্যুর, কিন্তু ভাগ্যে জুটেনি।’ একই আফসুস ছিলো হযরত হাসান বসরি (রা.)-রও। মোটকথা হলো, নির্ধারিত সময় ছাড়া কারো মৃত্যু আসে না।

আল্লাহ যাকে ইচ্ছে মৃত্যু দান করেন এবং যাকে ইচ্ছে মৃত্যু থেকে রক্ষা করেন। প্রত্যেকের মৃত্যুর একটা নির্ধারিত সময় রয়েছে। কিন্তু আমরা কি এই কথাটি পূর্ণাঙ্গরূপে বিশ্বাস করতে পারছি? পারলে মৃত্যুর ভয়ে আতংকিত কেন? আমরা যদি আল্লাহ এবং রাসুলের প্রতি পূর্ণাঙ্গ ঈমান বা বিশ্বাস রাখতে পারতাম তা হলে বিশ্বাস করতাম তাদের কথা কোনদিন মিথ্যা হয় না এবং হবেও না। তারা যা বলেছেন সবই সত্য, অর্থাৎ আমাদের মৃত্যু আসবে তা অনিবার্য সত্য।

‘মৃত্যুর পর অনন্তকালের জীবন এবং সেই জীবনে না গেলে আশিক তার মাশুকের দেখা পাবে না’ আমরা কি এই মহাসত্যে বিশ্বাস করতে পেরেছি? এর আগেও প্রশ্ন থেকে যায়, আমরা কি আল্লাহকে বিশ্বাস করি? আমরা কি আল্লাহকে ভালোবাসি? আমরা কি আল্লাহর আশিক? আমরা যারা মৃত্যুর ভয়ে আতংকিত তাদের স্বীকার করতেই হবে, আমরা আল্লাকে যতটুকু বিশ্বাস করলে ভালোবাসি কিংবা তাঁর আশিক বলে দাবী করা যায় ততটুকু বিশ্বাস করি না। যদি করতাম তাহলে মৃত্যুর ভয় আমাদেরকে আতংকিত করতে পারতো না। বরং মৃত্যুর সংবাদে আমরা আনন্দিত হতে পারতাম নিজের প্রেমের, নিজের মাশুকের সাথে দেখা হবে বলে।

অতঃপর দেখা-সাক্ষাতে আর কোন পর্দা থাকবে না। জীবন তো আশিক আর মাশুকের মধ্যখানে একটি পর্দা। এই পর্দা সরে না গেলে কীভাবে মিলন হবে? ঈমানদারেরা মনে করেন, মৃত্যু হলো পরবর্তী জীবনে আশিক আর মাশুকের অনন্তকালের মিলনের অভিষেক। তাই ঈমানদারেরা আমাদের মতো মৃত্যুকে ভয় করেন না। বরং তারা আজীবন মৃত্যুর অপেক্ষায় থাকেন। বলুন তো কোন আশিক চায় না তার মাশুকের মোলাকাত? কোন আশিকের মনে মাশুক থেকে বেশি অন্যকিছুর মহব্বত হয়েছে? ইউসুফের মাশুক ছিলেন আল্লাহ আর জুলেখার মাশুক ছিলেন ইউসুফ। মিশরের রাজ প্রাসাদ, সুন্দরী নারী আর ধন-সম্পদ কিছুই ইউসুফকে আকৃষ্ট করতে পারলো না। ইউসুফ গোলাম হয়েও প্রত্যাখ্যান করলেন মিশরের দ্বিতীয় প্রতাপশালী সুন্দরী নারী এবং তার নিজের মালিক জুলেখা সহ সকল নামি-দামী নারীদের কামভাবের আহ্বান; যারা তাকে অনেক সম্পদ দানের লোভও দেখিয়েছে। কারণ, এক মনে দুই জিনিষের সমান মহব্বত রাখা যায় না। অন্যদিকে জুলেখা তো আশিক ইউসুফের জন্য। সে তাঁর ভোগ-বিলাস, চাওয়া-পাওয়া, রাজপ্রাসাদ, যৌবনের সৌন্দর্য সবকিছু বিসর্জন দিলো শুধু একবার মাশুক ইউসুফকে দেখার জন্য। মাশুকের পিছু দৌঁড়তে দৌঁড়তে জুলেখা ভুলে গেলেন তাঁর নিজের অস্তিত্বের কথা। কাঁদতে কাঁদতে হারিয়ে ফেললেন চর্মচোখ, খোলেগেলো অন্তর। অতঃপর তিনি নিজের অন্তরে একটা ইউসুফ অনুভব করেন। তিনি ইউসুফ ছাড়া অন্যকিছুকে মনে স্থান দিতে চান না। ধীরে ধীরে তিনি ভুলে যান ইউসুফ কিংবা তাঁর নিজের দেহের কথা। বস্তুর অনুপস্থিতিতে এখানেই জুলেখা ইউসুফের আত্মাকে স্পর্শ করে ¯্স্টার সন্ধান লাভ করেন। ধীরে ধীরে জুলেখার মন ইউসুফকে বাদ দিয়ে স্রষ্টার আশিক হয় এবং তিনি নতুন মাশুকের ধ্যানে মগ্ন হন। অতঃপর লোভ ও কাম শূন্য জুলেখা দেখা পেলেন লোভ ও কামশূন্য ইউসুফের।

ইউসুফকে জুলেখা কিংবা আল্লাহকে ইউসুফ যেমন মনে ধারণ করেছিলেন তেমন ধারণ কি আমরা করতে পেরেছি? স্মরণ রাখতে হবে, প্রেমের পূর্বশর্ত বিশ্বাস। আমরা কি আল্লাহর প্রতি আমাদের বিশ্বাসকে পূর্ণাঙ্গ করতে পেরেছি? পারিনি। যদি পারতাম তা হলে মৃত্যুর ভয়ে আমরা আতংকিত হতাম না। বরং মোলাকাতের জন্য পাগল হয়ে যেতাম। আর যেহেতু জীবনটা হলো এই মোলাকাতে প্রধান প্রতিবন্ধক তাই অপেক্ষায় থাকতাম যখন এই জীবনের অবসান হবে?

বলতে পারেন, জীবন তো ইচ্ছে করলে আত্মহত্যার মাধ্যমে অবসান ঘটানো যায়? আচ্ছা বলুন তো পাসপোর্ট-ভিসা এবং ইমেগ্রেশনের নিয়মনীতি মান্য করা ছাড়া কেউ কোন দেশে সফর করলে নিরাপত্তা আইনে তাকে কি আদর করা হয়? অবশ্যই না, বরং তাকে শাস্তি দেওয়া হয়? আত্মহত্যার মৃত্যু এমন-ই একটি কর্ম। আল্লাহ কর্তৃক মৃত্যুর নির্ধারিত নিয়ম রয়েছে। সেই নিয়মে যেতে হবে। আত্মহত্যা কিংবা হত্যা দুটাই আল্লাহর নিয়মের বিপরীত। যারা নিয়ম ভঙ্গ করে তাদের জন্য শাস্তির বিধান রয়েছে। তাই ঈমানদারেরা নির্ধারিত মৃত্যুর অপেক্ষা করেন আজীবন। কারণ, এই মৃত্যুই তাদেরকে তাদের মাশুকের সান্নিধ্যে নিয়ে যাবে। আর দুনিয়ার মহব্বতে আমাদের ঈমান যেহেতু দূর্বল, আমরা যেহেতু আল্লাহর সাথে প্রেম করতে পারিনি, আমরা হতে পারিনি তাঁর আশিক, তাই মৃতু শব্দ শোনলে আমাদের আত্মায় কম্পন সৃষ্টি হয়ে যায়। অবশ্য কোন কোন ঈমানদারও মৃত্যুকে ভয় করেন শুধু সাকরাত, কবর, হাশর আর জাহান্নামের জীবনের কথা ভেবে।

কারণ, আমরা কেউ জানি না কার অবস্থা কি হবে। অবশ্য যারা প্রেম করে মাশুককে জয় করে নিয়েছেন তারা অনুভব করতে পারেন তাদের নিজেদের অবস্থান। আল্লাহর মারিফত তাদের অন্তরকে আলোকিত করে দিয়েছে। মহান আল্লাহপাক সবার অন্তরকে দুনিয়ার মায়া আর মৃত্যুর ভয় থেকে রক্ষা করুন এবং তাঁর মারিফতের নূর দিয়ে আলোকিত করুন। আমিন।

(২৯ মে ২০২০ করোনার ক্রান্তিকাল)

Facebook Comment





© All rights reserved © 2020 TabligNewsBD.Com
Design & Developed BY PopularServer.Com