শনিবার, ২৭ Jun ২০২০, ১১:১৯ অপরাহ্ন

সংবাদ শিরোনাম ::
পাকিস্তানের শীর্ষ আলেম মুফতি নাঈমের ইন্তেকল হাটহাজারীর শুরার সিদ্ধান্ত ও আমার কিছু কথা : আবু রেজা নদভী এম পি উভয় আমাদের কাছে সম্মানীত : সৈয়দ মবনু তবলীগ আমাদের, হাটহাজারীও আমাদের  “আড়ালের সাতকাহন”” প্রসঙ্গ হাটহাজারী: অশালীন শব্দচর্চা ওয়ারাসাতুল আম্বিয়াদের ভাষা হতে পারে না আমরা কি আজীবন মসজিদ মাদ্রাসা নির্ভর থাকব? বাবুনগরীর অব্যাহতি নিয়ে আধা ঘণ্টার ব্যবধানে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য মুঈনে মুহতামীমের পদ থেকে আমি পদত্যাগ চাইনি : আল্লামা বাবুনগরী খাজা মঈনুদ্দীন চিশতি রহঃকে নিয়ে অবমাননায় নিন্দা সাইয়েদ আরশাদ মাদানির হাটহাজারী মাদরাসার শূরার বৈঠকে গুরুত্বপূর্ণ তিন সিদ্ধান্ত
ভ্রাতৃত্ব ও ভালোবাসার সর্বজয়ী বিপ্লবের এক মহানায়ক মাওলানা ইলিয়াস রহ.

ভ্রাতৃত্ব ও ভালোবাসার সর্বজয়ী বিপ্লবের এক মহানায়ক মাওলানা ইলিয়াস রহ.

ভ্রাতৃত্ব ও ভালোবাসার সর্বজয়ী বিপ্লবের এক মহানায়ক মাওলানা ইলিয়াস রহ

মুহাম্মদ যাইনুল আবিদীন

ভ্রাতৃত্ব ও ভালোবাসার সর্বজয়ী বিপ্লবের এক মহানায়ক মাওলানা ইলিয়াস রহ.। আমরা না হয়ে পৃথিবীর অন্য কোনো জাতি যদি পেত-মানুষের মন মননে প্রীতি প্রতিষ্ঠার এমন কিংবদন্তী সাধক-তার নামের শুভ অলঙ্কারে ভরে দিত দুনিয়ার সকল সাদা দেয়াল। মানুষে মানুষে ভাই ভাই- পাক মদীনার এর সুবাসিত মন্ত্রকে যখন মানুষ ধরে নিয়েছিল- এ শুধুই অতীত দিনের শুভকথা- তখনই তিনি সত্যি করে দেখালেন ওই মন্ত্র। আত্মার সুবাসে এখনও বাঁধা যায় মানবতার পুণ্য সমাজ- মুহাম্মদী মমতার মন্ত্রে-এটা এখন পৃথিবীর সত্তম উদাহরণ! এখন মুসলিম উম্মাহর শ্রেষ্ঠ অর্জন। এই অর্জনের ম ম গন্ধে মাতোয়ারা এখন পৃথিবীর পূর্ব-পশ্চিম। সত্যসন্ধানী সকল মানুষের হৃদয়-রসে সঞ্জীবিত নাম হযরত মাওলানা ইলিয়াস রহ.। এই নামের মদির সুরভি মেখে এখন ফুল সুবাসিত হয় পরম সমর্পণে।

দাওয়াত ও তাবলীগ আমাদের প্রিয়তম নবী মানব ও মানবতার অহঙ্কার হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অন্যতম শ্রেষ্ঠ উত্তরাধিকার। সুদীর্ঘ দেড় হাজার বছরের ইতিহাসে এই উত্তরাধিকার মলিন হয়নি কখনও। বরং কর্মের বৈচিত্রে নানা বর্ণে পল্লবিত হয়েছে বরাবর। মদীনার পবিত্র মসজিদ আর মক্কার পবিত্র হেরেমে আলো ছড়ানো সাহাবায়ে কেরামের নূরময় পাঠশালা; সম্মানিত ফকীহগণের অতলস্পর্শী গবেষণা; মুহাদ্দিসীনে কেরামের হাদীস সংকলন ও পাঠদান; কুরআন-সুন্নাহার ভাষ্যপ্রসারিত রচনাবলি; খানকাহ ও নির্জন নিবাসে নিমগ্ন জিকিরের সমূহ মজলিস; নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সুফফা থেকে শুরু করে জগতের সভ্য সকল জনপদে স্থাপিত ওহীর আলোকেন্দ্রিক সকল মাদরাসা; লক্ষকোটি মিনারে ধ্বনিত মুয়াজ্জিনের আজান-সবই তো আমাদের পবিত্র ধর্মের দুর্বিনীত দাওয়াত। কী পূর্ব, কী পশ্চিম, কী শীত কী গ্রীষ্ম; কী অনুকূল- কী প্রতিকূল- আমাদের এই দাওয়াতের ধারা আকাশের মতোই স্থির আর বৃষ্টির মতো উদার। দেয়ালবেষ্ঠিত নিরাপত্তা- নিñিদ্র গোপন নিবাস-চাঁদের আলো নিষিদ্ধ যেখানে- সেখানেও আমরা পেীঁছে দিয়েছি আল্লাহর দ্বীনের পবিত্র এই দাওয়াত; ভালোবাসার এই মোহন মোম।
ইসলাম ও মুসলমানদের এই ঐতিহ্য আক্ষরিক অর্থেই অনুপম। পাঠদান লেখালেখি জিকির আত্মশুদ্ধি ওয়াজ ও নসীহতসহ কত ধারায় প্রবাহিত এই অমৃতের ধারা। মহামতি সাহাবায়ে কেরাম রাদিয়াল্লাহু আনহুম থেকে শুরু করে মহাপ্রাণ চার ইমাম অতঃপর হাদীসের অসংখ্য সংকলক শিক্ষক ও ভাষ্যকর তো সমাজে বাঁকে বাঁকে ছড়িয়ে গেছেন হেরাগুহার অলৌকিক এই নূর। নূরের এই মহান কাফেলার এক অনন্য অগ্রপথিক হযরত মাওলানা ইলিয়াস রহ.।

জন্ম ভারতের উত্তর প্রদেশে এক আউলিয়া-প্রসবিনী খান্দানে। মানুষ বলে কান্ধালা। বললে ভালো হতো ‘আউলিয়া নগর’। ভ্রাতৃষ্পুত্র শাইখুল হাদীস মাওলানা যাকারিয়া রহ. লিখেছেন-
‘আমাদের পাড়ায় মসজিদে বাইরে থেকে আসা এক মুয়াজ্জিন ব্যতিত আর এমন কোনো মুসল্লি ছিল না যে কুরআনের হাফেজ নয়।’ যে জনবসতির বুড়ো থেকে শিশু প্রত্যেকেই কুরআনের হাফেজ-সেখানেই তো জন্ম নেয়ার কথা বিশ্বময় কুরআনের দাওয়াত ছড়িয়ে দেয়ার অঙ্গিকারে আপসহীন ইমামের। সেই ইমামই হযরত মাওলানা ইলিয়াস রহ.।
শিক্ষা দাওয়াত আত্মশুদ্ধি ও জিহাদের দীপক পাঠশালা দারুল উলূম দেওবন্দে করেছেন পাঠসমাপন। স্বাধীনতা যুদ্ধে বীর সেনাপতি হযরত শাইখুল হিন্দ মাহমুদ হাসান দেওবন্দী রহ. এর কাছে পড়েছেন সহীহ বুখারী এবং জামে তিরমিযী। প্রিয় উস্তাদের হাতে হাত রেখে জিহাদের বাইয়াত ও শপথ পাঠ করেছেন।

আত্মশুদ্ধির প্রথম পাঠ গ্রহণ করেছিলেন হযরত গঙ্গুহীর কাছে। তার ইন্তেকালের পর পুনরায় প্রিয় শিক্ষক শাইখুল হিন্দের কাছে আবেদন করেন বাইয়াতের। শিক্ষকের চোখেও তার মূল্য ছিল অনন্য। হযরত শাইখুল হিন্দ বলতেন-
‘আমি যখন মাওলানা ইলিয়াসকে দেখি সাহাবায়ে কেরামের কথা মনে পড়ে যায়।’

পরে প্রিয় উস্তাদের পরামর্শে বাইয়াত হোন হযরত মাওলানা খলীল আহমদ সাহারানপুরীর হাতে। অল্প সময়ে অভ্যস্থ সাধানায় জয় করেন আত্মশুদ্ধির শীর্ষ চূড়া। খেলাফত লাভ করেন হযরত সাহারানপুরীর।
কথা কি, ইবাদত বন্দেগীর আবেগ ও অভ্যস্থতা ছিল তার ঘরের সম্পদ। পিতা মাওলানা ইসমাঈল রহ. এর কথা পরে বলি। আগে তার মহিয়সী মায়ের কথা বলি। তার মা বিয়ের পর দ্বিতীয় পুত্র মাওলানা ইয়াহইয়া কান্ধালবীর দুধপান কালে পবিত্র কুরআন হিফজ করেন। ইয়াদ ছিল পাকা। যেনতেন হাফেজ তার সামনে দাঁড়াতে পারত না। রমজান মাসে নিয়ম ছিল-প্রতিদিন এক খতম দশপারা তেলাওয়াত করতেন। পুরো রমজানে বত্রিশ খতম তেলাওয়াত করতেন।

তেলাওয়াত কন্ঠে আপন গতিতে বয়ে চলত । হাতে বরাবর ঘর সংসারের কোনো না কোনো কাজ করে যেতেন। রমজানের বাইরে প্রতিদিনকার রুটিনও ছিল বিস্ময়কর। দিনে পাঁচ হাজারবার দরূদ শরীফ পড়তেন। পাঁচ হাজার ‘আল্লাহ’ এক হাজার নয়শ বার ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম; এগারশ বার ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ; বারশ বার ইয়া হাইয়্যুন ইয়া কাইয়্যুমুন; দুইশ বার হাসবিয়াল্লাহু ওয়ানি’মাল ওয়াকীলসহ দীঘল তাসবীহ তাহলীল। তার সঙ্গে রোজানা এক মঞ্জিল কুরআনে কারীম তেলাওয়াত।
এই হলো মাওলানা ইলিয়াস রহ. এর তাপসী জননী। এবার তার বাবার কথা বলি। বাবা মাওলানা ইসমাঈল রহ. মূলত ঝানঝানার মানুষ। হযরত আবু বকর সিদ্দিক রাদিয়াল্লাহু আনহুর বংশধর। ছিলেন নির্জনস্বভাব এক সরল অলি। দিল্লীতে হযরত নিজামুদ্দীন আওলিয়া রহ. এর মাজারের কাছে ‘চৌষট্টি খুঁটি’ নামে বিখ্যাত ভবনের লাল ফটকের ওপর নির্মিত ক্ষুদ্র নিবাসের ওপর থাকতেন এই বুযুর্গ। তার সঙ্গেই একটি ছোট মসজিদ ছিল। ওই মসজিদের সামনে মির্জা এলাহী বখশের বৈঠকখানা ছিল। তাই ওই মসজিদকে মানুষ বাঙ্গলাওয়ালী মসজিদ বলতো।

জিকির ও ইবাদত ছিল স্বভাবজাত। নিজেকে লুকিয়ে রাখবার চেষ্টা করতেন নিরন্তর। কুরআনে কারীম এবং দীনের শিক্ষাদান ছিল তার নিত্য কাজ। সেবা ও বিনয় ছিল অনুপম। কোনো ভারবাহী ক্লান্ত তৃষ্ণার্ত যেতে দেখলে ছুটে যেতেন। ধরে বোঝা নামাতেন। নিজ হাতে কুয়া থেকে পানি তুলে পান করাতেন। তারপর দুই রাকাত নামাজ পড়ে এই বলে কৃতজ্ঞতা জানাতেন- হে আল্লাহ! দয়া করে তুমি আমাকে তোমার বান্দাদের সেবা করার তাওফিক দিয়েছ। আমি তো তার যোগ্য ছিলাম না।
কুরআন তেলাওয়াত দরুদ শরীফের প্রতি আকর্ষণ ছিল ভাষাতীত। রাতের বেলা যেন পরিবারের কেউ না কেউ জাগ্রত থাকে সে দিকে বরাবর লক্ষ্য রাখতেন। রাতের বারটা একটা পর্যন্ত মেঝ পুত্র মাওলানা ইয়াহইয়া পড়াশোনায় ডুবে থাকতেন। রাত বারটা একটায় মাওলানা ইসমাঈল সাহেব উঠে ইবাদতে ডুবে যেতেন, মাওলানা ইয়াহইয়া ঘুমিয়ে পড়তেন। শেষ রাতে জাগিয়ে দিতেন বড় পুত্র মাওলানা মুহাম্মদ সাহেব রহ.কে। মেওয়াতের সঙ্গে সম্পর্কের সূচনাও মাওলানা ইসমাঈল সাহেব রহ. এর কাল থেকেই। এর ইতিহাসও চমৎকার এবং ঈমানদীপ্ত। একবার তিনি এই ভেবে মসজিদ থেকে বের হোন-দেখি পথে কাউকে পেলে মসজিদে নিয়ে আসব। তারপর জামাতে নামাজ পড়ব। পথে কয়েকজন মুসলমান দেখতে পান। কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করেন-তোমরা কোথায় যাচ্ছ? বলল: কাজ করতে যাচ্ছি। জিজ্ঞেস করলেন- কত পাবে কাজ করে? তারা মুজরির পরিমাণ বললে মাওলানা বললেন- এই পরিমাণ টাকা যদি আমি দেই তাহলে কি এখানে থাকবে? তারা বলল- কেন থাকব না?

তাদের তিনি মসজিদে নিয়ে আসেন। তারপর নামাজ এবং কুরআনে কারীম শেখাতে থাকেন। সঙ্গে প্রতিদিনকার পারিশ্রমিকও দিতে থাকেন। এভাবে কিছুদনি যাওয়ার পর তারা রীতিমতো নামাজে অভ্যস্থ হয়ে উঠে। শেষ হয় মজদুরির পালা। এভাবেই ভিত্তি স্থাপিত হয় বাঙলাওয়ালী মসজিদের মাদরাসার। আজ যা সারা পৃথিবীতে নিজামুদ্দীন মারকাজ নামে খ্যাত।এই মজদুর শ্রমিকরাই ছিল এর প্রথম ছাত্র। তারপর থেকে বরাবরই এখানে দশ বারজন মেওয়াতি ছাত্র থাকত। মির্জা এলাহী বখশ রহ. তাদের খানাপিনার ব্যবস্থা করতেন।

হযরতজী ইলিয়াস রহ. এর যাত্রা শুরু এখান থেকেই। এই এক মনীষার নীরব বিপ্লবের প্রশান্ত সঙ্গীতে বিমন্দ্রিত আজকের পৃথিবী। তার সাধনার খুশবুতে সুবাসিত আমাদের সকল প্রাঙ্গন। এই দেখা সত্য এখন অস্বীকার করবে কোন পাষাণ?

কিন্তু যে কথা মনে রাখলে আমরা অধিক উপকৃত হতে পারব সে হলো তার শেকড়। কেমন মা বাবার ঘরে জন্মেছিলেন এই মহান মনীষা সেটাও উপেক্ষা করার মতো নয়। আলোকিত শুভ সন্তান চাইলে মা বাবাকেও জীবনে ধারণ করতে হবে আলো এবং সম্ভব সকল কল্যাণ। একই সঙ্গে মাওলানা ইলিয়াস রহ. যাদের কদমের রেণু সঞ্চয় করে গড়ে তুলেছিলেন তার মনীষাসত্তা-তারাও মুহাম্মদী কাফেলার অনন্য নক্ষত্র। অন্তত এই অঞ্চলেরবিদ্বান ও সচেতন কোনো মুসলমানকে এখন মাওলানা রশীদ আহমদ গাঙ্গুহী, শাইখুল হিন্দ মাহমুদ হাসান দেওবন্দী কিংবা মাওলানা খলীল আহমদ সাহারানপুরীকে চেনানো মানে- দুপুরে সূর্য চেনানো। এখন আমাদের দক্ষিণ এশিয়ায় বিশেষভাবে আর ইউরোপ আমেরিকা ও আফ্রিকায় সাধারণ ভাবে পবিত্র ইসলামের যে আমলি চর্চা ও আন্তরিক অনুশীলন দেখতে পাই- তার সবটাই এই বুযুর্গদের সাধনার ফসল। মাওলানা ইলিয়াস রহ. বড় হয়েছেন এইসব বুযুর্গদের সান্নিধ্য-ছায়ায়। হযরত মাওলানা রশীদ আহমদ গঙ্গুহী রহ. ছাত্রাবস্থায় কাউকে মুরীদ করতেন না। ব্যতিক্রম হয়েছিলেন মাওলানা ইলিয়াস রহ. এর ক্ষেত্রে। ছাত্রাবস্থায় তাকে মুরীদ করেছিলেন। একদিন তিনি হযরত গঙ্গুহীকে বলেন- হযরত আমি যখন জিকির করি তখন আমার মনে হয় এক ভারী বোঝা আমার ওপর চেপে আছে। একথা শুনে হযরত গঙ্গুহী ‘থ’ খেয়ে যান। তারপর বলেন- ঠিক একথাই মাওলানা মুহাম্মদ কাসেম নানতুবী হযরত হাজী ইমদাদুল্লাহ মুহাজিরে মক্কীকে বলেছিলেন। হাজী সাহেব বলেছিলেন-
আল্লাহ তায়ালা আপনাকে দিয়ে বড় কোনো কাজ করাবেন।

হযরাতুল ইমাম কাসেম নানুতবীকে দিয়ে আল্লাহ তায়ালা দেওবন্দ মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেছেন। আর হযরত মাওলানা ইলিয়াস রহ.কে দিয়ে প্রতিষ্ঠা করেন তাবলীগ জামাত। এই দুই সংগ্রাম পরস্পর কাঁধে কাঁধে মিলিয়ে পৃথিবীব্যাপী বিলিয়ে চলছে পেয়ারা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইলম আমল আখলাক ও আদর্শের অম্লান নূর। মহান এই দুই মনীষার একজন হযরত গঙ্গুহীর বন্ধু আরেকজন মুরীদ; একজন হযরত শাইখুল হিন্দের শিক্ষক আরেকজন ছাত্র! মাওলানা ইলিয়াস রহ. এর সংগ্রাম চিন্তা ও কর্মকে বুঝতে হলে শেকড়ের এই ইতিহাসটাও চোখের সামনে রাখতে হবে।

মুরীদ ও শিষ্য তো অনেকেই হয়। কিন্তু পীর ও শিক্ষকের দর্শন চিন্তা আদর্শ ও কর্ম নিজের জীবনে ধারণ করতে পারে ক’জন! আমাদের এই গর্বের কাফেলার কয়েকটি কেন্দ্রীয় বৈশিষ্ট্য ছিল- এক. কুরআন হাদীসের প্রতি আস্থা। দুই. দুনিয়াবিমুখতা। তিন. ইত্তেবায়ে শরিয়ত- দীনের অনুসরণে অবিচলতা ও আপসহীনতা। এইসব গুণ ও বৈশিষ্ট্য মাওলানা ইলিয়াস রহ. এর মধ্যে কেমন ছিল উদাহরণ দেই।
শায়খুল হাদীস হযরত মাওলানা যাকারিয়া রহ. লিখেছেন- সাহারানপুরের আমাদের এক বন্ধু। চাচাজানের কাছে একটি তাবিজ চেয়ে চিঠি পাঠিয়েছেন। সঙ্গে জবাবি খামও ঠিকানাসহ পাঠিয়েছেন। চাচাজান ওই খামের ওপর থেকে তার নাম কেটে আমার নাম লিখে-সঙ্গে আমাকে এই মর্মে একখানা চিঠি পাঠিয়েছেন-অমুক আমার কাছে একটি তাবিজ চেয়েছে। তুমি তাকে বলো- তুমি যখন ফজর ও মাগরিব পড়ে বের হবে তখন যেন তোমার থেকে ‘দম’ করিয়ে নেয়। আর আমাকে একটি দোয়া লিখে দেন। এও লিখে দেন-শুরু ও শেষে দরূদ শরীফ পড়ে এই দোয়া পাঠ করে ফু দিয়ে দিয়ো। আর-
এই দোয়ায় যে ভালো না হবে তার মরে যাওয়াই ভালো। আমি ওই ব্যক্তিকে ডেকে পত্রের বিষয়টি জানাই। তিন চার দিন চাচাজান নির্দেশিত পদ্ধতিতে দম করে দেয়ার পর সে ভালো হয়ে উঠে। পত্রের শেষের কথাটি তাকে আমি বলিনি। এটা ছিল চাচাজানের হাদীস শরীফের প্রতি আস্থা ও বিশ্বাসের কথা।
দ্বিতীয় হযরতজী মাওলানা ইউসুফ সাহেব রহ. বলেছেন- (আববাজান) মাওলানা ইলিয়াছ রহ. এর যুগে প্রথম দিকে ভীষণ অভাব ছিল। পর পর কয়েকদিন অনাহারে থাকতে হতো। ঘরেও অভাব, মাদরাসায়ও অভাব। একবার তিনি মাদরাসার সকলকে হাউজের পাড়ে ডেকে বললেন; আমার কারণে তোমরা কষ্ট করো না। অন্য কোথাও চাইলে চলে যেতে পার। অন্য কোনো মাদরাসায় গিয়ে খেদমত করতে পার। আমি তো হাউজের পানি খেয়ে দিন পার করে দিতে পারব! মাদরাসার খাজানায়ও কিছু নেই, ঘরেও কিছু নেই! উপস্থিত সকলেই তখন এককন্ঠে বলেন- হযরত! আমরা আপনাকে ছেড়ে যাব না। প্রয়োজনে আমরাও এই হাউজের পানি খেয়ে থাকব! এই উত্তর শুনে তার চোখ অশ্রুসজল হয়। উঠে তার হুজরায় চলে যান। অল্পক্ষণ পর ফিরে এসে বলেন; আল্লাহ বরকত দিবেন, অভাব দূর করে দিবেন।

হযরত শায়খুল হাদীস রহ. বলেন- এই ঘটনাও আমাকে মাওলানা ইউসুফ সাহেবই শুনিয়েছেন। তিনি তখন বালক। একটা বাক্স রাখা ছিল। কোথাও থেকে আটা আসলে ওর মধ্যে রেখে দেয়া হতো। ওখান থেকেই মাদরাসা এবং ঘরে রুটি তৈরি হতো। একবার এমন হয়েছে ঘরে কয়েকদিন ধরে অনাহার চলছে। মাওলানা ইউসুফ সাহেব ছেলে মানুষ।
ক্ষুধার কষ্টে ওই বাক্সটি খুলে খুঁটে খুঁটে আটা জমাতে থাকেন। অনেক কষ্টে যতটুকু আটা সংগ্রহ হয়েছে তাতে একটি রুটিও হবে না। কয়েকটি টিকা হতে পারে। হঠাৎ মাওলানা ইলিয়াস রহ. ঘর থেকে বেরিয়ে শিশুপুত্রের এই কান্ড দেখতে পান। পুত্রকে কাছে ডেকে সব কথা শোনার পর হুজরায় ফিরে যান। কিছুক্ষণ পর ফিরে এসে প্রিয় পুত্রকে সস্নেহে বলেন-
ইউসুফ! এই বাড়িতে ইনশাআল্লাহ আর অভাব আসবে না। হযরত শায়খুল হাদীস রহ. লিখেন- একবার চাচাজান আমাকে একটি পোষ্টকার্ড পাঠান। তাতে লিখেন- কয়েকদিন ধরেই তোমাকে একখানা পত্র লেখার প্রয়োজন অনুভব করছিলাম। কিন্তু আমার কাছে কোনো পয়সা ছিল না। কারো কাছ থেকে ধার করতেও মন চাচ্ছিল না। আজ আল্লাহ তায়ালা পয়সা দিয়েছেন। আর তোমাকে পত্র লিখছি।

পবিত্র মদীনার প্রিয়তম বাদশাহর ইতিহাস যাদের পড়া আছে এইসব ঘটনার মর্ম ও মূল্য তাদের কাছে সূর্যের মতো স্পষ্ট। দিল্লীর বিখ্যাত পীর- কিন্তু পত্র লেখার পয়সা নেই। ঘরে খাবার নেই দিনের পর দিন। তাই বলে মুহূর্তের জন্যে থেমে যায়নি মাদরাসার পাঠ, ঈমানের দাওয়াত, জিকিরের শোগল কিংবা সেজদার মগ্নতা! ইবাদতে ছিল আত্নার আবেহায়াত।

হযরত মাওলানা মনযুর নোমানী রহ. মাওলানা ইলিয়াস রহ. সম্পর্কে স্মৃতিচারণ করে লিখেছেন- নিজামুদ্দিনে গিয়ে দেখি হযরত এতটাই অসুস্থ-নিজে দাঁড়াতেও পারেন না। তার খেদমতে নিবেদিত ভাগ্যবান বান্দাগণ তাকে ধরে দাঁড় করাতে হয়। নামাজের সময়ও তারাই ধরে মুসল্লায় দাঁড় করিয়ে দেন। আল্লাহ জানেন, মুসল্লায় দাঁড়ানোর এবং তাকবীরে তাহরীমা বলে নামাজ শুরু করার পর কোথা থেকে শক্তি সঞ্চারিত হয়-পুরো নামাজ পূর্ণ সুস্থ মানুষের মতো দাঁড়িয়ে, বরাবরের মতো পূর্ণ রুকু- সেজদাসহ পড়াচ্ছেন। কারও কোনো সাহায্যের প্রয়োজন হচ্ছে না। কিন্তু সালাম ফেরানোর পর সঙ্গে সঙ্গে অবস্থা অন্যরকম হয়ে যাচ্ছে। সোজা হয়ে বসতেও পারছেন না। সেই খাদেমগণ এসে ধরে দেয়ালের সঙ্গে কোমর ঠেকিয়ে বসতে সাহায্য করছেন। আবার ওই অবস্থাতেই ফজরের পর আলোচনা করছেন। আলোচনার সময়ও আবার শক্তি ফিরে পাচ্ছেন। যদি নিজের চোখে না দেখতাম তাহলে এটা কী করে সম্ভব বুঝতাম না। আর বুঝলেও বিশ্বাস হতো না- এমন অসুস্থ দুর্বল একজন মানুষ এভাবে নামাজ পড়তে ও পড়াতে পারেন! এতটা আবেগোষ্ণ আলোচনা করতে পারেন?!
ঈমানের সুবাস ছড়ানো এই গ্রন্থ পাঠককে আপ্লুত করবে, বিশ্বাস ও চেতনায় করবে উজ্জীবিত। আল্রাহ লেখক পাঠক সবাইকে কবুল করুণ। আমীন

 

Facebook Comment





© All rights reserved © 2020 TabligNewsBD.Com
Design & Developed BY PopularServer.Com