রবিবার, ২৮ Jun ২০২০, ১১:৫১ পূর্বাহ্ন

আল মাদরাসাতুল মঈনুল ইসলাম: নিজামুদ্দীনের নামে লিখিত কাগজ

আল মাদরাসাতুল মঈনুল ইসলাম: নিজামুদ্দীনের নামে লিখিত কাগজ

মাদ্রাসার দলিল

সদ্য আল্লাহর প্রিয় হওয়া মুবাল্লীগ মুফতী আতাউর রহমান রহ এর প্রতিষ্ঠিত ঢাকার প্রানকেন্দ্র আল মাদরাসাতুল মঈনুল ইসলাম আজ হযরতের স্মৃতি বহন করে স্বমহিমায় মাথা উঁচু করে দাড়িয়ে আছে। যা তিনি নিজামুদ্দীন মারকাজের আমীরের নামে লিখিত কাগজ করে গিয়েছেন।

আল মাদরাসাতুল মঈনুল ইসলাম একটি ঐতিহ্যবাহী দ্বীনী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি দাওয়াত ও তাবলীগের মূলধারার উলামা মাশায়েখদের অন্যতম কেন্দ্র হিসাবে এই মকবুল প্রতিষ্ঠানটি গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করে আসছিল।

মাদ্রাসা‌টির বর্তমান ঠিকানা – ছোলমাইদ (পশ্চিম ঢালী বাড়ি), থানা-ভাটারা (সাবেক গুলশান) জেলা-ঢাকা, বাংলাদেশ ।

মাদ্রাসার দলিল

হযরতের মৃত্যুর পর মাদরাসা পরিচালনার বিষয়টি যখন সামনে আসল, কে চালবেন? কী তরতিবে চালাবেন? প্রতিষ্ঠানটি পরিচালনায় কোন নীতি আর্দশ লালন করা হবে। যেহেতো মুফতী সাহেব রহ কোন ছেলে নেই। তিনি স্ত্রী ও অবিবাহিত কিশোর পাঁচ মেয়ে রেখে মারা গেছেন।

তখন একটি বিষয় মাদরাসার উস্তাদগন ও হযরতের ঘনিষ্ঠজনরা জানান, তিনি সুবিশাল বহুতলা মসজিদসহ পুরো মাদরাসায়ে নিজামুদ্দীন বিশ্ব মারকাজের নামে ওয়াকফকরে দিয়েছিলেন। মাদরাসার কাগজেই উল্লেখ আছে, যে নিজামুদ্দীন মারকাজের যিনি আমীর থাকবেন এই মাদরাসা কেবল তারই পরামর্শ ও সিদ্ধান্ত ক্রমে পরিচালিত হবে।

এই হিসাবে আল মাদরাসাতুল মঈনুল ইসলাম, ভাটারার মূল জিম্মাদার ও মুতাওল্লী তাবলীগ জামাতের বিশ্ব আমীর শায়খুল ইসলাম ও শায়খুল হাদীস হযরতজী মাওলানা মুহাম্মদ সাদ কান্ধলভী দামাত বারাকাতুহুম।

তিনি স্পষ্ট করে লিখে কাগজ করে গেছেন, আল মাদরাসাতুল মঈনুল ইসলাম নিজামুদ্দীনের চিন্তা চেতনা, আর্দশকে লালন ও ধারণ করেই পরিচালিত হবে। এখানে যারা পরিচালনা করবেন, পড়বেন, পড়াবেন তারা সেই আদর্শের স্পষ্ট ধারক ও বাহক হবেন।

এবিষয়ে কাকরাইল মসজিদের মুকিম, তাবলীগের বিশিষ্ট মুরুব্বি মাওলানা শেখ আবদুল্লাহ মনসুর কাসেমী দা.বা. বলেন, এই প্রতিষ্ঠানকে মুফতী সাহেব এমনভাবে নিজামুদ্দীনের সাথে বাঁধে দিয়ে গেছেন, যে এর বাহিরে চলার কারো কোন সুযোগ নেই। এখানে যারা এটি পরিচালনা করবেন, পড়াবেন বা পড়বেন তারা নিজামুদ্দীন মারকাজের আনুগত্য করেই তালিমের পাশাপাশি দাওয়াতি কাজ করবেন। এটিই এই মাদরাসার উসুল বানিয়ে গেছেন তিনি। মুফতী সাহেব যে আর্দশকে নিঃসংকোচে লালন করতেন মৃত্যুর পরেও যেন সেই আর্দশ সমহিমায় আলো ছড়াতে পারে তিনি সেই ব্যাবস্থাই করে গেছেন।

এবিষয়ে মারকাজুল উলুৃম আশ শরীয়্যাহ সাভারের মুহতামিম, জাতীয় কওমী মাদরাসা শিক্ষাবোর্ড এর অন্যতম কর্ণধার মাওলানা জিয়া বিন কাসেম বলেন, গত তিন বছর ধরে শক্ত হাতে নিজামুদ্দিন মারকাজ ও হযরতজীর আর্দশকে লালন করতে গিয়ে মুফতী সাহেব যে নজিরবিহীন কুরবানী করেছেন তার কোন তুলনা হয় না। মাদরাসা থেকে অনেক ছাত্র শিক্ষক চলে গেছে তিনি কোন পরওয়া করেন নি। এমনকি সবাইকে বলতেন নিজামুদ্দীনের অনুসরণ করতে গিয়ে যদি আমার মাদরাসা দাওরায়ে হাদীস থেকে নেমে মক্তব বিভাগেও চলে আসে তাতেও আমি কোন পরোয়া করব না। প্রয়োজনে আবার নতুন করে নিজামুদ্দিনের দর্শনের উপর এটিকে আবার সাজানো হবে। কিন্তু তিনি নিজ আর্দশের বিপরীত কোন ষড়যন্ত্র কিংবা রক্তচক্ষুর সাথে মুহুর্তের জন্য আপোষ করতে রাজি ছিলেন না। আমাদের সকলের জিম্মাদারী, যেন যে কোনমূল্যে আমরা যেন মুফতী সাহেবের এই আমানতকে ধরে রাখতে পারি। এবং সকল প্রকার জঞ্জাল থেকে মাদরাসাকে মুক্ত রেখে মুফতী সাহেবের রুহে শান্তি পৌছাতে পারি। এটি আমাদের এখন সবচেয়ে বড় জিম্মাদারী।

নিজামুদ্দীন মারকাজের আমীরের নামে লিখিত কাগজ করে গিয়েছেন

জাতীয় কওমী মাদরাসা শিক্ষাবোর্ডের অম্যতম নীতিনির্ধারক, দারুল উলুম উত্তরার প্রতিষ্ঠাতা মুহতামিম মুফতী মুআজ বিন নূর এবিষয়ে বলেন, গত দুই বছর ধরে বেফাকিলুল মাদরিসিল আরাবিয়া যখন মুফতী সাহেবের মাদরাসা সহ মূলধারার অনেক মাদরাসার কেন্দ্রীয় পরিক্ষা নিতে আপত্তি জানাল, সেই সময় থেকে বহুবার বেফাক অফিসে, বেফাক নেতাদের সাথে হুজুরের শশুর, মঈনুল ইসলামের বর্তমান ভারপ্রাপ্ত মুহতামিম শায়খুল হাদীস আব্দুর রাজ্জাক সাহেবসহ আমরা বহুবার গিয়েছি। হুজুরের যে দৃঢ়তা ও ইস্তেকামত ছিল ইতাআতের উপর এর কোন তুলনা হতে পারে না।বেফাকের মহা পরিচালক মাওলানা জুবায়ের আহমদ চৌধুরী যেদিন প্রথম ডাকলেন বেফাক অফিসে আর বললেন, আপনারা আলেমদের সাথে ফিরে না আসলে আপনাদের মাদরাসাগুলোর এলহাক/ রেজিষ্ট্রেশন বাতিল করা হবে বলে বেফাক সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

তখন বেফাক অফিসে উলামায়ে কেরামের ভরা মজলিসে মুফতী আতাউর রহমান রহ. বলেছিলেন, আপনারা এটি ভাবলেন কী করে আপনারা এলহাক বাতিল করলে আমরা সাদ সাহেবের ইতাআত থেকে মূখ ফিরিয়ে নিব? আপনারা যতোটা ইয়াকীনের সাথে তাকে গোমরা মনে করেন,আমরা তাহকীক করে এর চেয়ে হাজার লক্ষ কোটিগুন বেশি তাকে হক মনে করি।”

মুফতী সাহেবের এই সহসী বক্তব্যের পর সবাই চুপ হয়ে গেলেন। আজ আমাদের উপর এটি অনেক বড় জিম্মাদারী মুফতী সাহেবের এই আমানতকে আমরা যেন জিম্মাদারীর সাথে তার আদর্শের উপর কায়েম ও প্রানবন্ত রাখতে চেষ্ঠা করি।

বিশিষ্ট লেখক ও গবেষক মাওলানা সৈয়দ আনোয়ার আব্দুল্লাহ বলেন বিগত দুই বছর মাদরাসাকে নিজামুদ্দীন মারকাজের আর্দশের উপর কায়েম রাখতে মুফতী আতাউর রহমান সাহেবের যে দৃঢ়তা আমরা লক্ষ্য করেছি সেটি এক নজিরবিহীন লড়াইয়ের কাহিনী। এনিয়ে হাইকোট পর্যন্ত মামলা, আমাদের পক্ষে হাইকোর্টের রায়, জাতীয় কওমী মাদরাসা শিক্ষাবোর্ড গঠনে আমি অধম মুফতী সাহেবের সাথে সবসময় থাকার চেষ্ঠা করেছি। তখন কাছে থেকে দেখেছি হযরতজী মাওলানা সাদ কান্ধলভী দা.বা. এর আর্দশের উপর মাদরাসাকে কায়েম রাখতে মুফতি সাহেবের দৃঢ়চিত্তে লড়াই। সর্বশেষ হুজুর নিজামুদ্দীন মারকাজের নামে যে কাগজ করে মাদরাসাকে দিয়ে গেছেন এটি তার ইখলাস ও কুরবানীর মকবুলিয়তের উৎকৃষ্ট উদাহরণ। মাদরাসা পরিচালনায় হুজুরের এই সংগ্রাম ও আদর্শকে সামনে রেখেই আমাদের এগোতে হবে, এটি এখন সবচেয়ে বড় আমানত। কেয়ামত পর্যন্ত যেন মুফতী সাহেবের মানশার উপর এই প্রতিষ্ঠান চলতে পারে। আর তিনি কবরে শান্তি সূখে এর সওায়াবে জারিয়া পেতে থাকেন।

দারুল উলুম রাহমানীয়া সাভারের মুহতামি ও কাকরাইল মসজিদের ইমাম মুফতী আজীমুদ্দীন বলেন, মুফতী আতাউর রহমান রহ নিজামুদ্দিনের আর্দশকে কেবল লালনই করতেন না, এই চিনৃতা দর্শন ফিকির ও উম্মতপনাকে সারা দুনিয়ায় বিশেষ করে বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠিত করতে তিনি ছিলেন একজন অকুতোভয় সিপাহসালার। আজ আমরা এতায়াতের যে মসৃণ ময়দানে নির্ভয়ে চলছি,এ জমিন তৈরিতে তাঁর অবদান ছিল প্রতি ইঞ্চি ইঞ্চি মাটি কনায়। তিনি ছিলেন তবলীগের দুঃসময়ের সিপাহসালার, অকুতোভয় মুজাহিদ। যাদের জান মালের অকল্পনীয় কুরবানির বদৌলতে ইতাআতের সুদৃঢ় প্রসাদ বাংলাদেশের প্রতিস্হাপিত হয়েছে, তিনি ছিলেন তাদের অগ্রগামী জানবায সৈনিক। মুফতী সাহেবের নিজের মাদরাসা সহ আমাদের সকল মূলধারার মাদরাসাকে নিজামুদ্দীনের আর্দশের উপর কায়েম রাখতে তিনি জীবনের শেষ মুহুর্তে এসে একটি বোর্ডও গঠন করেছেন। হুজুরের মাদরাসা এই মানশার আলোকেই পরিচালিত হবে ইনশাআল্লাহ।

আল মাদরাসাতুল মঈনুল ইসলাম নিজামুদ্দীনের চিন্তা চেতনা, আর্দশকে লালন ও ধারণ করেই পরিচালিত হবে

সভাবতই তিনি ছিলেন প্রচন্ড পরিশ্রমী এবং সাহসী মানুষ। বিশেষত বিগত দু বছরে তবলীগের বর্তমান হালতে সারা বাংলাদেশে চষে বেড়িয়েছেন বিরামহীন,রাত দিন। আমাকে প্রায় বলতেন,মুফতি সাহেব! আল্লাহ টাকা দিয়েছেন এই সময়ে দীন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে উজার করে খরচ করার জন্য। তিনি নিজের প্রতিষ্ঠানকে নিজামুদ্দিনের আমীরের কাছে ওয়াকফ করে দিয়ে আমাদেরকে জীবন মরনে আদর্শে অবিচল থাকার ও মাদরাসা পরিচালনার পথ দেখিয়ে গেলেন।যেন আমার মৃত্যুর পর আমার আর্দশের মৃত্যু না হয়।

 

 

Facebook Comment





© All rights reserved © 2020 TabligNewsBD.Com
Design & Developed BY PopularServer.Com