বৃহস্পতিবার, ২৬ নভেম্বর ২০২০, ০৬:৪৯ অপরাহ্ন

আল্লাহর রাস্তায় সফরের জরুরী হেদায়াত: মাওলানা রুহুল আমীন ঢাকুবী

আল্লাহর রাস্তায় সফরের জরুরী হেদায়াত: মাওলানা রুহুল আমীন ঢাকুবী

আল্লাহর রাস্তায় সফরের জরুরী হেদায়াত
মাওলানা রুহুল আমীন ঢাকুবী

বিসমিল্লাহির রহমানির রহিম

আসসালামু আ’লাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারকাতুহ,
মুহতারাম,সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ পাকের জন্য যিনি আপন অনুগ্রহে নবীওয়ালা মেহনত এর জিম্মাদারী দ্বারা তার হাবীব (স:) এর উম্মতকে সম্মানিত করেছেন এবং দুরুদ বর্ষিত হোক প্রিয় নবী রসুলুল্লাহ (স:) এর উপর যিনি খতমে নবুয়ত এর কারনে নবীওয়ালা মেহনত এর তোহফা তার উম্মতকে সোপর্দ করে গিয়েছেন।

দোস্ত বুযুর্গ আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা আপন অনুগ্রহে তার দ্বীনের মেহনত এর জন্য আল্লাহ পাকের রাস্তায় আমাদেরকে বের হওয়ার তৌফিক দিয়েছেন আর আল্লাহ পাকের নিয়ম হলো যখন তিনি কাউকে কোন অনুগ্রহ করেন তথা নিয়ামত দান করেন তখন বান্দা যদি এই নিয়ামতের শোকর ও কদর করে তখন আল্লাহ তায়ালা এই নিয়ামত কে বাড়িয়ে দেন, আর নিয়ামতের শোকর ও কদর হচ্ছে ঐ নিয়ামতের সঠিক ব্যবহার করা। এজন্য আল্লাহ পাকের রাস্তায় খুরুজের জমানায় এই নিয়ামতের সঠিক ব্যবহার এর জন্য কিছু জরুরী হেদায়াত।

প্রথমত, পুরা সফরের সময় পাঁচটি বিষয় এর উপর পুরাপুরি নজর রাখা ও আমলের কোশেশ করা।

প্রথম বিষয় হলো আমীরের এতাআ’ত, কেননা আমাদের এই মেহনত এর এক বড় উদ্যেশ্য হলো নিজের মধ্যে মানার যোগ্যতা তৈরী করা, আজ আমরা অনেকেই চাই আমার কথা মানা হোক কিন্তু আমি মেনে চলি এটা হলো জরুরী। এজন্য জামাতের আমীর যে কেউ হোকনা কেন যতক্ষণ পর্যন্ত শরীয়ত এর খেলাফ কোন আদেশ না করবেন ততক্ষণ পর্যন্ত মানতে হবে। এমনকি আমীর যদি ব্যক্তিগতভাবে কোন গুনাহে লিপ্ত হোন কিন্তু তার আদেশ শরীয়ত সম্মত হয় তবে আমাকে মানতে হবে। আমীর যদি কোন হারাম থেকে বাচতে বলেন আর আমি তা মেনে নেই এটা কোন এতাআ’ত নয় কেননা হারাম থেকে আমাকে বাচতেই হবে বরং এতাআ’ত এর পূর্নতা হ”েছ কোন নেক জজবা যখন আমীর রুখে দেন তখন তা মেনে নেওয়া এবং এতাআ’ত এর এক বাড় বাধা হচ্ছে আমীর এর কোন আদেশ কে নিজের হাইছিয়ত তথা মর্যাদার খেলাফ মনে করা এজন্য সব হালতে আমীর এর এতাআ’ত করি।

দ্বিতীয় বিষয় হচ্ছে, আমাদের এই মেহনতের কোন ওস্তাদ বা মুআ’ল্লিম নেই এই রাস্তার মুআ’ল্লিম হলো আমাদের ইজতেমায়ী আমল সমুহ। এইজন্য পুরো সফরে কোরবানী করে হলেও প্রতিটি ইজতেমায়ী আমলের এহতেমাম করি। কোন ইজতেমায়ী আমলকে হালকা মনে করা বা নিজেকে ঐ আমলের অমুখাপেক্ষী মনে করা বড় মাহরুমি তথা বঞ্চিত হওয়ার কারণ।

তৃতীয় বিষয়  হচ্ছে, ইনফেরাদী আমলের পাবন্দী। কেননা ইজতেমায়ী আমল তো মাহলের কারনে জুড়তেই হয়।  কিন্তু‘ ইনফেরাদী আমলে মশগুল হওয়া সত্যিকার তালেব এর আলামত এজন্য পুরা সফরের অবস্থায় শত ব্যস্ততার ভিতর নিজের মামুলাত তথা তাসবিহাত, তেলাওয়াত, নফল নামাজ ও দোয়ার এহতেমাম করা।

চতুর্থ বিষয় হ”েছ, নিজের সমস্ত কাজ চাই ইবাদত হোক বা জরুরিয়াত সুন্নাতের পাবন্দীর সাথে পুরা করা কেননা এছলাহ এর খোলাছা হলো সর্র্বহালতে সুন্নাতের পাবন্দী যেমন কেউ আমাকে গালি দিল এখন সুন্নাত কি? সকলে আমার খুব প্রশংসা করছে এখন সুন্নাত কি? আমার মন কোন জিনিস চা”েছ এখন সুন্নাত কি?

পঞ্চম বিষয় হলো নিজের সাথীকে বরদাশত করা,নবী সমস্ত উম্মতকে নিয়ে চলেছেন আমরাও তার রেখে যাওয়া কাজ করছি এখন যদি আমি আমার জামাতের সাথীকে বরদাশত করতে না পারি তবে পুরা উম্মতের জিম্মাদারী কিভাবে আদায় করবো। নবী তো মুনাফিককেও সাথে নিয়ে চলেছেন।

মুহতারাম দোস্ত বুযুর্গ বর্ণিত পাঁচটি বিষয় এর উপর আমল হলে আমার সফর আমার নিজের জন্য ও উম্মতের জন্য খায়ের এর জরিয়া বনবে।

দ্বিতীয়ত, এই রাস্তায় নিজের তাযকিয়া তথা এছলাহ এর জন্য বার টি বিষয়ের মশক্ব করা একান্ত জরুরী। আজ যত শেকায়েত যে জামাতে গিয়েছিলাম ফায়দা হয়নি বা ওমুকে জামাতে গিয়েছিলো কই ফায়দা তো হলো না। এই সমস্ত শেকায়েত এর জবাব হলো, এই বার টি বিষয়ের মশক্ব না হওয়া। মশক্ব এর এই কমিই সমস্ত কমজুড়ির শেকড়। আল্লাহ তাআ’লা তৌফিক দেন যখন এই বার টি বিষয়ের মশক্ব হবে তখন প্রত্যেক বের হনেওয়ালা অবশ্যই নিজের সংশোধন ও তাআ’ল্লুক মাআ’ল্লা নিয়ে ফিরবে ইংশাআল্লহ।

প্রথম বিষয় হচ্ছে,ইনফিরাদী দাওয়াত। নিজেকে যত বেশী ইনফিরাদী দাওয়াত এর ভিতর লাগাবো তত নিজের ভিতর ইয়াক্বীন ও আমলের মজবুতি পয়দা হবে। বহুত জরুরী কথা মনে রাখি, যে যত বেশী ইনফেরাদী দাওয়াত এর ভিতর নিজেকে মশগুল করবে ততবেশী তার দাওয়াতের কাজের বাছিরত তথা বুঝ হাছিল হবে। এখানে শর্ত হলো ইনফেরাদী দাওয়াত, মজমায় কথা বলা নয়। মজমায় কথা বলাও দাওয়াত এবং আজর ও সওয়াব এর কারন কিš‘ দাওয়াত এর বাছিরত তথা বুঝ ইনফিরাদী দাওয়াত এর সাথে। একথা এক্বীন এর সাথে বলা যেতে পারে ইনফিরাদী দাওয়াতে মশগুল হনেওয়ালা গাফলত ও ফিতনার শিকার হবে না ইংশাআল্লহ, আর এই দুটি বিষয় অর্থাৎ গাফলত ও ফিতনায় পড়ে যাওয়াই হলো দায়ীর মউত।

দ্বিতীয় বিষয় হচ্ছে, পুরা সফর তালীম তাআ’ল্লুম তথা শেখা শেখানোর সাথে কাটানো। সফরের শুরুতে ঠিক করে নেই এই পুরো সফরে আমি কি কি শিখবো এবং যা শিখব তা অন্যকে শেখানোর চেষ্টা করব। শেখার এই তালিকা যেন আমাকে অবসর হতেই না দেয়, সাথে সাথে ইজতেমায়ী তালীমের পাবন্দি ও ইজতেমায়ী তালীম হতে আছর গ্রহণ এর মশক্ব করি। নেছাবের কিতাব ও প্রয়োজনীয় কিতাব ইনফিরাদী মুতাআ’লা করি।

তৃতীয় বিষয় হচ্ছে, আল্লাহ পাকের জিকিরের এহতেমাম, সকাল সন্ধ্যার তাসবিহাত, কালামে পাকের তেলাওয়াত, দোয়ার মশগুলিয়াত যেন আমাকে ঘিরে রাখে। একই সাথে রোজানা জিকির এর জরিয়ায় আল্লাহ পাকের ধ্যান ও সিফাতে এহসানের খুব মশক্ব হয়।

চতুর্থ বিষয় হচ্ছে, নামাজের নিমগ্নতা, পুরা সফর ফরজ নামাজ পূর্ব প্রস্তত ও তাকবীরে উলার এহতেমাম এর সাথে আদায় হয়। এছাড়া নফল নামাজের তথা এশরাক, চাশত, তাহাজ্জুদ ইত্যাদির এহতেমাম এবং লম্বা লম্বা রুকু ও সিজদার অভ্যাস তৈরী করা। নিজের একেকটি প্রয়োজনকে নামাজের জরিয়ায় আল্লাহ পাকের কাছ থেকে পুরো করার মশক্ব করতে থাকা।

* বর্ণিত চারটি বিষয়ের মশক্ব দাওয়াত ও তাবলীগের এই মেহনতে দাওয়াত, তা’লীম ও তাযকিয়া কে জমা করে দিয়েছে।

এই চার লাইনের মেহনত আমার ভিতর যাতে আনওয়ারাত পয়দা করে এর জন্য আমাকে চারটি শর্ত মেনে চলতে হবে।

প্রথম বিষয় হচ্ছে, সফরে খানাপিনা সাদাসিধা ও জরুরত পরিমান হয়। সব সময় বিশেষ বিশেষ খানার এন্তেজাম করা ও পেট ভরে খাওয়া আমার চার লাইনের সাধনার নুরকে কম থেকে কম করে দিবে এবং গাফলতি আমার উপর সওয়ার হবে। তাই খানাপিনা জরুরত পরিমান হয়।

দ্বিতীয় বিষয় হচ্ছে, সফরের শুরুতে তায় করে নেওয়া আমি দিনে রাতে জরুরত হিসাবে মোট কত ঘন্টা ঘুমাবো এবং এর অতিরিক্ত আমার হাতে যত সময়ই থাকনা কেন আমি ঘুমাবো না। কেননা আমাকে তো ঐ চার আমল পুরো করতে হবে।

তৃতীয় বিষয় হচ্ছে, দাওয়াত এর মশগুলিয়াত ছাড়া কথা কম বলব। সফরের শুরুতেই তায় করে নেই কোন কিছু জানতে হলে সওয়াল করব। কেউ কোন সওয়াল করলে উত্তর দিব। এছাড়া কোন কথা না বলার চেষ্টা করব।

চতুর্থ বিষয় হচ্ছে, সকল জরুরত তথা, ওযু, গোসল, ইস্তেঞ্জা, বাজার ইত্যাদি যত কম সময়ে সম্ভব পুরা করার চেষ্টা করব।

বর্ণিত চার লাইনের মেহনত এর ফায়দা যাতে নষ্ট হয়ে না যায় এই জন্য চারটি বিষয়ের প্রতি লক্ষ্য রাখতে হবে।

প্রথম বিষয় হচ্ছে, কারো কাছে কোন কিছু সওয়াল না করা সফরে সর্ব হালতে নিজের প্রয়োজন কে লুকানো। আমাদের এই রাস্তায় প্রয়োজন প্রকাশ পাওয়া সওয়ালকারী হওয়ার জন্য যথেষ্ট। ছোট ছোট প্রয়োজনও কারো কাছে প্রকাশ না করা।

দ্বিতীয় বিষয় হচ্ছে, এশরাফে নফস তথা কারো কাছে কিছু পাওয়ার আশা না করা। যখন কারো কাছে কিছু আশা করব না তখন অপ্রাপ্তির কারনে কোন কষ্ট হবে না। সমস্ত আশা ও ভয়ের কেন্দ্র একমাত্র আল্লাহ তায়ালার সত্ত্বাই হয়।

তৃতীয় বিষয় হচ্ছে,এজাযত তথা অনুমতি ছাড়া কারো কোন জিনিষ ব্যবহার না করা। অন্যের জিনিষ অনুমতি ছাড়া নিজের জন্য হারাম মনে করা।
চতুর্থ বিষয় হচ্ছে, সমস্ত লাইনে অপচয় থেকে বেচে থাকা। কেননা অপচয় ভবিষ্যত নিয়ামত থেকে বঞ্চিত করে দেয়।

বর্ণিত বারোটি বিষয় এই রাস্তার সংশোধন এর চাবিকাঠি।

এছাড়া যে সকল জরুরি বিষয় এর উপরে খেয়াল রাখতে হবে তা নিম্নরুপঃ
প্রথমত, ছয় ছিফাত নিজের জীবনে আনার জন্য প্রত্যেক সিফাত এর উপর মেহনত করা যার প্রথম ধাপ হচ্ছে যেন সফরে প্রত্যেক সিফাত এর উপরে কমপক্ষে আধাঘন্টা দাওয়াত দেওয়ার যোগ্যতা তৈরী হয়।

দ্বিতীয়ত, এই রাস্তার খেদমতের মধ্যে নিজেকে খুব লাগানো, মনে রাখা এই রাস্তার খেদমত জরুরত পুরা করার জন্য নয় বরং খিদমত নিজের তরবিয়ত এর জন্য আর খেদমত এর দ্বারা তরবিয়ত তখনি হবে যখন নিজের হাইছিয়ত তথা মর্যাদা থেকে খিদমত এর আমলকে আরো অনেক বড় মনে করবো কেননা আল্লার রাস্তায় শহীদ হওয়া ব্যতীত খিদমতকারীর আজর ও সওয়াব কে কেউ অতিক্রম করতে পারে না। আল্লাহর রাস্তায় ফিরনেওয়ালাদের খিদমত এর সুযোগকে নিজের সৌভাগ্য মনে করা।

তৃতীয়ত, প্রত্যেক ইজতেমায়ী ফিকির এর সাথে সাথে ইনফেরাদী তথা ব্যক্তিগত ভাবে নগদ জামাত বের করার জন্য তথা একেকজনকে আল্লাহ পাকের রাস্তায় বের করার জন্য নিজের সর্বস্ব শক্তি ব্যয় করা। বহুত জরুরী কথা এই রাস্তার হরকতের তথা মেহনত এর হাক্বীকত আল্লাহ তার সামনে খুলবেন যে কুওয়্যাতে এস্তেনফার তথা লোকদেরকে আল্লাহর রাস্তায় বের করার পিছনে নিজের সমস্ত শক্তিকে ব্যায় করবে। আমি পুনরায় আরজ করছি “ইনফেরাদী দাওয়াত ও কুওয়্যাতে এস্তেনফার” ব্যতীত এই মেহনতের হাক্বীকত, বাছিরত তথা বুঝ, জরুরত ও বাস্তবতা বুঝে আসা মুশকিল।

এই জন্য বর্নিত দুই আমল (ইনফেরাদী দাওয়াত ও কুওয়্যাতে এস্তেনফার) পাবন্দির সাথে করে কেঁদে কেঁদে আল্লাহ তায়ালার কাছে এই কাজের বাছিরত তথা বুঝ চাই এবং আল্লাহ পাকের কাছে এই কাজের জন্য নিজেকে কবুল করাই।

আল্লাহ পাক আমাদের সকলকে বর্ণিত বিষয়ের উপর আমল করার তৌফিক দান করুক। সঠিক পথ প্রদর্শন করা এবং আমলের তৌফিক দাতা একমাত্র মহান আল্লাহ সুবহানাহু তাআ’লাই।
বিনীত
বান্দা রুহুল আমীন
(০১৯১৪-৭০৯৫৪৫)

Facebook Comment





© All rights reserved © 2020 TabligNewsBD.Com
Design & Developed BY PopularServer.Com