রবিবার, ২২ নভেম্বর ২০২০, ০৬:০৮ পূর্বাহ্ন

মুনাফিকদের ভয়ংকর ষড়যন্ত্র যুগে যুগে (র্পব-১)

মুনাফিকদের ভয়ংকর ষড়যন্ত্র যুগে যুগে-১

সৈয়দ আনোয়ার আবদুল্লাহ

ইসলামের দেড় হাজার বছরের ইতিহাসে শত্রুর চাইতে মুসলিম বেশধারী মুনাফিকরা ইসলামের ক্ষতিসাধন করেছে সবচেয়ে বেশি। মুনাফিক সর্দার আবদুল্লাহ ইবনে উবাই ইবনে সালুল মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জমানায় মদিনার পরিবেশ বিষিয়ে তোলে, আউস-খাজরাজ এবং আনসার ও মুহাজিরদের মধ্যে দ্বন্দ্ব ও বিবাদ তৈরি করে মুসলমানদের ঐক্যবদ্ধ শক্তিকে দুর্বল করার ব্যর্থচেষ্টা চালায়। স্পেনে আমর ইবনে হাফসুন, পশ্চিমবঙ্গে মীরজাফর এবং দাক্ষিণাত্যে মীর সাদিক শত্রুর সঙ্গে হাত মিলিয়ে স্বধর্ম, স্বজাতি ও স্বদেশের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের জাল বুনে এবং মুসলমানদের ঐক্যের পরিবেশ নষ্ট করে দেয়, শত্রুর হাত শক্তিশালী করে, বৈদেশিক আগ্রাসী শক্তির সঙ্গে আঁতাত করে। আল্লাহতায়ালা ওহির মাধ্যমে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে মুনাফিকের পরিচয় ও অবস্থান চিহ্নিত করে দিতেন। ফলে তিনি তাদের চক্রান্ত ও কর্মকান্ড আগেভাগে অবগত হয়ে যেতেন। তিনি সাহাবি হজরত হুজাইফা (রা.)-কে মদিনার মুনাফিকদের একটি তালিকা প্রদান করেন। এ কারণে তাকে ‘সাহিবু সিররে রসুল’ বা রসুলুল্লাহ (সা.)-এর গোপন তথ্য জানা ব্যক্তি বলা হতো।

আবদুল্লাহ ইবনে উবাই বিন সলুল, মদিনাতে একেবারে রাসূলের (সা:) পেছনে নামাজ পড়ত। রাসূলের (সা:) হিজরতের আগে সে মদিনার বাদশাহ হওয়ার ঘোষণার পর্যায়ে ছিল। রাসূলের (সা:) ইমামতির জাগাটার পেছনের স্থানটিকে ইসলামি শরিয়তি ভাষায় বলে ‘আর রৌদাহ’ যার অথ হলো বাগান। ইসলামি পরিভাষায় যাকে বলে জান্নাতের বাগানের অংশ বা টুকরা। এখানে দাঁড়িয়ে আবদুল্লাহ ইবনে উবাই নামাজ পড়ত। রাসূলের (সা:) মসজিদে রাসূলের পেছনে নামাজ পড়া কত বড় বুজুর্গির কাজ তাতো সহজেই বুঝা যায়। তদুপরি তার দাড়ি ও জামা লম্বা কম ছিল না।

তার কাজ ছিল মানুষকে ধোকা দেয়া, রাসূলের (সা:) বিরুদ্ধে, মুমিনদের বিরুদ্ধে চক্রান্ত করা, ষড়যন্ত্র করা এবং ষড়যন্ত্রকারীদের কূট পরামর্শ দেয়া। মুসলমানদের তা জানা ছিলনা। কিন্তু আল্লাহ তায়ালা কোরআন শরীফের একটা পূর্ণ সূরা অবতীর্ণ করে রাসূলকে(স:) ও মুমিনদেরকে জানিয়ে দিলেন যে, রাসূলের পেছনে যে লোকটি পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ জামায়াতের সাথে পড়ছে সে প্রকৃত পে মুমিন না, সে মুনাফিক। এবং সূরার নাম পর্যন্ত রেখে দিলেন সূরা আল-মুনাফিকুন। যাতে করে কিয়ামত পযন্ত মানুষ এই সূরা থেকে শিা নিতে পারে যে, মুনাফিক কারা এবং তাদের বিষাক্ত ছোবল কেমন।

আল্লাহর রাসূল (সা:) একবার মসজিদে নববিতে সাহাবায়ে কেরামদের নিয়ে আলোচনা করছিলেন। আলোচনার মধ্যেই ‘ভোম্ব’ করে একটা বিকট আওয়াজ শুনা গেল। আল্লাহর রাসূল (সা:) সাহাবায়ে কেরামকে জিজ্ঞাসা করলেন ‘যে আওয়াজটা শোনা গেল সেটা কিসের আওয়াজ বলতে পার কি? সাহাবায়ে কেরাম উত্তর দিলেন, আল্লাহ ও তার রাসূলই (সা:) ভালো জানেন। তারপর হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, যে আওয়াজটা তোমরা এখন শুনলে সেটা একটা বড় রক বা পাথরের আওয়াজ। এখন থেকে ৫০ হাজার বছর আগে সেটা ছাড়া হয়েছিল। গড়াতে গড়াতে জাহান্নামের সর্বনিম্ন জায়গায় গিয়ে এখন সেটা স্পর্শ করেছে। তারই আওয়াজ ছিল এটা।
পবিত্র কুরআন এই কথার স্যা এইভাবে দিচ্ছে যে, ‘মুনাফিকদের স্থান হবে জাহান্নামের অতল গহ্বরে অর্থাৎ সর্বনিম্ন র্গতে।

মুনাফিকের পরিচয় সময়ের ব্যবধানে উন্মোচিত হয়ে পড়ে। মুনাফিক সর্দার আবদুল্লাহ ইবনে উবাই ইবনে সালুল উহুদের যুদ্ধের উদ্দেশ্যে যাত্রাপথে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে অরক্ষিত অবস্থায় ফেলে ৩০০ অনুসারী নিয়ে পালিয়ে যায়। ইসলামের ইতিহাসে এটিই মুনাফিকদের প্রথম প্রকাশ্যে কোন ষড়যন্ত্র।

১৪ ই শাওয়াল ৩ হিজরী, নবীজী (সাঃ) জুম্মার নামযের পর উহুদের ময়দানে রওনা হলেন যুদ্ধের উদ্দেশ্যে। সঙ্গে ১০০০ মুজাহিদ, কিন্তু ৩ মাঈল পথ যাবার পরেই মুসলিম বেশধারী মুনাফিক আব্দুল্লাহ ঈবন উবায়্য কোন এক অজুহাতে যুদ্ধ করতে অসী্কৃতি জানায় এবং তার ৩০০ সৈন্য নিয়ে ফিরে যায়। এই ঘটনায় নবীজী (সাঃ) একরকম খুশিই হন। কেননা যুদ্ধের সময় এরা থাকলে অন্যদের কূ-মন্ত্রনা দিত।

‘তোমরা বর্তমানে যে অবস্থায় আছো, আল্লাহ মুমিনদের কখনও সেই অবস্থায় থাকতে দিবেন না। পাক-পবিত্র লোকদেরকে তিনি নাপাক ও অপবিত্রকে লোকদের থেকে আলাদা করেই ছাড়বেন। কিন্তু তোমাদেরকে গায়েবের খবর জানিয়ে দেয়া আল্লাহর রীতি নয়। কিন্তু আল্লাহ্ তাঁর রসূলদের মধ্যে হতে যাকে ইচ্ছা বাছাই করে নেন। সুতরাং আল্লাহর উপর এবং তাঁর রসূলগণের উপর তোমরা ঈমান আনয়ন কর। তোমরা যদি বিশ্বাসী হও এবং তাকওয়া অবলম্বন কর, তাহলে তোমাদের জন্যে রয়েছে বিরাট প্রতিদান।’

অর্থাৎ মুমিন ও মুনাফিকরা যেভাবে একসাথে মিশ্রিত অবস্থায় আছে, আল্লাহ্ তা‘আলা তাদেরকে সে অবস্থায় রেখে দিবেন না। বরং তিনি প্রকৃত মুমিনদেরকে মুনাফেকদের থেকে আলাদা করবেন। যেমন তিনি করেছিলেন উহুদ যুদ্ধের দিন। আল্লাহ্ তা‘আলা কাউকে গায়েবের খবর অবগত করেন না। কেননা গায়েবের মাধ্যমেই তিনি বিশ্বাসী ও অবিশ্বাসীদের মধ্যে পার্থক্য করেন। আল্লাহ্ তা‘আলা চেয়েছেন যে, বাহ্যিকভাবেও যেন বিশ্বাসী ও মুনাফেকদের মধ্যে পার্থক্য হয়ে যায়। আর ওহুদ যুদ্ধে তাই হয়েছিল।

প্রিয়নবী হযরত মুহম্মদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামকে মক্কী জীবনে কাফির-মুশ্রিকদের মোকাবেলা করতে হয়েছে, কিন্তু ৬২২ খ্রিস্টাব্দে মদিনা মনওয়ারায় হিজরত করে আসার পর তাঁকে ইয়াহুদী এবং সেখানকার কিছু লোক যারা বাইরে ইসলাম গ্রহণকারী হলেও গোপনে ইসলামের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রকারী ছিল তাদের মোকাবেলা করতে হয়। লোক দেখানো ইসলামে দাখিল হওয়া এই লোকরাই মুনাফিক হিসেবে পরিচিত হয়। এরাই ইয়াহুদী এবং মক্কার কাফির-মুশ্রিকদের সঙ্গে আঁতাত করে ইসলামের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নেমে পড়ে। এই মুনাফিকদের সরদার বা নেতা ছিল আবদুল্লাহ্ ইব্নে উবাই। সে চেয়েছিল ইদনার কর্তৃত্ব নিজে গ্রহণ করতে। বাইরে সে হযরত মুহম্মদ সাল্লাল্লাহু ’আলায়হি ওয়া সাল্লামের একান্ত আপনজন হিসেবে জাহির করত আর তলে তলে ইসলামের ক্ষতি হয় এমন সব কাজ করত।

আল্লাহ্ জাল্লা শানুহু এই মুনাফিকদের চেহারা উন্মোচন করে দিয়ে প্রিয়নবী হযরত মুহম্মদ সাল্লাল্লাহু ’আলায়হি ওয়া সাল্লামকে সম্বোধন করে ইরশাদ করেন : ওয়া মিনান নাসি মায়ইয়া কুলু আমান্না বিল্লাহি ওয়া বিল ইয়াওমিল আখিরি ওয়ামাহুম বি মু’মিনীন। ইউ খাদিউনাল্লাহা ওয়াল্লাযীনা আমানু ওয়া মা ইয়াখদাউনা ইল্লা আনফুসাহুম ওয়ামা ইয়াশ উরুন। -আর মানুষের মধ্যে এমন কিছু লোক রয়েছে যারা বলে, আমরা ইমান এনেছি আল্লাহর প্রতি এবং শেষ দিবসের প্রতি : আদতে তারা মু’মিনদের অন্তর্ভুক্ত নয়।

মুনাফিকের চরিত্র : আল্লাহ তাআলা সুরা বাকারার ৮ থেকে ২০ পর্যন্ত মোট ১৩টি আয়াত মুনাফিকদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য প্রসঙ্গে নাজিল করেছেন। তা ছাড়া বিভিন্ন সুরায় আরো ৩৮টি আয়াতে মুনাফিকদের আলোচনা করেছেন। তাদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য হলো—

দুমুখো স্বভাবের : তারা দুমুখো আচরণ করে। বাহ্যিকভাবে নিজেদের মুমিন বলে পরিচয় দেয় অথচ তাদের ভেতরে ঈমান নেই। ঈমান তিনটি জিনিসের সমন্বয়ের নাম। ১. অন্তরের বিশ্বাস, ২. মৌখিক স্বীকৃতি এবং ৩. স্বীকৃতি অনুযায়ী আমল করা (ইবনে মাজাহ)। মুনাফিক শুধু মৌখিকভাবে ঈমানের স্বীকৃতি দান করে, কিন্তু অন্তরে মোটেও বিশ্বাস লালন করে না। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘আর মানুষের মধ্যে এমন কতিপয় লোক আছে, যারা বলে আমরা আল্লাহ ও আখিরাতে ঈমান এনেছি, অথচ তারা মুমিন নয়।’ (সুরা বাকারা, আয়াত : ৮)

প্রতারক ও ধোঁকাবাজ : তারা খুবই ধূর্ত প্রতারক ও ধোঁকাবাজ। আল্লাহ ও মুমিনদের সঙ্গে তারা প্রতারণা করে। তারা মনে করছে, এতে তারা সফলকাম ও বিজয়ী হচ্ছে, অথচ প্রকারান্তরে তারাই প্রতারিত ও প্রবঞ্চিত হচ্ছে। সত্য পথ থেকে দূরে গিয়ে পথভ্রষ্ট হচ্ছে এবং তিলে তিলে ধ্বংসের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘আল্লাহ ও ঈমানদারদের তারা ধোঁকা দিতে চায়, আসলে তারা অন্য কাউকে ধোঁকা দিচ্ছে না, বরং নিজেদেরই প্রতারিত করছে, অথচ তাদের সে অনুভূতি নেই।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ৯)

তাদের অন্তর অসুস্থ : সুস্থতার সীমা থেকে বের হয়ে গেলেই অসুস্থতা বলা হয়। মুনাফিকদের আকিদা-বিশ্বাসে সন্দেহ, অস্বীকৃতি ও মিথ্যা থাকার কারণে তাদের কলবকে অসুস্থ কলব বলা হয়। অসুস্থতা হলো সুস্থতার বিপরীত। দ্বিমুখী আচরণ একটি কঠিন ব্যাধি। আর খাঁটি বিশ্বাস হলো সুস্থতা। ঈমান আনার পর যারা দ্বিমুখী আচরণ করে, তারা মূলত অসুস্থ। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘তাদের হৃদয়ে রয়েছে ব্যাধি। অতঃপর আল্লাহ সে ব্যাধিকে আরো বাড়িয়ে দিয়েছেন, তাদের মিথ্যাচারের দরুন তাদের জন্য রয়েছে অত্যন্ত যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি।’ (সুরা : আল বাকারা, আয়াত : ১০)

নিজেদের শান্তি প্রতিষ্ঠাকারী মনে করে : মুনাফিকরা সমাজে বিভিন্ন ধরনের ফ্যাসাদ ও অশান্তি সৃষ্টি করে থাকে, অথচ তারা প্রচার-প্রপাগান্ডায় নিজেদের শান্তি প্রতিষ্ঠাকারী বলে পরিচয় দেয়। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘আর যখনই তাদের বলা হয়, পৃথিবীতে ফ্যাসাদ সৃষ্টি কোরো না, তারা উত্তরে বলে—আমরাই তো সংশোধনকারী ও শান্তিকামী।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ১১)

ফ্যাসাদ সৃষ্টিকারী : ইসলাম শান্তির ধর্ম। মুনাফিকরা ইসলাম ও সামাজিক শান্তির বিরোধিতা করে অশান্তি সৃষ্টি করে। কিন্তু নিজেদের ভ্রষ্টতা ও অজ্ঞতার কারণে অনুভব করতে পারছে না। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘সাবধান! এরাই ফ্যাসাদ সৃষ্টিকারী, কিন্তু তাদের সে অনুভূতি নেই।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ১২)

মুমিনদের নির্বোধ মনে করে : মুনাফিকরা নিজেদের বুদ্ধিমান, ধূর্ত, চতুর ও চালাক মনে করে। আর মুমিন, মুত্তাকি ও নেককারদের নির্বোধ ও বোকা বলে মনে করে। অথচ আল্লাহ তাআলার কাছে তারাই বোকা ও নির্বোধ। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘যখন তাদের বলা হয়, অন্য লোকদের ন্যায় তোমরাও ঈমান আনো, তখন তারা বলে, আমরা কি সেই নির্বোধ লোকদের মতো ঈমান আনব? আসলে তারাই তো নির্বোধ, কিন্তু তাদের সে জ্ঞান নেই।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ১৩)

উপহাসকারী : মুনাফিকরা মুমিন ও কাফির সবার সঙ্গে মেশে। মুমিনদের সঙ্গে মিশে মুমিনদের পক্ষের লোক বলে দাবি করে। আবার কাফিরদের সঙ্গে মিশে বলে আমরা তোমাদেরই লোক। মূলত কারো সঙ্গে তাদের আন্তরিক ও গভীর ভালোবাসা নেই। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘যখন তারা মুমিনদের সঙ্গে মিলিত হয় তখন বলে, আমরা ঈমান এনেছি, আবার যখন নিরিবিলি তাদের শয়তানদের (কাফির নেতাদের সঙ্গে) মিলিত হয় তখন বলে, আমরা তো তোমাদের সঙ্গেই আছি। আমরা তাদের (মুমিনদের) সঙ্গে শুধু ঠাট্টা-তামাশা করছি মাত্র।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ১৪)

অবাধ্যতার বিভ্রান্তিতে ঘুরে বেড়ায় : মুনাফিকদের তাদের ভ্রষ্টতার জন্য তাত্ক্ষণিকভাবে শাস্তি না দেওয়ায় এবং দুর্নীতিপরায়ণ হয়েও পার্থিব জগতে সুখ-শান্তিতে কালাতিপাত করার সুযোগদানের ফলে তাদের ভ্রষ্টতা আরো গভীরে অনুপ্রবেশ করে। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘বস্তুত আল্লাহই তাদের সঙ্গে তামাশা করছেন (তাদের তামাশার জবাব দিচ্ছেন) এবং তাদের তাদের অবাধ্যতার বিভ্রান্তিতে ঘুরে বেড়ানোর অবকাশ দিচ্ছেন।’ (সুরা বাকারা-১৬) রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘যখন তোমরা কোনো বান্দাকে দেখতে পাও যে সে পাপী হওয়া সত্ত্বেও তার পছন্দনীয় জিনিস তাকে দেওয়া হচ্ছে এবং সে সুখ-শান্তিতে আছে, তবে মনে করবে তা তার জন্য পাকড়াও করার অবকাশ মাত্র।’ আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘আমি শাস্তি না দিয়ে সুযোগ দিই পাপ বৃদ্ধির জন্য।’ (সুরা : আলে ইমরান, আয়াত : ১৭৮)

ভ্রষ্টতা ক্রয় করে : মুনাফিকরা দুনিয়ার লালসায় হেদায়েতের বিনিময়ে ভ্রষ্টতাকে গ্রহণ করে। তারা হেদায়েতের ওপর ভ্রষ্টতাকে অগ্রাধিকার দেয়। মানুষ যে জিনিসকে ভালোবাসে ও পছন্দ করে, সে জিনিসই ক্রয় করে। মুনাফিকরা ঈমান বিক্রি করে নিফাককে ক্রয় করে—অর্থাৎ ঈমানের ওপর নিফাককে প্রাধান্য দেয়। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘তারা এমন লোক, যারা হেদায়েতের পরিবর্তে ভ্রষ্টতাকে ক্রয় করে নিয়েছে। সুতরাং তাদের এ ব্যবসা লাভজনক হয়নি; আর তারা  হেদায়েতও পায়নি।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ১৬)

তারা বোঝে না যে দুনিয়ার ক্ষণিকের লাভের জন্য আখিরাতকে বিসর্জন দেওয়া ঠিক হবে না।

তারা আলোর কাছে আসে না : বিশ্বনবী (সা.) দ্বিনের আলো তথা কোরআন নিয়ে এসেছেন এবং সর্বত্র দ্বিনের আলো প্রজ্বলিত করেছেন। কিন্তু মুনাফিকরা সে আলো থেকে উপকৃত হতে পারেনি। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘তাদের উদাহরণ হলো ওই ব্যক্তির মতো, যে (অন্ধকারে) আগুন জ্বালিয়েছে; কিন্তু যখন তা তার চারপাশ আলোকিত করল, তখন আল্লাহ তাদের আলো অপসারিত করে তাদের ঘোর অন্ধকারে ফেলে দিয়েছেন, যাতে তারা কিছুই দেখতে পায় না।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ১৭)

তারা বধির, মূক ও অন্ধ : মুনাফিকরা হক কথা শোনার ব্যাপারে বধির, তারা হক কথা শোনে না, সত্য কথা বলার ব্যাপারে মূক ও বোবা এবং সত্য কথা বলে না। সত্য ও ন্যায়ের পথে চলার ব্যাপারে অন্ধ। আল্লাহ তাআলা সুবিধাভোগীদের অবস্থা বর্ণনা করেন, ‘তারা বধির, বোবা ও অন্ধ। তারা (হকের দিকে) আদৌ ফিরে আসবে না।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ১৮)

তারা সন্দেহপ্রবণ, দ্বিধাগ্রস্ত ও সুবিধাবাদী : মুনাফিকরা সুবিধা ভোগের জন্য ইসলামে দাখিল হয়; কিন্তু ইসলামের বিধিবিধান পালন ও ইসলামের আনুগত্যের কষ্ট স্বীকার করতে রাজি নয়। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘(তাদের উদাহরণ হলো) বর্ষণমুখর ঘন মেঘের মতো, যাতে রয়েছে ঘোর অন্ধকার, বজ্রের গর্জন ও বিদ্যুতের চমক; বজ্রধ্বনিতে মৃত্যুভয়ে তারা তাদের কানে আঙুল ঢুকিয়ে দেয়; আল্লাহ এসব সত্য প্রত্যাখ্যানকারী লোকদের সর্বদিক দিয়ে পরিবেষ্টন করে রেখেছেন। অর্থাৎ তারা আল্লাহর আয়ত্তের ভেতরে আছে, তিনি তাদের সম্পর্কে জানেন।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ১৯)

সুসময়ের সঙ্গী : মুনাফিকরা মুসলমানদের সুখ-শান্তি দেখলে ইসলামের ছায়াতলে চলে আসে। আর যখন মুসলমানরা দুখ-কষ্ট ও বিপদাপদে পতিত হয়, তখন নীরবে কেটে পড়ে। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘বিদ্যুৎ চমক যেন তাদের দৃষ্টিশক্তিকে ছিনিয়ে নেয়। যখনই তারা তাদের একটু আলো দেয়, তারা পথ চলে, আর যখনই অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়, তখনই থমকে দাঁড়ায়।’ অর্থাৎ সুসময়ে ইসলামের ছায়াতলে চলে আসে, আর যখন বিপদ দেখতে পায়, তখন সিটকে পড়ে এবং পূর্বের নিফাকিতে অবিচল ও অটল থাকে।

মিথ্যাবাদী : মুনাফিকরা মিথ্যাবাদী। তারা আল্লাহ ও তাঁর রাসুল (সা.) সম্পর্কে মিথ্যা সাক্ষ্য দেয়। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘মুনাফিকরা অবশ্যই মিথ্যাবাদী।’ (সুরা : মুনাফিকুন, আয়াত : ১)

আল্লাহর পথে বাধা সৃষ্টিকারী : মুনাফিকরা মানুষদের আল্লাহর দিকে আসতে দেয় না। তারা নানাভাবে বাধা সৃষ্টি করে। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘তারা আল্লাহর পথে বাধা সৃষ্টি করে। তারা যা করছে, তা খুবই মন্দ।’ (সুরা : মুনাফিকুন, আয়াত : ২)

অহংকারী : মুনাফিকরা অহংকারী ও দাম্ভিক। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘আপনি তাদের দেখবেন যে তারা অহংকার করে মুখ ফিরিয়ে নেয়।’ (সুরা : মুনাফিকুন, আয়াত : ৬)

প্রতারক : আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘অবশ্যই মুনাফিকরা আল্লাহর সঙ্গে প্রতারণা করছে, অথচ তারা নিজেরাই নিজেদের প্রতারিত করে। বস্তুত তারা যখন নামাজে দাঁড়ায় তখন একান্ত শিথিলভাবে লোকদেখানোর জন্য দাঁড়ায়। তারা আল্লাহকে অল্পই স্মরণ করে। এরা দোদুল্যমান অবস্থায় ঝুলন্ত; এদিকেও নয়, ওদিকেও নয়।’ (সুরা : নিসা, আয়াত : ১৪৩-১৪৪)

মুনাফিকদের আরো অসংখ্য বৈশিষ্ট্য ও চারিত্রিক দোষ-ত্রুটি কোরআন ও হাদিস শরিফে বর্ণিত আছে। আল্লাহ তাআলা আমাদের এসব থেকে হেফাজত করুন, আমিমুনাফিকের শাস্তি ও পরিণতি : সুরা আন-নিসার ১৪৫তম আয়াতে আল্লাহতায়ালা স্পষ্টভাবে বলে দিয়েছেন, ‘মুনাফিকরা জাহান্নামের সর্ব নিম্নস্তরে অবস্থান করবে।’ এ আয়াতের ব্যাখ্যায় হজরত ইবনে মাসউদ (রা.) বলেন, ‘মুনাফিকরা অগ্নিগর্ভ সিন্দুকে থাকবে।’ হজরত আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, ‘রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘তাদের ঊর্ধ্বে ও নিম্নে আগুন জ্বালিয়ে দেওয়া হবে।’

এই মুনাফিকরাই যুগে যুগে মুসলিমদের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি করে নিজেদের ফায়দা হাসিলের চেষ্টা করে আসছে। ইসলামের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে এর অসংখ্য দৃষ্টান্ত পাওয়া যাবে। কারবালার যুদ্ধের কথাই বলি, দেখা যাবে, মুনাফিকদের কারণেই বেদনাদায়ক ঘটনা ঘটেছে। মুনাফিক মুখোশধারীরা আমাদের কালেও রয়েছে। এদের চিনতে এবং মুখোশ উন্মোচিত করে দিতে হবে।

Facebook Comment





© All rights reserved © 2020 TabligNewsBD.Com
Design & Developed BY PopularServer.Com