রবিবার, ২২ নভেম্বর ২০২০, ০১:০৫ অপরাহ্ন

যুগে যুগে মুনাফিকদের ভয়ংকর ষড়যন্ত্র-৩

যুগে যুগে মুনাফিকদের ভয়ংকর ষড়যন্ত্র-৩

যুগে যুগে মুনাফিকদের ভয়ংকর ষড়যন্ত্র-৩

সৈয়দ আনোয়ার আবদুল্লাহ

রাসূল সা. এর সাথে সংঘটিত এ সকল ঘটনা উম্মতের জন্য শিক্ষা। মুনাফিকরা রাসূলের পবিত্র জীবনে কালেমা লাগানোর অনেক চেষ্টা করেও যখন ব্যর্থ হয়েছিল, তখন তার প্রিয়তমা স্ত্রীর উপর জঘন্য অপবাদ দিয়ে নবুওয়তের কাজকে প্রশ্নবিদ্ধ ও নবীর দাওয়াতি মিশনকে বন্ধ করতে চাচ্ছিল। এই ঘটনা থেকে কেয়ামত পর্যন্ত উম্মত শিক্ষা নিবে, দাওয়াতের কাজকে বাধাগ্রস্ত করতে এভাবেই মুনাফিকরা আমীর কিংবা তার পরিবারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করবে।

إِنَّ الَّذِينَ جَاءُوا بِالْإِفْكِ عُصْبَةٌ مِّنكُمْ ۚ لَا تَحْسَبُوهُ شَرًّا لَّكُم ۖ بَلْ هُوَ خَيْرٌ لَّكُمْ ۚ لِكُلِّ امْرِئٍ مِّنْهُم مَّا اكْتَسَبَ مِنَ الْإِثْمِ ۚ وَالَّذِي تَوَلَّىٰ كِبْرَهُ مِنْهُمْ لَهُ عَذَابٌ عَظِيمٌ
অর্থ : ‘নিশ্চয় যারা এ অপবাদ রচনা করেছে, তারা তো তোমাদেরই একটি দল; এটাকে তোমরা তোমাদের জন্য অনিষ্টকর মনে করো না; বরং এটাতো তোমাদের জন্য কল্যাণকর; তাদের প্রত্যেকের জন্য আছে তাদের পাপকাজের ফল এবং তাদের মধ্যে যে এ ব্যাপারে প্রধান ভূমিকা গ্রহণ করেছে, তার জন্য আছে মহা শাস্তি।’ (সূরা নূর : ১১)
তাফসীর

ইফকের ঘটনাঃ আয়িশা(রা) এর উপর অপবাদের ঘটনা।إِنَّ الَّذِينَ جَاءُوا بِالْإِفْكِ عُصْبَةٌ مِّنكُمْ ۚ অর্থ:“যারা মিথ্যা অপবাদ রটনা করেছে।
ঘটনাটা সীরাতের পাতায় “ইফকের ঘটনা” নামে পরিচিত। ঘটনাটি ঘটে পঞ্চম হিজরীর শাবান মাসে। বনু মুসতালিকের যুদ্ধে। এ যুদ্ধে আগে থেকেই বুঝা যাচ্ছিলো যে, তেমন কোন রক্তপাত ঘটবে না। মুসলিমরা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বীতায় জিতবে। তাই মদিনার বিপুল সংখ্যক মুনাফিকরা এ যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলো। ইবনে সা’দ বর্ণনা করেন- “এই অভিযানে অসংখ্য মুনাফিক অংশগ্রহণ করে যা অন্য কোনো অভিযানে আগে দেখা যায়নি।”
.
রাসূল(সাঃ) যখন কোনো সফরে বের হতেন, তখন স্ত্রী নির্বাচনের জন্য লটারী করতেন। বনু মুসতালিকের যুদ্ধে অভিযানে সফরসঙ্গী হিসেবে লটারীতে আয়েশা(রাঃ) এর নাম আসে। আয়েশা(রাঃ) যাত্রাকালে প্রিয় ভগ্নি আসমা(রাঃ) এর একটি হার ধার নেন। হারটির আংটা এতো দূর্বল ছিলো যে বারবার খুলে যাচ্ছিলো। সফরে আয়েশা(রাঃ) নিজ হাওদাতে আরোহণ করতেন। এরপর হাওদার দায়িত্বে থাকা সাহাবীগণ হাউদা উঠের পিঠে উঠতেন। তখন আয়েশা(রাঃ) এর বয়স ছিল কেবল চৌদ্দ বছর। তিনি এতো হালকা গড়নের ছিলেন যে, হাওদা-বাহক সাহাবীগণ সাধারণত বুঝতে পারতেন না যে, ভিতরে কেউ আছে কি নেই!
.
সফরকালে রাতের বেলায় এক অপরিচিত জায়গায় যাত্রাবিরতি হয়। আয়েশা(রাঃ) প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে দূরে চলে গেলেন। ফেরার সময় হঠাৎ গলায় হাত দিয়ে দেখলেন ধার করা হারটি নেই। তিনি প্রচণ্ড ঘাবড়ে গেলেন। প্রথমত, তার বয়স ছিল কম আর তার উপরে হারটি ছিল ধার করা। হতভম্ব হয়ে তিনি হারটি খুঁজতে লাগলেন। বয়স কম হবার কারণে তার ভ্রমণের অভিজ্ঞতা ছিলো না। তিনি ভেবেছিলেন যাত্রা আবার শুরু হবার আগেই তিনি হারটি খুঁজে পাবেন আর সময়মতো হাওদাতে পৌঁছে যাবেন। তিনি না কাউকে ঘটনাটি জানালেন, না তার জন্য অপেক্ষা করার নির্দেশ দিলেন।
.
খুঁজতে খুঁজতে তিনি হারটি পেয়ে গেলেন কিছুক্ষণ পর। কিন্তু ততক্ষণে কাফেলা রওনা হয়ে গেছে। তারা ভেবেছিলেন, আয়েশা(রাঃ) হাওদার মধ্যেই রয়েছেন। এদিকে আয়েশা(রাঃ) কাফেলার স্থানে এসে কাউকে পেলেন না। তিনি চাদর মুড়ি দিয়ে সেখানেই পড়ে রইলেন। ভাবলেন, যখন কাফেলা বুঝতে পারবে তখন আবার এখানে ফিরে আসবে।
.
সে সফরে সাকাহ হিসেবে দায়িত্বে ছিলেন সফওয়ান(রাঃ)। সাকাহ বলতে কাফেলার রক্ষণাবেক্ষণকারীদের বুঝানো হয়। তাদের কাজ ছিলো কাফেলাকে কিছু দূর থেকে অনুসরণ করা। কেউ পিছিয়ে পড়লে কিংবা কোনো কিছু হারিয়ে গেলে তা কাফেলাকে পৌঁছে দেয়া। সফওয়ান(রাঃ) ছিলেন খুব বড়ো মাপের সাহাবী। তিনি পথ চলতে চলতে অস্পষ্ট অবয়ব দেখতে পেয়ে সামনে এগিয়ে গেলেন। আর চাদর মুড়ি দেয়া অবস্থাতেও আয়েশা(রাঃ) কে চিনতে পারলেন। কারণ, পর্দার বিধান নাযিল হবার পূর্বে তিনি আয়েশা(রাঃ) কে দেখেছিলেন। আয়েশা(রাঃ) তখন ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। তাকে সজাগ করার জন্য সফওয়ান(রাঃ) জোরে
“ইন্না-লিল্লাহ” বলে আওয়াজ দিলেন। বললেন, “এ যে রাসূল(সা) এর সহধর্মিণী! আল্লাহ আপনার উপরে রহম করুন! কি করে আপনি পিছে রয়ে গেলেন?”
.
আয়েশা(রাঃ) কোনো কথার জবাব দিলেন না। সফওয়ান(রাঃ) একটি উট এনে তাতে আয়েশা(রাঃ) কে আরোহণ করতে বলে দূরে সরে দাঁড়ান। আয়েশা(রাঃ) উটের পিঠে আরোহণ করলে তিনি উটের লাগাম ধরে সামনে পথ চলতে থাকেন। অনেক চেষ্টা করেও ভোরের আগে তারা কাফেলাকে ধরতে পারলেন না।
.
ঘটনাটি এতোটুকুই। এবং যে কোনো সফরে এমনটা ঘটা একদম স্বাভাবিক। কিন্তু যাদের হৃদয়ে বক্রতা আছে তারা ঘটনাটিকে লুফে নিলো। কুৎসা রটাতে লাগলো। তবে যাদের হৃদয় পবিত্র তারা এসব শোনামাত্রই কানে আঙ্গুল দিয়ে বলতেনঃ আল্লাহ মহাপবিত্র! এটা সুস্পষ্ট অপবাদ ছাড়া কিছুই না।
আবু আইয়ুব(রাঃ) তার স্ত্রীকে জিজ্ঞেস করলেন, “হে উম্মে আইয়ুব! যদি তোমার ব্যাপারে কেউ এমন মন্তব্য করতো, তুমি কি মেনে নিতে?” তার স্ত্রী জবাব দিলেন, “আল্লাহ মাফ করুন, কোনো অভিজাত নারীই তা মেনে নিতে পারে না।” তখন আবু আইয়ুব(রাঃ) বললেন, “আয়েশা(রাঃ) তোমার চেয়ে অনেক অনেক বেশি অভিজাত। তাহলে তার পক্ষে এটা কিভাবে মেনে নেয়া সম্ভব!”
.
এ ঘটনা সব জায়গায় ছড়ানোর মূল হোতা ছিলো আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই। আমিরুল মুনাফিকুন, মুনাফিকদের সর্দার। ঘটনাক্রমে আরো তিনজন সম্মানিত সাহাবী এই কুচক্রে জড়িয়ে পড়েন। হাসসান ইবনে সাবিত(রাঃ), হামনা বিনতে জাহশ(রাঃ) আর মিসতাহ ইবনে আসাসাহ(রাঃ)।এদিকে আয়েশা(রাঃ) মদিনা পৌঁছানোর পর ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়েন। তাই তিনি ঘটনাটি সম্পর্কে কিছুই জানতেন না। রাসূল(সাঃ) আর আবু বকর(রাঃ) তাকে কিছুই জানালেন না।
আয়েশা(রাঃ) আর রাসূল(সাঃ) এর মধ্যে খুবই উষ্ণ সম্পর্ক ছিলো সবসময়। রাসূল(সাঃ), আয়েশা(রাঃ) কে সবচেয়ে বেশী ভালোবাসতেন। এক সাথে দৌড় খেলতেন, ইচ্ছা করে হেরে যেতেন। আয়েশা(রাঃ) পাত্রের যে দিক দিয়ে পান করতেন, রাসূল(সাঃ) সেদিক দিয়ে পানি পান করতেন।
.
আয়েশা(রাঃ) অসুস্থ হলে তিনি দয়া আর কোমলতা প্রদর্শন করতেন। কিন্তু এবারের অসুস্থতায় আগের মতো কোমলতা প্রদর্শন করলেন না। আয়েশা(রাঃ) লক্ষ্য করলেন রাসূল(সা:) আর আগের মতো তার সাথে প্রাণ খুলে কথা বলেন না।
পুরো ব্যাপারটায় তিনি খুব কষ্ট পেলেন। তাই রাসূল(সাঃ) এর অনুমতি নিয়ে পিতৃগৃহে চলে গেলেন। তখনো তিনি আসল ঘটনাটি জানতেন না। পরবর্তীতে, একদিন রাতের বেলা প্রাকৃতিক প্রয়োজনে বাইরে বের হলে মিসতাহ(রাঃ) এর মা তাকে পুরো ঘটনাটি জানান। নিজের ছেলেকে মা হয়ে অভিশাপ দেন। আয়েশা(রাঃ) এর কাছে তখন সবকিছু পরিষ্কার হয়ে গেলো। তার মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়লো। তিনি রাত-দিন অবিরত কাঁদতে থাকলেন।
.
এদিকে তার বিরুদ্ধে অপবাদকারীরা আরো জোরে শোরে তাদের কুৎসা রটাতে থাকে। প্রায় ১ মাস হয়ে যায়। কোনো মীমাংসা হয় না। মুনাফিক আর গুটিকয়েক ব্যক্তি ছাড়া সবাই বিশ্বাস করতো আয়েশা(রাঃ) নির্দোষ ছিলেন। তারপরেও স্বচ্ছতার স্বার্থে রাসূল(সাঃ) ঘটনার তদন্ত করলেন। তিনি উসামা(রাঃ) আর আলী(রাঃ) এর সাথে পরামর্শ করলেন। উসামা(রাঃ) বললেন, “হে আল্লাহর রাসূল! আপনার পরিবার সম্পর্কে আমরা ভালো ভিন্ন আর কিছুই জানি না।” আলী(রাঃ) ঘটনার আরো সুষ্ঠু তদন্তের জন্য রাসূল(সাঃ) কে ঘরের দাসীদের জিজ্ঞেস করতে বললেন। দাসীকে জিজ্ঞেস করা হলে সে বললোঃ তার মধ্যে আমি দোষের কিছুই দেখি না। কেবল এতোটুকুই যে, তিনি যখন-তখন ঘুমিয়ে পড়েন, আর বকরী এসে সব সাবাড় করে নিয়ে যায়।
.
রাসূল(সাঃ) বুকভরা কষ্ট নিয়ে সবার উদ্দেশ্যে ভাষণ দিলেন। বললেন, “লোকসকল! মানুষের কি হয়েছে? তারা আমার পরিবার সম্পর্কে আমাকে কষ্ট দিচ্ছে। তারা মিথ্যা বলছে আমার পরিবারের বিরুদ্ধে।”
রাসূল(সাঃ) এরপর আবু বকর(রাঃ) এর গৃহে আগমন করেন। আয়েশা(রাঃ)কে উদ্দেশ্য করে বললেনঃ হে আয়েশা! লোকেরা কি বলাবলি করছে তা তো তোমার জানা হয়ে গেছে। তুমি আল্লাহকে ভয় করো। আর লোকেরা যেসব বলাবলি করছে তাতে লিপ্ত হয়ে থাকলে তুমি আল্লাহর নিকট তওবা করো। আল্লাহতো বান্দার তওবা কবুল করে থাকেন।
.
আয়েশা(রাঃ) সে কষ্টের অভিজ্ঞতার কথা সম্পর্কে বলেনঃ আল্লাহর কসম! তিনি আমাকে লক্ষ্য করে একথাগুলো বলার পর আমার চোখের অশ্রু সম্পূর্ণ শুকিয়ে যায়। আমার সম্পর্কে কুর’আন নাযিল হবে! আমার নিজেকে নিজের কাছে তার চাইতে তুচ্ছ মনে হয়েছে। তখন আমি বললাম- আমার সম্পর্কে যেসব কথা বলা হচ্ছে সে ব্যাপারে আমি কখনোই তওবা করবো না। আমি যদি তা স্বীকার করি তবে আল্লাহ জানেন যে আমি নির্দোষ আর যা ঘটেনি তা স্বীকার করা হয়ে যাবে। আমি ইয়াকুব(আঃ) আর নাম স্মরণ করতে চাইলাম। কিন্তু মনে করতে পারলাম না। তাই আমি বললাম- ইউসুফ(আঃ) এর পিতা যা বলেছিলেন, তেমন কথাই আমি উচ্চারণ করবোঃ
“ সুন্দর সবরই(উত্তম) আর তোমরা যা বলছো সে ব্যাপারে আমি আল্লাহর নিকট সাহায্য প্রার্থনা করছি।” (সূরা ইউসুফঃ১৮)
.
এ পর্যায়ে আল্লাহর পক্ষ থেকে ওহী নাযিল হলো আয়েশা(রাঃ) সম্পর্কে-
.
“যারা মিথ্যা অপবাদ রটনা করেছে, তারা তোমাদেরই একটি দল। তোমরা একে নিজেদের জন্যে খারাপ মনে করো না; বরং এটা তোমাদের জন্যে মঙ্গলজনক। তাদের প্রত্যেকের জন্যে ততটুকু আছে যতটুকু সে গোনাহ করেছে এবং তাদের মধ্যে যে এ ব্যাপারে অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছে, তার জন্যে রয়েছে বিরাট শাস্তি।
যারা পছন্দ করে যে, ঈমানদারদের মধ্যে ব্যভিচার প্রসার লাভ করুক, তাদের জন্যে ইহাকাল ও পরকালে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি রয়েছে। আল্লাহ জানেন, তোমরা জানো না।” (সূরা নূরঃ ১১,১৯)
.
আয়াত নাযিলের পর আয়েশা(রা:) এর মা প্রচণ্ড খুশী হন। মেয়েকে বলেন: যাও মা! আল্লাহর রাসূলের শুকরিয়া আদায় করো। আয়েশা(রা:) তখন এক বুক অভিমান নিয়ে বললেন: আমি কখনোই তার শুকরিয়া আদায় করবো না। বরং যেই আল্লাহতায়ালা আমার নিষ্কুলষতার সাক্ষ্য দিয়েছেন, আমি কেবল তারই শুকরিয়া আদায় করবো।

সূরা আন-নূরের অধিকাংশ আয়াত চারিত্রিক নিষ্কলুষতা ও পবিত্রতা সংরক্ষণের জন্য প্রবর্তিত বিধানাবলীর সাথে সম্পর্কযুক্ত। এর বিপরীতে চারিত্রিক নিষ্কলুষতা ও পবিত্রতার উপর অবৈধ হস্তক্ষেপ, অপবাদ রটানো ও সৎ চরিত্রের বিরুদ্ধে গুজব ছড়ানোর জাগতিক শাস্তি ও আখেরাতের মহাবিপদের কথা আলোচিত হয়েছে। ষষ্ঠ হিজরীতে কতিপয় মুনাফেক উন্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা সিদ্দীকা রাদিয়াল্লাহু আনহার প্রতি এমনি ধরণের অপবাদ আরোপ করেছিল যার গুজবে মদিনার বাতাস ভারী হয়ে উঠেছিল। কোন কোন সরলমনা সাহাবীও মুনাফিকদের চাক্রান্তে পড়ে এই অপবাদের কাজে জড়িয়ে পড়েছিলেন। তাদের অনুসরণ করে আসহাবে বদরের মতো জলিলুল কদর বড় মাপের সাহাবীও এ আলোচনায় জড়িত হয়ে পড়েছিলেন। রাসূল সা. একপর্যায়ে আম্মাজান হযরত আয়েশা রাযি. এর সাথে কথাবার্তা বন্ধ করে দিয়ে তাকে বাবার বাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। ব্যাপারটি সাধারণ মুসলিম সচ্চরিত্রা নারী ও রাসূলের পরিবার হিসাবে অত্যধিক গুরুতর ছিল। তাই কুরআনুল কারীমে আল্লাহ্ তা‘আলা আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহার পবিত্রতা বর্তনা করে এ স্থলে উপরোক্ত দশটি আয়াত নাযিল করেছেন। [ইবন কাসীর]

এসব আয়াতে আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহার পবিত্রতা ঘোষণা করতঃ তার ব্যাপারে যারা কুৎসা রটনা ও অপপ্রচারে অংশগ্রহণ করেছিল, তাদের সবাইকে হুশিয়ার করা হয়েছে এবং দুনিয়া ও আখেরাতে তাদের বিপদ বর্তনা করা হয়েছে। এই অপবাদ রটনার ঘটনাটি কুরআন ও হাদীসে ‘ইফকের ঘটনা’ নামে খ্যাত। ইফক শব্দের অর্থ জঘন্য মিথ্যা অপবাদ। [বাগভী] এসব আয়াতের তাফসীর বুঝার জন্য অপবাদের কাহিনীটি জেনে নেয়া অত্যন্ত জরুরি।

যখন এই মুনাফেক-রটিত অপবাদের চর্চা হতে লাগল, তখন স্বয়ং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম এতে খুবই মর্মাহত হলেন। আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহার তো দুঃখের সীমাই ছিল না। সাধারণ মুসলিমগণও তীব্রভাবে বেদানাহত হলেন। একমাস পর্যন্ত এই আলোচনা চলতে লাগল। অবশেষে আল্লাহ্ তা‘আলা উন্মুল মু’মিনীন আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহার পবিত্রতা বর্তনা এবং অপবাদ রটনাকারী ও এতে অংশগ্রহণকারীদের নিন্দা করে ৩০দিন পর উপরোক্ত আয়াতসমূহ নাযিল করলেন।

অপবাদের হদ-এ বর্ণিত কুরআনী-বিধান অনুযায়ী অপবাদ আরোপকারীদের কাছ থেকে সাক্ষ্য তলব করা হলো। তারা এই ভিত্তিহীন খবরের সাক্ষ্য কোথা থেকে আনবে? ফলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম শরীয়তের নিয়মানুযায়ী তাদের প্রতি অপবাদের হদ প্রয়োগ করলেন। আসহাব বদরের মতো সাহাবীসহ প্রত্যেককে আশিটি বেত্রাঘাত করা হলো। [আবু দাউদের বর্তনায়, তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম তিন জন মুসলিম মিসতাহ, হামানাহ ও হাসসানের প্রতি হদ প্রয়োগ করেন। [আবু দাউদঃ ৪৪৭৪] অতঃপর মুসলিমরা তাওবাহ করে নেয় এবং মুনাফেকরা তাদের অবস্থানে কায়েম থাকে। তবে আব্দুল্লাহ ইবনে উবাইকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম শাস্তি দিয়েছেন একথা প্রমাণিত হয়নি। যদিও তাবরানী কয়েকজন সাহাবী থেকে বর্তনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে শাস্তি দিয়েছেন। [দেখুন- মু‘জামুল কাবীরঃ ২৩/১৪৬(২১৪), ২৩/১৩৭(১৮১), ২৩/১২৫(১৬৪), ২৩/১২৪(১৬৩)] এছাড়া মিথ্যা অপবাদে শরীক হওয়ার জন্য কখনো তাদের সাক্ষী গ্রহনযোগ্য হবে না বলে সিদ্ধান্ত দিলেন।

এখানে কয়েকটি উসুলী কথা হলো,
(১) আম্মাজান আয়েশা রাযি. এর উপর যদি জঘন্য অপবাদ দিয়ে মদিনার বাতাসকে মুনাফিকরা ভারী করে তুলতে পারে, তাহলে ১৪শত বছর পরে এসে কোন আলেম বা আমীরের বিরুদ্ধে জঘন্য অপবাদ ও গুজব ছড়িয়ে বাতাসকে ভারী করা কি অস্ববাবিক কিছু? কারণ আম্মাজানের পায়ের ধুলোর মর্যাদাও রাখেন না এ জামানার কোন আলেম। আম্মাজান আয়েশা রাযি. এর এমন দশটি গুণ আছে যা এই উম্মতের করো মাঝে নেই। যেমন :
১. রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে তার বিয়ে হয়েছিল আল্লাহ পাকের সিদ্ধান্তে।
২. আয়েশা রাযি. এর বিয়ের উকিল ছিলেন হযরত জিবরাইল আমীন আ.।
৩. আয়েশা রাযি. রাসূলের একমাত্র কুমারী স্ত্রী।
৪. হযরত আয়েশা রাযি. উম্মতের সবচেয়ে বড় মুহাদ্দিস ও ফকীহ।
৫. তার কুলে মাথা রেখে রাসূল সা. দুনিয়া থেকে চির বিদায় নিয়েছিলেন।
৬. আম্মাজান আয়েশা রাযি. এর গৃহে রাসূল সা. রওজা পাকে শুয়ে আছেন।
৭. আম্মাজান আয়েশা রাযি. হযরত আবু বকর সিদ্দিক রাযি. এর সিদ্দিকা মেয়ে।
৮. আম্মাজান আয়েশা রাযি. এর পবিত্রতা আল্লাহ বর্তনাা করেছেন।
৯. আম্মাজানের উপর কুরআনের দশটি আয়াত নাজিল হয়েছে।
১০. রাসূল সা. এর ইন্তেকালের পর শরিয়ত ও ইমারতের বিষয়ে সাহাবাদের যাবতীয় মালআসা-মাসায়েল ও পরামর্শ দিয়ে তিনি দ্বীনের মহান খাদেমের ভূমিকা পালন করেছেন।

(২) মুনাফিকদের চক্রান্তে পড়ে অপপ্ররের কাজে যদি আসহাবে বদরের মতো কোন কোন সরলমনা মুসলমান জড়িয়ে পড়তে পারেন, আজকের যুগের মুনাফিকদের চক্রান্তে পড়ে এ জমানার আলমেরা বিভ্রান্ত হয়ে অপপ্রচারে শরিক হওয়া কি অস্বাভাবিক কিছু? আসহাবে বদর ঐসমস্ত সাহাবী যাদের আগের ও পরের সকল গোনাহ আল্লাহ মাফ করে দিয়েছেন। বর্তমান জমানার সকল পীর-দরবেশ, ওলী-আউলিয়া, আলেম, মুহাদ্দিস, মুফতী জমহুরিয়াত মিলে একজন আদনা সাহাবীর সমান হতে পরেন না, যিনি একদিন বা সামান্য সময় রাসূলের সোহবত পেয়েছেন। আর আম্মাজান আয়েশা রাযি. এর বিরুদ্ধে রটনা ও অপপ্রচারে আসহাবে বদরের মর্যাদাবান সাহাবী জড়িয়ে পড়েছিলেন, চক্রান্ত কতোটা ভয়ঙ্কর হলে এমন ঘটতে পারে ভাবা যায়? এই ঘটনা কি প্রমাণ করে না, কেয়ামত পর্যন্ত যে কেউ এমন বিভ্রান্তির শিকার হয়ে অপপ্রচারে নামতে পারেন।
(৩) রাসূল সা. এর সাথে সংঘটিত এ সকল ঘটনা উম্মতের জন্য শিক্ষা। মুনাফিকরা রাসূলের পবিত্র জীবনে কালেমা লাগানোর অনেক চেষ্টা করেও যখন ব্যর্থ হয়েছিল, তখন তার প্রিয়তমা স্ত্রীর উপর জঘন্য অপবাদ দিয়ে নবুওয়তের কাজকে প্রশ্নবিদ্ধ ও নবীর দাওয়াতি মিশনকে বন্ধ করতে চাচ্ছিল। এই ঘটনা থেকে কেয়ামত পর্যন্ত উম্মত শিক্ষা নিবে, দাওয়াতের কাজকে বাধাগ্রস্ত করতে এভাবেই মুনাফিকরা আমীর কিংবা তার পরিবারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করবে। আর সেই ষড়যন্ত্রের পাতানো ফাঁদে কোরআনের ভাষায় ‘তোমাদের লোক’ (তোমাদের একটি দল) জড়িয়ে যেতে পারেন। এমনকি বড়বড় মর্যাদাবান ব্যক্তিরাও তাতে শরীক হয়ে গুজব, অপপ্রচার আর অপবাদ দিয়ে বাতাসকে ভারী ও পরিবেশকে কঠিন করে তুলতে পারেন।

(৪) আল্লাহ পাক ইচ্ছে করলে আম্মাজান আয়েশা রাযি. এর পবিত্রতা বর্তনা করে সাথে সাথেই কোরআনের আয়াত বা অহি নাজিল করতে পারতেন। কিন্তু আল্লাহ পাকের কয়েকটি হেকমতের কারণে ৩০দিন পরে সূরায়ে নূরের এই দশটি আয়াত নাজিল করে আম্মাজানের পবিত্রতা বর্তনা করলেন। রাসূলের দোয়া, আবু বকর সিদ্দিক রাযি. এর চোখের পানি (তিনি মসজিদের কোণে বসে তখন হেঁচকি দিয়ে কাঁদতেন আর বলতেন, আমার মেয়ে এমন কাজ করতে পারে না, আমি বিশ্বাস করি না। জাহিলিয়াতের যুগেও আবু বকরের মুখ ও উরু পবিত্র ছিল), আয়েশা রাযি. এর রোনাজারি, সাহাবাদের দোয়া, কান্নাকাটি কবুল হয়ে আসতে ত্রিশ দিন লেগেছে, আজকের যুগে কোন আল্লাহর বান্দা যদি এমন কোন অপপ্রচারের শিকার হন, তাহলে তার বিষয়ে উম্মতের সামনে সত্য উম্মোচিত হতে ত্রিশ বছরও লাগতে পারে। মুনাফিকদের শেষ ব্যক্তিটি পেছন থেকে কল-কবজা নাড়ছিল। শেষ ব্যক্তিটি যখন বেরিয়ে এলো তখন মাকে খালেছ করতে আল্লাহ পাক আয়াত নাজিল করতেন। নতুবা আগে আয়াত নাজিল হলে সেই পেছনের ব্যক্তি পরবর্তীতে আরো জঘন্য কাজ করত মুসলমান সেজে, এটি ছিল আল্লাহর একটি হেকমত বটে।

Facebook Comment





© All rights reserved © 2020 TabligNewsBD.Com
Design & Developed BY PopularServer.Com