শুক্রবার, ২৭ নভেম্বর ২০২০, ১২:১৫ অপরাহ্ন

মুনাফিকদের ভয়ংকর ষড়যন্ত্র যুগে যুগে-৫

মুনাফিকদের ভয়ংকর ষড়যন্ত্র যুগে যুগে-৫

মুনাফিকদের ভয়ংকর ষড়যন্ত্র যুগে যুগে-৫

মাওলানা হাকীম সৈয়দ আনোয়ার আবদুল্লাহ

মুনাফিকদের ষড়যন্ত্রে ইসলামের তৃতীয় খলিফা আমীরুল মুমিনিন হযরত উসমান (রা)শাহাদাতের পর হযরত তালহা (রা.) এবং হযরত যুবায়ের (রা.) এর সক্রিয় প্রচেষ্ঠায় হযরত আলী (রা.) ৪র্থ খলীফা নিযুক্ত হন।

হযরত আলী (রা.) খলীফা নিযুক্ত হওয়ার পর সর্বপ্রথম তিনি হযরত (রা.) এর হত্যাকারীদের খোঁজ করেন। কিন্তু একাজে বহু চেষ্ঠা চালিয়েও তিনি প্রকৃত হত্যাকারীদের সন্ধান পেলেন না। হত্যাকান্ডের সময় উপস্থিত হযরত উসমান (রা.) এর স্ত্রী হযরত নায়েলা হত্যাকারীদের কাউকেই সনাক্ত করতে পারেন নাই। হযরত উসমান (রা.) এর হত্যাকান্ডে অনেক এলাকার বহু গোত্রের লোক জড়িত ছিল।

বর্তমানের অরাজক অবস্থায় সকলের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া সহজও ছিল না, নিরাপদ ছিল না। নিরাপদ ছিল না। এ অবস্থায় গোপনে তদন্ত করা ছাড়া হযরত আলী (রা.) এর সামনে কোন পথ রইল না।

অন্যদিকে মারওয়ান ইবনে হাকাম বনু উমাইয়ার কিছু ব্যাক্তিকে নিয়ে মানুষের মধ্যে উসমান (রা.) এর হত্যার সাথে হযরত আলী (রা.) এর সংশ্লিষ্টার মিথ্যা সন্দেহ ঢুকিয়ে দিল। আবার হত্যাকারীদের বিচারে বিলম্ব দেখে হযরত তালহা (রা.) ও হযরত যুবাইর (রা.) অসন্তুষ্টি হয়ে মক্কায় হজ উপলক্ষে অবস্থানরত আম্মাজন হযরত আয়শা (রা.) এর নিকট গিয়ে মিলিত হল।

মওয়ান ইবনে হাকাম তখন বনু উমাইয়ার বিরাট দল সহ মক্কাতেই ছিল। তারা সকলে মিলে হযরত আয়শা (রা.) কে হযরত আলীর বিরুদ্ধে উত্তেজিত এবং জনগনের মধ্যে বিদ্রোহের আগুন ধরিয়ে দিল। অবশেষে হযরত আয়শা (রা.) যুদ্ধে রওয়ানা হয়ে গেলেন। সঙ্গে ছিলেন হযরত তালহা (রা.) হযরত যুবাইর (রা.) সহ হমহুর সাহাবায়ে কেরাম (রা.) গন। হওয়াব নামক স্থারনে একটি কুপের নিকট কুকুর ডাকতেছিল। হযরত আয়শা (রা.) জিজ্ঞেস করলেন, এ স্থানের নাম কি ? কেহ জবাব দিল ‘হাওয়াব’। ইহা শুনেই হযরত আয়শা (রা.) বললেন, ‘আমি ফেরত যাব। কারণ আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট শুনেছি, আমার এক স্ত্রী যখন ভুল পথে চলবে তখন হাওয়াবের কুকুর ডাকবে।” তখন ফাসাদীরা কসম করে বলতৈ লাগল, না না, ভুল হয়ে গেছে এ স্থানের নাম হাওয়ার নয়। ইহা অন্য এক জায়গা। তারা ভিন্ন কথায় হযরত আয়শা (রা.) কে বুঝিয়ে শান্তনা দিতে দিতে বসরা নিয়ে গেল। তারা বসরা গমন করে উসমান (রা.) এর হত্যাকারী সন্দেহে কয়েকজনকে কিসাস স্বরুপ হত্যা করলেন। কিন্তু যেহেতু সন্দেহে মাধ্যমে তাদেরকে হত্যা করা হয়েছিল তাই অধিকাংশ বসরাবাসী হযরত আয়শা (রা.) এর বিরোধী হয়ে হযরত আলী (রা.) এর পক্ষে অবস্থান নিল।

অন্যদিকে নিরুপায় হয়ে হযরত আলী (রা.) নিরুপায় হয়ে বরসা অভিমুখে রওয়ানা হলেন। তখন সুযোগ সন্ধানী মুনাফিক নেতা আব্দুল্লাহ ইবনে সাবাহ ও তার সঙ্গীরা হযরত আলী (রা.) এর সৈন্য দলে যোগ দিল।

কোন পক্ষই যুদ্ধ পছন্দ করছিল না। কিন্তু বড়যন্ত্রকারীদের চক্রান্ত ও অপচেষ্টায় পরিস্থতি নিয়ন্ত্রনের বাহিরে চলে যাচ্ছিল। এমতাব অবস্থায় হযরত আলী (রা.) সন্ধির চেষ্টা করার জন্য প্রসিদ্ধ সাহাবী হযরত কা’কা (রা.) কে হযরত আয়শা (রা.), হযরত তালহা (রা.), হযরত যুবাইর (রা.) গনের নিকট পাঠালেন। হযরত কা’কা (রা.) কে হযরত আয়শা (রা.), হযরত তালহা (রা.), হযরত যুবাইর (রা.) গনের নিকট পাঠালেন। হযরত কা’কা (রা.) তাঁদেরকে অনেক কষ্টে বুঝিয়ে ভুল বুঝাবুঝির অবসান ঘটালেন। সিদ্ধান্ত হল আগামী কাল সকালে সন্ধি হবে। উভয় পক্ষে চক্রান্তকারীরা বুঝাবুঝির অবসান ঘটালেন। সিদ্ধান্ত হল আগামী কাল সকালে সন্ধি হবে।

উভয় পক্ষে চক্রান্ত কারীরা সাধুবেশে ছিল। হযরত আয়শা (রা.) এর পক্ষে মারওয়ান ইবনে হাকাম ও তার দল এবং তাদের উদ্দেশ্য ছিল ক্ষমতা দখল করে উমাইয়া বংশে স্থায়ী হুকুমত কায়েম করে আজীবন ফায়দা হাসিল করা। আর হযরত আলী (রা.) এর পক্ষে আব্দুল্লাহ ইবনে সাবাহ ও তার দল। আর তাদের উদ্দেশ্য ছিল খেলাফত ধ্বংশ করে ইসলামকে শেষ করা। তাই উভয় চক্রান্তকারী দল রাতারাতি বড়যন্ত্র করে রাতের অন্ধাকারে মারওয়ান ইবনে হাকাম হযরত আলী (রা.) এর বাহিনীর উপর এবং আব্দুল্লাহ ইবনে সাবাহর দল হরত আয়শা (রা.) এর বাহিনীর উপর আক্রমন করল। মাওয়ান ইবনে হাকাম হযরত তালহা ও যুবাইর (রা.) কে জানালা যে, হযরত আলী (রা.) সন্ধির নামে ধোকা দিয়ে রাতের অন্ধকারে হামলা করেছে। অপর পক্ষে আব্দুল।লা ইবনে সাবাহ হযরত আলী (রা.) কে জানালো যে, হযরত আয়শা (রা.) এর বাহিনী হামলা করেছে। ব্যস, বেধে গেল তুমুল যুদ্ধ। মুসলমানের হাতে মুসলামানের রক্ত ঝরতে লাগল।

সাহাবার হাতে সাহাবার লাশ পরতে লাগল। আসমান ও জমীনে হাহাকার উঠল। কিন্তু প্রকৃত যুদ্ধের কারণ কেহই অবগত ছিল না। শান্তিকামীদের সকল চেষষ্ঠাই ব্যর্থ হতে লাগল।

এক পর্যায়ে হযরত আলী (রা.) ও হযরত যুবাইর (রা.) এর ঘোড় মুখোমুখি হরে হযরত আলী (রা.) বললেন, “হে যুবাইর ! একদা তুমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আ’লাআহি ওয়াস সাল্লামের এ কথা বলেছিলে যে, আমি আলী কে ভালবাসি। তদুত্তরে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আ’লাআহি ওয়াস সাল্লামের বলেছিলেন, তুমি একদিন আলীর সাথে অনর্থক যুদ্ধ করবে। কথাটা কি তোমার স্মরণ আছে।”

সাথে সাথে হযরত যুবাইর (রা.) চমকে উঠলেন। ছেলে আব্দুল্লাহকে ডেকে বললেন, আপনি যান, আমি খালাআম্ম (হযরত আয়শা) এর সাথে আছি। হযরত যুবাইর (রা.) একাই রওয়ানা দিলেন। হযরত তালহা (রা.) জানতে পেরে তিনিও রণক্ষেত্র ত্যাগ করলেন। কিš’ মারওয়ান ইবনে হাকাম তাকে রণক্ষেত্র ত্যাগ করতে দেখে তার দিকে তীর ছুড়ে মারলেন। হযরত তালহা (রা.) ঘটনা ¯’ানেই শহীদ হলেন। আর হযরত যুবাইর (রা.) রণক্ষেত্র ত্যাগ ত্যাগ করে ওয়াদিউস সেবাহ নামক ময়দানে নামায পড়তে লাগলেন।

আব্দুল্লাহ ইবনে সাবাহ হযরত যুবাইর (রা.) হত্যা করার জন্য আমর ইবনে জরমুয নামক জনৈক ব্যক্তি পাঠাল। সে নামাযরত অবস্থায়ই তলোয়ার দিয়ে হযরত যুবাইর (রা.) এর উপর আঘাত কররেন এবং ঐ অবস্থাতেই তিনি শহীদ হয়ে গেলেন। আর চক্রান্তকারী প্রচার করল যে, তালহা ও যুবাইর (রা.) কে হযরত আলীর লোকেরা হত্যা করেছে। উত্তেজনা আরও বেড়ে গেল।

ফাসাদীরা হযরত আয়শা (রা.) এর উট নাচাতে লাগল ফেন তা দেখে সৈন্যদের উত্তেজনা বৃদ্ধি পায় এবং অন্য কিছু কল্পনা করার সুযোগও না পায়। বুঝতে পেরে হযরত আলী (রা.) লোক পাঠিয়ে উটের পায়ে আঘাত করে উটকে বসিয়ে ফেলল। হযরত আয়শার উট দেখতে না পেয়ে সাথে সাথে যুদ্ধের মোড় ঘুরে গেল। হযরত আয়শা (রা.) এর পক্ষের সৈন্যরা সকলে পালাতে লাগল। পরে সবাই প্রকৃত ঘটনা বুঝতে।
পারল। কিন্তু ততক্ষণে ইসলামের অপূরণীয় ক্ষতি সাধিত হয়ে গেল। হযরত আয়শা (রা.) উটের কারণে এর নাম ছিল জঙ্গে জামাল বা উষ্ট্রির যুদ্ধ।
৩য় ধাপের বেদনাদায়ক ঘটনা।

এবার উমাইয়াগন হযরত উসমান (রা.) এর রক্তমাখা জামা ও হত্যাকান্ডের সময় তাঁর স্ত্রী হযরত নায়েলার কাটা আঙ্গুল নিয়ে সমগ্র সিরিয়ার প্রতিটি গ্রামে, শহরে মসজিদে মসজিদে প্রদর্শন করিয়ে জালাময়ী বক্তৃতা দিয়ে জনগনকে একথা বুঝালো যে, হযরত উসমান (রা.) এর শাহাদাতে হযরত আলী (রা.) এর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা প্রত্যেক মুসলমানের উপর ফরজ। এতে সমগ্র সিরিয়অয় হিংসার আগুন জ্বলে উঠল। সিরিয়া ছাড়াও ইরান ও ইরাকের বহু লোকও তাদের দলে যোগ দিল। হযরত মুআবিয়া (রা.) হযরত আমর ইবনুল আস (রা.), হযরত শুরাহবীল ইবনে সস্মৎ (রা.) ইত্যাদির মত বড় বড় সাহাবীরা হযরত আলী (রা.) এর সাথে বিরাধিতার জড়িয়ে পড়লেন। এরই ধারাবাহিকতায় সিফফিনের যুদ্ধ হল।

এতে সমগ্র সিরিয়ায় হিংসার আগুন জ্বলে উঠল। সিরিয়া ছাড়াও ইরান ও ইরাকের বহু লোকও তাদের দলে যোগ দিল। হযরত মুআবিয়া (রা.) , হযরত আমর ইবনুল আস (রা.), হযরত শুরাহবীল ইবনে সম্মৎ (রা.) ইত্যাদির মত বড় বড় সাহাবীরা হযরত আলী (রা.) এর সাথে বিরোধিতার জড়িয়ে পলেন। এরই ধারাবাহিকতায় সিফফিনের যুদ্ধ হল। মুসলমানদের হাতে মুসলমানদের লাশের পাহাড় জমতে লাগল।

 

Facebook Comment





© All rights reserved © 2020 TabligNewsBD.Com
Design & Developed BY PopularServer.Com