শনিবার, ১৬ জানুয়ারী ২০২১, ০৬:০৬ পূর্বাহ্ন

মাথা নত না করা এক মহানায়ক ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রহ.

মাথা নত না করা এক মহানায়ক ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রহ.

মাথা নত না করা এক মহানায়ক

ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রহ.

জহির উদ্দীন বাবর:
‘কুরআন আল্লাহর সৃষ্ট’ এই আকিদায় বিশ্বাস করতেন না ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রহ. ও সমকালীন আলেমরা। আব্বাসি খলিফা মামুনুর রশিদ এসব আলেমকে গ্রেফতার করে শিকল পরিয়ে তারতুসে তার সামনে হাজির করার নির্দেশ দিলেন। যাতে অপরাধ সাব্যস্ত করে তাদের সাজা প্রয়োগ করা যায়। এই কঠোরতা বড় বড় আলেমদেকে ভীতসন্ত্রস্ত করে তুলল। অধিকাংশই মন না চাইলেও মামুনের আকিদায় সমর্থন দিয়ে দিলেন। বাগদাদের আলেমদের মধ্যে শুধু ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল ও মুহাম্মদ বিন নুহ রহ. নিজের মতের ওপর দৃঢ়পদ থাকলেন। মামুনের নির্দেশ মতো তাদের দুজনকে পায়ে শিকল পরিয়ে একই উটের ওপর সওয়ার করিয়ে শামের দিকে রওয়ানা হলো। এ সময় গোটা মুসলিম উম্মাহর মধ্যে একটা চাঞ্চল্য দেখা দিলো না জানি কী হয়! যদি এই দুই আলেমও নত হয়ে যেতেন তাহলে উম্মতের সর্বনাশ হয়ে যেত। শুধু শহরের নয় গ্রামের লোকজন পর্যন্ত আসলাফ থেকে চলে আসা আকিদা থেকে সরার জন্য প্রস্তুত ছিল না। কিন্তু এই সহিহ আকিদা অক্ষুণ্ন থাকার বিষয়টি নির্ভর করছিল উলামায়ে কেরামের দৃঢ়তার ওপর।
তারা যখন ‘রাহাবা’ নামক স্থানে পৌঁছলেন তখন আবদুল্লাহ বিন আমের নামে এক আরব বেদুইন এসে তাদের সঙ্গে মিলিত হলেন। তিনি আহমদ ইবনে হাম্বলকে বললেন:
‘জাতির প্রতিনিধি হয়ে যাচ্ছেন, জাতির জন্য যেন অশুভ বার্তা বয়ে না আনেন। আজ আপনারা উম্মতের নেতা। আপনারা যদি আজ এই ভুল আকিদা মেনে নেন তবে অন্যরাও মেনে নেবে। আর আপনারা যদি সত্যিকার অর্থে আল্লাহকে ভালোবাসেন তবে নিজের অবস্থানে দৃঢ় থাকবেন। আপনাদের মধ্যে আর জান্নাতের মধ্যে শুধু খুন হওয়ার অপেক্ষা। আপনাদেরকে হত্যা না করা হলেও একদিন না একদিন মৃত্যুবরণ করতেই হবে। তবে যদি দৃঢ়পদ থাকতে পারেন তাহলে সুনাম-সুখ্যাতি ভাগ্যে জুটবে।’
ইমাম আহমদ রহ. বলেন, ‘তার কথা আমার মনোবল দৃঢ় করে দিলো। সরকারের অবস্থান সমর্থন করবো না বলে পাক্কা সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলাম।’
মামুনের কাছে পৌঁছার মাত্র একদিনের পথ বাকি। এই সময় এক সরকারি কর্মকর্তা কাঁদতে কাঁদতে ইমাম আহমদ রহ.-এর কাছে এলেন এবং বললেন:
‘আমার খুব কষ্ট হচ্ছে, মামুন একদম নতুন একটি তলোয়ার বানিয়ে এনেছেন এবং একদম নতুন বিছানা বিছিয়ে বসে আছেন। আর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আত্মীয়তার সম্পর্কের শপথ করে বলছেন, আপনি যদি আকিদা পরিবর্তন না করেন এই তলোয়ার দিয়ে আপনাকে হত্যা করা হবে।’
ইমাম আহমদ রহ. এই কথা শুনে অনেকটা অনিচ্ছাকৃতভাবেই বসে গেলেন এবং আসমানের দিকে তাকিয়ে এই মোনাজাত করলেন:
‘হে প্রভু! আপনার সহিঞ্চুতার কারণে এই ফাসেক এতোটাই ধোঁকার মধ্যে পড়েছে, সে আপনার বন্ধুদের বেত্রাঘাত ও হত্যার হুমকি দিচ্ছে। হে আল্লাহ! আপনার কালাম যদি সৃষ্ট না হয় তবে আমাদেরকে মামুনের অনিষ্টতা থেকে রক্ষা করুন।’
এখনও সুবহে সাদিক উদিত হয়নি। এই সময় মামুনের ইন্তেকালের খবর চলে এলো। সরকারি অফিসাররা ইমাম আহমদ ও মুহাম্মদ বিন নুহ রহ.কে নৌকায় করে অন্যান্য কয়েদিদের সঙ্গে বাগদাদে ফেরত পাঠিয়ে দিলেন। তাদের পায়ে শিকল পরাই ছিল। সফরের কষ্টের কারণে মুহাম্মদ বিন নুহ রহ. রাস্তাতেই মারা গেলেন। ইমাম আহমদ রহ. ২১৮ হিজরির রমজান মাসে বাগদাদে পৌঁছলেন। সফরের অমানুষিক কষ্টের কারণে তিনিও অসুস্থ হয়ে পড়লেন। তখন তাঁর বয়স ছিল ৫৮ বছর। তাকে কারাগারে বন্দী করা হলো। সেখানেও তাকে দুটি শিকল পরিয়ে রাখা হয়। এই অবস্থাতেই তিনি কয়েদিদের নামাজে ইমামতি করতেন। সূত্র: মুসলিম উম্মাহর ইতিহাস, (খেলাফতে আব্বাসিয়া) অনুবাদ: জহির উদ্দিন বাবর [মাকতাবাতুল আযহার থেকে প্রকাশিতব্য]
Facebook Comment





© All rights reserved © 2020 TabligNewsBD.Com
Design & Developed BY PopularServer.Com