শুক্রবার, ১৫ জানুয়ারী ২০২১, ১০:২৭ অপরাহ্ন

তাবলিগ: হিজরি প্রথম শতকের জীবন্ত নমুনা

তাবলিগ: হিজরি প্রথম শতকের জীবন্ত নমুনা

তাবলিগ: হিজরি প্রথম শতকের জীবন্ত নমুনা

সাইয়্যেদ আবুল হাসান আলী নদভী রহ.

১৯৪০ সালের জানুয়ারি মাসে সর্বপ্রথম মেওয়াত গিয়েছিলাম, ফেরার সময় ওখানকার অনুভূতি ও অভিজ্ঞতা লিখে নিয়েছিলাম। মেওয়াতের মুবাল্লিগদের আলোচনা তাদের ভাষায় লিপিবদ্ধ করেছিলাম : পড়ন্ত বেলায় আমাদের গাড়ি গুরগাঁও জেলায় পৌঁছল। শুনে খুব খুশি লাগল ইতিমধ্যেই বিভিন্ন স্থান থেকে কয়েকটি জামাত এসে পৌঁছেছে। আমাদের আগমন সংবাদ শুনে জামাতের সাথীরা এগিয়ে নিতে এলো, আমাদের জিনিসপত্র তারা সানন্দে গাড়ি থেকে নামাল, যারপরনাই হৃদ্যতা ও আন্তরিকতা নিয়ে আমাদের সাথে মুসাফা করল।

মসজিদে প্রবেশ করে যে দৃশ্য দেখেছি তা কোন দিন ভুলতে পারবো না, এ দৃশ্য দেখার আনন্দের অনুভূতি এখনো আছে মনে। আমাদের সামনে ত্রিশ জনের একটি জামাত গোল হয়ে বসে আছে, তাদের মধ্যে সববয়সী লোকই ছিল, তের ও ষোল বছরের দুইজন কিশোরও ছিল, যুবক ছিল, ষাট বছরের বৃদ্ধও ছিল। তাদের পরনে ছিল পাঞ্জাবি, চাদর ও সুতি কম্বল, মাথায় পাগড়ি। আজ আটদিন হল তারা বাড়ি থেকে বের হয়েছে, যার যার সাধ্য অনুযায়ী সঙ্গে করে খাবার নিয়ে এসেছে, কিছু খাবার বাড়ির মানুষের জন্য রেখে এসেছে। ত্রিশ জনের জামাত তিন ভাগে বিভক্ত হয়ে ভিন্ন ভিন্ন তিনটি পথে গুরগাঁও রওয়ানা হল, প্রত্যেক দলে একজন করে আমীর নির্ধারণ করা ছিল, এক জামাতের মুয়াল্লিমের বয়স ছিল ষোল বছর। আমাদের সঙ্গী মুহতারাম রফীক পাটোয়ারী সাহেব এই জামাতের সামনে সংক্ষিপ্ত বয়ান করেন, অত্যন্ত দরদ নিয়ে বলেন- ভাইয়েরা আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করুন, আল্লাহ তাআলা আপনাদেরকে এই মুবারক কাজ করার জন্য ঘর ছেড়ে আসার তৌফিক দিয়েছেন, তাবলিগের পথ নবীদের পথ। আপনাদের জন্য আল্লাহর রহমতের দরজা খুলে গেছে, জনসাধারণের মাঝে দ্বীন প্রচারের সুন্নত বিলুপ্তপ্রায় হয়ে গিয়েছিল, আল্লাহর অনুগ্রহ হল, তিনি আপনাদের মাধ্যমে তা জিন্দা করছেন।
এরপর তিনি জামাতের আমীর সাহেবদেরকে কারগুজারী কার্যক্রমের বিবরণ শুনাতে বলেন। এক জামাতের আমীর দাঁড়িয়ে অত্যন্ত সাদাসিধা ভাষায় কারগুজারী তুলে ধরলেন-
গত শুক্রবারে নূহ অঞ্চলে এজতেমা হয়েছিল। ঐ এজতেমার পর আমরা বের হয়েছি। চান্দিনী নামক স্থানে আমরা লোকদের নামাজি বানিয়েছি। কালেমা শুদ্ধ করেছি। মাসে তিনদিন পাঁচ ক্রোশ-দশ বার মাইল জায়গার মধ্যে গাশত প্রচারের উদ্দেশে নির্দিষ্ট এলাকায় বিচরণ করতে উৎসাহিত করেছি। এক এলাকার চৌধুরী ও তহশিলদারদের নিয়ে অন্য এলাকায় গিয়েছি। সে এলাকার মাতবরদেরকে তাবলিগের কাজের জন্য উদ্বুদ্ধ করেছি। সেখান থেকে রওয়ানা হয়ে পাহাড়ি এলাকায় পৌঁছুলাম। সেখানে যুবক, বৃদ্ধ সবাই পাথরের উপর ঘুমিয়েই রাত পার করেছে। খাবারের কোন ব্যবস্থা ছিল না। সঙ্গীরা সবর ও শোকরের সঙ্গে রাত কাটিয়েছে। তৃতীয় একটি গ্রামে গাশত করে আমরা পিপাকা নামক স্থানে পৌঁছি। আলহামদুলিল্লাহ্ এখানেও অনেক বেনামাজি লোককে নামাজের জন্য বুঝিয়েছি। কালেমা শুদ্ধ করেছি, জামাত কায়েম করেছি। ইউপিতে গাশত করার জন্য মুরুব্বিদের উৎসাহিত করেছি। কেউ কেউ ওযর পেশ করেছে। আমরা বলেছি- দেখুন, আল্লাহর এ দ্বীনের অস্তিত্ব বহাল থাকলে আমাদের অস্তিত্ব বহাল থাকবে। আল্লাহর এ দ্বীনের অস্তিত্ব না থাকলে আমাদেরও কোন অস্তিত্ব থাকবে না। এতে লোকেরা বেশ প্রভাবিত হয়। পাহাড়ি অঞ্চলে গ্রামের সবার কালেমা সংশোধন করেছি, এলাকায় পীর সাহেবের সঙ্গে কথা বলেছি, রাসিনাতেও আমরা কাজ করেছি। কিছু বে-নামাজি কৃষক তখনই নামাজ পড়েছে। যতক্ষণ তারা গোসল করেছে, নামাজ পড়েছে ততক্ষণ আমরা তাদের চাষ-বাস ও ক্ষেতে পানি দেয়ার কাজ করেছি।
দ্বিতীয় জামাতের আমীর নিজ জামাতের রুটিন মাফিক কাজের কথা শুনিয়েছে। যা মূলত পুরো তাবলিগ জামাতেরই রুটিন- আমার সঙ্গীরা সাধারণত রাত চারটায় ঘুম থেকে উঠে। আল্লাহর তৌফিক হলে তাহাজ্জুদ পড়ে, এরপর ফজর নামাজ পর্যন্ত কিছু না কিছু পড়াশোনা করে। ফজর নামাজের পর তেলাওয়াত করে। এরপর আমাদের মুআল্লিম আমাদেরকে তা’লীম দেন। আমাদের নামাজ শুদ্ধ করে দেন, মাসআলা বলেন, কিতাব পড়ে শোনান। বেশিরভাগ সময় হেকায়াতে সাহাবা ও ফুতুহুশ শাম পড়া হয়। সব নামাজের আধা ঘণ্টা আগে বাজার ও মহল্লায় গাশত করি, মাগরিবের পর কিছু জিকির-আযকার করি। কিছু কিছু জায়গায় যেখানে কৃষকরা এশার সময় গল্প-গুজবের আসর বসায় সেখানে গিয়ে তাদেরকে দাওয়াত দেই। তাবলিগের মূলনীতি ও কর্মপন্থা সম্পর্কে বিভিন্নজন যা বলেন তার সামগ্রিক রূপ এমন দাঁড়ায়- আমরা বের হয়েছি আমাদের সংশোধনের নিয়তে, অন্যের সংশোধনের জন্য নয়। আমরা নিজেরাই সংশোধনের মুখাপেক্ষী, অন্যের সংশোধন আমরা কী করে করব। এ দ্বীন আল্লাহর, তিনি যার দ্বারা চান তার দ্বারা এ দ্বীনের কাজ নিবেন। আমাদের হাকীকত কী? আমাদের কোন জ্ঞানও নেই গুণও নেই। আমাদের দ্বারা আল্লাহ যে কাজ নেন তাই আল্লাহর অনুগ্রহ, আমাদের বিশ্বাস হল, মানুষ শুনুক বা না শুনুক আল্লাহ আমাদের কথা শোনেন। আমাদের উপর কঠোর নির্দেশ হল, আমরা যেন মুসলমানদের সম্মান করি, বিনয় ও নম্রতার সঙ্গে তাবলীগ করি, সব ধরনের দুর্ব্যবহার ও অসদাচরণ অম্লান বদনে সহ্য করি।
কোন মহল্লায় গেলে আমরা দুআ করি- হে আল্লাহ আমাদেরকে সব ধরনের ক্ষতি থেকে রক্ষা করুন, আমরা যা বলি তা তাদেরকে ভালোভাবে হৃদয়ঙ্গম করার তৌফিক দিন। মাকরুহ ওয়াক্ত না হলে দুই রাকাত নফল নামাজ আদায় করি, এরপর আমরা তাবলিগের জন্য বের হই।
১৯৪১ সালে আরেকবার নূহ অঞ্চলের গুরগাঁও জেলায় এক আজীমুশশান এজতেমা হয়েছিল। এ এজতেমায় প্রায় পনের বিশ হাজার মানুষ অংশগ্রহণ করেছিল। ত্রিশ চল্লিশ ক্রোশ দূর থেকেও মানুষ পায়ে হেঁটে এজতেমায় এসেছিল। এজতেমাকে মনে হচ্ছিল এক জীবন্ত খানকা; যেখানে এবাদত, যিকির, নামাজ ও নফলের প্রতি উৎসাহ প্রদানের পাশাপাশি কর্মমুখরতা, দ্বীন পালনের জন্য প্রস্তুতি, কষ্টসহিষ্ণুতা, অকৃত্তিমতা, সরল জীবনযাপন, বিনয় ও উলামায়ে কেরামের খেদমত, দ্বীনের মর্যাদা রক্ষা এবং ইসলামী চরিত্রের হৃদয়কাড়া দৃশ্যের অবতারণা হয়েছিল। ঐ এজতেমা থেকে ফিরে আমি আমার অনুভূতি ‘আন-নাদওয়া’ পত্রিকার সম্পাদকীয়তে প্রকাশ করেছি, এই লেখায় আগ্রহীদেরকে এ নীরব আন্দোলনের কেন্দ্র এবং কর্মপন্থা অধ্যয়ন ও প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য উৎসাহিত করেছি, এই লেখাটি পূর্বের সেই সম্পাদকীয়টি দিয়েই শেষ করেছি।
যারা দ্বীনের প্রতি আগ্রহ রাখেন, যারা দ্বীন বোঝেন এবং বর্তমান যুগের হাঙ্গামা ও হইচই দেখতে দেখতে ক্লান্ত এবং যাদের কাছে নবুওয়াতের পদ্ধতিই আমলের সঠিক পদ্ধতি এবং যারা দ্বীনের এ দুর্দশা দেখে আফসোস করেন তাদের প্রতি আমার আন্তরিক পরামর্শ হল- দিল্লীর নিজামুদ্দীনে হযরত ইলিয়াস রহ.-এর খেদমতে যান, তাঁর সঙ্গে কিছু সময় থাকুন, মেওয়াত গিয়ে তাবলিগের কাজ ও কাজের ধরন দেখুন এবং এর প্রভাব-প্রতিক্রিয়া গভীর মনোযোগ দিয়ে উপলব্ধি করুন। আশ্চর্যজনক হল- মানুষকে প্রাচীন প্রত্নতত্ত্ব, ঐতিহাসিক স্থাপত্যের ধ্বংসাবশেষ এবং বিলুপ্তপ্রায় কবর দেখার জন্য দূর-দূরান্ত ভ্রমণ করতে দেখা যায় কিন্তু হিজরি প্রথম শতকের জীবন্ত নমুনা এবং ইসলামের চলমান চিত্র দেখার জন্য আগ্রহী এবং এর জন্য সফর করতে ইচ্ছুক মানুষ খুব কমই পাওয়া যায়। বাস্তবতা হল সম-সাময়িকতা অনেক সত্য উপলব্ধির পথে বিরাট অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়।
Facebook Comment





© All rights reserved © 2020 TabligNewsBD.Com
Design & Developed BY PopularServer.Com