শুক্রবার, ২৩ এপ্রিল ২০২১, ০২:২২ অপরাহ্ন

অযোগ্যদের নেতৃত্ব ও রাসূলের দৃষ্টিতে আজকের পৃথিবী

অযোগ্যদের নেতৃত্ব ও রাসূলের দৃষ্টিতে আজকের পৃথিবী

অযোগ্যদের নেতৃত্ব ও রাসূলের দৃষ্টিতে আজকের পৃথিবী

মুহাম্মাদ আইয়ুব

আবূ হুরাইরা (রাঃ) বলেন, একবার নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কিছু লোকের এক মজলিসে বয়ান করছিলেন, এমন সময় এক গ্রাম্য ব্যক্তি এসে তাঁকে জিজ্ঞাসা করল, ‘কিয়ামত কখন হবে?’ আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বয়ান করতেই থাকলেন। অতঃপর বয়ান শেষ করে তিনি বললেন, কিয়ামত সম্পর্কে প্রশ্নকারী কোথায়? লোকটি বলল, ‘এই যে আমি, হে আল্লাহর রসূল!’ তিনি বললেন, যখন আমানত নষ্ট করা হবে, তখন কিয়ামতের অপেক্ষা কর। লোকটি বলল, ‘আমানত কিভাবে নষ্ট হবে?’ তিনি বললেন, যখন কোন অযোগ্য লোকের হাতে নেতৃত্ব তুলে দেওয়া হবে, তখন কিয়ামতের অপেক্ষা কর।
(বুখারী ৬৪৯৬)

প্রিয় পাঠক! এশিয়া থেকে আফ্রিকা, ইউরোপ থেকে আমেরিকা সব জায়গায় আজ অযোগ্যদের নেতৃত্ব। পাগল মাতাল, সমকামী ক্ষ্যাপাটে,অহংকারীদের হাতে আজ বিশ্ব। কখনো কখনো ক্ষমতার ময়দানে মহাসমারোহে ফুটবলার, ক্রিকেটার,রেসলার,গায়ক নায়করাও অবলীলায় ঢুকে পড়েন। একজন সারাজীবন আমোদ ফুর্তিতে কাটিয়ে শেষ বয়সে আশা জাগল অমুক দেশের প্রেসিডেন্ট হবেন তো একসময় সে বিপুল ভোটে প্রেসিডেন্ট বা প্রধানমন্ত্রীর মসনদ দখল করে ফেললেন। বিশ্বজুড়ে এরকম নজির এক দু’টো নয় বরং ভুরি ভুরি।
তাই শান্তির জন্য ব্যাঙের ছাতার মত এই কমিটি সেই কমিটি এই সংঘ সেই সংঘ করলেও কোথাও আজ শান্তির বালাই নেই।অশান্তি আর অশান্তি। অশান্তির উত্তরোত্তর উৎকর্ষ ও প্রবৃদ্ধির জন্য চলছে উন্মুক্ত ভয়াল প্রতিযোগিতা। পত্রিকা খুললেই বড় বড় অক্ষরে নেতাদের থলের বিড়াল বেরিয়ে আসে। হাজী সাহেব হয়েও নেতৃত্বের আড়ালে মাদক,সন্ত্রাস, অবৈধ দখল সহ হেন অপকর্ম যেটা নেতা সাহেব করেন না। আবার এই অযোগ্যরা নেতৃত্বের চেয়ারে বসে পূর্বসূরি ভালো লোকদের যাচ্ছেতাই বলে বেড়ায়। কেউ কেউ এককাঠি সরস হয়ে আমাদের মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নামে জঘন্য সব কটুক্তি, ব্যঙ্গ করে!
এ সব কি নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সেই ভবিষ্যদ্বাণীর সত্য প্রকাশ নয়?

আজ সবখানেই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সেই ভবিষ্যদ্বানীর খুল্লুম খুলা চিত্র চোখে পড়ছে। একই বিষয়ের প্রতিফলন সবখানে।নেতৃত্ব নিয়ে অযোগ্যদের কামড়াকামড়ি এখন টক অব দ্য ওয়ার্ল্ড। এটা এখন নিত্য নৈমত্তিক ব্যাপার।সোশ্যাল মিডিয়ার কল্যানে আজ যে কেউ হিরো হয়ে যেতে চায়। অযোগ্যদের চটকদার ফেস্টুন ব্যানারে গ্রাম থেকে শুরু করে তিলোত্তমা নগরীও ঢাকা পড়ে যায়। ইস্রাফীল আলাইহিস সালামের ফুঁৎকারের আগে ক্ষমতা লাভের লোভ ও কাড়াকাড়ির দরজায় তালা বোধহয় তালা ঝুলবেনা।

ইসলাম মহান আল্লাহ পাকের নির্ধারিত পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা। পৃথিবীর এমন কোনো বিষয় নেই যা ইসলামে অনুপস্থিত।বা আল্লাহর বিধানে নেই। নেতা ও নেতৃত্বের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টিও আল্লাহর নির্দেশিত জীবনব্যবস্থার অন্তর্ভুক্ত। পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রে নেতা এবং নেতৃত্ব থাকবে, অনুসারী থাকবে ও নীতিনির্ধারক থাকবে এ তো ইসলামী বিধানেরই অংশ। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেন,’আর আমরা তাদের (ইসহাক ও ইয়াকুব)কে ইমাম বানিয়ে দিলাম’ (সূরা আম্বিয়া-৭৩)।
এবার প্রশ্ন হচ্ছে নেতা কে হবেন? সবাই তো নেতা হতে পারে না। কেউ হয়, কেউ হয় না। নামাজের জামাতে সবাই ইমাম হন না। যিনি যোগ্য তাকে নামাজ পড়ানোর নেতৃত্ব দেওয়া হয়। কাজেই যিনি নেতা হন বা নেতৃত্ব দিয়ে থাকেন, তাকে বহু গুণের অধিকারী হতে হয়। জন্মসূত্রে কেউ নেতা হতে পারে না। যারা নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষমতা রাখে তারাই প্রকৃত নেতা। যিনি ইসলামে নির্দেশিত গুণাবলি অর্জন করবেন, তিনিই নেতৃত্ব দেওয়ার যোগ্যতা অর্জন করবেন। নেতৃত্ব যাকে দেওয়া হবে, তিনি নিতে চাইবেন না। কারণ নেতৃত্ব একটি বিশাল দায়িত্ব। অথচ আজকের চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন।আজ সবাই আগ বাড়িয়ে নেতা হতে চায়।

একজন মুসলিম নেতার প্রথম গুণই হলো তিনি আল্লাহভীরু ও রাসূলের পূর্ণ অনুসারী খাঁটি মুসলমান হবেন। এ নেতা আল্লাহর নির্দেশ ও প্রিয় রসুলের (সা.) জীবনাদর্শ মেনে চলার জন্য প্রতিনিয়ত উদগ্রীব ও উৎকণ্ঠিত থাকেন। তিনি রাসূল (সা.)-এর আদর্শের আলোকে আলোকিত থাকতে চান, তিনি ইসলামের জ্যোতি ছড়ান প্রতিনিয়ত। তার জীবনের সব কাজের লক্ষ্য হলো মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ। আল কোরআনে আল্লাহপাক যা করতে বলেছেন, নেতা তাই করবে, রাসূল (সা.) যেভাবে করতে বলেছেন, সেভাবে করবে। ইসলাম অনুমোদিত নেতার কাজেকর্মে সঙ্গতি থাকবে। যা বলবেন তা করবেন এবং যা করবেন তা বলবেন। ইসলামী নেতা হবেন স্বচ্ছ বা ট্রান্সপারেন্ট। তিনি যা ইচ্ছে তা-ই করতে পারবেন না। তাকে শুধু ভালো কাজ করতে হবে। কারণ ভালো কাজই তার ঈমানের প্রতিনিধিত্ব করে। আল-কোরআনে ঈমান ও ভালো কাজের সম্পর্ক ষাটবার উল্লেখ করা হয়েছে। ঈমান থাকলেও মন্দ কাজ করার দরুন তিনি নেতা হওয়া বা নেতৃত্ব দেওয়ার যোগ্যতা হারাবেন।

ঈমানের দৃঢ়তা অর্জনের জন্য এবং কাজে-কর্মে ঈমানের প্রতিফলন ঘটানোর জন্য মুসলমানদের জ্ঞান অর্জন করা অত্যাবশ্যকীয়। অযোগ্য, মূর্খের কাছ
নেতৃত্বের বাগডোর দেওয়া যায় না। রসুলের (সা.) প্রতি আল্লাহর প্রথম অহী ছিল, ‘ইক্বরা’ অর্থ পড়। প্রিয় রাসূল (সা.) নিরক্ষর ছিলেন কিন্তু মূর্খ ছিলেন না। তিনি ছিলেন জ্ঞানী ও জ্ঞানের উৎস, যা আল্লাহপাক তাকে দান করেন। যে বিষয়ে তিনি অবহিত ছিলেন না, জ্ঞান রাখতেন না, সে বিষয়ে অহির মাধ্যমে বা বিভিন্ন দৃশ্য ও অদৃশ্যের মাধ্যমে আল্লাহপাক তার সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে তাকে মহাজ্ঞানী করে তুলেছেন। তাই তো তিনি বিশ্বজাহানের সব সৃষ্টির নেতা, ইহকালের চিরঞ্জীব নেতা এবং পরকালের নেতা। তার নেতৃত্ব ইহ ও পরকালে ব্যাপৃত। তিনি আমাদের জীবনের প্রতিটি ব্যাপারে সর্বক্ষণের নেতা। তাই নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য নেতাকে জ্ঞান অর্জন করতে হবে। সময় অতিক্রান্তের সঙ্গে নতুন জ্ঞান ও প্রযুক্তির উদ্ভব হয়। আজকের নেতাদের কম্পিউটার জানতে হয়। বিভিন্ন দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বিষয়ে জ্ঞান রাখতে হয়। নেতাকে দোলনা থেকে কবর পর্যন্ত জ্ঞান অর্জন করতে হয়। এ জ্ঞান শুধু ব্যবহৃত হবে জনগণের স্বার্থে, উন্নতির জন্য। নেতা জ্ঞানপাপী হতে পারবে না, দেশ ও বিদেশে সন্ত্রাস করতে পারবে না।

ইসলামে জ্ঞানপাপী নেতার অস্তিত্ব নেই। কারণ ইসলামী নেতা হন অতি উত্তম চরিত্রের অধিকারী। এ চরিত্রের অধিকারী ছিলেন প্রিয় রাসূল (সা.), যিনি আল্লাহপাক ‘নৈতিকতার অতি উচ্চ মর্যাদায় অভিষিক্ত’ (সূরা আল কালাম-৪) বলে ঘোষণা করেছিলেন। জনগণকে স্বীয় কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে সুফল পাইয়ে দেওয়ার জন্য নেতার চরিত্র নৈতিকতায় ভরপুর থাকতে হবে। নেতার নৈতিক স্খলন জাতির জন্য দুর্ভোগ বয়ে আনে।

যদি কোন দিন নেতা হওয়ার খাহেশ জাগে তখন নিজেকে একশবার পরখ করে নেওয়া যে,মদীনার নবীর সাথে আমার মিল অমিল কতটুকু? মিলের পাল্লা ভারী হলে নিয়ত পরিশুদ্ধ করে এই ময়দানে নামা দরকার। আর যদি নেতা নির্বাচনের পালা আসে তখন আগে আমাকে অন্তত দশবার ভাবা দরকার আসলে আমি কাকে সমর্থন দিচ্ছি, তার দ্বারা দেশ, জাতী, সমাজ ও ধর্মের উপকার হবে নাকি অপকার? জোশের বশবর্তী বা কারো পাল্লায় পড়ে নেতা নির্বাচন করলাম আর নেতা রাতদিন একাকার করে শয়তানকে খুশি করতে মরিয়া! তখন কিন্তু আফসোস করেও কূলকিনারা করা যাবে না।

প্রিয় পাঠক! একজন মুসলিম হিসেবে আমাদের অবশ্যই ইসলামের ছায়াতলে ফিরে আসা উচিত। আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের নির্দেশিত পথেই রয়েছে সামগ্রিক কামিয়াবি ও সফলতা। যারে তারে নেতা বানিয়ে বিপাকে পড়া ও দো-জাহান নষ্ট ও বরবাদ করার কোন অর্থ হয় না। আল্লাহ পাক আমাদের সবাইকে সুমতি দান করুন আমিন।

Facebook Comment





© All rights reserved © 2020 TabligNewsBD.Com
Design & Developed BY PopularServer.Com