শুক্রবার, ২৩ এপ্রিল ২০২১, ০৩:০৬ অপরাহ্ন

আলী মিয়া নদবীর গ্রামে

আলী মিয়া নদবীর গ্রামে

—মুফতী আবদুস সালাম

নদওয়ায় দুটি দিন স্বপ্নের মত কেটে গেলো। আজ রাতের ট্রেন ধরে কলকাতা যেতে হবে। চব্বিশ ঘণ্টার পথে জানি না কপালে কি ভোগান্তি আছে। আদতে সেই চব্বিশ ঘণ্টা ছত্রিশ ঘণ্টায় গড়িয়েছিলো। আর কিছুক্ষণ দেরী হলেই ফ্লাইট মিস করে বসতাম। কেউ যদি আমাকে জিজ্ঞেস করে জীবনে সবচেয়ে কষ্টের মুহূর্ত কোনটি? আমি নির্দ্বিধায় এই ছত্রিশ ঘণ্টার কথাই বলবো । ভ্রমণের কষ্ট কাকে বলে, তা কত প্রকার ও কী কী? সব প্রশ্নের উত্তর মিলেছে এই হাজার মাইলের পথে পথে। সেই তিক্ত স্মৃতিগুলোর কথা মনে হলেই গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠে।

ফযর নামাজের পরে নদওয়ায় ঘুমের রেওয়াজ। গ্রাত্রোত্থান করে কিতাব বগল দাবা করে ছাত্ররা ক্লাসে যায়। নয়টার আগে পাখির কলকাকলিতে আমার ঘুম ভাঙলো। নদওয়ার এই ক্যাম্পাসে প্রকৃতির কোন কমতি নেই। ঘন গাছগাছালিতে ছাওয়া চারিদিক। পাখির কলতানে সারাদিন মুখর থাকে এই আঙিনা।

তড়িঘড়ি করে নাস্তা সেরে বেরিয়ে গেলাম তাকিয়া কেলার উদ্দেশ্য । এই তাকিয়া কেলাই আলী মিয়া নদবীর গ্রাম, সাইয়েদ আহমাদ শহীদের গাঁ। সাথে আছে ইমরান কাজী, হাবিবুল্লাহ মাহমুদ, সাইদ নদবী আর রাহবার হিসেবে আছে ইসমাঈল ভাই। ইসমাঈল ভাই হযরত রাবে নদবীর মুরিদ। তার কল্যাণেই হযরত রাবে’ হাসানীর সাথে সাক্ষাৎ করতে পেরেছিলাম।

লাখনৌ বাস স্টেশন থেকে সাড়ে তিন ঘণ্টায় তাকিয়া কেলায় পৌঁছা গেলো। স্টেশন থেকে ডান দিকে যেই রাস্তাটি গিয়েছে তার নাম আবুল হাসান আলী নদবী সড়ক। এই সড়ক ধরে বিশ মিনিট হাঁটলেই পাবেন আলী মিয়া নদবীর বাড়ি। আমরা অবশ্য অটো বাইকে চড়ে সেখানে গিয়েছিলাম। পথেই পড়বে মাদরাসাতু সাইয়েদ আহমাদ শহীদ। এই অজপাড়া গাঁয়ে এমন দৃষ্টি নন্দন ভবন সত্যি অবাক করার মত। মাদরাসার দোতালায় রয়েছে আলী মিয়া নদবীর ব্যক্তিগত পাঠাগার ও ইয়াদগার। এখানে সংরক্ষিত আছে তাঁর এওয়ার্ড সমূহ। আলী মিয়াই একমাত্র হিন্দুস্তানী যিনি ইন্ডিয়া থেকে শুরু করে অক্সফোর্ড ফয়সাল এওয়ার্ড থেকে নিয়ে দুবাই আন্তর্জাতিক এওয়ার্ড অর্জন করেছেন।

ইন্ডিয়ায় মুসলিম শিশুদের ঈমান আকিদা রক্ষার্থে কিন্ডারগার্টেন করার উদ্যোগ গ্রহণ করায় তাঁকে একটি সম্মাননা দেওয়া হয়েছিলো। সেই ক্রেস্টটি দেখে আমার ইকরা স্কুলের কথা মনে পড়লো। একই উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে আল্লামা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ দা.বা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ইকরা বাংলাদেশ স্কুল। সারা বাংলাদেশে ইকরার সিলেবাস শত শত প্রতিষ্ঠানে পড়ানো হয়। আমি মনে করি হাজারটা কওমী মাদরাসার চেয়ে সমাজে এমন একটি স্কুলের বেশী প্রয়োজন। কিন্তু কথা হলো যেই উদ্যোগের কারণে একদেশের মানুষ পুরুস্কৃত হন সেই একই উদ্যোগ গ্রহণের কারণে আরেক দেশের মানুষ হন তিরস্কৃত। এজন্যই কবি বলেছিলেন, এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি।

ফিরে আসি আলী মিয়া নদবীর প্রসঙ্গে। আলী মিয়া ১৯৮০ সালে খিদমাতে ইসলামের জন্য পেয়েছিলেন ফয়সাল এওয়ার্ড । এওয়ার্ডের ক্রেস্টটি এখানে নেই। আরো অনেক কিছুই এখান থেকে হারিয়ে গেছে। ইচ্ছে করলেই যে কেউ হাত দিয়ে নিয়ে যেতে পারে।

পাশেই রয়েছে আলী মিয়া নদবীর ব্যক্তিগত কিতাবের পাঠাগার। অনেক পুরনো পুরনো কিতাবের দেখা মিললো এখানে। কোন কোন কিতাবে আলী মিয়ার হাতে লেখা টিকা টিপ্পনী লেখা রয়েছে। আবার হারিয়ে গেছে অনেক বই।

নিচে নেমে এসে দেখা হলো দারুর রাশাদের প্রিন্সিপাল সালমান সাহেবের সাথে। এই লোকটির মাধ্যমেই আমি মূলত সাইয়েদ আবুল হাসান আলী নদবী নামটির সাথে পরিচিত হয়েছি। কৈশোরের শুরুতে ‘মাওলানা আবুল হাসান আলী নদবী; জীবন ও কর্ম’ নামে তার লেখা একটি বই পড়েছিলাম৷ সেই থেকে আলি মিয়া নামটি আমার হৃদয়ে গেঁথে আছে।

মাদরাসাতু সাইয়েদ আহমাদ শহীদ পার হয়ে একটু আগ বাড়লেই সাইয়্যেদ আহমদ শহীদ রহ. এর পারিবারিক কবরস্থান। পাশের বস্তিতে তাঁর খান্দানের বসবাস। এই পথ ধরে আর একটু এগুলে আলী মিয়া নদবীর বাড়ি। হযরত আলী মিয়া নদবীর বাড়িটি খুবই সাদামাটা, একতলা ভবন। এখানেই জন্মগ্রহণ করেছেন মুফাক্কিরুল ইসলাম সাইয়্যেদ আবুল হাসান আলী নদবী। সাথেই রয়েছে আলী মিয়া নদবীর খানকা। এখন এই খানকায় বসেন আলী মিয়া নদবীর ভগ্নীপুত্র রা’বে হাসানী নদবী।

এখানে আছে সাইয়্যেদ আহমাদ শহীদ রহ.-এর নামে একটি মসজিদ ও হিফজখানা। মসজিদে জোহর নামাজ পড়ে যিয়ারত করলাম সায়েদ আবুল হাসান আলী নদবী রহ.-এর পারিবারিক কবরস্থান। হেফযখানার এক ছাত্রকে জিজ্ঞেস করলাম, আলী মিয়ার কবর কোনটি? গেইটের সামনের কবরটি দেখিয়ে দিলো ছেলেটা।

কিছুক্ষণ পরেই সাক্ষাৎ করলাম সাইয়্যেদ রাবে’ হাসানী নদবীর সঙ্গে। তুলতুলে রেশমি কোমল হাতের পরশ থেকে পৃথক হতে মন চাইছিলো না। বেশ ভূষণে তিনি পুরাই আলী মিয়া৷ আমি দু’আ চাইবো কি তার আগে তিনিই দু’আ চেয়ে বসলেন আমার কাছে।

সবশেষে চলে আসার পালা। সন্ধ্যায় পৌঁছে গেলাম নদওয়ায়। দশটার দিকে নদওয়ার ছাত্রদের থেকে বিদায় নিয়ে চললাম চারবাগ স্টেশনে। টেক্সিতে জায়গা হবে না বিধায় সাইদ আহমাদ নদবী রয়ে গেলেন।

হলি পূজা উপলক্ষে লাখনৌ থেকে স্পেশাল ট্রেন যাবে কলকাতা। সেই ট্রেনের ছত্রিশ নাম্বার সীটটিই আমার। কিছুক্ষণের মধ্যেই ট্রেন প্লাটফর্মে লেগে গেলো। প্রচণ্ড ভিড় ঠেলে লাগেজ নিয়ে ভেতরে ঢুকলো ইমরান কাজী, আর হাবিবুল্লাহ মাহমুদ। আমার ইন্ডিয়া সফরের একমাত্র সঙ্গী হাবিবুল্লাহ মাহমুদ এখন থেকে আর আমার সঙ্গ দেবে না। মুম্বাই থেকে সে এসেছিলো আবার মুম্বাই চলে যাবে। ধীরে ধীরে ট্রেন চলতে শুরু করলো। ট্রেনের সাথে হাত নেড়ে নেড়ে দৌড়াচ্ছে ইমরান কাজী, হাবীবুল্লাহ মাহমুদ, কিছুক্ষণের মধ্যেই তারা অদৃশ্য হয়ে গেলো। শহর পেরিয়ে ট্রেন চলে এসেছে বিস্তির্ন গম খেতের ভেতর। আমাকে অবাক করে দিয়ে আকাশে থালার মত চাঁদ উঠেছে। সেই চাঁদের আলোয় আমি যেন স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি বাংলার নদী মাঠ খেত পাহাড় আর বন বনানী৷

লেখক : শিক্ষক ও পরিভ্রাজক

Facebook Comment





© All rights reserved © 2020 TabligNewsBD.Com
Design & Developed BY PopularServer.Com