শুক্রবার, ০৯ এপ্রিল ২০২১, ০৭:০০ পূর্বাহ্ন

দ্বীনি কাজ পরিচালনার মূলনীতি ‘হায়াতুস সাহাবা’

দ্বীনি কাজ পরিচালনার মূলনীতি ‘হায়াতুস সাহাবা’

দ্বীনি কাজ পরিচালনার মূলনীতি ‘হায়াতুস সাহাবা’

সৈয়দ আনোয়ার আবদুল্লাহ

পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘আপনি বলুন, যদি তোমরা আল্লাহকে ভালোবাসতে চাও তাহলে আমার অনুসরণ করো।’ (সূরা আলে ইমরান : ৩১)। এ আয়াতে আল্লাহ তায়ালাকে ভালোবাসার জন্য মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর অনুসরণকে শর্ত করা হয়েছে। আর নবীজিকে তখনই যথার্থভাবে অনুসরণ করা যাবে যখন তাঁর জীবন সংগ্রাম, তাঁর যুদ্ধ ও জিহাদ, তাঁর আদেশ ও নিষেধ, তাঁর বিচার ও ফয়সালা সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান থাকবে। তিনি যখন মক্কি জীবনে দুর্বল ছিলেন তখন মানুষের সঙ্গে কীরূপ আচরণ করেছেন, মদিনার জীবনের যখন রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব তাঁর হাতে এলো তখন মানুষের প্রতি তাঁর কী ধরনের আচরণ ছিল তা বোঝা ও অনুধাবন করা একজন সচেতন মুসলমানের জন্য জরুরি। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘তোমাদের মধ্যে যাঁরা আল্লাহ ও আখেরাতকে ভয় করে এবং আল¬াহকে অধিক স্মরণ করে, তাদের জন্য মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ।’ (সূরা আজহাব : ২১)।

প্রিয় নবী যখন এ ধরায় শুভাগমন করেন, তখন সেই যুগ ছিল আইয়ামে জাহেলিয়াতের। সে সময়ে গোটা জাতির উপর অন্যায়-অত্যাচার, অবিচার, অস্থিরতা, নৈরাজ্য, স্থবিরতা জেঁকে বসেছিল। আরব দেশে বিরাজ করছিল অসংখ্য সঙ্কট ও সমস্যা। যুদ্ধ-সংঘাত, রক্তপাত ছিল তখন নিত্যদিনের ঘটনা। সামাজিক ও নৈতিক অবয়, মিথ্যা, অসত্য, কুসংস্কার, কু-প্রথা, বিভ্রান্তি, নারী জাতির অবমাননা, শোষণ, রাজনৈতিক নিপীড়ন, ধর্মের নামে অধর্মসহ এমন কোনো দিক ছিল না, যেখানে অবয় ও সঙ্কট ভয়াবহ রূপ ধারণ করেনি।এমনই এক পরিবেশে শান্তি, মুক্তি ও কল্যাণের পয়গাম নিয়ে তিনি আগমন করেছিলেন। তার আগমনের বদৌলতে জাহেলিয়াত, শিরক, পৌত্তলিকতা ও বর্বরতার ঘোর অমানিশায় নিমজ্জিত দুনিয়ায় হিদায়াতের নূর উদ্ভাসিত হয়। জাহিল ও পথভ্রান্ত জাতি হিদায়াতের পরশ পেয়ে জান্নাতের সন্ধান পায়।

সিরাত বলতে বোঝায় মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর জীবনে ও যুগে সংঘটিত সব ঘটনার বিবরণ ও ইতিহাস। তিনি যা বলেছেন, যা করেছেন এবং যা কিছুর অনুমোদন দিয়েছেন বা নির্দেশ দিয়েছেন তার সবকিছু সিরাতের অন্তর্ভুক্ত। রাসূলুল¬াহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর জীবনচরিত, তাঁর চারিত্রিক গুণাবলি ও বৈশিষ্ট্য, তাঁর বংশধারা, তাঁর নবুয়তের দলিলগুলো এবং এগুলোর সঙ্গে সংশি¬ষ্ট ঘটনাবলি, তাঁর যুদ্ধ ও জিহাদ সিরাতের মৌলিক বিষয়বস্তু। এটি কোনো সাধারণ মানুষের জীবনচরিত নয়; বরং সর্বশেষ ও শ্রেষ্ঠ নবী, পৃথিবীর ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ মহামানব, মুসলমানদের শ্রেষ্ঠ নেতার জীবনের ইতিহাস। একজন মুসলমানের জন্য সিরাত হলো সবচেয়ে বড় ও শ্রেষ্ঠ জ্ঞানভা-ার। শুধু জ্ঞান অর্জন নয়; বরং মুসলমান হিসেবে নিজের আকিদা ও বিশ্বাস এবং চিন্তা ও চেতনাকে একটি মজবুত ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠা করার জন্য সিরাত পাঠ অপরিহার্য।

মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হলেন আল্লাহর পক্ষ থেকে ইসলামি শরিয়তের প্রবর্তক। বলা হয়ে থাকে যে, সিরাতুন্নবী বা নবীজির জীবনচরিতই হলো শরিয়তসংক্রান্ত জ্ঞানের আধার। তাঁর জীবেন শরয়ি হুকুম-আহকামের বাস্তবিক রূপ মূর্ত হয়ে উঠেছে এবং ইসলামের প্রতিটি বিধানের প্রায়োগিক ব্যাখ্যা রয়েছে। শরয়ি শিক্ষাদীক্ষার মূলভিত্তি দাঁড়িয়ে আছে তাঁর প্রবর্তকের জীবনচরিতের ওপর। সুতরাং শরয়ি শিক্ষা-দীক্ষায় ব্যুৎপত্তি অর্জন করতে হলে নবীজির জীবনচরিত পাঠের বিকল্প নেই।

আখেরী নবী হযরত মুহাম্মদ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর খতমে নবুওয়াতের উসিলায়, এই উম্মতের উপর দাওয়াতের কাজের জিম্মাদারী। রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে দুনিয়াতে প্রেরিত হয়েছিলেন এবং হযরত সাহাবায়ে কেরাম রাযিঃ কে যে মালসাদের উপর উঠিয়েছিলেন, পুরো দ্বীন উম্মতের মধ্যে আসার জন্য দাওয়াতের মেহনত একমাত্র পথ ও পদ্ধতি। দ্বীনের সকল শাখা ও শোভার মেহনতের মূল মাকসাদই হল দাওয়াতে ইলাল্লাহ। যেন সকল মানুষ জাহান্নাম থেকে বেঁচে জান্নাতমূখি হয়ে যায়। আল্লাহর জমিনে আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠিত হয়। এই মেহনত যখন দিনিয়াতে জিন্দা হবে দ্বীনের সকল শাখা তখন পত্র-পল্লবে বিকশিত হয়ে সজিব ও প্রানবন্ত হয়ে উঠবে। এজন্য রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দাওয়াতের মেহনত করে এক কালেমার উপর এক উম্মত বানিয়েছিলেন। সাদা, কালা, বর্ণ গোষ্ঠি বেদ করে উম্মত এক কাতারে দাড়াবে। ওয়াহদাতে কালেমার মেহনত করবে। তাই নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ইন্তেকালের পর এই উম্মতপনা ও ইজতেম্যাইয়াত তথা ঐক্য ধরে রাখতে সাহাবায়ে কেরাম উম্মতের একজন আমীর তথা খলিফা নিয়োগ করতে তিনদিন অপেক্ষা করেন, অতঃপর রাসূলে পাক সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের লাশ মোবারক দাফন করেন। এই ঘটনার দ্বারা সহজেই অনুমেয় উম্মতের আমীর ঠিক করা কত গুরুত্বপূর্ণ।

সময় যত এগিয়ে যাচ্ছে ধর্মের নামে নানান ফেৎনা ক্রমশ মাথা চাড়া দিয়ে উঠছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, এমন একটি সময় আসবে যখন হাতে আগুন নিয়ে চলার চেয়েও ঈমান নিয়ে চলা কঠিন হবে। দ্বীনকে বিকৃত করা, মনগড়া দ্বীনের অপব্যাখ্যা করা, সীরাতে রাসূল ও সীরাতে সাহাবা বাদ দিয়ে নিজেদের মনমতো নানান পথ-পদ্ধতি বাস্তবায়নের যুক্তি তুলে ধরে উম্মতকে বিভ্রান্ত করার মহৌৎসব চলছে। দ্বীনি সকল কাজের মূলনীতি হবে হযরত সাহাবায়ে কেরাম রাযি আনহুমদের জীবন ও কর্ম। তারা রাসূলে পাক সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে যেভাবে দ্বীনকে ক্যাচ করেছেন কেয়ামত পর্যন্ত এটিই হবে উম্মতের জন্য নমুনা বা মডেল। দাওয়াত ও তাবলীগের দ্বিতীয় হযরতজী মাওলানা মুহাম্মাদ ইউসুফ রহ.কে বলা হয়েছিল, আপনি তাবলীগের কাজ পরিচালনার জন্য একটি উসুলি কিতাব (সংবিধান) লিখে দিন। তিনি বললেন, আমার পক্ষ থেকে লিখলেতো এটি আমার তৈরি উসুল বা মূলনীতি হবে। আমি এই কাজ পরিচালনার জন্য একটি মূলনীতি লিখে দিচ্ছি, সেটি হলো ‘হায়াতুস সাহাবা’। দ্বীনি সকল কাজ ‘হায়াতুস সাহাবা’র আলোকে করতে হবে।

আজ উম্মতকে সাহাবানীতি ও সাহাবিদের আদর্শ এবং চিন্তা চেতনা, পথ-পদ্ধতি থেকে বিচ্ছিন্ন করার সুগভীর ষড়যন্ত্র চলছে। নানান চটকদার শব্দ আর খোঁড়া যুক্তি দিয়ে পাশ্চাত্য ফর্মূলার আলোকে দ্বীনের মাঝে নানান মতবাদ ঢুকিয়ে দেয়া হচ্ছে। ইজমায়ে সাহাবার আর্দশ ও মূলনীতির বিরোধিতা করে নতুন মতবাদকে দ্বীন হিসাবে চালিয়ে দেয়া হচ্ছে। তাদের একমাত্র টার্গেট হলো, উম্মতে মুহাম্মদীকে ‘ما أنا عليه و أصحابي’ এর ত্বরীকা থেকে বিচ্যুত করা। তাই ফেতনার সময় ‘ما أنا عليه و أصحابي’ কে আঁকড়ে ধরে থাকাই হবে একমাত্র রক্ষাকবচ।

Facebook Comment





© All rights reserved © 2020 TabligNewsBD.Com
Design & Developed BY PopularServer.Com