শুক্রবার, ১৮ Jun ২০২১, ০৮:৩৭ অপরাহ্ন

সংবাদ শিরোনাম ::
চলতি মাসেই চালু হচ্ছে ৫০ মডেল মসজিদ অনলাইনে বিভিন্ন গ্রুপ ও পেইজ এডমিনদের নিয়ে মাশোয়ারার  বাংলাদেশে আরবি বিস্তারের মহানায়ক আল্লামা সুলতান যওক নদভী (দা.বা) দেওবন্দে গেলেন হযরতজী মাওলানা সাদ কান্ধলভী দা.বা. মনসুরপুরীকে নিয়ে সাইয়্যেদ সালমান হুসাইনি নদভির স্মৃতি চারণ আল্লামা ক্বারী উসমান মানসুরপুরীর ইন্তেকালে বিশ্ববরেণ্য আলেমদের শোক আমীরুল হিন্দ আল্লামা ক্বারী উসমান মানসুরপুরীঃ জীবন ও কর্ম আমার একান্ত অভিভাবক থেকে বঞ্চিত হলাম : মাহমুদ মাদানী মানসুরপুরীর ইন্তেকালে জাতীয় কওমী মাদরাসা শিক্ষাবোর্ডের গভীর শোক প্রকাশ দেওবন্দের কার্যনির্বাহী মুহতামিম সাইয়েদ কারী মাওলানা উসমান মানসুরপুরী আর নেই
সাবেকমন্ত্রী মুফতি মুহাম্মদ ওয়াক্কাস আর নেই

সাবেকমন্ত্রী মুফতি মুহাম্মদ ওয়াক্কাস আর নেই

বাংলাদেশ কওমি মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড বেফাকের সিনিয়র সহ-সভাপতি, হাইয়াতুল উলইয়ার কো-চেয়ারম্যান, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের সভাপতি ও সাবেক ধর্মপ্রতিমন্ত্রী মুফতি মুহাম্মদ ওয়াক্কাস আর নেই। ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।

আজ বুধবার ৩১ মার্চ ভোর ৪.৩০মিনিটে রাজধানী ঢাকার মহাখালী শেখ রাসেল জাতীয় গ্যাস্ট্রোলিভার ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে ইন্তেকাল করেন তিনি। বিষয়টি আওয়ার ইসলামকে নিশ্চিত করেছেন রাজধানীর গুলিস্তান পীর ইয়ামেনী জামে মসজিদের খতিব মুফতি ইমরানুল বারী সিরাজী।

মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৭৪বছর।তিনি ৩ ছেলে ও ৪ মেয়েসহ অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে গেছেন। জানাজার নামাজ তাঁর প্রতিষ্ঠিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জামিয়া ইমদাদিয়া মনিরামপুর, যশোরে অনুষ্ঠিত হবে।

মুফতি ওয়াক্কাস যশোর জেলার মণিরামপুর উপজেলার বিজয়রামপুর গ্রামে ১৯৪৮ সালের ১৫ জানুয়ারি জন্মগ্রহণ করেন। সংসারের কনিষ্ঠ সন্তান হিসেবে মো. ইসমাইল মোড়ল-নূর জাহান বেগম দম্পতির স্নেহ একটু বেশিই পেয়েছেন। যেমন এখন পান সাধারণ মানুষের ভালোবাসা ও শাগরেদদের অবারিত শ্রদ্ধা।
স্থানীয় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ালেখার সূচনা। শিক্ষাজীবনে তিনি যে কৃতিত্ব দেখিয়েছেন তার রীতিমতো বিস্ময়কর। মাদরাসা বোর্ড থেকে দাখিলে (১৯৬৫) সম্মিলিত মেধা তালিকায় ৩য়, আলিমে (১৯৬৭) সম্মিলিত মেধা তালিকায় ১ম, ফাজিলে (১৯৬৯) মাদরাসা বোর্ডে প্রথম শ্রেণিতে মেধা তালিকায় ৩য় ও কামিলে (১৯৭১) মাদরাসা বোর্ডে প্রথম শ্রেণিতে মেধা তালিকায় ৩য় স্থান অর্জন করেন। দাখিল পরীক্ষার অবসরে মাত্র ৩ মাসে কোরআনে কারিম হিফজ করেন। ১৯৭২ সালে মণিরামপুর মহাবিদ্যালয় থেকে এইচএসসি পাশ করেন।
এরপর মুফতি ওয়াক্কাস তার মুরুব্বি ও মুর্শিদ হজরত মাওলানা তজম্মুল আলী রহমাতুল্লাহি আলাইহির নির্দেশে দারুল উলুম দেওবন্দ গমন করেন ও সেখানে ৪ বছর অধ্যায়ন করেন। ১৯৭৩ সালে ১ম বিভাগে মওকুফ আলাইহি, ১৯৭৪ সালে দাওরায়ে হাদিস (মেধা তালিকায় ৪র্থ), ১৯৭৫ সালে তাকমিল দ্বীনিয়াত (মেধা তালিকায় ১ম) ও ১৯৭৬ সালে ইফতা (মেধা তালিকায় ১ম) শেষ করে মুফতি সনদ লাভ করেন। সময়ের হিসেবে তিনি দেওবন্দে পড়াশোনার সময় শ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিস ও শিক্ষকদের পেয়েছেন। ১৯৭৩ সালে তিনি শায়খ তজম্মুল আলী (রহ.)-এর হাতে বায়াত হন এবং ১৯৮৪ সালে খেলাফত লাভ করেন।
দারুল উলুম দেওবন্দ থেকে দেশে ফিরে শায়খ তজম্মুল আলী (রহ.)-এর পরামর্শে হেড মাওলানা হিসাবে লাউড়ী কামিল মাদরাসায় যোগ দিয়ে ২ বছর শিক্ষকতা করেন। পরে দারুল উলুম খুলনায় (১৯৭৮-১৯৮৬) ৮ বছর শায়খুল হাদিস, নাজেমে তালিমাত ও প্রধান মুফতির দায়িত্ব পালন করেন। মাঝে কিছুদিন ঢাকা মালিবাগের মুহতামিম ও শায়খুল হাদিস ছিলেন। ১৯৯৩ সাল থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত যশোরের জামেয়া এজাজিয়া রেলষ্টেশন মাদরাসার শায়খুল হাদিসের দায়িত্ব পালন করেন। এ ছাড়া নিজের প্রতিষ্ঠিত জামেয়া ইমদাদিয়া মাদানীনগরের মুহতামিম ও শায়খুল হাদিস। ১৯৮২ সালে জামেয়া ইমদাদিয়া মাদানীনগর প্রতিষ্ঠা করেন মুফতি ওয়াক্কাস। ১৯৮৯ সালে এর বালিকা শাখা প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৯৫ সালে বালিকা শাখায় দাওরায়ে হাদিস এবং ২০০৩ সালে বালক শাখায় দাওরায়ে হাদিস চালু হয়। ২০০৯ সালে ইফতা ও ২০১৪ সনে আরবি বিভাগ খোলা হয়। প্রতিষ্ঠানটি দক্ষিণবঙ্গের অন্যতম বৃহৎ দ্বীনি প্রতিষ্ঠান। এখানে প্রায় দুই হাজার ছাত্র-ছাত্রী লেখাপড়া করছে।
পাকিস্তান আমলেই শায়খ তজম্মুল আলী (রহ.)-এর তত্ত্বাবধানে জমিয়তের রাজনীতিতে যুক্ত হন। বাহাদুরপুর কামিল মাদরাসায় পড়াশোনার সময় জমিয়তে তলাবায়ে আরাবিয়া বাহাদুরপুর শাখার ভিপি ছিলেন। স্বাধীনতার পর শায়খে কৌড়িয়া রহ. ও শায়খুল হাদিস আল্লামা আজিুল হক রহ. জমিয়তের সভাপতি থাকাকালীন সময়ে মুফতি ওয়াক্কাস খুলনা বিভাগে জমিয়তের নাজেমের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮৬ সালে দলমত নির্বিশেষে এলাকাবাসীর অনুরোধে স্বতন্ত্রপ্রার্থী (মটরগাড়ী প্রতীক) হিসেবে যশোর-৫ আসন থেকে জাতীয় সংসদ নির্বাচন করে বিপুল ভোটে সরকার দলীয় প্রার্থীকে পরাজিত করেন।
নির্বাচনে এলাকাবাসীর স্বতস্ফূর্ত অংশগ্রহণে সম্পূর্ণ বিনাখরচে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। যা রাজনীতিতে বিরল ঘটনা। পরে এলাকার উন্নয়নের কথা চিন্তা করে এলাকাবাসী ও জমিয়তের নেতৃবৃন্দের পরামর্শক্রমে জাতীয় পার্টিতে যোগ দেন মুফতি ওয়াক্কাস। ১৯৮৮ সালের নির্বাচনে পুনরায় নির্বাচিত হন ও ধর্ম প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পান। নানা কারণে মন্ত্রিত্বের পদে বেশিদিন থাকা হয়নি। এর পর তিনি এরশাদ সরকারের শেষদিন পর্যন্ত জাতীয় সংসদের হুইপের দায়িত্ব পালন করেন। এরশাদ সরকারের পতনের পর মুফতি ওয়াক্কাস আবার সক্রিয় হন জমিয়তের রাজনীতিতে। ১৯৯১ সালে আরজাবাদ মাদরাসায় অনুষ্ঠিত জমিয়তের জাতীয় কাউন্সিলে তাকে সর্বসম্মতিক্রমে জমিয়তের মহাসচিব নির্বাচিত করা হয়।
মুফতি ওয়াক্কাস ১৯৮৬, ১৯৮৮, ১৯৯১, ১৯৯৬, ২০০১, ২০০৮ ও ২০১৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছেন। তন্মধ্যে ১৯৮৬, ১৯৮৮ ও ২০০১ সালে যশোর-৫ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। সংসদীয় কমিটি
১৯৯১ থেকে ২০১৬ পর্যন্ত মুফতি মুহাম্মদ ওয়াক্কাস বাংলাদেশ তথা ভারত উপমহাদেশের সবচেয়ে পুরোনো ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করেন। দল পরিচালনার নানা বিষয় নিয়ে জমিয়তের কেন্দ্রীয় নেতারা মতবিরোধে জড়িয়ে যান। ফলে ২০১৮ সালের ১১ জানুয়ারি আলাদা কনভেনশন করে মুফতি ওয়াক্কাসকে জমিয়তের সভাপতি নির্বাচিত করা হয়।
মুফতি ওয়াক্কাস রাজনীতির পাশাপাশি বিভিন্ন সামাজিক আন্দোলন থেকে শুরু করে ধর্মবিরোধী কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদে সংগঠিত আন্দোলন-সংগ্রামে নেতৃত্ব দিয়েছেন। কাদিয়ানী বিরোধী আন্দোলনের মাইলফলক ১৯৯৪ সালের আন্তর্জাতিক মজলিসে তাহাফফুজে খতমে নবুওয়ত আহুত মহাসমাবেশে তার ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য। এ ছাড়া মুসলিম পারিবারিক আইনে কোরআন-সুন্নাহ বিরোধী ধারা বাতিল, এনজিওদের ধর্মান্তরের কাজের প্রতিবাদে হওয়া আন্দোলনেও তিনি বিশাল ভূমিকা রেখেছেন। ১৯৯৫ সালে ‘ঈমান বাঁচাও দেশ বাঁচাও’ কমিটি এবং ২০০১ সালের ১ জানুয়ারি বিচারপতি গোলাম রাব্বানী ও নাজমুন আরা সুলতানার ‘সব ধরনের ফতওয়া নিষিদ্ধ’ রায়ের প্রতিবাদে সব ইসলামি দল নিয়ে গঠিত ‘ইসলামী আইন বাস্তবায়ন কমিটি’র মহাসচিব ছিলেন মুফতি ওয়াক্কাস।
ইসলামী আইন বাস্তবায়ন কমিটি বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম অধ্যায়। ফতোয়া বিরোধী রায়ের বিরুদ্ধে জন্ম নেওয়া সংগঠনটি কোরআন-সুন্নাহ বিরোধী নারী উন্নয়ন নীতিমালা এবং সংবিধান থেকে আল্লাহর ওপর থেকে আস্থা ও বিসমিল্লাহ উঠিয়ে দেওয়ার প্রতিবাদে ব্যাপক ভূমিকা রাখে। এভাবে মুফতি ফজলুল হক আমিনী ও মুফতি ওয়াক্কাস হয়ে উঠেন বাংলাদেশের ইসলামি আন্দোলনের দুই মহীরুহ।
মুফতি ওয়াক্কাস ১৯৮৭ সালে সংসদ সদস্য হিসেবে, ১৯৮৮ সালে ধর্ম প্রতিমন্ত্রী থাকাকালে দলনেতা হিসেবে হজপালন করেন। সেবার সৌদি সরকারের পক্ষ থেকে তাকে বায়তুল্লাহ শরিফের মহামূল্যবান গিলাফ উপহার দেওয়া হয় এবং পবিত্র কাবা ঘরে প্রবেশ করে নফল নামাজ আদায়ের সুযোগ পান। এরপর তিনি আরও অনেকবার হজ-উমরা পালন করেছেন। রাষ্ট্রীয় কাজে সৌদি আরব, ইরাক, লিবিয়া ও মৌরিতানিয়া সফর করেছেন। এছাড়া ব্রিটেন, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ভারত ও পাকিস্তান সফর করেছেন।
মুফতি ওয়াক্কাস ‘শরীয়তের আলোকে মুসলিম পারিবারিক আইন’ ও ‘ইসলামী আইন বনাম প্রচলিত আইন’ নামে গুরুত্বপূর্ণ দু’টি বই রচনা করেছেন।
২০১৩ সালে কথিত শাহবাগ জাগরণের নামে ধর্ম অবমাননা, আল্লাহ ও তার রাসূল সম্পর্কে কটূক্তি এবং কোরআন-হাদিস, আলেম-উলামা ও ইসলামি পোশাক নিয়ে বহুমুখী চক্রান্ত ও ষড়যন্ত্র শুরু হয়। এমতাবস্থায় হাটহাজারী মাদরাসার মহাপরিচালক আল্লামা শাহ আহমদ শফীর আহবানে ২০১৩ সালের ৯ মার্চ হাটহাজারীতে বাংলাদেশের শীর্ষ আলেমরা উপস্থিত হন। গঠিত হয় অরাজনৈতিক সংগঠন হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ।
মুফতি ওয়াক্কাস হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় নায়েবে আমির নির্বাচিত হন। শুরু হয় ইসলাম অবমাননাকারীদের শাস্তির চেয়ে ১৩ দফা দাবি আদায়ের আন্দোলন। হেফাজতের ডাকে সভা-সমাবেশ, লংমার্চ (২০১৩ সালের ৬ এপ্রিল) অনুষ্ঠিত হয়। হেফাজত আন্দোলনের কথা বিশ্ব মিডিয়ায় বিশেষভাবে জায়গা করে নেয়। অবশেষে ২০১৩ সালের ৫ মে শাপলা চত্বরে এ আন্দোলন মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হয়। হেফাজত নেতাকর্মীদের রক্তে রাজপথ রঞ্জিত হয়, শুরু হয় জেল-জুলুম-মামলা হুঁলিয়া। অসংখ্য আলেম, মাদরাসার ছাত্র ধর্মপ্রাণ মানুষ গ্রেফতার হন। হেফাজত আন্দোলনের অন্যতম শীর্ষ নেতা মুফতি ওয়াক্কাস ২০১৩ সালের ২ সেপ্টেম্বর চৌধুরীপাড়া থেকে গ্রেফতার হন। তার বিরুদ্ধে রুজু হয় একে একে ২৪টি মামলা। দীর্ঘ ৯ মাস কারাভোগের পর ২০১৪ সালের ৯ জুন তিনি জামিনে মুক্তি পান।
সত্তরের বেশি বয়স তার। এই বয়সেও বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়ার সহ-সভাপতি এবং কওমি মাদরাসার সবোর্চ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা হাইয়াতুল উলইয়ার সদস্য হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। হাদিসের দরস, ওয়াজ-মাহফিল, রাজনৈতিক সভা-সমাবেশ ও ইসলামি মাহফিলে নিয়মিত অংশ নিচ্ছেন। তার সাত সন্তানই দ্বীনী শিক্ষার সর্বোচ্চ ডিগ্রী অর্জন করেছে। তিন ছেলেই দেওবন্দ থেকে শিক্ষা গ্রহণ করেছেন। মেয়েরাও দাওরায়ে হাদিস পাশ করে হাদিসের খেদমত করছে।
আকাবিরদের অনুকরণে পরিচালিত দল জমিয়তের পেছনে তার অবদান অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। আর ক্ষমতাসীন দলের এমপি হয়েও তার ঢাকার মাথাগোঁজার ঠাঁই না থাকার কারণ তার সততা ও নিলোর্ভী মানসিকতা।
তথ্য ও লেখা: মুফতী এনায়াতুল্লাহ
সিনিয়র সাংবাদিক
Facebook Comment





© All rights reserved © 2020 TabligNewsBD.Com
Design & Developed BY PopularServer.Com