সোমবার, ১৪ Jun ২০২১, ০২:৫১ অপরাহ্ন

সংবাদ শিরোনাম ::
চলতি মাসেই চালু হচ্ছে ৫০ মডেল মসজিদ অনলাইনে বিভিন্ন গ্রুপ ও পেইজ এডমিনদের নিয়ে মাশোয়ারার  বাংলাদেশে আরবি বিস্তারের মহানায়ক আল্লামা সুলতান যওক নদভী (দা.বা) দেওবন্দে গেলেন হযরতজী মাওলানা সাদ কান্ধলভী দা.বা. মনসুরপুরীকে নিয়ে সাইয়্যেদ সালমান হুসাইনি নদভির স্মৃতি চারণ আল্লামা ক্বারী উসমান মানসুরপুরীর ইন্তেকালে বিশ্ববরেণ্য আলেমদের শোক আমীরুল হিন্দ আল্লামা ক্বারী উসমান মানসুরপুরীঃ জীবন ও কর্ম আমার একান্ত অভিভাবক থেকে বঞ্চিত হলাম : মাহমুদ মাদানী মানসুরপুরীর ইন্তেকালে জাতীয় কওমী মাদরাসা শিক্ষাবোর্ডের গভীর শোক প্রকাশ দেওবন্দের কার্যনির্বাহী মুহতামিম সাইয়েদ কারী মাওলানা উসমান মানসুরপুরী আর নেই
হজরতজি ইলিয়াস কান্ধলভী [রহ.] যেভাবে রমজান কাটাতেন

হজরতজি ইলিয়াস কান্ধলভী [রহ.] যেভাবে রমজান কাটাতেন

হজরতজি ইলিয়াস কান্ধলভী [রহ.] যেভাবে রমজান কাটাতেন

শায়খুল হাদিস হযরত মাওলানা মুহাম্মাদ যাকারিয়া রহ.

কান্ধালার খান্দানী রেওয়ায মোতাবেক চাচাজানের অভ্যাস ছিল যে, যা কিছু খাওয়ার তা তিনি ইফতারীর সময়ই খেয়ে নিতেন। চাচাজানের এখানে চায়ের তেমন একটা গুরুতৃ ছিল না। তার খানা হত খুবই সামান্য । ইফতার এর সময় এক আধটা রুটি খেয়ে নিতেন। যাহোক, তিনি ইফতারের পর মাগরিবের নামায পড়তেন । মাগরীবের পর দীর্ঘ সময় পর্যন্ত নফল নামায পড়তে থাকতেন। আর এই অভ্যাস তার বাল্যকাল থেকেই ছিল । তবে রমজান মাসে তা এত দীর্ঘ হত যে, ইশার আযানের কিছু পূর্বে তা শেষ হত।নকলের পর মসজিদেই কিছুক্ষণ শুয়ে পড়তেন। তখন খাদেম ও অন্যান্যরা শরীর টিপতে থাকত। প্রায় আধা ঘন্টা আরাম করার পর এশার হলে উঠে যেতেন। ভিনি নিজেই তারাবীহ পড়াতেন। তারাবীহ শেষ হওয়ার সাথে সাথে শুয়ে পড়তেন। এ সময় কোন মজলিস করা বা কারোসাথে কথা বলার অভ্যাস তার ছিল না। অনেকবারই তিনি আমাকে একথা বলেতেন যে, বিতিরের সালাম ফিরানোর পর বালিশে মাথা রাখার আগেইআমি ঘুমিয়ে যাই। তবে এ অধম যখন চাচাজানের দরবারে রমায়ান মাসে উপস্থিত হতাম, আর আমার মত লোভী এবং পেটুকের তো ইফতারীর আসল সময় ছিল তারাবীর পর। পূর্ব থেকেই তো ফুলরী ইত্যাদির ব্যবস্থা থাকতো। এছাড়াও বন্ধু-বান্ধবরা কোন ফল-ফুট হাদীয়া দিলে সেগুলোও তারাবীর পর খাওয়া হত। ফলে চাচাজান রহ.ও কিছুক্ষণের জন্য এতে শরীক হতেন।আমি অনুরোধ করে বলতাম, কষ্ট না করে আপনি গিয়ে আরাম করুন। কি অনুরোধ সত্তেও তিনি প্রায় পনের-বিশ মিনিট এতে ব্যয় করতেন।

রাত বারটার দিকে তিনি সজাগ হয়ে যেতেন। ঐ সময় খাদেমরা দু’টি গরম গরম সিদ্ধ ডিম তার খিদমতে পেশ করত। জরুরত থেকে ফারেগ
হয়ে ডিম দু’টো খেয়ে নিতেন। এরপর তিনি তাহাজ্জুদে দাড়িয়ে যেতেন।একেবারে শেষ সময়ে সাহরী খেতেন। এমন সময় সাহরী খেতেন যে, অনেক দিন আমি নিজে দেখেছি, তিনি ডান হাতে লুকমা নিয়ে একজনকে বলতেন পানি নিয়ে আস, আরেকজনকে বলতেন, আযান দাও। মুয়াযিন আযান দেয়ার জন্য ছাদে উঠতে উঠতে তিনি খানা থেকে ফারেগ হয়ে যেতেন। অর সঙ্গে সঙ্গেই আযান হয়ে যেত।

আমাদের জনৈক আত্মীয় দিল্লীর এক মসজিদের ইমাম ছিলেন। তিনি মনে করতেন, ভাইজান (ইলিয়াস সাহেব) যেহেতু সারা দিল্লীর পীর, তাই রমযানে হয়তো অনেক হাদীয়া তোহফা আসে।আসে ফলে তিনি এখানে এক রাত থাকার জন্য আসেন। ইফতারের সময় হলে চাচাজান খাদেমকে বলল, ভাই! খাওয়ার কিছু থাকলে নিয়ে এস।খাদেমরা উত্তর দিল, হযরত! রাতের সেই গোলরগুলোই রয়ে গেছে । তিনি বললেন, বাহ্‌ বাহ্‌! তাই নিয়ে এস। এটাই ছিল সেদিনের ইফতারীর একমাত্র আইটেম । আবার এটাই ছিল সেদিন মাগরিবের পর খাওয়ার আইটেম। সাহহীর সময় আবার জিজ্ঞাসা করলেন, কিছু আছে কি? থাকলে নিয়ে এস।থাদেমরা বলল. হযরত! কিছু গোলর রয়ে গেছে। চার পাচটা গোলর খেয়ে রোযা রাখলেন । 

আযানের পর ওয়াক্তের শুরুতে নামায পড়লেন । রমাযানে ফজরের পর চাচাজান বয়ান করতেন না। মাওলানা ইউসুফ সাহেবই সর্বপ্রথম তা শুরু করেন। চাচাজান ফজরের পর ইশরাক পর্যন্ত জায়নামাযে বসে যিকির-আযকার ও তাসবীহ-তাহলীল আদায় করতে থাকতেন । অন্যান্য সমস্ত খাদেমরা ফজরের পর শুয়ে যেতেন এবং যার যার সময় অনুযায়ী ঘুম থেকে সজাগ হতেন।
ইশরাক আদায় করার পর যদি চাচাজানের কিছুটা কান্তি অনুভব হত এবং হাতেও সময় থাকত, তাহলে কিছুক্ষণের জন্য আরাম করতেন। অন্যথায় মেওয়াতগামী জামাতের সাথীদেরকে হেদায়াতী কথা বলতেন এবং যেসব জামাত সবেমাত্র এসেছে তাদের সাথে কথা-বার্তা
বলতেন । চাচাজানের এখানে নতুন মেহমানদের খুব কদর করা হত । তাদের খাতিরে স্বীয় মা’মুলাতে বিঘ্ন ঘটাতেও কোন কুণ্ঠাবোধ করতেন না। তার এখানে সায়্যিদযাদাদের খুব সম্মান ছিল। তাদের মেহমানদারী এবং ইহতেরাম করতে আমাকেও অনেকবার তাকীদ করেছেন। সায়্যিদযাদারা তার শাগরিদ বা মুরীদ হলেও তাদের অনেক দোষ ক্রটি তিনি এড়িয়ে যেতেন। একবার আমি চাচাজানের কোন এক খাদেম সম্পর্কে তার কাছে অভিযোগ করলে তিনি বললেন, আমারও তা জানা আছে। তবে সে সায়্যিদযাদা। শেষের শব্দটি তিনি এত সম্মানের সাথে উচ্চারণ করেছেন যে,আমিও এতে ভয় পেয়ে গেলাম ।

আলী মিঞা চাচাজানের জীবন চরিত “মাওলানা মুহাম্মাদ ইলিয়াস সাহেব আওর উনকি দ্বীনি দাওয়াত’ নামক গ্রন্থের মধ্যে লিখেন যে, মাওলানা মুঈনুল্লাহ নদবী বর্ণনা করেন যে – একবার আমি অসুস্থ হয়ে পড়লাম।রমাযান মাস ছিল। মাওলানা তখন নফলের নিয়ত বেধেছেন। ছেলেকে বললেন, খানা রেখে দাও । আমি নিজে নিয়ে যাব। তিনি বুঝতে না পেরে খানা আমার কামরায় দিয়ে চলে গেলেন। নামায শেষে হযরত আমার কামরায় চলে আসলেন। ওযরখাহী করে বললেন, ছেলেটিকে বলেছিলাম, আমি খানা নিয়ে যাব। কিন্তু যে আমাকে সুযোগ না দিয়ে নিজে নিয়ে এসেছে। পরে অনেকক্ষণ পর্যন্ত আমাকে আদর-সোহাগ করলেন এবং আমার মন সন্তুষ্টির জন্য কথাবার্তা বলতে লাগলেন। (দ্বীনি দাওয়াত)

এই সম্মান প্রদর্শনের পিছনে বড় কারণ হল, মাওলানা ছিলেন সায়্যিদযাদা ।

দুপুরে দেড়-দু’ঘন্টা যাবত আরাম করা তার মা*মূল ছিল। যোহরের পর হুজরায় চলে আসতেন এবং যে সমস্ত জামাত বিদায় নিবে বা যারা সবে মাত্র এসেছে, তাদের সাথে কথাবার্তা বলতেন। আসর পর্যন্ত এই ধারাবাহিকতা চলতে থাকত । এছাড়াও রমাযানে করো সবক থাকলে তাও পড়িয়ে দিতেন। আসরের পর মাগরীব পর্যন্ত যিকরে জেহরী করতে থাকতেন। রমাযান ছাড়া অন্যান্য সময় এ যিকির শেষ রাতে করতেন। তাহাজ্জুদের পর থেকে নিয়ে প্রায় ফজর নামায পর্যন্ত যিকির করতে থাকতেন। কারণ রমাযান ছাড়া অন্যান্য মাসে ফজর নামায আকাশ ফর্সা হলে পড়া হত। জীবনের শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত চাচাজান রহ.কে এত ইহতেমামের সাথে যিকরে জেহরী করতে দেখেছি যে, অন্য কোন আকাবিরকে এমনটি করতে দেখা যায়নি । অসুস্থ হয়ে যাওয়ার পূর্ব পর্যন্ত বার তাসবীহ এবং ইসমে জাতের যিকির রমাযান মাসে
আসরের পর থেকে মাগরীব পর্যন্ত আর রমাযান ছাড়া অন্যান্য মাসে তাহাজ্জুদের পর থেকে ফজর পর্যন্ত খুব ইহতেমামের সাথে করতে থাকতেন ।
চাচাজান রহ- এর তৃতীয় হজের সফর শুরু হয়েছিল রমাযান মাসে। আলী মিয়া চাচাজানের জীবনীতে লিখেন, ১৩৫১ হিজরীতে তিনি তৃতীয় হজ করেন। নিজামুদ্দীন থাকতেই রমাযানের চাদ দেখা গেল। দিল্লীর স্টেশনে পৌছে তারাবীহ পড়লেন এবং তারাবীহ শেষ হলে করাচিগামী ট্রেনে উঠলেন।
(দ্বীনি দাওয়াত)

চাচাজানকে বিদায় জানানোর জন্য দিল্লীর স্টেশন পর্যন্ত গিয়েছিলাম । গাড়িতে আসবাবপত্র রাখার পর চাচাজান স্টেশনের এক জায়গায় তারাবীহ পড়ালেন। যারা বিদায় জানানোর জন্য সঙ্গে গিয়েছিলেন, তারা তো ছিলেনই, দিল্লীর অনেক লোকজন এসে এতে শরীক হয়েছিলেন। অনেকে নিজ নিজ মসজিদে তারাবীহ শেষ করে চাচাজানের পিছনে এসে জামাতে শরীক, হলেন। কারণ সাধারণত মসজিদগুলোতে তারাবীহ তাড়াতাড়ি শেষ যায়। অন্য দিকে গাড়িতে মাল সামানা রাখতে রাখতে দেরী হওয়ায় তারাবীহও দেরীতে শুরু হয়েছিল। চাচাজান তারাবীতে ‘আলিফ-লাম-মীম’ থেকে পড়া শুরু করলেন, যেভাবে মসজিদে ধীরে ধারে পড়াতেন এখানেও অনুরূপ ধীর গতিতে পড়ালেন। কারণ সেদিন গাড়ি ছাড়তে দেরী করেছিলো এবং ছাড়তে প্রায় সোয়া ঘন্টা বাকী ছিল। মাওলানা ইউসুফ সাহেবর মত তিনিও সব সময় তাবলীগী মোযাকারায় ব্যস্ত থাকতেন। এটা দেখেছেন এমন লোক এখনো হয়ত হাজারের অধিক জীবিত আছেন । খেতে বাসে এই আলোচনা, ট্রেনে বসে এই আলোচনা, যাত্রী ছাউনিতে বসেও ঐ একই আলোচনা । মোটকথা উঠতে বসতে, এমনকি প্রতিটি কদমে কদমে তার এ একই আলোচনা ।

স্নেহাস্পদ মুহাম্মাদ সানী “সাওয়ানেহে ইউসুফ” নামক জীবনী গ্রন্থে লিখেন, হযরত ইলিয়াস সাহেব সব সময় রমাযানের অনেক কদর করতেন। এ সময় মেওয়াত অঞ্চল থেকে ব্যাপকহারে নিজামুদ্দীনে জামাত আসত।বিভিন্ন অঞ্চলের উদ্দেশ্যে এই জামাতগুলো বের হয়ে যেত। এমনকি স্বয়ংদিল্লী মারকাজের মাকামী কাজও খুব গুরুত্বের সাথে আঞ্জাম দেয়া হত। (সাওয়ানেহে ইউসুফ)

আকাবির কা রমযান

Facebook Comment





© All rights reserved © 2020 TabligNewsBD.Com
Design & Developed BY PopularServer.Com