শনিবার, ১৯ Jun ২০২১, ০৯:১৪ পূর্বাহ্ন

সংবাদ শিরোনাম ::
চলতি মাসেই চালু হচ্ছে ৫০ মডেল মসজিদ অনলাইনে বিভিন্ন গ্রুপ ও পেইজ এডমিনদের নিয়ে মাশোয়ারার  বাংলাদেশে আরবি বিস্তারের মহানায়ক আল্লামা সুলতান যওক নদভী (দা.বা) দেওবন্দে গেলেন হযরতজী মাওলানা সাদ কান্ধলভী দা.বা. মনসুরপুরীকে নিয়ে সাইয়্যেদ সালমান হুসাইনি নদভির স্মৃতি চারণ আল্লামা ক্বারী উসমান মানসুরপুরীর ইন্তেকালে বিশ্ববরেণ্য আলেমদের শোক আমীরুল হিন্দ আল্লামা ক্বারী উসমান মানসুরপুরীঃ জীবন ও কর্ম আমার একান্ত অভিভাবক থেকে বঞ্চিত হলাম : মাহমুদ মাদানী মানসুরপুরীর ইন্তেকালে জাতীয় কওমী মাদরাসা শিক্ষাবোর্ডের গভীর শোক প্রকাশ দেওবন্দের কার্যনির্বাহী মুহতামিম সাইয়েদ কারী মাওলানা উসমান মানসুরপুরী আর নেই
মাদ্রাসার দেহ আছে প্রাণ নেই : সুরত আছে সিরাত নেই

মাদ্রাসার দেহ আছে প্রাণ নেই : সুরত আছে সিরাত নেই

মাদ্রাসার দেহ আছে প্রাণ নেই : সুরত আছে সিরাত নেই…

সাইয়্যেদ আবুল হাসান আলী নদভী রহ.
অনুবাদ: সৈয়দ আনোয়ার আবদুল্লাহ
আমার কথা খোলা মনে গ্রহণ করুন, আমি তো আপনাদেরই একজন। এটা সমালোচনা নয়, আত্ম-সমালোচনা। আমি বলতে চাই, মাদ্রাসা এখন সেই ‘পুষ্প’-এর সুবাস থেকে প্রায় বঞ্চিত। আগের সেই নুরানিয়াত নেই। সেই নুরানি মানুষ নেই, যাদের দেখে নিন্দুকেরও জবান সংযত হতো, যাদের সোহবতে মুরদা দিলও জিন্দা হতো।
যে গুণ ও বৈশিষ্ট্যের কথা বললাম, মাদ্রাসার বাসিন্দাদের মাঝে দিন দিন তা অবনতির দিকেই চলেছে। যত তিক্ত হোক স্বীকার করতেই হবে যে, কবি যা বলেছেন সত্য বলেছেন। তাই বুকে পাথর রেখে আমাদের তা শুনতে হবে এবং তা থেকে শিক্ষা নিতে হবে।
কবি বলেছেন-‘এখানে আজ নেই জীবনের তরঙ্গ ও প্রেমের জোয়ার,
নেই অন্তর্জ্ঞান ও অন্তর্দৃষ্টি।
ফল এই যে, হাজারো মাদ্রাসায় এখন আছে লাখো তালেবা, কিন্তু সমাজের অঙ্গনে এবং জীবনের প্রাঙ্গণে তাদের কোনো প্রভাব নেই, নিয়ন্ত্রকের ভূমিকা নেই।
অথচ আগে সংখ্যা ছিল কম, ধার ও ভার ছিল অনেক বেশি। এক সময় এ দেশেই খাজা মাঈনুদ্দীন আজমিরী কিংবা সৈয়দ আলী হামদানি কাশ্মীরী (রহ.)-এর মতো সহায়-সম্বলহীন এক ফকির আত্মপ্রকাশ করতেন আর সারা দেশ হৃদয়ের তাপে ও উত্তাপে উত্তপ্ত হয়ে উঠত এবং ঈমান ও ইয়াকিনের নুরে নুরানি হতো।হজরত মুজাদ্দিদে আলফে সানি (রহ.) মোগল হুকুমতে একা এক ইনকিলাব এনেছিলেন। তারই নীরব প্রচেষ্টার বরকতে আকবরের সিংহাসনে আমরা দেখি আওরঙ্গজেবের মতো আলিম, ফাকিহ ও দ্বীনদার বাদশাহকে।
শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলবী (রহ.) বিশাল বিস্তৃত এই হিন্দুস্তানের গতিধারা বদলে দিয়েছিলেন এবং সমগ্র চিন্তাব্যবস্থা ও শিক্ষাব্যবস্থার ওপর সুগভীর প্রভাব বিস্তার করেছিলেন।
মাওলানা মোহাম্মদ কাসিম নানুতবী (রহ.) এক সর্বগ্রাসী হতাশা ও নৈরাশ্যের মাঝে এবং ‘পিছু হটা’ এক নাজুক সময়ে এত বড় ইসলামী দুর্গ তৈরি করেছেন এবং দ্বীন ও শরিয়তের কঙ্কাল দেহে নতুন প্রাণ সঞ্চার করেছেন।
আর এই কিছুদিন আগে হজরত মাওলানা ইলিয়াস (রহ.) ঈমানের মেহনত এবং দ্বীনি দাওয়াতের যে জাযবা ও হিম্মত এবং উদ্যম ও মনোবল মানুষের মাঝে সঞ্চার করেছেন তা এক কথায় বিস্ময়কর। একজন ইলিয়াস (রহ) বদলে দিলেন গোটা পৃথিবীকে। একজন মানুষের ঈমানী উত্তাপ ছড়িয়ে পড়লো সমগ্র জাহানের মাশরেক থেকে মাগরিবে। কবির ভাষায়-‘এক জাহান বদলে দিতেন এক মরদে খোদা’
এখন মাদ্রাসা থেকে বের হয়ে আসা আমাদের ওলামা-ফোযালা এই প্রাণ ও প্রেরণা থেকে, এই জাযবা ও চেতনা থেকে এবং এই রূহ ও রূহানিয়াত থেকে প্রায় শূন্যের পর্যায়ে চলে এসেছে। একজন ইলিয়াস কেন আজ জাতি পাচ্ছেনা লাখ লাখ আলেম থেকে।কেন উম্মতের ব্যাথ্যা আর দরদওয়ালা, চিন্তা ও ফিকির ওয়ালা , ঈমানী বলে বলিয়ান একজন তরুণ বের হয়ে আসছে না? যিনি একজন ইলিয়াস রহ. এর মতো বদলে দিবেন গোটা ধরনীকে।
সেই হৃদয়-সম্পদ থেকে আজ তারা বঞ্চিত, সেই ‘কলবি হারারাত’ ও হৃদয়োত্তাপ থেকে আজ তারা মাহরুম, যা কাওমকে নতুন চিন্তায় ও চেতনায় উদ্বুদ্ধ করত এবং জীবনের পথ পন্থায় আমূল পরিবর্তন আনতে বাধ্য করত। যুগ ও সময় বড় বাস্তববাদী।
এখানে ফাঁক ও ফাঁকির সুযোগ নেই। এখানে শক্তি উচ্চতর শক্তির কাছেই শুধু আত্মসমর্পণ করে। মস্তিষ্ক উন্নততর মস্তিষ্কের সামনেই শুধু অবনত হয় এবং নিরুত্তাপ হৃদয় উত্তপ্ত হৃদয়ের সংস্পর্শেই শুধু বিগলিত হয়।
তিক্ত সত্য এই যে, এখন মাদ্রাসা ও তার বাসিন্দাদের জ্ঞান – বুদ্ধিবৃত্তি যেমন স্থবির তেমনি তাদের ঈমানে র্নিজিবতা, হৃদয়বৃত্তি অবনতিশীল। চিন্তা-চেতনা যেমন প্রাণহীন, তেমনি আত্মিক শক্তিও নিস্তেজ।
বক্তা ও বক্তৃতার এবং লেখক ও লেখার অভাব এখনও নেই। দর্শন ও দার্শনিকের, লেকচারার আর বক্তার অভাব নেই আজ । চিন্তা ও চিন্তাবিদের কমতি এখনও নেই, যু্ক্তি ও বুদ্ধির শেষ নেই, কিন্তু কবি জিগার মুরাদাবাদীর ভাষায়-
চোখের তারায় প্রেমের ঝিলিক কোথায়?
চেহারায় ঈমানের সে নুর কোথায়?
মাদ্রাসা এক সময় ছিল জীবন ও জীবনী-শক্তির কেন্দ্র, দ্বীন ও ঈমানের রক্ষা-দুর্গ এবং বড় বড় ব্যক্তি ও ব্যক্তিত্বের লালন ক্ষেত্র, সময়ের প্রয়োজনে যারা জন্ম দিতেন কল্যাণপ্রসূ বিপ্লবের এবং সংস্কার আন্দোলনের। তৈরী করতেন যুগ জামানা বদলে দেয়া দাঈ ইলাল্লাহ। এখানে তৈরী হতো আল্লাহওয়ালা আর তাকওয়াওয়ালা একেকজন র্মদে মুমিন। যারা যুগ ও সময়কে বদলে দিতেন খোদায়ী মদদ আর শক্তিতে।
সেদিনের সেই মাদ্রাসা আজ হতাশা ও নিরাশায় বিপর্যস্ত, অযোগ্যতার অনুভূতি ও হীনমন্যতা বোধে বিধ্বস্ত।এখন মাদ্রাসার সংখ্যা বেড়েছে, ছাত্র ও ছাত্রাবাস অনেক হয়েছে, পাঠ্যবই ও পাঠব্যবস্থা বেশ উন্নত হয়েছে, কুতুবখানার সমৃদ্ধি এবং সুযোগ-সুবিধার বৃদ্ধি যথেষ্ট হয়েছে, কিন্তু অবক্ষয়েরও চূড়ান্ত হয়েছে।
হৃদয়ের স্পন্দন যেন থেমে গেছে, আত্মার খোরাক যেন কমে গেছে। দেহ আছে প্রাণ নেই, শব্দ আছে মর্ম নেই, কথা আছে হাকিকত নেই, সুরত আছে সিরাত নেই, মজলিস আছে সোহবত নেই। এক কথায় সব আছে, কিন্তু কিছুই নেই।
তাই কোনো দরদি ও সংবেদনশীল মানুষ যখন ‘পথ ভুলে’ এখানে এই পরিবেশে এসে পড়ে তখন তার শ্বাসরুদ্ধ হয়, দম আটকে যায় এবং সে পালিয়ে বাঁচতে চায়। সাগরের এই নিস্তরঙ্গ চেহারা দেখেই যেন বেদনাভারাক্রান্ত কবি ফরিয়াদ করেছেন-‘আল্লাহ করুন/ঝড়-তুফানের সঙ্গে হোক তোমার পরিচয়!/ কেননা তোমার সমুদ্রে জলরাশি আছে/তরঙ্গবিক্ষোভ নেই/কিতাবের পাতা থেকে অবসর নেই তোমার/তাই তুমি গ্রন্থপাঠক, গ্রন্থকার নও।’
এখন তো মাদ্রাসায় বসে সৃষ্টিধর্মী ঝড়-তুফানের পরিচয় প্রার্থনা করতেও বুক কেঁপে ওঠে। কেননা সবখানে সব মাদ্রাসায় এখন দেখতে পাই ধ্বংসাত্মক ঝড়-তুফানের পূর্বাভাস।
এ হল বাইরের ঝড়-তুফান, যা মাদ্রাসার ভিত কাঁপিয়ে দিতে চায়, এগুলো হচ্ছে লক্ষ্যহীন, চিন্তাহীন ও শিকড়হীন আন্দোলন যার ধ্বংসাত্মক ঢেউ মাদ্রাসার চার দেয়ালের গায়ে এসে আছড়ে পড়ছে। তাতেও আমাদের ছাত্রদের ভূমিকা শুধু অনুকরণপ্রিয় তোতাপাখির।
এটা বড় দুঃখজনক ও মর্মান্তিক বাস্তবতা যে, যেসব আলোড়ন ও আন্দোলন, যেসব শোরগোল ও নৈরাজ্য এবং প্রতিবাদ ও বিক্ষোভের যেসব রীতিনীতি ও কর্মকাণ্ড আজ আধুনিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও জাগতিক বিদ্যালয়গুলোতে অচল ও সেকেলে এবং নিষ্ফল ও ক্ষতিকর রূপে পরিত্যক্ত হয়ে চলেছে সেগুলোই এখন আমাদের দ্বীনি মাদ্রাসার তালেবানে ইলমের কাছে কদর ও সমাদর লাভ করছে।
যারা হবে সময়ের নিয়ন্ত্রক ও জামানার ইমাম, যারা হবে সৃজনশীল চিন্তার ধারক, স্বতন্ত্র আদর্শের বাহক এব স্বকীয় ব্যক্তিত্বের অধিকারী জামাত, যারা হবে ঈমানের বলে বলিয়ান ,সুন্নত ও সীরাতের ধারক-বাহক তারাই হয়ে পড়েছে ধর্মহীন শিক্ষা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অন্ধ অনুসারী, নীতিহীন, চরিত্রহীন ব্যক্তি ও ব্যক্তিত্বের পূজারি। এটাই যেন তাদের গর্ব ও গৌরব।
তাই কবি বড় দুঃখ করে বলেছেন- অন্ধকারে আলো ছড়াবার এবং যুগের নেতৃত্ব দেয়ার/যোগ্যতা ছিল যাদের, দেখ হায়!/তারাই এখন আঁধারে পথ হারায়/তারাই এখন মাথা দোলায় যুগের ইশারায়।
আজ আমাদের দ্বীনি মাদ্রাসায় সবচেয়ে ভয়ংকর ফেতনা ও চিন্তানৈতিক ব্যাধি হল সর্বব্যাপী এক হীনমন্যতাবোধ, যা ঘুণে ধরা কাঠের মতো ভেতরে ভেতরে আমাদের গ্রাস করে চলেছে।
আর বলাবাহুল্য, কর্মচঞ্চল ও সংগ্রামমুখর এই পৃথিবীতে ঘুণে ধরা কোনো প্রতিষ্ঠানের পক্ষে বেঁচে থাকা ও টিকে থাকা কখনও সম্ভব নয়।
উর্দু গ্রন্থ পাজা সু-রাগে জিন্দেগি থেকে.
পাঠক! আশা করি লেখাটি পড়ে আপনার অনুভূতি জানাবেন এবং শেয়ার করবেন।
Facebook Comment





© All rights reserved © 2020 TabligNewsBD.Com
Design & Developed BY PopularServer.Com