শনিবার, ১৯ Jun ২০২১, ০৮:৩২ পূর্বাহ্ন

সংবাদ শিরোনাম ::
চলতি মাসেই চালু হচ্ছে ৫০ মডেল মসজিদ অনলাইনে বিভিন্ন গ্রুপ ও পেইজ এডমিনদের নিয়ে মাশোয়ারার  বাংলাদেশে আরবি বিস্তারের মহানায়ক আল্লামা সুলতান যওক নদভী (দা.বা) দেওবন্দে গেলেন হযরতজী মাওলানা সাদ কান্ধলভী দা.বা. মনসুরপুরীকে নিয়ে সাইয়্যেদ সালমান হুসাইনি নদভির স্মৃতি চারণ আল্লামা ক্বারী উসমান মানসুরপুরীর ইন্তেকালে বিশ্ববরেণ্য আলেমদের শোক আমীরুল হিন্দ আল্লামা ক্বারী উসমান মানসুরপুরীঃ জীবন ও কর্ম আমার একান্ত অভিভাবক থেকে বঞ্চিত হলাম : মাহমুদ মাদানী মানসুরপুরীর ইন্তেকালে জাতীয় কওমী মাদরাসা শিক্ষাবোর্ডের গভীর শোক প্রকাশ দেওবন্দের কার্যনির্বাহী মুহতামিম সাইয়েদ কারী মাওলানা উসমান মানসুরপুরী আর নেই

ধৈর্যের মহাপরীক্ষা রমজানে

ধৈর্যের মহাপরীক্ষা রমজানে

সৈয়দ আনোয়ার আবদুল্লাহ

মাহে রমজান বিশেষভাবে সবর ও ধৈর্যের মাস। হাদিস শরিফে এসেছে : নবী করিম (সা.) বলেছেন, ‘রমজান সবরের মাস, আর সবরের প্রতিদান জান্নাত।’ (বায়হাকি)রমজান মাস শিক্ষা দেয়, কীভাবে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে সহনশীলতা ও সবরের মাধ্যমে একটি সুশৃঙ্খল জীবন প্রতিষ্ঠিত করা যায়।

যেকোনো কাজে আমাদের দৈনন্দিন জীবনে অনেক কঠিন বাস্তবতা রয়েছে, যেখানে সবর ও নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করা খুবই প্রয়োজন। কঠিন অনেক সমস্যার সমাধান হচ্ছে ধৈর্য ও সবর। ইরশাদ হয়েছে, ‘তোমরা সবর ও নামাজের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা করো।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ১৫৪)

তাফসীরে মাআরিফুল কুরআনে মুফতি শফী র. বলছেন, ‘সবর’ শব্দের অর্থ হচ্ছে সংযম অবলম্বন ও নফস এর উপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ লাভ করা। কুরআন ও হাদীসের পরিভাষায় এ ‘সবর’ এর রয়েছে তিনটি শাখা।

এক. নফসকে সকল প্রকার হারাম এবং নাজায়েয বিষয়াদি থেকে বিরত রাখা,

দুই. নফসকে আল্লাহর এবাদত ও আনুগত্যে বাধ্য করা,

তিন. যেকোন বিপদ ও সংকটে ধৈর্যধারণ করা। অর্থাৎ যেসকল বিপদাপদ এসে উপস্থিত হয়, সেগুলোকে আল্লাহর বিধান বলে মেনে নেওয়া এবং এর বিনিময়ে আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রতিদান প্রাপ্তির আশা করা।

তীব্র গরমে আর বড় দিনে রোজা রাখাতে খুবই ধৈর্যের পরিচয় দিতে হয়। ধরমার না করা, গিবত না করা, সেহরি খেতে না পারলে সহ্য করা, দৃষ্টির হেফাজত, অন্তরের হেফাজত, পানাহার থেকে বিরত থাকা, কামনা-বাসনা থেকে বিরত থাকা ইত্যাদি ক্ষেত্রে ধৈর্যধারণ করা অত্যন্ত জরুরি রোজার পবিত্রতার জন্য।রমজান মাসের প্রতিটি সময় প্রতিটি মুহূর্ত মহামূল্যবান এবং দামি। তাই আমাদের উচিত এ মহান মাসের প্রতিটি সময় ও ক্ষণ অত্যন্ত ধৈর্য ও সহনশীলতার সঙ্গে ব্যবহার করা।

প্রকৃতপক্ষে এক মাসের সিয়াম সাধনা মানুষের সারা বছরের নানাবিধ গর্হিত ও নাজায়েয কাজ, পার্থিব ঝুট ঝামেলা ও প্রবৃত্তির নানা লোভ-লালসার মোহে আচ্ছন্ন যাবতীয় কুচিন্তা, শয়তানী ওয়াস্ওয়াসা, সকল পাপাচারমূলক আচরণ ও এর অনুভূতিকে পুড়িয়ে ফেলার এক কার্যকর অনুশীলন। শরীয়তের যাবতীয় বিধি-বিধান মেনে আন্তরিকতার সাথে মাস ব্যাপী এ সিয়াম সাধনা দ্বারা একজন ব্যক্তি সত্যিকার অর্থে আত্মশুদ্ধির মাধ্যমে তার পাশবিক প্রবৃত্তিকে সংযত ও অবদমিত করতে এবং আত্মিক শক্তিকে জাগ্রত ও বিকশিত করতে সক্ষম হয়।

রমজানের সিয়াম ‘সবর’ এর উল্লিখিত তিন শাখার উপরই মানুষকে অভ্যস্থ বানায় বলে সে অনেক সুযোগ-সুবিধা থাকার পরও কিংবা নির্জনে পানাহার বা ইন্দ্রিয়তৃপ্তির মত সিয়ামের পরিপন্থী আচরণের সুযোগ পেয়েও তেমন আচরণের সাহস করেনা। কেননা তার বিশ্বাস, সে সর্বত্র-সর্বদা আল্লাহর দৃষ্টিসীমার মধ্যেই রয়েছে। কোন হারাম ও নাজায়েয কাজে লিপ্ত হলে বা তাঁর আদেশ লংঘনে তিনি শাস্তি দিতে পারেন। তাই আল্লাহর আদেশ লংঘনের দুঃসাহস সে দেখায়না। আত্মশুদ্ধির মাধ্যমে মানুষকে সংযত বানানোর ক্ষেত্রে সিয়াম সাধনা যে কতখানি প্রশিক্ষকের ভূমিকা পালন করে, তা রোজার বিধি-বিধানের দিকে তাকালে সহজেই অনুধাবন করা যায়।

ধৈর্যধারণকারীর সাফল্য সুনিশ্চিত কারণ আল্লাহ তাআলা ধৈর্যধারণকারীর সঙ্গে থাকেন; আর আল্লাহ রাব্বুল আলামিন যার সঙ্গে থাকবেন তার সফলতা অবধারিত। কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে মুমিনগণ! ধৈর্য ও সালাতের মাধ্যমে তোমরা সাহায্য প্রার্থনা করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সঙ্গে আছেন।’ (সুরা-২ বাকারা, আয়াত: ১৫৩)।

সবর না থাকার কারণে মানুষ অনাকাঙ্ক্ষিত বহু সমস্যার সম্মুখীন হয়ে পড়ে। অনেক সময় কারণে-অকারণে ধৈর্যচ্যুতি ঘটে, মেজাজ খারাপ হয়ে যায়। রোজা রেখে যেন ধৈর্যের বাঁধ না ভাঙে, সে জন্য নবী করিম (সা.) আমাদের সতর্ক করে দিয়েছেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘রোজা হচ্ছে ঢালস্বরূপ। যখন তোমাদের কেউ রোজা থাকে, সে যেন অশ্লীল কথাবার্তা না বলে এবং মূর্খের মতো কাজ না করে। কেউ যদি তাকে গালি দেয় বা ঝগড়া-বিবাদে লিপ্ত হয়, তাহলে সে যেন বলে, আমি রোজাদার, আমি রোজাদার।’ (বুখারি, হাদিস : ১৯০৪; মুসলিম, হাদিস : ১১৫১)

মুমিনের ধৈর্যের প্রয়োজন জীবনের সব ক্ষেত্রে, বিপদ-আপদে, মুসিবত, কষ্ট ও জটিলতায়। মুমিন ব্যক্তি বিশ্বাস করে, যত সংকটই আসুক না কেন, সব আসে আল্লাহর পক্ষ থেকে। ফলে সে বিপদে পড়েও ক্ষোভ, হতাশা ও অস্থিরতা প্রকাশ করে না। নিজের ভাষা ও আচরণ সংযত রাখে। কারণ সে আল্লাহর প্রতি গভীরভাবে বিশ্বাসী। সে তকদিরে বিশ্বাস করে। তকদিরে বিশ্বাস করা ঈমানের ছয়টি স্তম্ভের একটি। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘…আল্লাহর হুকুম ছাড়া কোনো বিপদ আসে না। আর যে আল্লাহর প্রতি ঈমান আনে তিনি তার অন্তরকে সঠিক পথের সন্ধান দেন।’ (সুরা : তাগাবুন, আয়াত : ১১)

কোনো ব্যক্তি যদি উপরিউক্ত অর্থে ধৈর্য অবলম্বন করেন; তবে তাঁর জীবনে পূর্ণতা ও সফলতা অনস্বীকার্য। কারণ প্রথমত, অন্যায় অপরাধ তথা পাপ কাজ থেকে বিরত থাকা সকল প্রকার অকল্যাণ ও গ্লানি থেকে রক্ষা পাওয়ার একমাত্র উপায়। দ্বিতীয়ত, ইবাদত ও সত্কর্ম সম্পাদন করা সফলতার একমাত্র সোপান। তৃতীয়ত, প্রতিকূল পরিস্থিতিতে দৃঢ় ও অবিচল থাকা লক্ষ্যে পৌঁছার একমাত্র মাধ্যম। সুতরাং ‘সবর কামিল’ বা পরিপূর্ণ ধৈর্যই মানবজীবনকে পূর্ণতা দিতে পারে। আমাদের উচিত সকল অনভিপ্রেত অবস্থায়, যেকোনো অযাচিত পরিবেশ ও অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতিতে নিজেকে সংযত রেখে দৃঢ়তার সঙ্গে লক্ষ্য পানে এগিয়ে যাওয়া। তবেই আল্লাহর সাহায্য আমাদের সাথি হবে, আল্লাহ আমাদের সঙ্গী হবেন।

রমজানে রোজা, সাহরি, ইফতার, তারাবি, তিলাওয়াত ও ইতিকাফ এবং জাকাত, সদকাসহ ইবাদত-বন্দেগির মাধ্যমে আমরা তিন প্রকার ধৈর্যের পরিপূর্ণ অনুশীলন করতে পারি।

ঈমানদারের জন্য বিপদ-মুসিবত নিয়ামতস্বরূপ। কারণ এতে গুনাহ মাফ হয়। বিপদে ধৈর্য ধারণ করলে তার প্রতিদান পাওয়া যায়। মুমিন বিপদে পড়লে আল্লাহর কাছে বেশি বেশি কান্নাকাটি করে। আল্লাহর কাছে নিজের অভাব ও অসাহয়ত্বের কথা তুলে ধরে। সৃষ্ট জীব থেকে বিমুখ হয়ে এক আল্লাহর দিকে ফিরে আসে।

Facebook Comment





© All rights reserved © 2020 TabligNewsBD.Com
Design & Developed BY PopularServer.Com