শনিবার, ১২ Jun ২০২১, ১০:৫৯ পূর্বাহ্ন

সংবাদ শিরোনাম ::
চলতি মাসেই চালু হচ্ছে ৫০ মডেল মসজিদ অনলাইনে বিভিন্ন গ্রুপ ও পেইজ এডমিনদের নিয়ে মাশোয়ারার  বাংলাদেশে আরবি বিস্তারের মহানায়ক আল্লামা সুলতান যওক নদভী (দা.বা) দেওবন্দে গেলেন হযরতজী মাওলানা সাদ কান্ধলভী দা.বা. মনসুরপুরীকে নিয়ে সাইয়্যেদ সালমান হুসাইনি নদভির স্মৃতি চারণ আল্লামা ক্বারী উসমান মানসুরপুরীর ইন্তেকালে বিশ্ববরেণ্য আলেমদের শোক আমীরুল হিন্দ আল্লামা ক্বারী উসমান মানসুরপুরীঃ জীবন ও কর্ম আমার একান্ত অভিভাবক থেকে বঞ্চিত হলাম : মাহমুদ মাদানী মানসুরপুরীর ইন্তেকালে জাতীয় কওমী মাদরাসা শিক্ষাবোর্ডের গভীর শোক প্রকাশ দেওবন্দের কার্যনির্বাহী মুহতামিম সাইয়েদ কারী মাওলানা উসমান মানসুরপুরী আর নেই

রমজানে জবানকে সংযত রাখি

রমজানে জবানকে সংযত রাখি

সৈয়দ আনোয়ার আবদুল্লাহ

রোজাদারের জবানও যেন রোজা থাকে এটা নিশ্চিত করা রমজানের অনেক বড় ইবাদত। জবানকে যাবতীয় অন্যায় ও মন্দ কথা বলা থেকে সংযত রাখা। জবান দ্বারা মিথ্যা কথা, চোগলখুরি, গিবত, কটূ বাক্য, অনৈতিক ও অশ্লীল কথা ইত্যাদি যেন বের না হয়- সেদিকে খেয়াল রাখা।

মিথ্যাকে সকল পাপের মূল বলা হয়েছে। রোজাদারকে অবশ্যই মিথ্যা কথা পরিহার করতে হবে। একজন মুসলমান অপর মুসলমানকে হাত ও মুখদ্বারা কষ্ট দিতে পারে না। হাদিসে আছে, সেই প্রকৃত মুসলিম যার জবান ও হাত দ্বারা অপর মুসলিম নিরাপদ থাকে।

ঝগড়া করা মুমিনের কাজ নয়। বিশেষত রোজাবস্থায় এটি মোটেও শোভনীয় নয়। হাদিসে আছে, রোজা মানুষের জন্য ঢালস্বরূপ। সুতরাং যখন কারও রোজার দিন আসে তখন সে অশ্লীল কথা-বার্তা ও ঝগড়া করবে না। তাকে যদি কেউ কটূ কথা বলে অথবা তার সাথে লড়াই করতে চায়- তখন সে যেন তাকে বলে, আমি রোজাদার। এ বলে ঝগড়া থেকে বিরত থাকবে। (সহিহ বোখারি ও সহিহ মুসলিম)

গিবত একটি সমাজ গর্হিত অনৈতিক কাজ। এতে সমাজের মানুষের মধ্যে ভ্রাতৃত্ববোধ নষ্ট হয়। এটি একে অপরকে বিদ্বেষ ভাবাপন্ন করে তোলে। পরিণতিতে একে অপরে মারামারি-কাটাকাটিতে জড়িয়ে পড়ে। ইসলামি শরিয়তে এটি চরমভাবে নিন্দিত। হাদীসে আছে গীবত জিনার চেয়েও মারত্মক, এখন রমজান মাসে রোজা রেখে গিবত করলে বিষয়টি কতোটা ভয়াবহ পরিনাম হতে পারে সহজেই অনুমেয়।

নবী করিম (সা.)-এর যুগে দু’জন নারী রোজা রেখে ক্ষুধায় কাতর হয়ে পড়ে। তাদের মৃতপ্রায় অবস্থা দেখে সাহাবিরা নবী করিম (সা.)-এর নিকট তাদের বিষয়টি জানতে চাইলেন। নবী করিম (সা.) তাদের (মহিলা) কাছে একটি পেয়ালা পাঠিয়ে বললেন, তারা যেন এতে বমি করে। বমি করার পর দেখা গেল তাতে গোশতের টুকরা ও তাজা রক্ত। এর কারণ ব্যাখ্যা করে হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন, তারা হালাল রুজি দ্বারা রোজা রেখেছে বটে কিন্তু গিবত করে হারাম ভক্ষণ করেছে।

আমাদের হযরতজী মাওলানা সাদ কান্ধলভী বলেন, এটি কথার কথা নয়। রাসুল রোজাদার দুইজনকে বমি করিয়েছেন। আর বাস্তবেই তাদের মূখ থেকে গোশত এসেে।  এটি কথার কথা নয়। গীবত করা মৃত ব্যক্তির গোশত ভক্ষণ করা এটি ইয়াকীনী।

আল্লাহতায়ালা গিবতকে আপন মৃত ভাইয়ের গোশত খাওয়ার সাথে তুলনা করে সূরাতুল হুজুরাতের ১১ নম্বর আয়াতে বলেন, ‘তোমাদের কেউ যেন অপরের গিবত না করে। তোমাদের কেউ কি অপর মৃত ভাইয়ের গোশত খাওয়া পছন্দ করবে? এটা তোমরা ঘৃণা করবে। তোমরা আল্লাহকে ভয় করো। আল্লাহ তওবা কবুলকারী এবং অতীব দয়াবান।’

একদা হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.) কয়েকজন লোককে দাঁত খিলাল করতে বললেন। তারা বলল, আমরা তো আজ গোশত খাইনি। নবী করিম (সা.) বললেন, অমুকের গোশত তোমাদের দাঁতে বিদ্ধ হয়েছে। (পরে জানা গেল, তারা সেই লোকের গিবত করেছিল।

রমজান মাসের রোজার ফজিলত অর্জন করতে হলে একজন মুমিনকে অবশ্যই গিবত পরিত্যাগ করতে হবে। ইসলাম মনে করে, শুধুমাত্র রমজান মাসেই গিবত পরিত্যাগ করবে তা নয় বরং রমজান মাসে এটি পরিত্যাগের চর্চা করে পরবর্তী ১১ মাসে তথা সারা জীবনে তা বাস্তবায়ন করবে।

রমজানে তাকওয়ার গুণ অর্জনের জন্য চোখের হেফাজত ও অন্যান্য আমলের সঙ্গে জবান (মুখে কথা বলা) সংযত রাখার গুরুত্ব অপরিসীম। মনের ভাব থেকে শুরু করে যাবতীয় বিষয় জবানের মাধ্যমে আমরা প্রকাশ করে থাকি। কিন্তু আফসোসের বিষয় হলো, দামি এ নেয়ামতের কদর আমাদের কাছে নেই। ফলে আমরা এর অপব্যবহার করেই চলছি। আমাদের চারপাশের বাকশক্তিহীন মানুষেরা বুঝে জবান কত বড় নেয়ামত।

এই জবানকে আমরা দাওয়াতি কাজে ব্যাবহার করি। উম্মতকে তাওহিদ রেসালাত ও আখেরাতের কথা বলে বলে জাহান্নাম থেকে বাঁচাই। আমার জবান হাজারো বনি আদমের নাজাতের জড়িয়া হতে পারে।

হজরত আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণনা করেন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, যে ব্যক্তি আল্লাহ তায়ালা ও পরকালের প্রতি ঈমান রাখে সে যেন উত্তম কথা বলে অথবা চুপ থাকে। (বুখারি : হাদিস ৫৫৯৩)।

মুহাদ্দিসগণ বলেন, হাদিসটিতে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সব ধরনের অনর্থক ও অশ্লীল কথাবার্তা থেকে বিরত থাকার নির্দেশনা ও কল্যাণকর কথারল বলার প্রতি উৎসাহ দিয়েছেন। সুতরাং জবানের প্রতি সতর্ক দৃষ্টি রাখা প্রয়োজন যেন এর দ্বারা গুনাহ না হয়ে যায়। জবানের নেয়ামত দেয়া হয়েছে দাওয়াতের মেহনতের জন্য। যেন আল্লাহ ভুলা মানুষকে এই জবান দিয়ে আল্লাহর সাথে পরিচয় করিয়ে দিতে পারি।

জবানের হেফাজত এত বড় আমল যার বিনিময়স্বরূপ রসুলুল্লাহ (সা.) জান্নাতের জিম্মাদারি হয়ে যান, হজরত সাহল ইবনে সাদ (রা.) থেকে বর্ণিত। রসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি তার দুই চোয়ালের মধ্যবর্তী বস্তু, অর্থাৎ জিহ্বা এবং তার দুই ঊরুর মধ্যবর্তী তথা লজ্জাস্থানের জিম্মাদার হবে আমি তার জন্য জান্নাতের জিম্মাদার হব। (বুখারি)। জবানের হেফাজত না করার কারণে জাহান্নাম ঠিকানা হতে পারে, যেমনিভাবে হজরত আবু সাইদ খুদরি (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, হজরত মুয়াজ ইবনে জাবাল (রা.) একবার বললেন, হে আল্লাহর রসুল! আমরা যা বলি তা নিয়ে কি আমাদের পাকড়াও করা হবে? তখন রসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, হে মুয়াজ! জবানের হেফাজত না করার কারণে মানুষকে উপুড় করে জাহান্নামের আগুনে নিক্ষেপ করা হবে। (তিরমিজি, ইবনে মাজাহ)।

জবান দামি সম্পদ। এর সঠিক ব্যবহার করা চাই। একজন জাহান্নামি কাফের জবান দিয়ে কালিমা উচ্চারণ করে মুসলমান হলে সঙ্গে সঙ্গে তার জীবনের সব গুনাহগুলো মাফ হয়ে যায়। আল্লাহর অভিসম্পাতে অভিশপ্ত এ ব্যক্তি জবানের কারণেই রহমতপ্রাপ্ত জান্নাতি বান্দাদের তালিকাভুক্ত হয়।

আমার জবানের একটি কথা একজন মানুষের জীবন বদলে দিতে পারে। এজন্য আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, ‘তার কথার চেয়ে কার কথা উত্তম হতে পারে যে মানুষকে আল্লাহর দিকে দাওয়াত প্রদান করে।

জবানকে আল্লাহর বড়ত্ব বলে বলে সতেজ রাখা চাই। হাদিসে এসেছে, কোনো ঈমানদার যখন ‘সুবহানাল্লাহ’ বলে এর দ্বারা মিজানের পাল্লা অর্ধেক ভরে যায়। বুখারি শরিফের শেষ হাদিসে হজরত আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণনা করেন, বিশ্নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, দুটি কালিমা যা দয়াময় আল্লাহর নিকট খুব প্রিয়! উচ্চারণে অতি সহজ তবে মিজানের পাল্লায় অধিক ভারী, তা হলো ‘সুবহানাল্লাহি ওবি হামদিহী সুবহানাল্লাহিল আজিম।’ অনুরূপভাবে জবান দ্বারা বেশি বেশি কোরআন তেলাওয়াত ও দ্বীনি জ্ঞান চর্চা করা চাই।

হজরত উকবা ইবনে আমের (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি বললাম, হে আল্লাহর রসুল! নাজাত পাওয়ার উপায় কী? তিনি জবাব দিলেন, তোমার কথাবার্তা সংযত রাখো, তোমার ঘর প্রশস্ত কর (মেহমানদারি করা) এবং তোমার কৃত অপরাধের জন্য আল্লাহর কাছে কান্নাকাটি কর। (তিরমিজি)। হজরত আবু সাইদ খুদরি (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, সকালে মানুষ যখন ঘুম থেকে ওঠে, তখন তার দেহের সব অঙ্গপ্রত্যঙ্গ জিহ্বাকে অনুনয়-বিনয় করে বলে, তুমি আমাদের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় কর। কেননা, আমরা তোমার সঙ্গে সম্পৃক্ত। তুমি যদি সঠিক পথে থাকো, আমরাও সঠিক পথে থাকতে পারি। আর তুমি যদি বাঁকা পথে চল তাহলে আমরাও বাঁকা পথে যেতে বাধ্য। (তিরমিজি)।

সুনান ইবনে মাজায় রয়েছে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, অনেক মানুষ জবানের গুনাহের কারণে জাহান্নামে যাবে। (হাদিস ৩৯৭৩)। সুতরাং মিথ্যা, গিবত, চোগলখোরী, অশ্লীল কথাবার্তা ইত্যাদি অবশ্যই পরিত্যাগ করা দরকার। আবু বকর সিদ্দীক (রা.) একবার জিহ্বা টেনে ধরে বসেছিলেন এবং তা মোচড়াচ্ছিলেন। লোকেরা জিজ্ঞাসা করল আপনি এমনটি কেন করছেন? তিনি উত্তর দিলেন এ জিহ্বাই আমাকে মহা বিপর্যয়ের মধ্যে ফেলে দিয়েছে। সুতরাং একে নিয়ন্ত্রণ করা দরকার। আরেক বর্ণনায় এসেছে তিনি মুখে কংকর এঁটে বসেছিলেন যেন জবান থেকে অনর্থক কথা বের না হয়।

হজরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) থেকে বর্ণিত। রসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যখন কোনো বান্দা মিথ্যা বলে তখন এর দুর্গন্ধে ফেরেস্তারা তার কাছ থেকে এক মাইল দূরে চলে যায়। (তিরমিজি)। অন্য হাদিসে হজরত মুয়াবিয়া বিন হাইদাহ (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রসুলুল্লাহ (সা.)-কে বলতে শুনেছি, দুর্ভোগ তার জন্য, যে লোকদের হাসানোর উদ্দেশ্যে মিথ্যা (গল্প বানিয়ে) বলে। দুর্ভোগ তার জন্য, দুর্ভোগ তার জন্য (আবু দাউদ)

জবান থেকে কখনও এমন কথা বের হয় যা দ্বারা অন্যের হৃদয়ে গভীর ক্ষতের সৃষ্টি হয়। দুনিয়াতে তলোয়ারসহ অন্যান্য ধারালো অস্ত্রের আঘাতের জন্য বিভিন্ন প্রতিষেধক আছে অর্থাৎ তা নিরাময়যোগ্য কিন্তু কথার দ্বারা যে আঘাত দেওয়া হয় তা নিরাময়ে কোনো প্রতিষেধক নাই। আল্লাহ তায়ালা কোরআনে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে উদ্দেশ্য করে বলেন, আল্লাহর রহমতে আপনি তাদের প্রতি কোমল হৃদয় হয়েছেন, যদি আপনি কর্কশভাষী ও কঠিন হৃদয় হতেন তবে তারা আপনার কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যেত। (সুরা আলে ইমরান : আয়াত ১৫৯)। আয়াতে কারীমা দ্বারা বোঝা যায় কোমল হৃদয় ও মিষ্টভাষী হওয়া আল্লাহর রহমত প্রাপ্তির লক্ষণ। যেটা অর্জনে সবারই চেষ্টা করা উচিত।

রোজা রেখে মিথ্যা, গিবত, পরনিন্দাসহ অশ্লীল কথাবার্তা ও ঝগড়া থেকেও রিবত থাকাও জরুরি। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘রোজা অবস্থায় তোমাদের কেউ যেন অশ্লীল কথা না বলে এবং শোরগোল, হট্টগোলে লিপ্ত না হয়। বরং যদি কোনো ব্যক্তি কোনো রোজাদারের সঙ্গে গালিগালাজ বা মারামারি-কাটাকাটিতে লিপ্ত হতে চায় তবে সে যেন (অনুরূপ আচরণ না করে) বলবে, আমি রোজাদার।’

অন্য হাদিসে প্রিয়নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি রোজা অবস্থায় মিথ্যাচার ও মন্দ কাজ ত্যাগ করেনি তার পানাহার ত্যাগে আল্লাহর কোনো প্রয়োজন নেই।’ (বুখারি)

উল্লেখিত হাদিসের আলোকে বুঝা যায় যে, রোজা অবস্থায় মারামারি ও ঝগড়াঝাটি তো দূরের কথা, শোরগোল করাও রোজার আদব পরিপন্থী। আর এ সব কাজ জবান দ্বারা হয়ে থাকে। আল্লাহ তায়ালা এই পবিত্র রমজান মাসে আমাদেরজে জবানের হেফাজত করার তাওফিক দান করুন৷ আমীন

Facebook Comment





© All rights reserved © 2020 TabligNewsBD.Com
Design & Developed BY PopularServer.Com