বৃহস্পতিবার, ২১ জানুয়ারী ২০২১, ০২:০৮ অপরাহ্ন

তাবলীগ পরিচালনায় প্রশ্নবিদ্ধ হাইয়াতুল উলিয়া | শিক্ষাবোর্ডের কাজ কি?

তাবলীগ পরিচালনায় প্রশ্নবিদ্ধ হাইয়াতুল উলিয়া | শিক্ষাবোর্ডের কাজ কি?

সিনিয়র ষ্টাফ রিপোর্টার | তাবলীগ নিউজ বিডিডটকম | কওমী সনদের সরকারি স্বীকৃতির জন্য দেশের শীর্ষ পাঁচটি কওমী মদারাসা শিক্ষাবোর্ড নিয়ে শিক্ষামন্ত্রনালয়ের তত্বাবধানে গঠিত হয় ‘হাইয়াতুল উলিয়া লিল জামিয়াতিল কওমিয়া বাংলাদেশ।’ শুরু থেকেই বোর্ডের দ্বায়িত্বশীলদেরকে রাজনীতিমুক্ত রাখার কথা বলা হলেও হেফাজত নেতাদের পাশাপাশি ২৩ দলীয় জোটের শরীক জমিয়ত, খেলাফত মজলিস নেতাদের আধিপত্যের কারণে ‘হাইয়াতুল উলিয়া লিল জামিয়াতিল কওমিয়া’কে বারবার বিতর্কিত ও প্রশ্নবিদ্ধ করা হচ্ছে। এসব কারণে শুরু থেকেই কওমী সনদ স্বীকৃতির প্রধাণ কারিগর ও রূপকার আল্লামা ফরীদ উদ্দীন মাসউদ হাইয়াতুল উলিয়ার সকল ঘরোয়া বৈঠক বর্জন করে আসছেন।

সম্প্রতি সময় তাবলীগ নিয়ন্ত্রণে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশকে অপব্যবহার করে চরমভাবে ব্যর্থ ও বিতর্কিত হওয়ার পর হেফাজত নেতারা এখন তাবলীগ ইস্যুতে ‘হাইয়াতুল উলয়া’র ঘাঁড়ে সওয়ার হয়েছেন। এর দ্বারা একদিকে সরকারের উপর প্রভাব সৃষ্টি এবং অপরদিকে সকল কওমী মাদরাসার আলেমদের ইমোশনাল ব্যাকমেইলিং করা হচ্ছে। কিন্তু সর্বমহলে আজ প্রশ্ন, কেন ‘হাইয়াতুল উলিয়া’কে বিতর্কিত ও প্রশ্নবিদ্ধ করা হচ্ছে? শিক্ষাবোর্ডের কাজ কি?

তালেবে ইলমের স্বার্থ আদায় ও শিক্ষাবোর্ডের শিক্ষাসংক্রান্ত যাবতীয় কার্যক্রম পরিচালনা করাই ‘হাইয়াতুল উলয়া’ প্রতিষ্ঠার মূল উদ্দেশ্য। পাশাপাশি বিদেশে পড়ালেখার সুযোগসৃষ্টি এবং দেওবন্দে পড়ার শিক্ষাভিসা প্রদান করবে এই নবগঠিত শিক্ষাবোর্ড, এমনটিই প্রত্যাশা করে আসছে কওমীর লাখ লাখ শিক্ষার্থীর। কিন্তু তাবলীগ নিয়ে যে কাজ দেওবন্দও করেনি তা যদি ‘হাইয়াতুল উলিয়া’ করে থাকে তাহলে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দেওবন্দের যে মূলনীতির উপর এই বোর্ড গঠন করেছিলেন তা থেকে বোর্ডকে নীতিভ্রষ্ট করার জন্য কাজ করে চলছে একটি বিশেষ মহল।

সর্বশেষ গত ৪ নভেম্বর ‘হাইয়াতুল উলিয়া’র উদ্দ্যোগে আয়োজিত মাননীয় প্রধানমন্ত্রী কওমী জননী শেখ হাসিনার শুকরিয়া মাহফিলে সিদ্ধান্ত হয়, কওমী সনদের স্বীকৃতির বাহিরে চলমান বিতর্কিত কোন বক্তৃতা যেন না দেয়া হয়। কিন্তু বেফাক মহাসচিব মাওলানা আব্দুল কদ্দুস ও রাজাকারপুত্র মাওলানা আজহার আলী আনোয়ার শাহ ঠিকই তাবলীগ ও মাওলানা সা’দ কান্ধলভীকে নিয়ে বিতর্কিত বক্তব্য দিয়ে তাবলীগ নিয়ন্ত্রনে নিজেদের ব্যর্থতার দায় স্বীকার করে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করেন।

এর ২ দিন আগে মঙ্গলবার (৩০ অক্টোবর) সকাল ১০ টায় মতিঝিলের পীরজঙ্গী মাদরাসায় অনুষ্ঠিত ‘হাইআতুল উলইয়া’র শুকরানা মাহফিলের প্রস্তুতি সভায় সিদ্ধান্ত নেয়া হয়, বাংলাদেশ কওমি মাদরাসা শিক্ষাবোর্ড বেফাকের অন্তর্ভুক্ত কোনো মাদরাসা তাবলীগের চলমান দ্বন্দ্বের মুহূর্তে মাওলানা সা’দের সঙ্গে ঐক্যমত পোষণ করলে সে মাদরাসাকে বেফাক থেকে বহিস্কার করা হবে বলে জানিয়েছেন মাওলানা মাহফুজুল হক। বেফাকের সহকারী মহাসচিব ও জামিয়া রাহমানিয়ার প্রিন্সিপাল মাওলানা মাহফুজুল হক বলেন, উলামায়ে কেরামের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে কোন মাদরাসার মুহতামিম যদি মাওলানা সাদ কান্ধলভীর অনুসরণ করে তাহলে প্রথমে তাকে বোঝানো হবে এবং অবস্থান পরিবর্তনের সুযোগ দেয়া হবে। এতেও তিনি ফিরে না এলে বেফাক থেকে সে মাদরাসাকে বহিস্কার করা হবে। কিন্তু শুকরিয়া মাহফিলে দুই বক্তা মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে বলেন ‘হাইয়াতুল উলিয়া’ ৬ বোর্ড মিলে এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছে। যদিও মাওলানা ফরীদ উদ্দীন মাসউদ এর বোর্ড স্পষ্ট জানিয়েছে তারা এমন কোন সিদ্ধান্ত নেয় নি। আর ‘হাইয়াতুল উলিয়া’ এমন সিদ্ধান্ত নিলে সেটি আত্মঘাতী হবে। তাবলীগের মূলধারার সাথীরা তখন বাধ্য হবেন নিজেদের মাদরাসাগুলোকে একত্র করে আরেকটি শিক্ষাবোর্ড গঠন করার।

গত বৃহস্পতিবার বিশ্বব্যাপী পরিচালিত মুসলিমদের অরাজনৈতিক ধর্মীয় সংঘ তাবলিগ জামাত পরিচালনার জন্য ২৪ সদস্যের পরিচালনা কমিটি গঠন করা হয়েছে। ‘হাইয়াতুল উলিয়া’র কো-চেয়ারম্যান মাওলানা আশরাফ আলীকে এই পরিচালনা কমিটির আহবায়ক করা হয়েছে।

বৈঠক সূত্রে জানা যায় যে, গত ১০ ডিসেম্বর হাটহাজারী মাদরাসায় অনুষ্ঠিত বৈঠকে গৃহীত সিদ্ধান্তের আলোকে এই কমিটি গঠন করা হয়। গত বুধবার সকালে ঢাকার যাত্রাবাড়ীতে অবস্থিত বেফাক অফিসে এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠক সূত্রগুলো জানায়, তাবলিগ জামাত পরিচালনার জন্য গঠিত কমিটির ২৪ সদস্যদের মধ্যে ৭ জনকে রাখা হয়েছে কাকরাইলের বিদ্রোহী মুরুব্বী থেকে। নয় জন হাইআতুল উলিয়ার অংশিদার ৫ বোর্ড থেকে নেয়া হতে পারে। আর অধিকাংশরা বেফাক থেকে থাকবেন। বৈঠকসূত্র ও কয়েকটি ইসলামপন্থী অনলাইন নিউজ পোর্টাল এমন সংবাদ প্রকাশ করেছে। তবে আল্লামা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদের নেতৃত্বাধীন বেফাকুল মাদারিসিদ দ্বীনিয়া বাংলাদেশ-(জাতীয় দ্বীনী মাদরাসা শিক্ষা বোর্ড) এর কোনো প্রতিনিধি রাখা হয়নি কমিটিতে।

তাবলীগ জামাতের ১শ বছরের ইতিহাসে তাবলীগ নিয়ন্ত্রণে এরকম কোন কমিটি পৃথিবীর কোন দেশে আজ পর্যন্ত কেউ করেনি বলেই জানিয়েছেন তাবলীগের মূলধারার মুরুব্বীগণ। তারা মনে করছেন, হেফাজত নেতাদের রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষ থেকেই এই কমিটি গঠন, যা নিতান্তই উদ্ভট ও হাস্যকর ছেলেমানুষী। নতুবা এর পেছনে আন্তর্জাতিক ইসলাম বিরোধী শক্তির যোগসূত্র আছে কিনা খাতিয়ে দেখা দরকার। এতে করে আরেকটু স্পষ্ট প্রমাণিত হল, তাবলীগের শ্বাসত নিয়ম ও উসুল থেকে তারা বেরিয়ে রাজনৈতিক খপ্পরে পড়েছেন তাবলীগের মূলধারা থেকে বিচ্যুত গোটি কয়েক বিদ্রোহীরা। সরকার ও সাধারণ কওমী মাদরাসার আলেমদের বিভ্রান্ত করতেই তাবলীগ পরিচালনায় শিক্ষামন্ত্রণালয় কতৃক গঠিত শিক্ষাবোর্ড ‘হাইয়াতুল উলিয়া’ ও সর্বজন শ্রদ্ধেয় অশতিপর বৃদ্ধ অসুস্থ আহমদ শফী সাহেবের নাম বারবার ব্যবহার করছেন রাজনৈতিক নেতারা। এরদ্বারা প্রশ্নবিদ্ধ ও কলংকিত করা হচ্ছে নবগঠিত এই শিক্ষাবোর্ডকে।

কেন এই কমিটি গঠন অযৌক্তিক?

কমিটি গঠনের পর থেকেই পক্ষে-বিপক্ষে তুমুল আলোচনা-সমালোচনা সৃষ্টি হয়েছে। এ নিয়ে দারুল উলূম উত্তরার প্রতিষ্ঠাতা, তরুণ মুবাল্লিগ মাওলানা মু’আয বিন নূর বলেনঃ

চোখের ডাক্তার দিয়ে দাঁতের চিকিৎসা হয় না। আবার দাঁতের ডাক্তার দিয়েও চোখের চিকিৎসা হয় না। দাঁতের ডাক্তার যদি চোখের চিকিৎসা করতে গিয়ে খেই হারিয়ে ফেলে তাহলে পরিস্থিতি কী দাঁড়াবে? দাঁত তোলার আংটা দিয়ে চোখ তোলা ছাড়া আর তো কিছু করার থাকবে না। ঠিক এমনটিই ঘটেছে এই কথিত ‘কমিটি গঠন’এর ব্যপারে। আমরা গো-বেচারা জনগণ ভেবেছি, ডাক্তার মানেই সব বিষয়ে পারদর্শী। আলেম মানেই সব বিষয়ে অভিজ্ঞ। অথচ বিষয়টি সম্পূর্ণ বিপরীত। অনেকেই ‘হাইয়াতুল উলিয়া’ এর নাম ভাঙ্গিয়ে এই ‘কমিটি গঠন’ এর খবরে আনন্দে আত্মহারা হয়ে ভাবছেন, এত এত উলামায়ে কেরাম তাবলীগের নেতৃত্বে চলে আসলে কাজের গতি-প্রকৃতি আরো বেগবান হবে। অথচ এটি চরম গুজামিলী ও ধোঁকাপূর্ণ কথা।

কেননা, আলেম হলেই কেউ সবজান্তা হয়ে যায় না। আলেম হওয়ার পরও ফতোয়া দেওয়ার অধিকার অর্জন করতে হলে কয়েক বছর ‘তাখাসসুস ফিল ফিক্বহ’ পড়তে হয়। কুরআনের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করতে হলে ‘তাখাসসুস ফিত্-তাফসীর’ পড়তে হয়। একটি আশ্চর্যজনক প্রশ্ন হলো, আলেম হওয়ার পরও কি একজন ব্যক্তি নামাজ পড়ানোর উপযুক্ত হয় না? নতুবা তাকে ‘ইমাম প্রশিক্ষণ কোর্স’ করতে হয় কেন? হিফয বিভাগের ভালো উস্তাদ যাচাই করতে হলে কেন ‘হুফফাযুল কুরআন’এর প্রশিক্ষণের কথা প্রশ্ন করা হয়? আলেম হওয়ার পরও মক্তবে ‘আলিফ-বা-তা’ পড়াতে কেন ‘নূরানী ট্রেনিং’ নিতে হয়? এত এত প্রশ্নের উত্তর হলো, ‘দাওরা’ পাশ করার অর্থ হলো, আলেম হওয়ার প্রাথমিক মানদণ্ডে উপনীত হওয়া। এরপর যে যে বিষয়ে পারদর্শী হতে চায় তাকে সে বিষয়ে সাধনা ও প্রশিক্ষণ নিতে হয়। এতটুকুতো সব আলেমই মানেন। মানেন বলেই তো এসব প্রশিক্ষণ কোর্সগুলো উলামায়ে কেরাম দিয়ে টুইটম্বুর হয়ে থাকে।

কওমী শিক্ষাবোর্ড ‘হাইয়াতুল উলিয়া’এর মূলকার্যক্রম হলো, কওমী সনদের মান দেয়া ও কওমী শিক্ষা সংক্রান্ত যাবতীয় কার্যাবলী সম্পাদন করা। যার কার্যপরিধি কেবল এই ছোট্ট বাংলাদেশের গুটিকতক কওমী মাদরাসায় সীমিত। পক্ষান্তরে তাবলীগ জামাতের কাজ হলো, গোটাবিশ্বের সর্বোত্র দাওয়াতের মেহনত পরিচালনা করা। একটি আঞ্চলিক, অপরটি আন্তর্জাতিক। এক্ষেত্রে ‘আঞ্চলিক’ অভিজ্ঞতা দিয়ে আন্তর্জাতিক কার্যক্রম পরিচালনার দৃষ্টান্ত হলো, আঞ্চলিক বাহন রিক্সার চালক দিয়ে আন্তর্জাতিক বাহন উড়োজাহাজ চালানোর মত। যার পরিণতি ঘুরেফিরে ‘১লা ডিসেম্বর ট্রাজেডি’র দিকেই ভবিষ্যতকে বারবার ঠেলে দিতে পারে। এই অবৈধ হস্তক্ষেপের ফলে এদেশে ধর্মীয় সংঘাত আরো উস্কে যেতে পারে। যা একটি শিক্ষাবোর্ডের কাছে আমরা কোনভাবেই আশা করতে পারি না।

তাই একথা তো আজ দ্বিবালোকের মত স্পষ্ট যে, শুধু ‘দাওরা’ পাশ করলেই সবজান্তা বা সর্বদর্শী আলেম হওয়া যায় না। প্রত্যেকের পরিধিই সীমিত। যদি আলেম হওয়ার পরও ছোট ছোট বাচ্চাদেরকে সামান্য ‘আলিফ-বা-তা’ পড়াইতে বিশেষ প্রশিক্ষণ নিতে হয় তাহলে ‘দাওয়াত ও তাবলীগ’ নামে গোটা বিশ্বের সবচেয়ে বড় ইসলামী প্রজেক্ট চালাতে কি কোন বিশেষ প্রশিক্ষণের প্রয়োজন নেই? এই বিশেষ প্রশিক্ষণের নামই হলো ‘আমীরের তত্বাবধানে দাওয়াত ও তাবলীগে ১ সাল (১ বছর) দিয়ে প্রাথমিক ধারণা ও প্রস্তুতি গ্রহণ করা। তারপর মহল্লার নিয়মিত কার্যক্রমে নিবীড় নিমগ্ন থাকা।’ নতুবা বিনা প্রশিক্ষণে এত বড় কাজে হাত দিলে শেষ পরিণতিতে বারবার ‘১লা ডিসেম্বব’ এর পূণরাবৃত্তি ঘটবে। তাই অনাকাঙ্খিত পরিস্থিতি এড়াতে এখনই এই তথাকথিত ‘কমিটি’র বিরুদ্ধে সচেতনতা গড়ে তোলা প্রয়োজন।

সচেতন চিন্তাশীল আলেমরা মনে করছেন, কতিপয় স্বার্থান্বেষী মহল নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্যই মূলত দারুল উলুম দেওবন্দ ও গোটা বিশ্বে তাবলীগের সাথে সংশ্লিষ্ট চার মাজহাবের আলেমদের বৃদ্ধাঙ্গুলী দেখিয়ে হেফাজতের আড়ালে এখন হাইয়াতুল উলিয়া লিল জামিয়াতিল কওমীয়ার নামে বাংলাদেশে তাবলীগ নিয়ন্ত্রণের হীন ব্যর্থ চেষ্টা করে সমাজ ও রাষ্টে ধর্মীয় সংঘাত এবং বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির পায়তারা করছেন। তারা এটিও বলছেন, গুটি কয়েক ব্যক্তির এসব কমিটি গঠন এবং তাবলীগ নিয়ন্ত্রণের উচ্চাভিলাষী খায়েশ কখনো পুরা হবে না, ইনশা আল্লাহ।

Facebook Comment





© All rights reserved © 2020 TabligNewsBD.Com
Design & Developed BY PopularServer.Com