মঙ্গলবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ১২:০৬ পূর্বাহ্ন

অবশেষে মুফতী আমানুল হকের ইসরায়েলী তথ্যের গোমড় ফাঁস

অবশেষে মুফতী আমানুল হকের ইসরায়েলী তথ্যের গোমড় ফাঁস

ষ্টাফ রিপোর্টার, তাবলীগ নিউজ বিডিডটকম | বিগত ১লা ডিসেম্বর টঙ্গীর ময়দানে হেফাজতে ইসলামের সমর্থক মাদরাসার ছাত্রদের সাথে তাবলীগ জামাতের সাথীদের সংঘর্ষের পর নানান গুজব ছড়ানো হয়েছে। এর মধ্যে ২রা ডিসেম্বর ঢাকার ভিক্টোরিয়া পার্ক মসজিদের খতিব ওজাহাতি নেতা মুফতি আমানুল হকের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়। সেখানে তাকে বলতে দেখা যাচ্ছে যে, ভারত থেকে তাকে জানানো হয়েছে, ১লা ডিসেম্বর টঙ্গী ট্রাজেডীর সময় সা’দ সাহেব ইসরায়েলে ছিলেন। ইসরায়েলের গোপন ষড়যন্ত্রের ভিত্তিতেই টঙ্গীতে হেফাযতীদের উপর আক্রমণ চালানো হয়েছে। পাঠকের সামনে সেই বক্তব্য তুলে ধরা হলোঃ

অনুসন্ধানে জানা যায়, ভারতের ভূপাল থেকে শাহনেওয়াজ নামক জনৈক ব্যক্তি জানিয়েছেন, মাওলানা সাদ সাহেব আজ ইসরায়েল থেকে এসেছেন। কোন যাচাই-বাছাই ছাড়া শোনা কথাকে আসমানী প্রত্যাদেশ জ্ঞান করে জনসমক্ষে চালিয়ে দিয়েছেন এই কুখ্যাত ওজাহাতীনেতা আমানুল হক। এই মুফতি আমানুল হক মূলত পাকিস্তানী আলমী শুরাপন্থী কারী জুবায়েরের সবচেয়ে ঘনিষ্ট মূলহোতাদের একজন। ঢাকাতে কারী জুবায়েরের পর তিনিই মূলত বারবার নানান মিথ্যা ও ভুয়া তথ্য দিয়ে উলামায়ে কেরামকে বিভ্রান্ত করেছে।

এরপর থেকে মুফতী আমানুল হকের ভুয়া এই ভিডিও বার্তাটি ব্যাপকভাবে ভাইরাল করেন কথিত ‘জমহুর’ নামক ওজাহাতি আলেমরা। এমনকি কথাটিকে মাঠে ময়দানে ঢালাওভাবে প্রচার করে মাওলানা সাদ কান্ধলভীর সাথে ইহুদীদের যোগসূত্র আছে বলে বয়ান বক্তৃতায় দাবী করতে থাকেন এইসব ‘ওজাহাতী’রা। সিলেট কোর্ট পয়েন্টে আরেক আলেম এরকম জঘন্য মিথ্যা বক্তব্য দিয়ে ছাত্রদের উস্কানী দেন বলে অনুসন্ধানে জানা যায়।

এ বিষয়ে তাবলীগ নিউজ বিডিডটকম এর পক্ষ থেকে উভয় পক্ষের কাছে অনুসন্ধান চালানো হয়। জানা যায়, গত ৩০ নভেম্বর থেকে ৩রা ডিসেম্বর পর্যন্ত ভারতের বুলন্দ শহরে বিশ্বমারকায নিজামুদ্দিনের তত্বাবধানে “আলমী ইজতেমা” অনুষ্ঠিত হয়। ভারতীয় সকল গণমাধ্যমে উক্ত ইজতিমায় ২ কোটি সাধারণ মানুষ ও ৯০ হাজার উলামায়ে কোরামের উপস্থিতির কথা বলা হয়। ঐ চার দিন মাওলানা সা’দ কান্ধলভী বুলন্দ শহর ইজতেমায় মূল বয়ান করেন এবং বিশ্বআমীর হিসাবে পুরো ইজতেমার কার্যক্রম পরিচালনা করেন।

এরপর থেকেই ওজাহাতি আলেমদের এই বানোয়াট কথা, ভুয়া খবর এবং মিথ্যাচারের মূল রহস্য উদঘাটনে তাবলীগ নিউজ বিডিডটকম এর অনুসন্ধানী টিম মাঠে নামে। এর ধারাবাহিক রিপোর্টের প্রথম পর্ব আজকে তুলে ধরা হল।

এই ইসরায়েলী তথ্যের মূলনায়ক ঢাকার ভিক্টোরিয়া পার্ক মসজিদের খতিব ‘ওজাহাতি’ নেতা মুফতি আমানুল হকের সাথে এ নিয়ে সেদিন রাতেই কথা বলেন, তাবলীগ নিউজ বিডিডটকম এর অতিথি রিপোর্টার সাংবাদিক আব্দুল্লাহ শাকিল। তা হুবহু পাঠকের সামনে তুলে ধরা হল। পাঠকের সুবিধার্থে সেই অডিওটিও রাতে এখানে সংযুক্ত করে দেওয়া হবে।

আব্দুল্লাহ শাকিলঃ মুফতী আমানুল হক সাহেব! আপনি বলেছেন, মাওলানা সাদ সাহেব ১লা ডিসেম্বর ইসরাইল গেছেন আর সেখানে বসেই বাংলাদেশের আলেমদের পিটানোর পরিকল্পনা করেন। তিনি এর পরদিন সেখান থেকে ভারতে এসেছেন। ঘটনাটি কতটুকো তথ্যবহুল?

মুফতী আমানুল হকঃ আমার কাছে একটি ম্যাসেজ এসেছিল। আমার কাছে নয়, মাওলানা আব্দুল ওয়াদুদের কাছে। সে আমাকে দিয়েছে। পরে যখন আমি তাহকিক করি তখন দেখি এটি এখনের ম্যাসেজ নয়। মাওলানা সাদ যখন জর্ডান গিয়েছিলেন, সে সময়কার। তার মানে যাওয়ার সংবাদ মুটামুটি ঠিক।

আব্দুল্লাহ শাকিলঃ অর্থাৎ আপনি তাহকিক করে পেয়েছন সেটি জর্ডান সফরের সময় যাওয়া। সে সময় তিনি কি ইসরাইল গিয়েছিলেন এই তথ্যটি কতটুকো সত্য?

মুফতী আমানুল হকঃ হ্যা জর্ডান সফরের সময় গিয়েছিলেন। সেটি ইন্ডিয়ান সাথী ম্যাসেজে গতকাল বলেছিল।

আব্দুল্লাহ শাকিলঃ গতকাল বলতে?

মুফতী আমানুল হকঃ ম্যাসেজটি গত রাতেই এসেছিল। মনে করেছি এটি নতুন। ভেবেছিলাম ১ তারিখের। পরে জানলাম এটি পুরানো। ১ তারিখ একজন ফরওয়ার্ড করেছে, মূলত ম্যাসেজটি আগের।

আব্দুল্লাহ শাকিলঃ যে সাথী জানালো, তার পরিচয় কি?

মুফতী আমানুল হকঃ আব্দুল ওয়াদুদ। আমি তার নাম্বার আপনাকে দিব। সে তাহকিক করেছে।

আব্দুল্লাহ শাকিলঃ তার মানে আপনি তাহকিক করেন নি! আপনার পক্ষ থেকে তো এ নিয়ে ইতোমধ্যেই একটি বক্তব্য দিয়েছেন যে সাদ সাহেব সেদিন ইসরায়েলে ছিলেন। এটি দেয়ার আগে একটু চিন্তা করা উচিত ছিল না? নতুবা মানুষ বিভ্রান্ত হচ্ছে। আপনার তথ্য যে ভুল সেটা তো আবারো বলে দেওয়া উচিৎ না?

মুফতী আমানুল হকঃ ঐ তথ্যটি মাওলানা আব্দুল ওয়াদুদ বলেছিল। তার রেফারেন্স দিয়ে আরেকটি বক্তব্য গ্রুপে দিব।

আব্দুল্লাহ শাকিলঃ হাদীসে তো এসেছে, যেকোন শোনা কথা যাচাই ছাড়া বলে দেয়া মিথ্যাবাদী হওয়ার জন্য যথেষ্ট। আপনি পরে জানলেন তথ্যটি ভুল। তাহকিক ছাড়া শোনা কথা বলা তো অন্যায়।

মুফতী আমানুল হকঃ পরে, তিনি রাগ করে অন্য কথায় চলে যান এর কোন উত্তর দিতে পারেন নি।

এই হল, আমাদের কথিত জমহুরদের তাহকিকি কথাবার্তার কাণ্ড। এভাবেই এরকম একের পর এক বিভ্রান্তমূলক কথা ভাইরাল করে গুজব ছড়িয়ে দেশে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ও গৃহযুদ্ধের পটভূমি তৈরির ষড়যন্ত্র করে যাচ্ছে এই কথিত ‘জুমহুর’রা।

শুধু এই আমানুল হকই নয়। আরো কিছু মুফতী, মুহাদ্দিস ও শায়খুল হাদীসের ধ্বজাধারী হেফাযতী আলেম বিনা যাচাই-বাছাইয়ে ধর্মপ্রাণ মুসলিমদের মাঝে তথ্যসন্ত্রাস চালিয়ে যাচ্ছে। এ নিয়ে মূলধারার একজন আলেমের সাথে কথা বললে তিনি জানান, এতে তো আশ্চর্য হওয়ার তেমন কিছু দেখছি না। আমানুল হক তো সেদিনের ছেলে। তার মুরুব্বীরা যেখানে তাসবীহ হাতে নিয়ে অনর্গল মিথ্যা বলে যাচ্ছে সেখানে এটিতো খুবই স্বাভাবিক ব্যপার। এখন পর্যন্ত একজন ‘ওজাহাতী’ও একটি ভুলেরও দলীল পেশ করতে পারে নাই। সবাই শোনা কথার পিছে দৌঁড়ে বেড়াচ্ছে। তবে এভাবে ছেড়ে দিলে এরা সূরা তওবার ৩১ নং আয়াতে বর্ণিত ‘ইহুদী আলেম’দের মত মিথ্যা ও জালিয়াতী দিয়ে পুরো ইসলামকেই বিকৃত করে ছাড়বে। তাই মূলধারার হক্কানী উলামায়ে কেরামের উচিৎ, এখনই এই ভণ্ড ধর্মব্যবসায়ী আলেম নামধারীদের বিরুদ্ধে যথাযোগ্য পদক্ষেপ গ্রহণ করা এবং জনসাধারণকে এদের ব্যপারে সতর্ক করতে থাকা।

এই ফোনালাপের পর জনসাধারণের মাঝে ব্যপক প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। অনেকেই বলেন, এই একটি ব্যপারই আমাদের চোখ খুলে দিয়েছে। এরা যে এভাবেই মিথ্যাচার করে সারাদেশ তোলপাড় করে আসছে সেটা এই বক্তব্যটি না দেখলে বুঝা মুশকিল ছিলো। তারা দাবী করেন, আমানুল হকসহ বাকীদের বিরুদ্ধে অতিদ্রুত আইসিটি আইনে মানহানী মামলায় গেপ্তার করে ধর্মপ্রাণ মুসলিমদের ঈমান-আমল বাঁচানো এখন সময়ের সবচে’ বড় দাবী হয়ে দাঁড়িয়েছে।

কী ছিলো সেই শাহনেওয়াজ ভূপালীর অডিওটিতে? ১লা ডিসেম্বর নাকি জর্দান সফর? সে কী বলেছিলো? সেতো ‘জর্দান’ শব্দই উল্লেখ করে নাই। বরং আরেকজন বাঙালী ‘ওজাহাতী’ সেটার ব্যখ্যায় সুস্পষ্ট করে বলছে যে, ১লা ডিসেম্বরের মারামারির দিন সা’দ সাহেব ইসরায়েল ছিলেন। তাহলে আমানুল হক কেন মিথ্যা বললো? এসব প্রশ্ন পাঠকের বিবেকের কাছে রাখা হলো। পাশাপাশি সত্য যাচাইয়ের জন্য সেই অডিওটিও এখানে তুলে দেওয়া হলো।

Facebook Comment





© All rights reserved © 2019 Tablignewsbd.Com
Design & Developed BY PopularServer.Com
error: Content is protected !!