মঙ্গলবার, ১৯ নভেম্বর ২০১৯, ০৬:৩৯ পূর্বাহ্ন

জনবিচ্ছিন্ন হওয়ার পথে উম্মুল মাদারিস হাটহাজারী। কেন ও কিভাবে?

জনবিচ্ছিন্ন হওয়ার পথে উম্মুল মাদারিস হাটহাজারী। কেন ও কিভাবে?

-মুঈনুল ইসলাম হাটহাজারী মাদরাসার সামনের চিত্র

তাবলীগ নিউজ বিডিডটকম।

প্রারম্ভিকাঃ এশিয়া মহাদেশের অন্যতম বৃহত্তম ইসলামী বিদ্যাপীঠ আল-জামিয়াতুল আহলিয়া দারুল উলুম মুঈনুল ইসলাম হাটহাজারী। বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ ও সর্বপ্রাচীন এই মাদরাসাটি প্রতিষ্ঠিত হয় ১৮৯৬ খৃষ্টাব্দে। ১ শতাব্দীরও অধিককাল সুনাম ও স্বগৌরবে প্রতিষ্ঠানটি চলে আসলেও সাম্প্রতিককালে মুখ থুবড়ে পড়ার উপক্রম হয়েছে। অর্থনৈতিক ভঙ্গুরদশা কাটাতে প্রতিষ্ঠানটি সওয়ার হয়েছে সামর্থহীন ছাত্রদের ঘাঁড়ে। পান থেকে চুন খসলেই বিনানোটিশে মোটা অঙ্কের জরিমানা তুলে কোনরকম ‘লেঁজে গোবরে’ দিনগুজার করে যাচ্ছে শতবর্ষী ঐতিহ্যবাহী এই প্রতিষ্ঠানটি। কিন্তু কেন হঠাৎ এমন পরিস্থিতিতে পড়তে হলো? একটি অনুসন্ধানী রিপোর্টে প্রাথমিকভাবে জানা যায়, দাওয়াত ও তাবলীগের পবিত্র মেহনতে কৃত্রিম সঙ্কট তৈরী করে রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের জন্য যেসব বিপথগামী আলেম নেশাগ্রস্ত হয়ে মাঠে নেমেছে, তাদের নেতৃত্বে রয়েছে এই প্রতিষ্ঠানের একাধিক দায়িত্বশীল ব্যক্তিবর্গ। বরং এই কৃত্রিম সঙ্কট সৃষ্টির দূরভিসন্ধিগুলোও এই প্রতিষ্ঠানের চৌহদ্দীতে হয়েছে। দিবালোকের মত সুস্পষ্ট এসব ঘটনা জানাজানি হওয়ার পর ধীরে ধীরে জনসাধারণের আস্থা হারাতে থাকে প্রতিষ্ঠানটি। বরকত ও রহমত শুন্য হতে থাকে রূহানিয়াতসমৃদ্ধ এই নূরানী বাগান। লেবাসধারী রাজনীতিক স্বার্থলোভীদের কড়াল গ্রাস থেকে প্রাণাধিক প্রিয় প্রতিষ্ঠানটি পূণরোদ্ধারের আশায় আজও লক্ষ লক্ষ ভক্ত অনুরক্তরা রাতভর অশ্রু ঝড়িয়ে দু’আ করে থাকে। এমনই একজন ছাত্রের অশ্রুসিক্ত লেখা পাঠকের সামনে তুলে ধরা হচ্ছে। এই জলজ্যান্ত অবক্ষয় আমাদেরকে শুধু একটি বার্তাই দিয়ে যাচ্ছে যে, উম্মত থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার সাথে সাথে আল্লাহর রহমতের রজ্জু ছিড়ে যায়। ফলে যতবড় কারামতওয়ালা ‘হাস্তি’ই হোক, লাঞ্চনা-বঞ্চনাই তার একমাত্র প্রাপ্যফলে পরিণত হয়। আল্লাহ তা’আলা আমাদের সবাইকে ‘আলেম-আওয়াম’ শিরোনামে বিভক্ত হওয়ার পরিবর্তে ‘উম্মত’ হয়ে চলার তাউফীক দান করুন। আমীন।

উম্মুল মাদারিসের করুণ অবস্থা দেখে নিজেকে খুব লজ্জিত মনে হয়! কাফিয়া থেকে মিশকাত পর্যন্ত পটিয়াতে লেখাপড়া করে হাটহাজারিতে তাকমীল পড়েছি। শায়খুল ইসলামের ছাত্র হওয়ার গৌরব এবং বাবুনগরী হুজুরের সোহবত অর্জনের জন্য পটিয়ার সাথে একপ্রকার নিমকহারামি করেছি! কিন্তু আজ শায়খুল ইসলামের ছাত্র হিসেবে নিজেকে পরিচয় দিতে গিয়ে বারবার হোঁচট খাই!! অন্যদিকে বাবুনগরীর স্নেহধন্য হিসেবে নিজেকে নিয়ে গর্ববোধ করি!!

দোষটা আসলে শায়খুল ইসলামের নয়। একজন বয়োবৃদ্ধ আলেমকে জীবনের শেষপ্রান্তে মানুষের সমাজে এতটা নীচে নামিয়ে আনতে পারে তাঁরই প্রিয়জন, ভাবতেও অবাক হই! নিজেরা কোটি-কোটি টাকা অর্জন এবং জায়গাজমি বাড়ি গাড়ি লাভ করার জন্য একজন জনপ্রিয় মানুষকে ঘাটে ঘাটে বিক্রি করেছে সেই চিহ্নিত কুলাঙ্গাররা! কেবলমাত্র তাঁকে বিক্রি করে ক্ষ্যান্ত হচ্ছে না তারা; শকুনদের দৃষ্টি এখন উম্মুল মাদারিসের উপর।

গতবছর যখন হাটহাজারি ছিলাম, নানা অনিয়ম আর জুলুমবাজি দেখার সুযোগ হয়েছে তখন। মাদ্রাসার একনিষ্ঠ নিবেদিতপ্রাণ হুজুরদেরকে জিম্মি করে রাখা, কাউকে-বা বহিষ্কার করা, একক চিন্তাধারা এবং ক্ষমতাবলে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব থেকে যোগ্যদের বঞ্চিত করে অযোগ্যদের স্থান দেওয়াসহ যাবতীয় একনায়কতন্ত্র কর্মকাণ্ড চলছে ; শুধুমাত্র বয়োবৃদ্ধ সেই আলেমকে ব্যবহার করে!

বয়োবৃদ্ধ আলেমের অবস্থা তো এখন এমন; উনাকে যা শোনানো হয়, তিনি শুধুমাত্র তা-ই শোনেন। উনাকে যা বলতে বলা হয়, তিনি কেবলমাত্র সেগুলোই বলেন। এক কথায়: উনার চোখ এখন অন্যদের চোখ। উনার কান এখন অন্যদের কান। উনার মুখ এখন অন্যদের মুখ। সেইসাথে উনার পকেটও এখন অন্যদের পকেট। উনি পৃথিবীতে বেঁচে আছেন, কিন্তু উনার স্বকীয়তা বলতে কিছুই নেই। তিনি নিজেও অন্যদের কাছে জিম্মি হয়ে আছেন। এই ‘অন্যরা’ কারা, তাদেরকে সকলেই চেনে, সকলেই জানে।

উম্মুল মাদারিসের বার্ষিক মাহফিল ও দস্তারবন্দী সম্মেলন।

এই সম্মেলন বৃহত্তর চট্টগ্রামসহ সারা বাংলাদেশের আপামর জনসাধারণের আশা-আকাঙ্ক্ষা ও কাঙ্ক্ষিত এক সম্মেলন! সাধারণ মানুষ নিজেদের সারা বৎসরের উপার্জন হতে মুক্তহস্তে মাদ্রাসায় দান-খয়রাত করে থাকে এই সম্মেলনে। কিন্তু এবারের মাহফিলটা ছিল তার ব্যতিক্রম। অনেকের কাছেই শুনেছি; মাহফিলের আগের যে কয়েকদিন কালেকশন করা হয় সেদিনগুলোতে মাদ্রাসার কোনো উস্তাদ কারো কাছে মাদ্রাসার জন্য সাহায্য চাইলে জনসাধারণ মুখ ফিরিয়ে নেয়। তীর্যক বাক্যও শুনতে হয় অনেক উস্তাদকে। লজ্জায় অবনত হয়েছে উনার চেহারা।

মাহফিলের দিন জুমআর পরে যখন বয়োবৃদ্ধ সেই আলেম বয়ান শেষে আকুতি মিনতি জানিয়ে কালেকশন করেন; লোকজন তখন যা-ও কিছু একটা দিতে চেয়েছিল, চিহ্নিত ও সমালোচিত একজন ব্যক্তি মাঝখানে মুরব্বিয়ানা ও নাক গলানোর কারণে তাও দেয়নি মানুষ! মাদ্রাসার প্রবল হিতাকাঙ্ক্ষী ও একনিষ্ঠ একজন মুহাদ্দিসকে স্টেজ পরিচালনা থেকে দূরে সরিয়ে সমালোচিত ব্যক্তি নিজেকে জনসম্মুখে প্রকাশ করার স্বার্থে স্টেজ পরিচালনা করায় সাধারণ মানুষের চেহারায় আমি বিরক্তির ছাপ স্পষ্ট দেখেছি।

মানুষের কাছে চাঁদা-সদকা না পেয়ে সেসব চিহ্নিত ব্যক্তিবর্গ মাদ্রাসার খরচ বহন করতে চাচ্ছে নীরিহ ছাত্রদের উপর চাঁপ প্রয়োগ করে, চাঁদাবাজি করে।

হাটহাজারি মাদ্রাসার ইতিহাস পাল্টে দিয়েছে এবারের দস্তারবন্দী সম্মেলন। বার্ষিক পরীক্ষায় বোর্ড কর্তৃক নির্ধারিত ফিসের দ্বিগুণ পরিমাণ টাকা নেওয়ার পরেও দস্তারবন্দী সম্মেলনে ১০০০ টাকা ‘চাঁদাস্বরূপ’ দেওয়া ছাড়া পাগড়ি দেওয়া হয়নি এবারের সম্মেলনে। যার ফলে তিন ভাগের দুই ভাগ ছাত্ররা সামর্থহীনতার কারণে এ বছর পাগড়ি নেওয়া থেকে বঞ্চিত হয়েছে। আজ রবিবার (১৩ই জানুয়ারী ২০১৯) ৩য় ঘণ্টায় যারা অনুপস্থিত ছিল তাদের উপর ৫০০ টাকা জরিমানা করা হয়েছে।

অনুপস্থিতির শাস্তি হয়ে থাকে। তাই বলে এতটুকু বিষয়ের জন্য ৫০০ টাকা জরিমানা নেওয়ার ঘটনা হাটহাজারির জন্য বিরল একটা ইতিহাস। দুর্বল ছাত্রদের উপর জুলুমবাজিই এখন হয়ে উঠছে মাদ্রাসার চাবিকাঠি। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে; ছাত্ররাই এখন মাদ্রাসার ব্যয়ভার বহন করতে হবে।

সমালোচিত ব্যক্তিরা মাদ্রাসার হর্তাকর্তা হওয়ায় জনবিচ্ছিন্ন হওয়ার সম্মুখীন আমাদের উম্মুল মাদারিস। মাদ্রাসার একজন সচেতন ফারেগ হিসেবে মনেপ্রাণে কামনা করি, এই অবস্থার পরিবর্তন হোক। স্বকীয়তায় ফিরে আসুক আমাদের প্রাণপ্রিয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। অন্যায়, অবিচার, জুলুমবাজি, ছাত্রদের উপর চাঁদাবাজি এবং সমালোচিত-ঘৃণিত ও চিহ্নিত সেসব লোকদের হাত থেকে মুক্ত হোক আমাদের উম্মুল মাদারিস।

Facebook Comment





© All rights reserved © 2019 Tablignewsbd.Com
Design & Developed BY PopularServer.Com
error: Content is protected !!