রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১২:৩৬ পূর্বাহ্ন

দেওবন্দের কাছে সরকারিভাবে যে ৬টি প্রশ্নের উত্তর জানতে চান তাবলীগের সাথীরা

দেওবন্দের কাছে সরকারিভাবে যে ৬টি প্রশ্নের উত্তর জানতে চান তাবলীগের সাথীরা

ষ্টাফ রিপোর্টার, তাবলীগ নিউজ বিডিডটকম | আগামী ২২ জানুয়ারী বাংলাদেশ সরকারের একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল তাবলীগের চলমান সংকট নিরসনে ভারতের দেওবন্দ যাচ্ছে।  প্রতিনিধি দল থেকে মাত্র একটি প্রশ্নের উত্তর জানতে দেওবন্দ যাওয়ার কথা বললেও মূলধারা তাবলীগের সাথীরা সংকট নিরসনে সরকারি প্রতিনিধি দলের মাধ্যমে মূলত ৬টি বিষয় দেওবন্দের কাছে জানতে চাচ্ছেন।

তাবলীগের সাথীরা মনে করছেন এতো বড় জটিল একটি ভয়াবহ পরিস্থিতি, যেখানে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে খোদ মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর তত্বাবধানে সরকারি প্রতিনিধি দল ভারত সফরে যেতে হচ্ছে, সেখানে মাত্র একটি বিষয় জিজ্ঞাসা করে চলে আসাটি কখনো সমাধানের পথ খুলে দিবে না। বরং সংঘাত ও সংকটকে আরো ঘনীভূত করতে পারে। তাই তারা চাচ্ছেন, বিষয়টি খোলামেলা আলোচনা করে সমাধানের সঠিক পথ বের করে নিয়ে আসা।

তারা মনে করছেন, নিজামুদ্দীনের মূলধারার তাবলীগ থেকে বিচ্যুত বাংলাদেশের স্বতন্ত্র তাবলীগওয়ালাদের পক্ষ থেকে যে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে, তার ফলে দেশের বিভিন্ন জেলায়, থানায়, মার্কাজে, মহল্লায় ও মসজিদে, এমনকি ঘরে ঘরে উশৃঙ্খলতা, বিশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তাহীনতার পরিবেশ বিরাজ করছে। তাঁদের ভাবভঙ্গির দ্বারা প্রকাশ পাচ্ছে যে, তাঁরা দারুল উলুম দেওবন্দ মাদ্রাসার ইশারায় এসব করছে। এসবের সমাধানের জন্য সংযুক্ত কাগজে কয়েকটি প্রশ্ন লিখিতভাবে দেয়া হলো। সেগুলোর উত্তর নিরপেক্ষভাবে দারুল উলুম দেওবন্দ থেকে পাওয়া গেলে আশা করা যায়, উপরোক্ত সমস্যাগুলোর সমাধান তরাণ্বিত হতে পারে। এ ব্যবস্থা না নিলে দেশে বিশৃঙ্খলা ক্রমশঃ বাড়তে থাকবে ও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। দারুল উলুম দেওবন্দ থেকে সংযুক্ত কাগজে উল্লেখিত প্রশ্নাবলীর উত্তর আসলে আশা করা যায় আমাদের দেশের সম্মানিত উলামায়ে কেরাম ও জনসাধারণ মেনে নেবেন। কারণ, দেওবন্দকে সবাই মান্য করেন।

যেহেতু বাংলাদেশ থেকে একটি প্রতিনিধিদল দেওবন্দ যাচ্ছেন, তাঁরা হাতে হাতে এগুলোর জবাব নিয়ে আসতে পারবেন। বাংলাদেশে বিশ্ব ইজতিমা বহু বছর ধরে হজরত মাওলানা সা’দ সাহেবের ইমারতিতে (নেতৃত্বে) হয়ে আসছে। তিনি বিশ্ব ইজতিমায় আসা নিতান্তই দরকার, নতুবা সারা পৃথিবী থেকে বিদেশী মেহমান আসা খুব নগণ্য সংখ্যক হবে।

দেওবন্দের কাছে সরকারি প্রতিনিধি দলের মাধ্যমে যে প্রশ্নের উত্তর জানতে চান মূলধারার তাবলীগের সাথীরা।

১. হজরত মাওলানা সা’দ কান্ধলভী হাফিযাহুল্লাহ আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাত থেকে বাদ পড়েছেন কি?

২. তাবলীগ জামাতের মূলকেন্দ্র হিসেবে সারা দুনিয়াতে নিজামুদ্দীন মার্কাজ পরিচিত। বিগত ৯৯ বছর যাবত যে মার্কাজ থেকে তাবলীগের মেহনত পরিচালিত হচ্ছে, এখনও সেই মার্কাজ থেকে সারাবিশ্বে তাবলীগ চলছে। প্রশ্ন হলোঃ তাবলীগের সাথীগণ নিজামুদ্দীন মার্কাজের মজলিশে শুরা ও তাঁর জিম্মাদারের নির্দেশনা এবং তাঁদের মতামত মেনে চলতে শরয়ী কোনো আপত্তি আছে কি না?

৩. মাওলানা সা’দ কান্ধলভী হাফিযাহুল্লাহ গত ২২ বছর ধরে সারাবিশ্বে দাওয়াতের এই মেহনত পরিচালনা করে আসছেন। টঙ্গী ইজতিমায় মূল বয়ান ও হেদায়েতের কথা তিনিই বলে থাকেন। তিনিই আখেরী মোনাজাত পরিচালনা করে থাকেন, যা সারাবিশ্বে সম্প্রচারিত হয়। সেই ধারাবাহিকতায় এখনও বিশ্বব্যাপী তাবলীগের যেসব সাথীগণ তাঁকে জিম্মাদার মানেন, তিনিসহ তাঁরা গোমরাহ বা বাতিল কি না?

৪. মাওলানা সাদ কান্ধলভী হাফিযাহুল্লাহ ভারতসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ইজতিমাগুলোতে এ বছরও অংশগ্রহণ করেছেন। এক্ষেত্রে দেওবন্দের কোন নিষেধাজ্ঞা ছিলো কি না? বাংলাদেশের ইজতিমায় তাঁর অংশগ্রহণ করার ব্যাপারে দারুল উলুম দেওবন্দের কোনো নিষেধাজ্ঞা আছে কি?

৫. তাবলীগের চলমান অাভ্যন্তরীণ মতবিরোধে (ইমারত-শুরার ইখতিলাফ) দারুল উলুম দেওবন্দ কোনো পক্ষ অবলম্বন করেছে কি না?

৬. বাংলাদেশের বিভিন্ন মাদ্রাসার শিক্ষক, ত্বোলাবা (ছাত্র) ও মূলধারা থেকে বিচ্যুত সাথীদের দ্বারা নিজামুদ্দীনের অনুসারী মূলধারার তাবলীগের মার্কাজ ও মসজিদসমূহে এবং বিভিন্ন জোড় ও ইজতিমা হওয়ার ব্যাপারে বাঁধা দেয়া ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা হচ্ছে। শরীয়তের দৃষ্টিতে এর কোনো সমর্থন আছে কিনা?

এ ব্যপারে প্রশ্ন করা হলে দারুল উলূম উত্তরার মুহতামিম মাওলানা মু’আয বিন নূর বলেনঃ “বাংলাদেশে এই চলমান সংকট যেসব প্রশ্ন ঘিরে সৃষ্টি হয়েছে সেসব আড়াল করে মাত্র একবাক্যে হ্যাঁ/না সূলভ কিছু একটা জিজ্ঞাসা করে চলে আসা হবে আত্মপ্রবঞ্চনার শামিল। এতে প্রতারিত হবে আলেম-উলামার ভক্তবৃন্দ সাধারণ মুসলমান। পরবর্তিতে এই লুকায়িত সত্য প্রকাশ হয়ে গেলে স্থায়ীভাবে জনসাধারণের আস্থা ও বিশ্বাস হারাবে আলেম সমাজ। এতে জটিলতা আরো সহস্রগুণ বাড়বে। তাই আমি মনে করি, যদি প্রকৃতপক্ষেই এই প্রতিনিধি দল সংকট নিরসনে আন্তরিক হয়ে থাকে তাহলে তাদের উচিৎ হবে ৩টি কাজ করা।
১। আলোচিত প্রতিটি আপত্তি ও প্রশ্ন নিয়ে দেওবন্দে খোলামেলা আলোচনা করা। উপরোল্লিখিত ৬টি প্রশ্ন এখানে সর্বাধিক গুরুত্ব রাখে। এগুলো খোলাসা না করে চলে আসা হবে মারাত্মক খেয়ানত।
২। দেওবন্দের সিদ্ধান্ত তার অফিশিয়াল প্যাডে সুস্পষ্টভাবে লিখিত আকারে নেওয়া।
৩। প্রতিনিধি দলের সকল সদস্যের সর্বসম্মতিক্রমে প্রতিবেদন তৈরি করা। এবারো যদি দেওবন্দ থেকে মৌখিক মতামত নিয়ে ফিরে এসে লুকোচুরি খেলা হয় এবং মাওলানা সাদ ও বিশ্ব ইজতেমা সংক্রান্ত জটিলতার কোন সমাধানের পথ বের করা না হয় তাহলে সাম্প্রদায়িক সংঘাত আরো বাড়বে। বরং স্থায়ী সহিংসতার এক পর্যায়ে গৃহযুদ্ধের রূপও পরিগ্রহ করতে পারে এই চরম মতানৈক্য।”

মু’আয বিন নূর আরো বলেন, মাওলানা সাদ সাহেবের ব্যপারে দেওবন্দ ‘ইতমিনান’ আছে কি না, এটা এক ধরণের ‘আহম্মকী’ প্রশ্ন। অনেকটা ‘শাক দিয়ে মাছ ঢাকা’র মত ব্যপার। কোন জীবিত ব্যক্তির উপর ইতমিনানের কোন সুযোগ নেই। চাই তিনি হারামাইনের ইমাম হোন কিংবা দেওবন্দের মুহতামিম বা শাইখুল হাদীস হোন কিংবা বিশ্ব আমীর হোন, কারো ব্যপারে জীবিত থাকাবস্থায় ‘ইতমিনান’ হওয়া যাবে না। ইবনে আবদুল বার তাঁর ‘জামে’ কিতাবে ইবনে মাসঊদ রাযিয়াল্লাহু আনহুর একটি ‘আছার’ উল্লেখ করেন। যেখানে বর্ণিত আছে “فإن الحي لا تؤمن عليه الفتنة” অর্থাৎ কোন জীবিত ব্যক্তিই ফেতনা থেকে নিরাপদ নয়। অতএব, ইতমিনানের প্রশ্ন শুধু সাদ সাহেবের ব্যপারে কেন চাওয়া হবে? হেফাজতের জুমহুর অজাহাতি আলেমদের ব্যপারেও তো ইতমিনানের প্রশ্ন তোলা উচিৎ দেওবন্দের কাছে।

Facebook Comment





© All rights reserved © 2020 TabligNewsBD.Com
Design & Developed BY PopularServer.Com