বুধবার, ২৫ নভেম্বর ২০২০, ০৮:৩৯ পূর্বাহ্ন

বাংলাদেশের তাবলীগের সংকট নিয়ে দেওবন্দের শীর্ষ আলেমরা কী ভাবছেন?

বাংলাদেশের তাবলীগের সংকট নিয়ে দেওবন্দের শীর্ষ আলেমরা কী ভাবছেন?

সৈয়দ আনোয়ার আবদুল্লাহ, দেওবন্দ থেকে | গত সোমবার বাঙ্গালী ছাত্রদের আমন্ত্রণে ভারতের বিশ্ব বিখ্যাত দারুল উলুম দেওবন্দ আসা হয়। বাংলাদেশী, আসামী ও কলকাতাসহ পশ্চিম বঙ্গের অসংখ্য ছাত্র দেওবন্দে পড়ে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কল্যানে আমার সাথে তারা নিবিড়ভাবে পরিচিত। তাদের মেহমানদারীতে আমি আপ্লুত। দারুল উলুম দেওবন্দের একমাত্র বাঙ্গালী উস্তাদ মাওলানা উসমানগনী হাওরায়ীর নিজ বাসায় মেহমানদারী ও আন্তরিকতা ভুলার মতো নয়। দেওবন্দ ঘুরতে ঘুরতে স্থানীয় শীর্ষ আলেমদের কাছে তাবলীগের চলমান সংকটে তাদের মতামত ও দৃষ্টিভঙ্গী কী, তা জানার চেষ্টা করি।

গত দুই দিনে বিশ্ববিখ্যাত দ্বীনী শিক্ষা প্রতিষ্টান দারুল উলুম দেওবন্দের শীর্ষ উস্তাদ ও আহলে শুরাদের সাথে কথা হয়। বাংলাদেশ সরকারের একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল আগামী বিশ্বইজতেমাকে সামনে রেখে দেওবন্দ আসছে, এ খবর মিডিয়ার মাধ্যমে সবারই জানা। অনেকেই নিজ থেকে আমাদেরকে জিজ্ঞাসা করেছেন, বাংলাদেশের হালত কি? টঙ্গীর সংঘর্ষের ঘটনা সবারই জানা। এ নিয়ে খোদ দেওবন্দের অধিকাংশ উস্তাদদের শঙ্কার শেষ নেই।

অপরদিকে বাংলাদেশের ওজাহাতি আলেমদের একটি জামাত গত কয়েকদিন ধরে এখানে অবস্থান করে চেষ্টা করছে, বাংলাদেশের প্রতিনিধি দল দেওবন্দে এলে মাওলানা আবুল কাসিম নোমানীর মতামত যেন তাদের পক্ষে যায়। এ নিয়ে নানান স্থানে দৌঁড়ঝাঁপ করছেন বাংলাদেশ থেকে দেওবন্দে আসা ওজাহাতি আলেমদের দলটি। দেওবন্দে ঘুরতে এসে এ খবর শুনে আমরা বিস্মিত হলাম।

এসব কিছু মিলিয়ে এখন দেওবন্দের অন্যতম আলোচিত বিষয় হচ্ছে, ২২ জানুয়ারী বাংলাদেশের প্রতিনিধিদল আসা। তবে বাংলাদেশের প্রতিনিধি দল দেওবন্দ আসলে, সেদিন দারুল উলুম দেওবন্দের মুহতামিম আনুষ্ঠানিকভাবে মাওলানা সাদ কান্ধলভীর রুজু কবুলের বিষয়ে কী ব্যাখ্যা দিবেন তা এখনো জানা যায় নি।

যদিও একাধিক সিনিয়র শিক্ষক বলছেন, তিনি মৌখিক রুজু করার পর দেওবন্দ তার সম্পর্কে আর কিছু বলে নি। সারা ভারতে মাওলানা সাদ সাহেব বড়বড় ইজতেমা করছেন। এসবে দেওবন্দের পক্ষ থেকে কোন বাঁধা নিষেধ নেই। তাই বাংলাদেশের আলেমরা দেওবন্দের এই নীতির উপর অটল থাকলে তো আর কোন ঝগড়া বা সমস্যা হবার কথা ছিল না। তারা মনে করছেন, তাবলীগ জামাত তার কেন্দ্রীয় মারকাজ নিজামুদ্দিন বা এর আমীর কোনভাবেই দেওবন্দ নিয়ন্ত্রিত না। তাই এসব বিষয়কে বারবার দেওবন্দের সাথে জড়ানো সঙ্গত নয়। ভারতে তো কোন জটিলতা নেই। তবে বাংলাদেশে যারা এই বিষয়টিকে এত জটিল ও মারমুখি করে তুলেছে তাদের প্রতি সীমহিন নাখোশ উলামায়ে হিন্দ।

দারুল উলুম দেওবন্দের মুহতামিম মাওলানা আবুল কাসিম নোমানী এ বিষয়ে কোন কথা বলতে নারাজ!  তবে এতটুকো বললেন, আপনাদের দেশের লোকজন অতিরিক্ত আবেগ প্রবণ। আবেগ দিয়ে নয়, দ্বীনের কাজ করতে হয় হেকমত দিয়ে। নতুবা কল্যাণের চেয়ে অকল্যাণ বেশি হয়। আর আলেমরা হেকমত থেকে দুরে সরে গিয়ে কোন কাজ করলে এর জন্য বড়ধরনের মাশুল দিতে হয়।

মাওলানা আরাশাদ মাদানীর সাথে নিজ বাসগৃহে কথা হয়। তিনি দু’দিন আগে দিল্লী হাসপতালে চিকিৎসা নিয়ে বাসায় ফিরেছেন। তিনি নিজ থেকে বাংলাদেশের তাবলীগের হালত সম্পর্কে জানতে চান। তারপরে বলেন, এখতেলাফ থাকতে পারে, মতানৈক্য হতে পারে কোন বিষয়ে। এরকম আমাদের আকাবিরদের মাঝেও হয়েছে, তাই বলে মারমুখি হওয়া, একে অপরকে দ্বীনী কাজ করতে বাধা দেয়া কোনভাবে সমুচিত নয়। এটি অন্যায়। অন্যায়কে তো অন্যায় বলতে হব।

এ ব্যাপারে দেওবন্দের সবচেয়ে শীর্ষ ও প্রধান আলেম, বাহরুল উলুম আল্লামা নেয়ামত উল্লাহ আজমীর সাথে কথা হলে তিনি বলেন, দেওবন্দ তার সন্তানকে কিছু বিষয়ে সতর্ক করেছে। এর চেয়ে বেশি কি? এতো বড় করে এসব ভাবনার সময় কোথায়? কত কাজ পড়ে আছে। তোমাদের বাংলাদেশের আলেমরাতো ইসলাম কে কুফর বলে ফেলে। তোমাদের কথা কী বলব! সহজ বিষয়কে তোমরা কঠিন করে ফেল। তাবলীগওয়ালারা তাদের মতো করে যেভাবে কাজ করে আসছে, তাদের সেভাবেই কাজ করতে দাও। তোমরা আবার তাবলীগকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য গেলে কেন? সবকিছু নিয়ে রাজনীতি করা তোমাদের অভ্যাস। আল্লাহকে ভয় করা উচিত।

দারুল উলুম দেওবন্দের নায়বে মুহতামিম আব্দুল খালিক মাদ্রাজি বলেন, “এতমিনান হ্যায় ইয়া নেহি, এ কেইছা বাত হো” কারো উপর ‘এতমিনান’ আছে কি না, এটি কেমন কথা? আমার উপর কি কেউ ‘এতমিনান’ এমনটি কেউ বলতে পারবে? জীবিত কারো উপর এতমিনান হওয়া যায় না। বললাম অমুকের উপর আমরা ‘এতমিনান’, কাল যে সে ভুল করবে না এর গ্যারেন্টি কোথায়? তখন এই ‘এতমিনান’ কথাকেই দলিল বানাবে লোকজন। দুনিয়ার কোন ব্যক্তিকেই তার হায়াতের ভিতর ‘এতমিনান’ বলা যায় না।  দেওবন্দতো আর তোমাদের বাঙ্গালী আলেমদের মতো মাওলানা সাদকে গোমরা বা ইহুদী বলে নি। মানা যাবে না, তাও বলেনি। আমরা কোন এলজাম লাগাইনি। কেন খামোখা দেওবন্দের নাম বলে ফেৎনা করছো তোমরা? আল্লাহর ওয়াস্তে উম্মতের রক্ত ঝরানো থেকে থামো ভাই।”

দারুল উলুম দোওবন্দের সাবেক নাজিমে তালিমাত (শিক্ষা সচিব) মাওলানা ইউসুফ তাওলয়ী বলেন, তিনি প্রথম এসবের এলমী ব্যাখ্যা দিয়েছেন। দুটি বিষয়ে ব্যাখ্যা দেওবন্দের মনোপূত হয় নি। দেওবন্দ বলেছে, ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ ছাড়া দেওবন্দের শর্ত মেনে তাকে রুজু করতে হবে। তিনি তাও করেছেন। পরবর্তীতে দেওবন্দের চাওয়া অনুযায়ী মৌখিকভাবেও প্রত্যাহার করেছেন৷ আমি মনে করি, বিষয়টি নিয়ে আর জলঘোলা করা ঠিক হবে না। দেওবন্দ তার স্থানে থাকুক। এসব নিয়ে বেশি ঘাটাঘাটি করলে, এতে সবারই ক্ষতি হবে। তিনি বলেন আমরাতো দারুল উলুমের মূখপাত্র নই। তাই আনুষ্ঠানিক কিছু বলতে পারি না। সেটা সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলরাই বলবেন।

দারুল উলুম দেওবন্দের মুহাদ্দিস ও প্রধান মুফতী হাবিবুর রহমান আজমী বাংলাদেশের অবস্থা শুনে বলেন, তোমরা ভাই বাঙ্গালী। তোমাদের সব লাইনে যোগ্যতা বেশি। তোমাদের কাছে কী মূল্য আছে দারুল উলুমের? আর কিইবা মর্যাদা আছে উলামায় হিন্দ এবং আকাবিরের? কুলহিন্দের আকাবিরগণ যা বলেন নি, তোমরা নিজ থেকে শুনেশুনে তাই বলছো! তোমাদের ব্যাপারে আমরা কী বলবো? আমরা যতটুকো বলেছি, তোমরা এতটুকো বললে পেরেশানী হতো না। একে অপরকে ক্ষমা করে দিয়ে ভাই ভাই হয়ে চলো। সব ঠিক হয়ে যাবে।

দারুল উলুম দেওবন্দের সিনিয়র উস্তাদ মাওলানা উসমানগনী হাওরায়ীর কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এটিতো বাংলাদেশের সমস্যা। সেখানে থাকাই ভাল। হিন্দুস্তানে যেখানে কোন জটিলতা নেই, দাওয়াতের কাজে দোওবন্দের দৃষ্টিভঙ্গিকে কেন্দ্র করে সেখানে বাংলাদেশের বিশ্বইজতেমাতে যাওয়া না যাওয়াকে কেন্দ্র করে এখানে আসাটি আমার বোধগাম্য নয়।

এ বিষয়ে দারুল উলুম দেওবন্দ (ওয়াকফ্) এর মুহতামিম মাওলানা সুফিয়ান কাসেমী বলেন, হিন্দুস্থানের আলেমদেরকে ফলো করে কাজ করলে বাংলাদেশের সমস্যা এত জটিল হত না। ভারতে এমন একজন আলেম কি কেউ দেখাতে পারবে, যিনি সাদ কান্ধলভী হাফিযাহুল্লাহকে গোমরা বলেছেন? আর বাংলাদেশে কী বলা হচ্ছে, এসব ভিডিও দেখে আমি লজ্জিত হয়ে গেলাম। ছি..!  একটি দেশের আলেমরা কিভাবে এত নিচে নামতে পারেন? আল্লাহ আমাদের হেফাজত করুন।

এ বিষয়ে দেওবন্দের প্রসিদ্ধ আলেম, ‘মাদরাসায়ে উম্মে মাকতুম দেওবন্দ’ এর মুহতামিম মুফতী আহসান সাঈদ কাসেমীর সাথে কথা বললে তিনি জানান, এটি খুবই আশ্চর্যের বিষয় যে, বাংলাদেশে তাবলীগের কাজ কিভাবে চলবে এর জন্য দেওবন্দের মতামত চাওয়া হচ্ছে। খোদ দেওবন্দ এলাকার সকল মসজিদে তাবলীগের কাজ নিজামুদ্দিন মারকাজের অধিনে সাদ সাহেবকে আমীর মেনেই করা হচ্ছে। এখানে তো কোন বাঁধা বা নিষেধাজ্ঞা নেই।

এ বিষয়ে দেওবন্দের বিদগ্ধ তরুণ আলেম ও মাওলানা আরশাদ মাদানীর দীর্ঘদিনের খাদেম মুফতী ফুরকান কাসেমী এই প্রতিবেদককে বলেন, মাত্র কয়েকদিন আগে বুলন্দশহরে কয়েক কোটি মুসলমানের আলমী ইজতেমা হল। দেওবন্দ থেকে শতশত গাড়ি ভরে লোকজন সেখানে গেল। কই, কেউতো নিষেধ করেনি। মাওলানা সাদ সাহেব সারা দুনিয়াতে ইজতেমা করছেন, বাংলাদেশ ছাড়া কোন দেশ থেকেই এমন সমস্যা নিয়ে কেউ দেওবন্দ আসছে না।

Facebook Comment





© All rights reserved © 2020 TabligNewsBD.Com
Design & Developed BY PopularServer.Com