বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০৬:১০ পূর্বাহ্ন

আমাদের সাথীরা কি দেশ ছেড়ে পালিয়েছে? কাকরাইল শূন্য কেন? মাওলানা রবিউল হক (অডিও সহ)

আমাদের সাথীরা কি দেশ ছেড়ে পালিয়েছে? কাকরাইল শূন্য কেন? মাওলানা রবিউল হক (অডিও সহ)

কাকরাইলের সাবেক শুরা মাওলানা রবিউল হক (বয়ানরত)

নিজস্ব রিপোর্টার; তাবলীগ নিউজ বিডিডটকম। তাবলীগের মূলধারা থেকে বিচ্যুত শূরাপন্থী ওজাহাতীরা চরম হীনমন্যতায় ভুগছে বলে মন্তব্য করেছেন কাকরাইলের সাবেক শুরা মাওলানা রবিউল হক। হেফাজতনিয়ন্ত্রিত পাকিপন্থীদের আয়োজিত ঢাকা জেলার মাশোয়ারায় দু’আর প্রাক্কালে সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে এই মন্তব্য করেন রবি হুজুর ওরফে মাওলানা রবিউল হক। তার বক্তব্যের অডিও লিঙ্ক প্রতিবেদনের নীচে সংযুক্ত রয়েছে।

মূলধারা ও রাজনৈতিকধারার মাঝে একটি তুলনামূলক পর্যালোচনাসহ রবি হুজুরের বক্তব্যটি পাঠকের সামনে তুলে ধরা হচ্ছে।

আলোচিত বক্তব্যের ২:০০ মিনিটে তিনি বলেন, “বর্তমান পরিস্থিতির কারণে মেহনতে কী পরিমাণ ভাটা পড়েছে এবং আমরা কী পরিমাণ প্রভাবিত হয়েছি, কাকরাইলের বর্তমান চিত্রটা দেখলে সেটা আপনাদের সামনে পরিষ্কার হয়ে যাবে। নিচ তলাটা সম্পূর্ণ খালি। উপরে ছোট্ট একটা মজমা আছে। তাও সেটা দু’আর সময় জমা হয়। তা’লীম ও হেদায়েতের সময় যদি দেখেন তাহলে চোখে পানি চলে আসবে।

২:২৫ মিনিটে বলেন “কোথায় গেলো আমাদের সাথীরা? ৮টা শবগুজারী থেকে যদি সপ্তাহে মাত্র একটা করে জামাত আসে তাহলে ৮টি জামাত হয়ে যাবে। তাহলে ঢাকা কি এতই দূর্বল হয়ে গেলো যে, সপ্তাহে ৮টি জামাতও আসছে না? ৮ শবগুজারীতে ৮টি জামাত ও ৬৪জেলার মার্কাজ থেকে কমপক্ষে ৬৪টি জামাত আসতো। অথচ এখন……।”

৩:১৫ মিনিটে বলেন “আমাদের মধ্যে যেন নৈরাশ্যতা ছেয়ে গেছে। নৈরাশ্যের কোন কারণ নেই। আমরা তো আশা রাখবো আল্লাহ তা’আলার উপর।”

৪:৩৩ মিনিটে বলেন “আমরা মেহনত আল্লাহর জন্য করছি। এটা যদি সামনে থাকে তাহলে ইনশা আল্লাহ আমরা হিম্মত পাবো ও আগে বাড়তে পারবো। নতুবা নৈরাশ্য আমাদেরকে পেয়ে বসবে। আর নৈরাশ্য যদি প্রবল হয় তাহলে কখনো কখনো নৈরাশ্য মানুষকে কুফরী পর্যন্ত নিয়ে যায়। ঈমানের স্তর থেকে সরিয়ে দেয়।”

৫:৩৫ মিনিটে বলেন “প্রত্যেক সাথী আমরা একে অপরকে আশান্বিত করি। এমন কথা শোনাই, যে কথার দ্বারা তার হিম্মত ও আশা বাড়তে থাকে আল্লাহ তা’আলার উপরে। নিরাশ হওয়ার কোন কারণ নেই। আল্লাহ তা’আলা নিষেধ করেছেন কুরআনে পাকে “তোমরা নিরাশ হইয়ো না”।

৬:৫৭ মিনিটে বলেন, “কাকরাইলে ৩০ থেকে ৩২টা নযম আছে। সাধারণত তারতীবের জামাত তো ২ মাসের জন্য হয়। কিন্তু নযমের জন্য ৫দিন, ৭দিন বা ১০দিনের জন্য হলেও হয়। এখন তো এমন অবস্থা হয়েছে যে, তারতীব তো দূরে থাক, তারতীবের কথা চিন্তা কইরেন না, নযমে যদি ৫করেও সাথী আসতো তাহলে ১৫০ সাথী হয়ে যেতো। ৫জনের কমে তো কোন নযম সম্ভব না। অথচ পুরো কাকরাইলে ১৫০জন সাথীও নাই।”

৭:৪১ মিনিটে বলেন, “মাস্তুরাতের নযম কেন এ রকম হয়ে গেলো? আমাদের মধ্যে কি মাস্তুরাতের মেহনত নাই? আমাদের মধ্যে কি মাস্তুরাতের মেহনত করনেওয়ালা সাথীরা নাই? সব কি শহর ছেড়ে চলে গেছে? দেশ ছেড়ে চলে গেছে সব?”

৭:৫৫ মিনিটে বলেন “এখন তো আমাদের ‘পালা’ চলতাছে। তাহলে আপনাদের সমস্যাটা কি? আপনাদের পেরেশানীর কারনটা কি? কেন আপনারা স্থবির হয়ে গেলেন? একটু বলেন!! কী কারণে?”

৮:১০ মিনিটে বলেন “ঐ দুই সপ্তাহে (মূলধারার দুই সপ্তাহে) আপনি বের হতে পারছেন না। কিন্তু আমাদের পালা ৪ সপ্তাহ একমাস, এর ভিতরে তো আপনি ৩দিনের খুরুজ করতে পারেন, ১০দিনের খুরুজ করতে পারেন।”

৮:১৯ মিনিটে বলেন “ঘরের মাস্তুরাতরাও যদি মেহনত থেকে স্থবির হয়ে যায় তাহলেতো ঘরেও মেহনতের পরিবেশ নেই।”

৮:২৯ মিনিটে বলেন “আমার হাল কী হবে তখন? মেহনত ঘরেও নাই। মহল্লাতেও নাই। আমি হরকতের মধ্যেই নাই, তাহলে আমার কী হবে? আমার ঈমানের কী অবস্থা হবে? ঈমানের পরীক্ষায় আগে বাড়ার পরিবর্তে আমি তো পিছে চলে যাচ্ছি।”

পর্যালোচনাঃ রবি হুজুরের বক্তব্যে যা পেলামঃ-

১. ওজাহাতিদের ‘পালা’ চলে ৪ সপ্তাহ বা একমাস। আর মূলধারার সাথীরা কাকরাইলের কার্যক্রম চালায় মাত্র ২ সপ্তাহ। দ্বিগুণ সময় পাওয়া সত্বেও তাদের ‘পালা’ চলাকালীন সময় কাকরাইল মসজিদ জনশুন্যতায় খা খা করতে থাকে। ১০০ লোকও নেই। মূলধারার সাথীদের ক্রমবর্ধমান জাগরণ, দ্বীনের জন্য জান কুরবানের মনোভাব, সত্যের পক্ষে আত্মনিবেদন ও অসত্যের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপনে একেবারে নেতিয়ে পড়েছে হেফাজতপন্থী নেতাকর্মী ও তাদের লেলিয়ে দেওয়া ওজাহাতিগণ। অপরদিকে মূলধারার সাথীদের দু’সপ্তাহে প্রকৃত দাঈ ও মুবাল্লিগদের উপচে পড়া ভিড়ে কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে ওঠে কাকরাইল মসজিদ।

২. ওজাহাতিগণ হীনমন্যতা ও হতাশার চূড়ান্ত মাত্রাও অতিক্রম করে ফেলেছে। তাদেরকে জাগিয়ে তুলতে কুফরীর ভয় পর্যন্ত দেখাচ্ছেন রবি হুজুর। তবুও সাহস পাচ্ছে না মূলধারা থেকে বিচ্যুতরা। ১লা ডিসেম্বর ট্রাজেডীর পর কার্যত ‘মেডিকেলী ডেড’ হয়ে গেছে পাকিস্তানী শূরাপন্থী বিদ্রোহীরা। অবশেষে ‘লাইফ সাপোর্ট’ দিয়ে কৃত্রিমভাবে কোন রকম বাঁচিয়ে তোলার চেষ্টা করেও বারবার ব্যর্থ হচ্ছেন রবি হুজুর ও সমমনা মুরুব্বীরা। পক্ষান্তরে মেহনতের মাঠ-ময়দান দাঁপিয়ে বেড়াচ্ছে মূলধারার সাথীরা। তাদের দৌঁড়ঝাঁপ ও জান-মালের সর্বাত্মক কুরবানী বেড়েই চলছে কল্পনাতীত মাত্রায় ও অকল্পনীয় দ্রুত গতিতে।

৩. হতাশায় নিমজ্জিত ও মানষিক বিকারগ্রস্ত এই অংশটিকে তিনি মাত্র ৩দিন, ৫দিন, ৭দিন ও ১০দিনের জন্য তাশকীল করছেন। সপ্তাহে মাত্র ৮টি জামাত বের করার হিসাব-নিকাশ শেখাচ্ছেন। নযমগুলো চালানোর জন্য মাত্র ১৫০ সাথী তাশকীল করতে গিয়ে তিনি ‘মৌখিকভাবে’ হাতে পায়ে ধরে অনুরোধ করেছেন। হতাশাগ্রস্ত সাথীদেরকে আশাব্যঞ্জক কথা শুনাতে বলেছেন। তবুও সাহস পাচ্ছেনা সাথীরা। অথচ মূলধারার সাথীরা পুরো জীবন ওয়াকফ করে রাত-দিন আল্লাহর রাস্তায়, আল্লাহর কালিমাকে সমুন্নত করার জন্য মেহনত করে যাচ্ছে। চলমান সঙ্কটে এতকিছুর পরও ন্যুনতম প্রভাবিত হয়নি নিযামুদ্দীনের অনুসারী সাথীরা। বিশ্বজয়ের লক্ষ্যে তাদের ‘বিদেশ সফর’ উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে।

৪. কাকরাইলের মাস্তুরাতের নযমে ১জনও নেই। এক রকম তালাবদ্ধ রাখা হয়েছে মাস্তুরাতের কামরা। অথচ মূলধারার সাথীদের ‘পালা’ চলাকালীন দেশীদের পাশাপাশি বিদেশী মাস্তুরাতও থাকে।

৫. হায় আফসোস! রবি হুজুর নিজেই বলছেন, শুধু কাকরাইলেই নয়। ঘরে, মহল্লায়, আল্লাহর রাস্তায়, কোথাও ওজাহাতিদের মেহনত নেই। এমনকি তাদের ঘরের মহিলারাও আজ নিষ্কর্মা। আমীরের অানুগত্য থেকে ছিটকে পড়ায় পুরো ওজাহাতি গ্রুপটি দাওয়াত ও তাবলীগের আযীমুশ শান মেহনত থেকে পুরোপুরি সটকে পড়েছে। যা ‘পোড়া কপাইল্লা’দের নসীবেই শুধু জোটে। অথচ মূলধারার সাথীরা শতগুণ আগে বেড়ে ঘরে, মহল্লায় ও আল্লাহর রাস্তায় ‘জানতোর’ কুরবানী করে যাচ্ছে।

দারুল উলূম উত্তরার প্রতিষ্ঠাতা মাওলানা মু’আয বিন নূর এই বক্তব্য সম্পর্কে বলেন “বুঝাই যাচ্ছে, ঘুড্ডি যখন নাটাই-এর এতায়াত থেকে বের হয়ে যায় তখন আর আকাশে উড়তে পারে না। গাছের ডালে কিংবা বাড়ির ছাদে আটকে পড়ে। বাতাস উড়িয়ে নিয়ে যায়। ছিড়ে যায়। হারিয়ে যায়। ঠিক তেমনই আমীরের এতায়াত থেকে যে বা যারা বের হয়ে যাবে তারা আর চলতে পারবে না। স্থবির হয়ে পড়বে। হতাশাগ্রস্ত হবে। আর কী কী হবে, তা আমাদের এই ভাইদের চলন-বলনের দিকে তাকালেই স্পষ্ট দেখা যায়।”

মু’আয বিন নূর আরো বলেন, “জোড়, ইজতেমায় বাঁধা দেওয়া ও মসজিদ থেকে জামাত বের করে দেওয়ার কারণটিও কিন্তু রবিউল হক সাহেবের কথায় ফুটে ওঠেছে। ওজাহাতি ভাইয়েরা হীনমন্যতা, মানসিক বিপর্যয় ও চক্ষুলজ্জার কারণে কাজ থেকে সম্পূর্ণরূপে ছিটকে পড়েছে। একটি বিশেষ প্রাণীর স্বভাব হলো, আস্ত একটা মরা গরু নিজেই খেতে শুরু করবে। কিন্তু সে জানে, নিজে পুরাটা খেতে পারবে না। তারপরও তার কোন জ্ঞাতি ভাইকে মরা গরুর কাছে ভিড়তে দিবে না। ‘নিজে যেহেতু খাইতে পারুম না, তাই কাউরে খাইতেও দিমু না।’ এটি মানবীয় গুণাবলী বহির্ভূত।”

মু’আয বিন নূর জোর দিয়ে বলেন “তারা যা-ই করুক, আমাদের উচিৎ, তাদের কাছে আখলাকের সাথে গাস্তে যাওয়া। সত্যের দিকে ফিরে আসার দাওয়াত অব্যাহত রাখা। অনেকেই সত্য বুঝে গেছেন। কিন্তু চক্ষু লজ্জায় আসতে পারছেন না। অনেকেই এলাকা পরিবর্তন করে নতুন এলাকায় নিযামুদ্দীনের সাথে জুড়ে আমল শুরু করছেন। এই ভাইদের কাছে যদি আমরা বিনয়, মহব্বত ও হাদিয়া সহকারে বারবার গাস্ত করতে থাকি তাহলে তারা নতুন আশার আলো দেখতে পাবে। অন্ধকার চিপা গলি ছেড়ে আলোর রাজ পথে ফিরে আসবে ইনশা আল্লাহ। যারা আজ সর্বশান্ত হয়ে মসজিদে আসাই ছেড়ে দিয়েছে, তারাই হয়তো নতুন উদ্দমে গোটা বিশ্বে ঈমানের কালিমা নিয়ে চষে বেড়াবে ইনশা আল্লাহ। আল্লাহর কাছে কোন কিছুই অসম্ভব নয়।”

Facebook Comment





© All rights reserved © 2020 TabligNewsBD.Com
Design & Developed BY PopularServer.Com