রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০৫:৪৮ অপরাহ্ন

বিশ্ব ইজতেমা নিয়ে ৮ জটিলতা: শঙ্কামুক্ত ইজতেমা এবং একটি প্রস্তাবনা

বিশ্ব ইজতেমা নিয়ে ৮ জটিলতা: শঙ্কামুক্ত ইজতেমা এবং একটি প্রস্তাবনা

ষ্টাফ রিপোর্টার, তাবলীগ নিউজ বিডিডটকম

আসন্ন ইজতেমাকে সামনে রেখে নানান শঙ্কা তৈরি হচ্ছে। তৈরি হচ্ছে জটিলতা। সম্মিলিত ইজতেমা করার সিদ্ধান্তের ভেতরেই মাওলানা জুবায়ের গতকালও ঐক্যবিরোধী সংঘাত তৈরির লক্ষে উস্কানিমূলক বক্তব্য দিয়েছেন।সবকিছু বিবেচনা করে সাধারণ তাবলীগের সাথীরা চান, সরকার ও দেশের ভাবমূর্তি অক্ষুন্ন রাখতে শঙ্কামুক্ত ইজতেমা। এবছর দুপক্ষের একত্রে ইজতেমা করতে যেসব জটিলতা রয়েছে তা তারা সবাইকে জানিয়েছেন এবং এর সমাধান কী হতে পারে সে পরামর্শ দিয়েছেন।

তাবলীগের দু’পক্ষের একসাথে ‘এক ইজতেমা’ করার ক্ষেত্রে বিবেচ্য বিষয়সমূহঃ

আমরা ভারতের দিল্লির নিজামুদ্দীন মার্কাজ থেকে ধারাবাহিকভাবে আসা তাবলীগের মূলধারার অনুসারীগণ সরকার এবং সরকারের আইনের প্রতি সবসময় শ্রদ্ধাশীল ছিলাম, এখনও আছি, ইনশা-আল্লাহ ভবিষ্যতেও থাকবো।

সরকারের পক্ষ থেকে অনুরোধ এসেছে, দু’পক্ষ মিলে এক ইজতিমা করার জন্য। ‘একসাথে’ করার ক্ষেত্রে কাল্পনিক নয়, বরং নিচের বাস্তব সমস্যাগুলো দেখা যাচ্ছে:

১. নাশকতা: তাবলীগের সমস্যাসমূহ সমাধানে তাবলীগের শুরা ও মুরুব্বীগণের বাইরে অন্য কেউ, কোনো পরামর্শদাতা, ’মিডলম্যান’ ইত্যাকার কারো না থাকার কথা না বলার বা পরামর্শ না দেবার বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়েছে। এতে করে বিভিন্ন ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান, সুবিধাপ্রত্যাশীরা অসন্তুষ্ট হয়েছে। এরা ছাড়াও কট্টরপন্থী ইসলামী দল বা জঙ্গীরা যদি উদ্দেশ্যমূলকভাবে সরকারকে বিব্রত করার জন্য ইজতিমা মাঠের কোথাও কোনো অনাকাঙ্খিক ঘটনা ঘটায় সেটা দাবানলের মতো পুরো ইজতেমা মাঠে, মাঠের সাথীদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়বে না? তাতে করে সরকারের অবস্থান কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে?

২. সংঘাত: মূলধারা (নিজামদ্দীন মার্কাজ)-র অনুসারী এবং মূলধারা থেকে বিচ্যুত তাবলীগের সাথীদের মধ্যে বিগত সময়ে, বিশেষ করে ১ ডিসেম্বর ২০১৮ তারিখে টঙ্গীর অনাকাঙ্খিত ঘটনার পরে সারাদেশে যেসব ঘটনা ঘটেছে, সেসবের কারণে উভয় পক্ষের মধ্যে ক্ষোভ ও রাগ এখনও আছে। প্রতিশোধ নেবার মানসিকতাও লক্ষ্য করা যাচ্ছে! ইজতিমা ময়দানে লাখ লাখ সাথী একত্রিত হবেন। রান্না ও বিভিন্ন প্রয়োজনে প্রত্যেক জামাতের সাথে শাবল, দা, বঁটি, লাকড়ি, লাঠি ইত্যাদি থাকবে। আল্লাহ না করুন, কেউ যদি উত্তেজিত হয়ে যায় বা খারাপ কিছু চিন্তা করে অন্যের উপর চড়াও হয়, অপ্রীতিকর কিছু ঘটে; তার জের কী ভয়াবহ হতে পারে, চিন্তাই তো করা যায় না! এমন কিছু হলে যতো পুলিশ, র‌্যাব বা প্রশাসনের লোকবল থাকুক, সেসব সামাল দেয়া যাবে? তখন পুরো দায়-দায়িত্ব সরকারের কাঁধে এসে পড়বে না? সরকার শুধু দেশেই নয়, সারা পৃথিবীজুড়ে বিব্রত হবেন না?

৩. বিভ্রান্তী: মূল ধ্যান-ধারণার মধ্যে মিল নেই, এমন দু’দল মানুষ একসাথে থাকবেন ৪/৫ দিন ধরে। মিম্বর থেকে যেসব কথা বলা হবে বা বয়ান করা হবে, তাঁরা কার কথা শুনবেন? কার কথা মানবেন? দু’পক্ষের চিন্তাধারা তো এক নয়! যেমন: ইজতিমায় আ’মালের সময় মূলধারার অনুসারী মুরুব্বীগণ বলবেন, এতো বছর ধরে পড়ে আসা হাদিসের কিতাব ’মুন্তাখাব হাদিস’ পড়তে। মূলধারা থেকে বিচ্যুত তাবলীগের মুরুব্বীগণ বলবেন, “ওটা পড়া যাবে না!” তখন কী অবস্থা দাঁড়াবে পুরো ময়দানজুড়ে? মূলধারা বলবেন, ইজতিমা শেষে ফিরে গিয়ে মসজিদে মুসুল্লি বাড়ানোর জন্য ‘মসজিদ আবাদীর মেহনত’ করতে। অপরপক্ষ বলবেন, “করা যাবে না!”। এসব কথা সাথীদের পরিপূর্ণ বিভ্রান্ত করবে না? আরেকটি খুব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো: মূলধারা থেকে বেরিয়ে যাওয়া পক্ষ মনে করেন, মূলধারার আমির হজরত মাওলানা সা’দ সাহেব গোমরাহ (পথভ্রষ্ট), তাঁর অনুসারীগণও গোমরাহ! এই ’গোমরাহ’ এবং সঠিক পথে চলমান (বিচ্যুত পক্ষের ভাষ্যমতে) পক্ষ দু’টি একসাথে এক প্যান্ডেলের নিচে প্রায় ৪/৫ দিন কী করে থাকবেন?

৪. দু’আ: ইজতিমা শেষে দু’আ কে করবেন? দুইপক্ষই তো চাইবে তাঁর পক্ষের মুরুব্বী কেউ সেটি করেন! সেটার সমাধান কী করে হবে?

৫. নজম (সার্ভিস): ইজতিমার মাঠে কম-বেশি ৫৪টি নজম (সার্ভিস) থাকে। যেমন: বিদেশী মেহমানদের খেদমত, দেশী মেহমানদের খেদমত, দেশী ও বিদেশী মেহমানদের ইস্তিকবাল (অভ্যর্থনা), পাহারা, অর্থ, পানি, বিদ্যুৎ, সাফাই (পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন), মূল প্যান্ডেল, গাড়ি ব্যবস্থাপনা, আমানত (পাসপোর্ট, জরুরি ও দামী জিনিস সংরক্ষণ) ইত্যাদি। এসব জামাতের জিম্মাদারী/নেতৃত্ব কোনপক্ষের কাছে থাকবে? এসব জামাত চালানোর সাথী নির্বাচিত হবেন কী করে?

৬. খিত্তার আমির: পুরো ইজতিমার প্যান্ডেল এলাকা এবং জেলা অনুযায়ী ভাগ করা থাকে।যেটাকে ‘খিত্তা’ বলে। এই খিত্তার জিম্মাদার সেই পুরো এলাকা বা জেলার দায়িত্বে/জিম্মাদারীতে থাকেন। খিত্তার জিম্মাদার কে হবেন? একপক্ষের কেউ হলে অন্যপক্ষ তাঁকে মানবেন? অন্যপক্ষের নেতৃত্বে ইজতিমার সব কাজ, আ’মাল ইত্যাদি করবেন?

৭. স্থান সংকুলান: এটি তো সবচেয়ে বড়ো সমস্যাগুলোর একটা! ইজতিমা মাঠে শোয়া, বয়ান শোনা, অজু, গোসল, টয়লেট ব্যবহার ইত্যাদির শুধু অসুবিধা নয়, ভয়াবহ অসুবিধা হবার কারণে বিগত প্রায় ৮/১০ বছর ধরেই ইজতিমা দু’ধাপে হয়ে আসছে। একেক ধাপে ৩২ জেলা করে আসেন। তাতেও পেশাব- পায়খানা করতে গেলে ১০/১২ জনের পেছনে লাইনে দাঁড়াতে হয়। অজু করতে গিয়ে দেরি হয় বলে, অনেক সাথী অনেক সময় নামাজের জামাতেই শরিক হতে পারেন না। এখন ৬৪ জেলা একসাথে ইজতিমা করলে এসব সমস্যার সমাধান কী করে হবে?

৮. ‘বিশ্ব ইজতেমা’, বিদেশী মেহমান: সবার আগে বোঝা দরকার। আমাদের এই ইজতিমাকে ‘বিশ্ব ইজতেমা’ এই জন্য বলে যে, সারা পৃথিবী থেকে তাবলীগের শুরা, ফায়সাল, মুরুব্বিগণ টঙ্গীতে আসেন তাঁদের দেশের তাবলীগের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে পরামর্শ করতে এবং সেসব বিষয়ে দিকনির্দেশনা নিয়ে যেতে; তাঁদের দেশের ইজতিমা/জোড় পরবর্তী বছর কখন হবে। সেই বিষয়ে সিদ্ধান্ত জেনে নিতে। বিগত ২২ বছর ধরে তাবলীগের বিশ্ব আমির হজরত মাওলানা সা’দ এই বিষয়গুলোর সমাধান দিয়ে আসছেন,

বাংলাদেশসহ সব দেশের ইজতিমার তারিখ তিনিই নির্ধারণ করে আসছেন। সরকারের অনুরোধ মেনে মাওলানা সা’দ সাহেব যদি এবারের ইজতিমায় না আসেন, তাহলে বিদেশী মেহমানদের এবং তাঁদের দেশের এসব সমস্যার সমাধান কে করবেন? অন্য কেউ করলেও বিদেশীগণ সেসব মেনে নেবেন?

মাওলানা সা’দ সাহেব আসবেন না জানলে।তাঁরা তো ইজতেমাতেই আসবেন না। যেমন: গত বছর মাওলানা সা’দকে ইজতিমায় অংশগ্রহণ করতে টঙ্গী যেতে দেয়া হয়নি, তিনি কাকরাইলে ছিলেন। বিদেশী প্রায় ৪০ দেশের তাবলীগের সাথী এবং মুরুব্বীগণ ময়দান ছেড়ে তাঁর কথা শোনার জন্য এবং তাঁর পরামর্শ নেয়ার জন্য কাকরাইলে চলে আসেন।

কাজেই আশঙ্কাজনকভাবে বাংলাদেশ বিদেশী মেহমান হারাবে না? এটি তখন আর ‘বিশ্ব ইজতিমা’ থাকবে? ‘জাতীয় ইজতিমা’ হয়ে যাবে না?

সম্ভাব্য সমাধান:

স্থাান সংকুলান না হবার কারণে সকলের সম্মতিতে বিগত প্রায় ৮/১০ বছর ধরেই ইজতিমা দু’ধাপে হয়ে আসছে। এবারও সেভাবে হতে পারে। আগের ধারাবাহিকতা অনুযায়ী বিষয়টি ‘এক ইজতিমা’ হিসাবেই গণ্য হতে বাধা নেই।

প্রার্থনা হলো, যাবতীয় সমস্যা এবং অনাকাঙ্খিত ঘটনা এড়াতে প্রথম ধাপে নিজামুদ্দীন মার্কাজের অনুসারীগণ এবং দ্বিতীয় ধাপে অন্যপক্ষ ইজতিমা করতে পারেন। ইজতিমায় যার যার পছন্দমতো দেশি- বিদেশী মেহমান আনা থেকে শুরু করে বয়ান, আ’মাল, তদারকি, দু’আ ইত্যাদি দু’পক্ষ যার যার মতো

করে করবেন, অন্যপক্ষ সেসবে কোনো বাধা দেবেন না। বরং স্থাান সংকুলান এবং অন্যান্য সমস্যার কারণে একপক্ষের সাথীগণ অন্যপক্ষের ইজতেমাতে আসবেনই না। শঙ্কামুক্ত ইজতেমা হলো, ’এক ইজতেমা’।

Facebook Comment





© All rights reserved © 2020 TabligNewsBD.Com
Design & Developed BY PopularServer.Com