শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০৯:২৫ পূর্বাহ্ন

সংবাদ শিরোনাম ::
ধন্যবাদ মাননীয় প্রধানমন্ত্রী| তাবলীগের সাথে আমার আত্মার সম্পর্ক

ধন্যবাদ মাননীয় প্রধানমন্ত্রী| তাবলীগের সাথে আমার আত্মার সম্পর্ক

ড. কাজী এরতেজা হাসান| উপদেষ্টাঃ তাবলীগ নিউজ বিডিডটকম

সদ্য কৈশোরে পদার্পণ, সেই থেকে শুরু। জীবনের প্রায় তিন দশক ধরে আল্লাহর রাস্তায় সফর ও তাবলিগের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে পড়ি। টঙ্গীর বিশ্ব ইজতেমা ময়দানের কত শত ধুলো এ গায়ে লেগে আছে তার হিসাব মেলাতেও চাই না। আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের নৈকট্য লাভের জন্য দ্বীনের পথেই আমৃত্যু থাকতে চাই। সাম্প্রতিক সময়ে তাবলিগের সংকটময় পরিস্থিতি কিছুটা কাটিয়ে উঠেছে। তাই সব জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে দুই পর্বেই হচ্ছে আসন্ন বাংলাদেশের ইজতেমা।

পাকিস্তান আলমি শুরাপন্থিরা ইজতেমা করবেন ১৫ ও ১৬ ফেব্রুয়ারি আর তাবলিগের মূলধারার সাথিরা বিশ্ব ইজতেমা করবেন ১৭ ও ১৮ ফেব্রুয়ারি। মঙ্গলবার ধর্ম মন্ত্রণালয়ে এই সিদ্ধান্তের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রশংসিত হচ্ছে এই যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত। প্রশংসায় ভাসছেন বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা। সংঘাতময় পরিস্থিতিতে তাবলিগের বিবাদমান দুপক্ষের ইজতেমা নিয়ে সারাদেশে উৎকণ্ঠা ছিল। এ নিয়ে গত কয়েক মাস ধরে চলছিল বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে দফায় দফায় বৈঠক।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বারবার একত্রে বিশ্ব ইজতেমা করার ব্যাপারে দৃঢ় প্রত্যয় প্রকাশ করলেও তাবলিগের মুরুব্বিরা বলে আসছিলেন, নিজামুদ্দিন বিশ্ব মারকাজের মুরুব্বিদের একক নিয়ন্ত্রণ ছাড়া বিশ্ব ইজতেমা করলে বিশ্বব্যাপী তাবলিগের কাজ ক্ষতিগ্রস্ত হবে, বিদেশি মুসল্লিরা বিশ্ব মারকাজ ও বিশ্ব আমির ছাড়া ব্যাপকভাবে ইজতেমায় অংশগ্রহণ করবে না। এতে করে মূলত বাংলাদেশ ও সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হবে আর বাংলাদেশ থেকে বিশ্ব ইজতেমার ক্ষমতা ও সম্মান খর্ব হওয়াসহ অর্ধ শতাব্দীর ঐতিহ্য বিনষ্ট হতে পারে।

ধর্ম মন্ত্রণালয়ের সভাক্ষকে ধর্মপ্রতিমন্ত্রী শেখ মো. আব্দুল্লাহর সভাপতিত্বে এক বৈঠকে দুই পর্বে আলাদা বিশ্ব ইজতেমার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। এ সময় কাকরাইলের আহলে শুরা তাবলিগের শীর্ষ মুরুব্বি সৈয়দ ওয়াসিফুল ইসলাম, খান শাহাবুদ্দীন নাসিম, মাওলানা জুবায়ের ও মাওলানা উমর ফারুক উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে হেফাজতসহ তৃতীয়পক্ষের কোনো মুরুব্বি সেখানে উপস্থিত ছিলেন না। অনেকেই মনে করছেন, তৃতীয়পক্ষকে বাদ দিয়ে বসার কারণেই তাবলিগের দুপক্ষ সরকারের সাথে বসে সুন্দর সমাধান করতে সক্ষম হয়েছে।

সাধারণ তাবলিগের সাথিরা শুরু থেকেই বলে আসছিলেন, হেফাজতপন্থি ও পাকিস্তানী শুরাপন্থিরা যদি দিল্লির বিশ্ব মারকাজ ও বিশ্ব আমির মাওলানা সা’দ কান্ধলভীকে বাদ দিয়ে ইজতেমা করতে চান তাতে আমাদের কোনো আপত্তি নেই। কিন্তু ধর্মীয় স্বাধীনতায় তো বাঁধা দেওয়ার অধিকার কারো নেই। আমি ধর্মের দাওয়াত দেবো। আপনি যদি না নেন সেটা আপনার ব্যাপার। কিন্তু আমাকে তো বাঁধা দিতে পারেন না। ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রে নানা মতবাদের মানুষ যুগ যুগ ধরে তাদের ধর্মীয় কাজ করে আসছে। যখন বাঁধা দেওয়া হবে বা কারো উপর কিছু চাঁপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হবে তখন যেকোন পক্ষ থেকেই ধর্মীয় সংঘাত ও গৃহযুদ্ধের পথ তৈরি হবে। আজ বড় ধরনের জটিলতার সমাধান হলো। বিশ্ব ইজতেমার মতো সারাদেশে তাবলিগের কাজ আলাদাভাবে চলুক, এটিই শান্তিকামী মুসল্লীদের কামনা।

এদিকে তাবলিগের মূলধারার মুরুব্বিরা মনে করছেন, আলাদা ইজতেমার কারণে রাহুমুক্ত হয়েছে অর্ধশতবর্ষী বিশ্ব ইজতেমা। নতুবা পাকিস্তানের গভীর ষড়যন্ত্রই বাস্তবায়িত হত বলে কাকরাইলের মূলধারার মুরুব্বিরা মনে করেন। মঙ্গলবার ধর্ম প্রতিমন্ত্রীর মধ্যস্থতায় এমন সিদ্ধান্তে তাবলিগের বিশ্ব ইজতেমা অন্তত একপর্বে হলেও আন্তর্জাতিক মান ধরে রাখতে পারবে বলে মূলধারার সাথীরা আশা করেন।

সরকারের চিন্তাধারা ও ঐক্যপক্রিয়াকে শ্রদ্ধা দেখিয়ে একত্রে বিশ্ব ইজতেমায় কাকরাইলের আহলে শুরা সৈয়দ ওয়াসিফুল ইসলাম ও খান মোহাম্মদ সাহাবুদ্দীন নাসিম রাজি হলেও নিজামুদ্দিন মারকাজের অধীনে ছয় যুগ ধরে চলে আসা বিশ্ব ইজতেমা পূর্বের মতোই বিশ্ব আমির মাওলানা সা’দ ও নিজামুদ্দিন মারকাজের তত্ত্বাবধানেই যেকোনো মূল্যে করতে চান তাবলিগের ৬৪ জেলার সাথিরা। তারা কোনোভাবেই মাওলানা জুবায়েরের সঙ্গে রাজনৈতিক স্টাইলে ইজতেমা নামক কোনো জাতীয় সমাবেশে শরিক হতে আগ্রহী ছিলেন না। তারা মনে করেন, মাওলানা জুবায়ের তার কথার উপর স্থীর থাকার যোগ্যতা হারিয়ে ফেলেছেন। তিনি এখন রাজনৈতিক আলেমদের দ্বারা প্রভাবিত ও নিয়ন্ত্রিত। ইজতেমা তখনি বিশ্বমানের হবে যখন বিশ্ব আমির মাওলানা সা’দ কান্ধলভী যেভাবে পূর্বে আসতেন সেভাবেই আসবেন। তিনি আরব, ইউরোপ, আমেরিকা, আফ্রিকাসহ সারা বিশ্বে ইজতেমা করছেন। অথচ কোথাও কোন সমস্যা বা বাঁধা আসছে না। তাকে নিয়ে বিশ্ব মারকাজের তত্ত্বাবধানে বিশ্ব ইজতেমা হলেই ইজতেমা বিশ্ব মানের হবে। অংশ নিবে সারা বিশ্বের মুসল্লীরা। সরকার পাবে তার হাজার কোটি টাকার রাজস্ব।

উল্লেখ্য যে, মাওলানা জুবায়েরের একের পর এক হঠকারী সিদ্ধান্ত ও উগ্রপন্থী ঐক্যবিরোধী আচরণন কোনভাবেই মেনে নিতে পারছেন না তৃনমূলের তাবলীগের সাথীরা। এ বিষয়ে সৈয়দ ওয়াসিফুল ইসলাম দৈনিক ভোরের পাতাকে বলেছেন, আমরাতো বিশ্ব ইজতেমা করতে সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছি। নিজামুদ্দিন মারকাজের মুরুব্বীদের নিয়েই আমরা বিশ্ব মানের বিশ্ব ইজতেমা করব। সারা দুনিয়ার মেহমানরা আসবেন ইনশাআল্লাহ। আমরা দুই পর্বে বিশ্ব ইজতেমার সরকারী সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানাই। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে আমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি।

তাবলীগের এই চলমান বিরোধিতার মূল নেপথ্যের কারণ সম্পর্কে অনেকেরই জানা নেই।পাকিস্তানের মৌলভী ফাহিমের নেতৃত্বে ২০১৫ সালে পাকিস্তান ইজতেমার সময় কথিত আলমী শুরার নাম ব্যাবহার করে নিজামুদ্দিন মারকাজের ভিতরে লুকিয়ে থাকা স্বার্থন্বেষী ক্ষুদ্র একটি গ্রুপকে ব্যবহার করে তাবলীগের বিশ্ব আমীরকে সরানোর চেষ্টা করা হয়। ভারতসহ মুসলিম বিশ্বে এরা পুরাপুরিই ব্যার্থ হয়ে শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশে ক্বারী জুবায়ের ও তার কতিপয় বন্ধুকে ব্যবহার করে বাংলাদেশে পাকিস্তানপন্থী কিছু আলেমকে সামনে নিয়ে বিশ্ব ইজতেমা বানচালের সুগভীর ষড়যন্তের মিশন বাস্তবায়ন করেন ড. আব্দুল আউয়াল ও সাবের ক্যাপাডিয়া। প্রথমে কোন সুবিধা না করে দেওবন্দের কাছে মাওলানা সাদ কান্ধলভীর সাতটি বয়ানকে কাটছাট করে ফতোয়া চাওয়া হয়। দেওবন্দ এ বিষয়ে তার (মাওলানা সা’দ কান্ধলভীর) মতামত জানতে চাইলে তিনি এর ব্যাখ্যা দেন। পরে একটি বিষয়ে দেওবন্দ আপত্তি করলে তিনি প্রকাশ্যে তা প্রত্যাহার করে নেন। কিন্তু বিরোধীরা নতুন চাল খেলতে থাকে এবং তাবলীগে বিভক্তির চেষ্টা করলে দেওবন্দ স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেয় যে, তারা কোন পক্ষের সাথে নেই।

মূলত ২০১৬ এর শেষের দিকে পাকিস্তানের রায়বেন্ড মারকাজের মুরুব্বী ফাহিমের প্রচেষ্টায় আনুষ্ঠানিকভাবে তাবলীগ নিয়ে ফেৎনা শুরু হলেও দেওবন্দের দোহাই দিয়েই বাংলাদেশর কিছু আলেম সরাসরি পাকিস্তানের প্রস্তাবিত আলমী শুরার পক্ষে চলে যান। পাকিস্তান ১৯৪৭সালের দেশভাগের পর থেকে তাবলীগের বিশ্ব মারকাজ দিল্লীর নিজামুদ্দিন মারকাজের নেতৃত্ব মেনে নিতে পারছিল না। তারা বিশ্ব মারকাজ ও বিশ্ব ইজতেমাকে সারা দুনিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন করে এর ক্ষমতাকপ খর্ব করা ও সরিয়ে নেয়ার ষড়যন্ত্র হয়প আসছিল। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপে বাংলাদেশে নিজামুদ্দিন মারকাজের অধিনে বিশ্ব ইজতেমার আলাদা তারিখ করে দিয়ে বাংলাদেশকে পাকিস্তানী চক্রান্ত থেকে বাচালেন। এতে করে বাংলাদেশর ঐতিহ্য ও গর্বপর প্রতীক বিশ্ব ইজতেমা তার আপন প্রাণে ফিরে আসবে।

ইসরাইলি ষড়যন্ত্রে পাকিস্তানের ফাহিম আমেরিকাতে বসে বাঙ্গালী ড. আউয়াল ইহুদী লবীর শক্তিশালী এজেন্ট তার ঘনিষ্ট দুই বন্ধু আব্বাস প্যাটেল, সাবের কাপাডিয়াকে নিয়ে তাবলীগ নিয়ে চলমান সংকট তৈরির মাষ্টার প্লেন তৈরি করেন। তাবলীগ নিয়ে আন্তর্জাতিক মোসাদ, আইএসআইসহ নানান গোয়েন্দা সংস্থার ষড়যন্ত্রের ভয়ংকর তথ্য বেরিয়ে এসেছে নানান সময়।

কিভাবে বিভিন্ন বিদেশী গোয়েন্দা সংস্থা ও এজেন্টদের সরাসরি হস্তক্ষেপে বাংলাদেশে তাবলীগ বিরোধী আন্দোলন ও ধর্মীয় সংঘা নীল নকশা তৈরি করা হয় । বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২৩দলীয় ঐক্যজোটের কয়েকজন ইসলামী ডাকসাইটের পাকিস্তানপন্থী নেতাকে হাত করে বাংলাদেশে জমহুর নামক একটি আন্দোলনের জন্ম দেন আমেরিকা প্রবাসী ড. আউয়াল। এ বিষয়ে তিনি ঘন ঘন পাকিস্তান সফর করেন। নানান সূত্রে জানা যায়, বেশ কয়েকবার আব্বাস প্যাটেল, সাবের কাপাডিয়া ও আব্দুল আউয়ালের সাথে পাকিস্তানে বাংলাদেশের মাওলানা উমর ফারুক, মাওলানা আব্দুল মতিন, উবায়দুল্লাহ ফারুকদের বৈঠক হয় আইএসআইর মধ্যস্থতায়। তাদের পাসপোর্ট চেক করলেই প্রসাশনের কাছে এসব তথ্য স্পষ্ট হয়ে উঠবে।

অপর দিকে মিশরের নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন ইখওয়ানুল মুসলিমিনের বাংলাদেশের এজেন্ট হিসাবে জেলখাটা উত্তরার এক মসজিদের খতিব সাবেক বাদ্রারহুড নেতা ও মাওলানা শাহরিয়ার মাহমুদকে ব্যবহার করে ওজাহাতি ফান্ডিং আমেরিকা ও পাকিস্তান থেকে আসতে থাকে। তাদের সাথে ঢাকার মোহাম্মদপুরের অর্থলোভী দুই সহোদর ছাহেবজাদা সংযুক্ত হয়ে মাঠে নামেন। মোটা অংকের টাকা দিয়ে খরিদ করা হয় চট্টগ্রামের এক ছাহেবজাদাকে। এভাবে পাকিস্তানি চক্রান্তে গড়ে তোলা হয় বাংলাদেশে ধর্মীয় সাম্প্রদায়িক সংঘার্ত তৈরির নীল নকশা।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সরাসরি হস্তক্ষেপে দুই পর্বের ইজতেমা ও তাবলীগের বিবাদমান দু’পক্ষের যার যার কাজ স্বতন্ত্রভাবে করতে পারাই মূলত বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক সম্প্রতি বজায় থাকার উত্তমপন্থা। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার বিচক্ষণতা ও দু্রদর্শী নেতৃত্বে বাংলাদেশ সকল চক্রান্ত মোকাবেলা করে ধর্মীয় সম্পৃতি ও সকল সহিংসতা এড়িয়ে সবাইকে নিয়ে এগিয়ে যাবে বহু দূর।

সম্পাদক, দৈনিক ভোরের পাতা

Facebook Comment





© All rights reserved © 2020 TabligNewsBD.Com
Design & Developed BY PopularServer.Com