সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০৭:৩৮ অপরাহ্ন

রহমতের বারিধারায় শিক্ত মকবুল এক কাফেলা: মুফতী আতাউর রহমান

মুফতী আতাউর রহমান : উপদেষ্টা, তাবলীগ নিউজ বিডিডটকম

এবার ইজতেমায় রহমতের বারিধারায় শিক্ত হয়েছিলেন আনুগত্যশীল এক জামাত ও আল্লাহর পথের পথিকরা। গত রোববার তাবলীগের মূলধারার সাথীদের বিশ্ব ইজতেমা শুর হয় ফজরের পর থেকে। সুবহে সাদিকের পূর্ব থেকেই ময়দানের দিকে আসতে শুরু করে দলে দলে দায়ীদের কাফেলা।

মাঠে এক দু’পা ফেলতেই আকাশ থেকে ফোটায় ফোটায় বৃষ্টি পড়তে থাকে। আস্তে আস্তে ভোরের আলো উদ্ভাসিত হওয়ার বদলে আকাশে কাল মেঘের ঘনগর্জন ও ভারী বৃষ্টি আসতে শুরু করে। বৃষ্টিস্নাত হয়েই দলেদলে লাখ লাখ মুসল্লী রহমতের বারিধারায় শিক্ত হয়ে ইজতেমার ময়দানে প্রবেশ করেন।

মুবাল্লীগ সাথীরা নিজেদের স্ব স্ব জামাতের ওয়াটারপ্রুফ সামিয়ানা টাঙ্গিয়ে আল্লাহর দিকে মুতাওয়াজ্জু হয়ে যান। লাখ লাখ সাথী চিৎকার করে বলতে থাকেন  اللهم حوالينا و لا علينا ভাবে চলতে থাকে প্রায় দুঘন্টা।  ততোক্ষণে সাথীদের উপস্তিতি ক্রমশ বেড়েই চলছিল। আল্লাহর রাস্তায় অল্প কষ্ট জাহান্নামের আগুনকে নিভিয়ে দেয়ার ওয়াদা আছে। সাথীরা তাই সেই বৃষ্টিভেজা কষ্টকে রহমত ও মাগফিরাতের ওসিলা হিসাবেই দেখছিলেন।

ততোক্ষণে ময়দানে প্রবেশ করেন নিজামুদ্দিন ও কাকরাইলের মুরুব্বীগন। চলতে থাকে দোয়া, ফিকির ও মাশওয়ারা। আস্তে আস্তে আকাশের মেঘ কাটতে থাকে। পরিস্কার হতে থাকে চারদিক। বৃষ্টি থেমে যায়।

একদল মকবুল বান্দার দোয়াকে আল্লাহ কবুল করে দেখান নগদে। কিছুক্ষণ পরেই আধার কেটে ভেসে উঠে সূর্যের আলো।রৌদ্রস্নাত আকাশ ঝলমল করে উঠে।  খড়া রৌদ্রে অল্পক্ষণের ভিতরেই সব শুকিয়ে যায়।

ইজতেমার ময়দানে আসহাবে বদরিনদের মতো বালিকনা বৃষ্টিতে বসে মাঠ আরো মজবুত ও পরিচ্ছন্ন হয়ে যায়। বদরের যুদ্ধের দিনের মতো এ যেন মাহবুবে হাকীকীর পক্ষ থেকে ছিল বৃষ্টিস্নাত ইস্তেকবাল।

সাথীরা আপন জায়গায় বিছানা বিছাতে শুরু করেন। হেঁসে উঠে কুদরতি আকাশ। মওলা পাকের এই অভ্যার্থনায় হেসে উঁঠে শুকিরিয়াতান আল্লাহ ওয়ালাদের দ্বীল। মাবুদ তুমি সবই পার। সবকিছু তোমার পরম অনুগ্রহ ও দান।

এই রহমতের বারিধারায় আমাদের কতিপয় বন্ধু আহবাব অনেক খুশি হয়ে নানান অপপ্রচার বিভ্রান্তি ও  মন্তব্য করতে থাকেন। এযেন সেই হাদীসের মতো,  রাসুল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, আজকের বৃষ্টি কারো ঈমান বাড়িয়ে দেব আর কাউকে মুনাফেক বানিয়ে দিবেন।

কিন্তু তারা জানতেন না,  মওলা পাকের পক্ষ থেকে এই রহমতের বারিধারায় বৃষ্টিস্নাত ইস্তেকবাল তিন দিনের এই মকবুল এই ইজতেমায় অনেক উপকার পৌছে দিয়েছে। যেমন-

(১) তিনদিন পুর্নাঙ্গ ইজতেমা: প্রসাশনের পক্ষ থেকে ইজতেমার তারিখ করা ছিল ১৫,১৬,১৭,১৮ ফেব্রুয়ারি।  সে হিসাবে গতকাল সোমবার ইজতেমা শেষ হওয়ার কথা ছিল। সরকার ও প্রসাশনের পক্ষ থেকে গতকাল  অফিস আদালত বন্ধ করে সে ভাবেই প্রস্তুতি ছিল। তাবলীগের মুরুব্বিদের উপর ১৮,তারিখ আখেরী মোনাজাত করতে প্রচন্ড চাপও ছিল। তখন একদিনের মাথায় ইজতেমা শেষ হয়ে যেত। কিন্তু ঘন্টা -দু’য়েক এই রহমতের বারিধারা সেই চাপকে ধুয়েমুছে সবার অন্তর পরিস্কার করে খুব সহজে মঙ্গলবার আখেরী মোনাজাত করার সিদ্ধান্ত হয় এবং তা ব্যাপকভাবে মিডিয়াতে প্রচারিত হয়। এটি ছিল মওলা পাকের পক্ষ থেকে রহমতের বারিধারার প্রথম নুছরত।

(২) ময়দান পরিস্কার:  মূলধারার সাথীদের ইজতেমার আগে আরেকটি মজমা এখানে  অবস্থান করে ছিল। যার ৮০ভাগ ছিল মাদরাসার ছাত্র ও শিশু কিশোর। ইজতেমায় থাকা খাওয়া চলাফেরা ও পয়-পরিস্কারের ব্যাপারে ছিল অনভিজ্ঞ। ফলে ময়দান নোংড়া ছিল সিমাহীন। রাতভর হাজার হাজার সাথী পরিস্কার করার পরেও পচাভাসী খাবার ও ময়লার দুর্ঘন্ধ যাচ্ছিল না। বৃষ্টি এসে সব ধুয়ে পরিস্কার করে আল্লাহর পথের মেহমানদের পবিত্র পাক সাফ এক ময়দান  নিজের কুদতরত দ্বারা করে দেন।

(৩) মুন্তাখাব মজমা: একবছর মেহনতের পর সাহাবায়ে কেরামের নকশায় হযরতজী মাওলানা মোহাম্মদ ইলিয়াস রহ আমীর ভিত্তিক দাওয়াতের কাজে,  এক আমীরের আনুগত্য করে এক খালেছ মজমা সারা দেশে আল্লাহপাক দাড় করিয়েছেন।  মূলধারা ইজতেমার রাতেই মুবাল্লীগরা চলে আসেন। রোববার সকালে সাড়াদেশের সাধারণ লোকজন যখন আশা শুরু করেছিল। যাদের বড় অংশ ইজতেমায় এসে কেনাকাটা ঘুরাফিরা ও ভীর জমাত। তারা বৃষ্টি দেখে থমকে যান।  একেবারে নির্বাচিত খালেছ, বাছাইকৃত মুবাল্লীগ ও মাহবুব বান্দাদের দিয়ে আল্লাহ পাক সহলতের সাথে একটি আনুগত্যশীল ইজতেমা বৃষ্টি দিয়ে করিয়ে দেন, আপন মেহেরবানীতে।

(৪) দোয়া কবুল: বৃষ্টি আশার পর সাথীরা আল্লাহর দিকে পুরোপুরি রুজু হন। চোখের পানি ফেলেন। মওলা তার প্রিয় বন্দার চোখের পানিতে খুশি হন।  এভাবে ইজতেমায় তার প্রিয় বান্দাদের চোখের পানি ও দোয়া দেখে মওলা খুশি হয়ে যান। প্রচন্ড বৃষ্টি আর আকাশের কাল মেঘ মুহুর্তে সড়িয়ে নেন আল্লাহ পাক নিজ কুদরতদ্বারা। আল্লাহ সরাসরি গায়বি মদদ ও নুসরত করে এই মজমার মকবুলিয়ত প্রমাণ করে দেন।যে হালতের মুকাবিলায় তোমরা আমার কাছে চাইবে। আমি এভাবেই তোমাদের মাথার উপর থেকে সকল মেঘ সরিয়ে নিব।

 

(৫) হিম্মত বাড়ানো: আল্লাহ রব্বুল আলামীন তার কুদরতী এই বৃষ্টিস্নাত ইস্তেকবাল করে ময়দানে আশা লক্ষ লক্ষ সাথীদের হিম্মত বাড়িয়ে দেন। হালত দিয়ে তাদের দ্বীলের অবস্থা দেখেন। তারপর নগদ দোয়া কবুল করে মুবাল্লীগ সাথীদের হিম্মত বাড়িয়ে দেন। তার নিজ চোখে দোয়া কবুলের কুদরত দেখে সকল হালতের মোকাবেলায় পাহাড়সম হিম্মত নিয়ে আজ আখেরী মোনাজাত করে মেহনতের ময়দানে আবার ছড়িয়ে পড়বেন।

সর্বপরি বদরের মকবুল যুদ্ধের সাথে মিলে যায় এই তিনদিন ব্যাপি ইজতেমার মকবুলিয়ত। এযেন,  إن العطايا علي متن البلايا সব সময় পুরস্কার যা আসে মসিবতের কাঁধের উপর সওয়ার হয়ে। এভাবে এই বৃষ্টিস্নাত রহমতের বারিধারা এসেছিল মহা পুরস্কার হিসাবে আসহাবে বদরিনদের মতো মহা বিজয় ও  নুছরত নিয়ে। অনুলিখন: সৈয়দ আনোয়ার আবদুল্লাহ

 

লেখক, তাবলীগের শীর্ষ মুরুব্বি,  মুহতামীম : মাদরাসায়ে মঈনুল ইসলাম বারিধারা, ঢাকা।

 

Facebook Comment





© All rights reserved © 2020 TabligNewsBD.Com
Design & Developed BY PopularServer.Com