রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০৪:৪২ অপরাহ্ন

২২১ জন ছাত্রের ভবিষ্যত নিয়ে ছিনিমিনি খেলছে হাইয়াতুল উলিয়া ও বেফাক; নাটের গুরু মাহফুজুল হক

২২১ জন ছাত্রের ভবিষ্যত নিয়ে ছিনিমিনি খেলছে হাইয়াতুল উলিয়া ও বেফাক; নাটের গুরু মাহফুজুল হক

নিজস্ব প্রতিবেদক; তাবলীগ নিউজ বিডিডটকম

কওমী মাদরাসার জাতীয় শিক্ষাবোর্ড বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া ও নবগঠিত সরকার অনুমোদিত শিক্ষাবোর্ড হাইয়াতুল উলিয়া লিল জামিয়াতিল কওমিয়া বাংলাদেশ আসন্ন দাওয়ারায়ে হাদীস (মাস্টার্স) ও বেফাকের অধীনে মেশকাত (স্নাতক) ক্লাসের সমাপনী পরীক্ষার্থী ২২১ ছাত্রকে নিয়ে ছিনিমিনি খেলছে সংশ্লিষ্ট এই দু’টি বোর্ড। ৬টি কওমী শিক্ষাবোর্ড নিয়ে শিক্ষামন্ত্রণালয়ের অধীনে গঠিত বোর্ড হাইয়াতুল উলিয়া এবং বেফাকের সভাপতি একই ব্যক্তি হওয়ায় অন্যান্য বোর্ডের প্রধানদের মতামত ও শিক্ষামন্ত্রণালয়ের নীতিমালাকে উপেক্ষা করেই এসব ছাত্রের পরীক্ষা নিয়ে একের পর এক নাটকীয়তা করা হচ্ছে। আর এসবের পিছনে নাটের গুরু হিসেবে কাজ করছে বিতর্কিত একটি জাতীয় প্রতিষ্ঠানের নাম ভাঙ্গিয়ে খেলাফত মজলিসের মহাসচীব মাওলানা মাহফুজুল হক, সহ আরো কয়েকজন।

জানা যায়, সম্প্রতি তাবলীগ জামাতের বিশ্ব আমীর শায়খুল হাদীস আল্লামা সাদ কান্ধলভীর অনুসারীদের পরিচালিত সকল মাদরাসার ছাত্রদের পরীক্ষা স্থগিত করেছে বেফাক ও হাইয়াতুল উলিয়া। এর মাঝে চট্টগ্রামের লালখান বাজার মাদরাসা সহ মোট ৮টি মাদরাসার ছাত্রদের সমাপণী পরীক্ষা বাতিলের বিষয়টি বিভিন্ন গণমাধ্যম ও নানান সূত্রে দেশব্যপি ছড়িয়ে পড়ে। অনুসন্ধানে জানা যায়, বেফাকের বৈঠকে কয়েকজন ব্যক্তি বসে আল্লামা আহমদ শফীকে প্রভাবিত করে হাইয়াতুল উলিয়ার নামে সংবিধান বহির্ভূত এসব প্রচারণা চালিয়ে ছাত্রদেরকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করে।

হাইয়াতুল উলিয়ার সাথে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানিয়েছে, ৬ বোর্ডের প্রধানদের যৌথ সিদ্ধান্ত ছাড়া এককভাবে কেউ কোন ধরণের সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার রাখে না। আর গঠনতন্ত্র অনুযায়ী রেজিষ্ট্রেশনের পর হুট করে ছাত্রদের ব্যপারে এরকম আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত নেওয়ার কোন আইনী বৈধতা নেই। এ ব্যপারে হাইয়াতুল উলিয়ার কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করা হলে তারা কোন সদুত্তর কিংবা লিখিত বিবরণ দিতে ব্যর্থ হন।

তাহলে মিডিয়ার মাধ্যমে কেন এ ধরণের বিভ্রান্তিকর অপপ্রচার চালানো হচ্ছে, এ নিয়ে সংশ্লিষ্ট মাদরাসা সমূহের পক্ষ থেকে চাঁপ সৃষ্টি করলে গত শুক্রবার মাওলানা সাদ কান্ধলভীর অনুসারী ৮টি বড় মাদরাসার মুহতামিমকে ফোন করে হাইয়াতুল উলিয়ার অফিস সহকারী ওসিউর রহমান জানান,  হাইয়াতুল উলিয়ার কো-চেয়ারম্যান মাওলানা আশরাফ আলী আগামী ২৪শে মার্চ সকাল দশটায় বেফাক অফিসে আনুষ্ঠানিক বৈঠকে উপস্থিত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন।

যথা সময়ে সকার দশটায় ৮টি মাদরাসার প্রধান বেফাক অফিসে উপস্থিত হলে বেফাক কিংবা হাইয়াতুল উলিয়ার কাউকে সেখানে পাওয়া যায় নি। বেফাকের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক মুফতি আবু ইউসুফ কিছুক্ষণ পর এসে জানান, আজকের বৈঠক সম্পর্কে আমরা কেউ কিছু জানি না। তখন ওসিউর রহমানের সাথে যোগাযোগ করলে তিনি বলেন, “মাওলানা আশরাফ আলী সাহেব বৃদ্ধ মানুষ। তিনি দাওয়াত দিয়েও ভুলে গেছেন।” তখন তিনি যোগাযোগ করে জানান, এ বিষয়ে হাইয়াতুল উলিয়া ও বেফাকের পক্ষ থেকে তাদের সাথে কথা বলবেন বেফাকের মহাপরিচালক জুবায়ের আহমদ চৌধুরী। দীর্ঘ দেড় ঘন্টা অপেক্ষার পর তিনি এসে বলেন, “আমাদের সর্বসম্মতিক্রমে সিদ্ধান্ত হয়েছে, আপনারা সাদ সাহেবের পক্ষ ছেড়ে আহমদ শফী সাহেবের পক্ষ গ্রহণের লিখিত ঘোষণা পেশ করলে আমরা আপনাদের মাদরাসার ছাত্রদের পরীক্ষা গ্রহণ করবো।” তখন প্রতিনিধি দলের প্রধান, বারিধারা মুঈনুল ইসলাম মাদরাসার সুনামখ্যাত মুহতামিম মুফতি আতাউর রহমান বলে দেন “আপনারা যেমন হক মনে করে সাদ সাহেবের বিরোধিতা করছেন, আমরা তারচে’ দ্বিগুণ হক মনে করে সাদ সাহেবের অনুসরণ করে যাচ্ছি।” তখন বেফাকের মহাপরিচালক বলেন, “আমরা আমাদের অবস্থান থেকে কিছুটা সরে এসেছি। আপনাদের ছাত্রদের পরীক্ষা আমরা সরাসরি বেফাক ও হাইয়াতুল উলিয়ার অধীনে গ্রহণ করবো। আপনাদের মাদরাসার নামে নয়। তবে ফল প্রকাশের আগে যদি আপনারা বর্তমান অবস্থা থেকে সরে আসেন তাহলে আপনাদের প্রতিষ্ঠানের নামেই ফলাফল প্রকাশ করা হবে।”

এ বিষয়ে আপত্তি জানান সংশ্লিষ্ট ৮টি মাদরাসার কর্তৃপক্ষ। তারা এই সিদ্ধান্তের লিখিত কপি তলব করেন। তখন মহাপরিচালক লিখিত দিতে অপরাগতা প্রকাশ করে বলেন, “আমি শুধু মুরুব্বীদের সিদ্ধান্ত আপনাদেরকে জানিয়ে দিলাম। আমার এ বিষয়ে নিজ থেকে করার কোন অধিকার নেই।” তখন তিনি বেফাকের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক মুফতী আবু ইউসুফকে উপরোক্ত ৮টি মাদরাসার ছাত্রদের রেজিষ্ট্রেশন ও পরীক্ষা ফী গ্রহণের নির্দেশ দেন। এসময়ে মাহফুজুল হক বেফাকের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রককে ফোনে হুমকি-ধমকি দিয়ে বলেন, “আপনাকে সাদপন্থীদের ওকালতি করতে কে বলেছে? এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকার মহাপরিচালকের নেই। আমি মাত্রই মহাসচিবের সাথে কথা বলেছি। তিনি এই সিদ্ধান্ত স্থগিত করতে বলেছেন।”

তার সাথে কথা বলার পরপরই শুরু হয় নতুন নাটকীয়তা। বেফাকের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক মহাপরিচালকের কাছে ফোন দিলে তিনি মহাসচিবের সাথে আলাপ করে জানানোর কথা বলেন। দীর্ঘ সময় পর তিনি বলেন, মহাসচিব  পরীক্ষা ফী জমা নেওয়ার ব্যপারে সম্মতি দিয়েছেন।

এ বিষয়ে সাভার মারকাযুল উলূম আশ শারইয়ার মুহতামিম মাওলানা জিয়া বিন কাসেম বলেন, বেফাক ও হাইয়াতুল উলয়ার মত জাতীয় দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠানের কাছে ছাত্রদের ভবিষ্যত নিয়ে এমন নাটকীয়তা আমরা আশা করি না। এটা কওমী শিক্ষা ব্যবস্থার প্রতি অশনি সংকেত। চিহ্নিত কিছু লোক, বিশৃঙ্খলা তৈরীর সার্থে এসব বিষয়ে পিছন থেকে কলকাঠি নাড়ছে।

দারুল উলূম উত্তরার মুহতামিম মুফতি মু’আয বিন নূর বলেন, পার্থিব উন্নতির সাথে তাল মিলিয়ে আমাদের ধর্মীয় উন্নতি অগ্রসর না হওয়ার অন্যতম কারণ এটি। দুনিয়াবী পদগুলোতে সর্বোচ্চ যোগ্যতাসম্পন্ন ব্যক্তিবর্গকে নিয়োগ দেওয়া হয়। পক্ষান্তরে আমাদের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে সবচে’ বৃদ্ধ, নবতিপর, হীতাহীতজ্ঞানশূন্য ও অসুস্থ/অচল ব্যক্তি নিয়োগ দেওয়া হয়। যারা বৈঠক ডেকেও বার্ধক্যের কারণে ভুলে যান, না বুঝে শুধু পুতুলের মত মাথা নাড়েন। আর পেছন থেকে কলকাঠি নাড়ে স্বার্থাণ্বেষী একটি তরুণ মহল। তাদের গুটিকয়েকের কাছেই জিম্মি হয়ে রয়েছে পুরো কওমী অঙ্গন। ফলে বারবার ভুল ও আত্মঘাতি পথে পা বাড়াচ্ছে কওমী মাদরাসার সর্বোচ্চ শিক্ষাবোর্ড। তাই দেখা যায়, শিক্ষা সংক্রান্ত গবেষণামূলক কার্যক্রম রেখে শিক্ষাবোর্ড রাজনীতি ও অন্যান্য বিষয়ে সারা বছর জড়িয়ে থাকে। ফলে ক্রমশ হুমকির মুখে থুবড়ে পড়তে যাচ্ছে কওমী শিক্ষা ব্যবস্থা।

মু’আয বিন নূর আরো বলেন, ভাবতে অবাক লাগে, যারা ছোট্ট একটি শিক্ষাবোর্ড নিয়ন্ত্রণ করতে বরাবরই ব্যর্থ, তারাই আবার বিশ্বব্যপী দাওয়াত ও তাবলীগের কাজের নিয়ন্ত্রণ হাতিয়ে নিতে চায়।

 

Facebook Comment





© All rights reserved © 2020 TabligNewsBD.Com
Design & Developed BY PopularServer.Com