সোমবার, ১৫ Jul ২০১৯, ০৪:০১ অপরাহ্ন

সংবাদ শিরোনাম ::

গতকাল সিলেট ইজতেমায় যা দেখে এলাম: সৈয়দ মবনু

সৈয়দ মবনু : অতিথি লেখক, তাবলীগ নিউজ বিডিডটকম

এই লেখা আমার শ্রদ্ধেয় দাদাজী মরহুম হাজী সৈয়দ শমসেদ আলীর একটি উপদেশ দিয়ে শুরু করতে চাই। আমার বাপ-চাচা যখন প্রথম ইংল্যান্ড যান তখনও টেলিফোন, মোবাইল, ইন্টারনেট ইত্যাদির যুগ আসেনি। দাদা দেখলেন মানুষের মুখে মুখে সংবাদ গন্তব্যে পৌঁছতে পৌঁছতে তিল হয়ে যায় তাল। তাই তিনি তাঁর ছেলেদেরকে উপদেশ দিলেন- ‘কোন সংবাদ অন্যের মাধ্যমে প্রেরণ করবে না, কারণ সে তোমার থেকে আমি পর্যন্ত পৌঁছাতে তিল কে তাল বানিয়ে ফেলবে। তোমরা টেলিগ্রাম কিংবা চিঠি লিখে দিও। সংবাদ দেরিতে পৌঁছলেও সঠিক এবং সত্য পৌঁছবে।’ আজও দাদাজির এই উপদেশটি আমি চেষ্টা করি মেনে চলার। সংবাদের সত্যতা অনুসন্ধান না করে আমি কোথাও বিশ্বাস কিংবা অবিশ্বাস করি না। এই বিশ্বাস এবং অবিশ্বাস থেকেই মূলত আমার তাবলিগ কিংবা মাওলানা সাদ কান্ধালভীকে নিয়ে অনুসন্ধান।

আমার দৃষ্টিতে তাবলিগের উভয়গ্রুপই মূলত এক গ্রুপ। বড় গ্রুপ হলে এমন মতানৈক্য থাকেই। ভারতের নিজামমুদ্দিন মসজিদকে কেন্দ্র করে মাওলানা ইলিয়াস কান্ধালভী বর্তমান প্রচলিত তাবলিগের কাজ শুরু করেছিলেন। বিগত শত বছর থেকে এই মসজিদই হলো তাবলিগের বিশ্ব মারকাজ। মাওলানা সাদ কান্ধালভী হলেন মাওলানা ইলিয়াস কান্ধালভীর প্রপৌত্র। বর্তমানে তিনি নেতৃত্বে রয়েছেন, যা মাওলানা ইবরাহিম লাট প্রমূখ মেনে নিতে পারেননি। মূল সংঘাতটা এখান থেকে শুরু। অতঃপর আরও কিছু শাখা-প্রশাখা গজিয়ে উঠেছে।

বাংলাদেশের অনেক আলেম তাবলিগের ইস্যুতে সত্য-মিথ্যার প্রশ্নে নিরব ছিলেন। শত্রুপক্ষ অত্যান্ত কৌশলে টঙ্গি ময়দানকে রক্তাক্ত করে দিলে অনেকেই নিরবতা ভঙ্গ করে মাঠে কথা বলতে শুরু করেন। এই সময় উভয় পক্ষ কমবেশি ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছেন। যেহেতু তাবলিগের মানুষেরা রাজনৈতিক বক্তব্য কিংবা কলাকৌশল বুঝেন কম, তাই তারা প্রচারে কিছুটা কৌশল গত আটকে গেলেন, অবশ্য তারা বলছেন তাদের আমির মাওলানা সাদ কান্ধালভী বলেছেনÑ‘নীরবতা অবলম্বন করতে। তিনি নাকি মনে করেন, এখানে দুই গ্রুপ নয়, সবাই মূলত একগ্রুপ। আলেমগ্রুপ বলে যারা প্রচার করছেন তারাও নাকি তাবলিগের অংশ, তাই ওদেরকে পরাজিত করার চেষ্টা মানে নিজেকেই পরাজিত করা।’ তিনি নাকি সবাইকে নির্দেশ দিয়েছেন আলেমদের সহবতে বেশি বেশি করে গিয়ে তাদের অভিযোগগুলো শোনে নিজেদেরকে সংশোধন করতে এবং তাদের যেসকল ভুল ধারণা রয়েছে সেগুলোকে কৌশলে ভাঙানোর চেষ্টা করতে। তবে আলেমদের সাথে কোন প্রকারের তর্ক-বিতর্ক করা চলবে না। কারণ, তর্ক-বিতর্কে আলেমদের অপমান হলে মূলত দ্বীনেরই ক্ষতি হবে।’ এই কথাগুলো যদি সত্য হয় তবে তা তো খুবই সুন্দর পরামর্শ বলতে হবে। প্রশ্ন হলো, কেউ কেউ মাঝেমধ্যে তাবলিগীদের পক্ষ নিয়ে কেউ কেউ মাঝেমধ্যে আলেমদের বিরুদ্ধে, হেফাজতে ইসলামের বিরুদ্ধে বলছে কেন? তাবলিগীদের সহজ উত্তর, তা আমাদের জানার মধ্যে নয়। আমরা যাদেরকে জানি কিংবা যারা আমাদের আমিরের সঠিক এতেয়াত করেন তারা অবশ্যই এমন কর্ম করতে পারেন না। তৃতীয়পক্ষ কেউ উস্কানির জন্য এমনটি করলে আমাদের করার কি? ইতিহাসে তৃতীয় পক্ষেের উস্কানির হাজারো ঘটনা রয়েছে ইসলামের প্রাথমিক সময় থেকে।

তাবলিগ জামায়াতের সিলেট জেলা ইস্তেমা নিয়ে কিছুটা হৈ চৈ শুরু হলে আমি বেশ আতংকিত ছিলাম যদি টঙ্গির ময়দানের মতো সিলেটও কিছু ঘটে যায়। কোন পক্ষের ইস্তেমা তা আমার কাছে বিষয় নয়। উত্তেজনাকে কমিয়ে রাখার জন্য নিজের সর্বশক্তি দিয়ে চেষ্টা করেছি। তখন একটা লেখাও পোস্ট করেছি ‘ইজতেমা সম্পর্কে উস্কানিমূলক বক্তব্য দেওয়া অনুচিৎ’ বলে।

সেখানে আমি স্পষ্ট বলেছি, ‘এদেশের নাগরিক যারা তাদের নাগরিক অধিকার রয়েছে ইজতেমা করার। আপনি বিরোধী, আপনারও নাগরিক অধিকার রয়েছে প্রশাসনে প্রতিবাদ করার।’ প্রথম দিকে বিষয়টি যেমন উস্কে উঠার সম্ভবনা ছিলো শেষ পর্যন্ত তা হয়নি। প্রশাসন উভয়গ্রুপকেই গুরুত্ব দিয়ে সমস্যার সমাধানের চেষ্টা করেছেন। ইজতেমা বিরোধীদের দাবী ছিলো ইজতেমা করা যাবে না। প্রশাসন তাবলিগের মারকাজে গিয়ে কর্তৃপক্ষের সাথে আলোচনা করে এমনভাবে সামাধান করেছেন যাতে সাপও মরে লাঠিও ভাঙে না। ধন্যবাদ প্রশাসনকে।

ইজতেমা হয়েছে একেবারে জমজমাট। অনুমানিক প্রায় দশ হাজার মানুষের ইজতেমা। কিন্তু সম্পূর্ণ প্রচার ছাড়া। পুলিশ প্রশাসন থেকে পত্রিকাগুলোকেও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, মোটেও ইজতেমার প্রচার করা যাবে না। প্রচার করতে হবে- ‘শবগুজারি’। পত্রিকাগুলোও তাই করেছে। ইজতেমার পক্ষ এবং বিরোধীদেরকে পুলিশ অনুরোধ করেছে ফেসবুকে সর্বপ্রকার প্রচার থেকে বিরত থাকতে। তারা উভয়গ্রুপই তা মেনে চলেছেন। ইজতেমা পক্ষের লোকেরা ওয়ালা এবং প্রশাসনের পরামর্শে বেশ কিছু কৌশলও অবলম্বন করেছেন। রাস্তায় অনেক পুলিশ পাহরাদার ছিলো।

ইজতেমা হচ্ছে কি না তা দেখার জন্য আমি আর সাংবাদিক ফায়যুর রহমান গিয়েছিলাম বদিকোনা ইজতেমার মাঠে। সাথে ছিলো আমার ছেলে স্যাইয়িদ মুজাদ্দিদও। ইজতেমার মাঠে ছবি তোলা অলিখিত নিষেধ। মোবাইল বের করলেই কেউ না কেউ প্রতিবাদ করেন-‘ভাই আমরা ছবি না উঠাই।’ আমি মুজাদ্দিদকে দায়িত্ব দিলাম যেকোন ফাঁকে ছবি উঠানোর জন্য। তাকে অনেকটা স্বাধীনভাবে ছেড়ে দিলাম মাঠে। আমি আর ফায়যুর রহমান মাঠ ঘুরে দেখতে লাগলাম। সিলেটের বিভিন্ন এলাকা থেকে পৃথক পৃথক জামায়াত এসেছে। অনেক পরিচিত মানুষের সাথে দেখা হলো। আমাদের শাহী ঈদগাহ মহল্লা থেকে প্রায় শ খানেক মানুষের একটি কাফেলা গিয়েছে। তারা আমাকে দেখে নিয়ে বসালেন এবং তাদের সাথে খাওয়ার জন্য খুব অনুরোধ করলেন। সময়ের অভাবে তা সম্ভব হলো না। মঞ্চ থেকে বয়ান চলেছে মাইকে। আমরা হাটতে হাটতে বয়ান শোনছিলাম। হাটতে হাটতে তাশকিলের কিত্তায় এসে তাবলিগের অনেক মুরুব্বী এবং আলেমের সাথে মোলাকাত হয়। আমি আর ফায়যুর রহমান অনুসন্ধানি দৃষ্টিতে তাদের অনেকের সাথে আলাপ করি। জানতে চাই, আপনারা কি এই ইজতেমা নিয়ে সিলেটের শীর্ষস্থানিয় আলেমদের কাছে গিয়েছিলেন? তারা বলেন, আমরা প্রায় সকল বড় বড় আলেমের কাছে দোয়ার জন্য গিয়েছি। আমরা জানতে চাই, কার কার কাছে গিয়েছেন? তরুণ তাবলিগী এমদাদ, যাকে তার সাথীরা এমদাদ ভাই ডাকেন, তিনি বলেন; আমরা দরগাহ মাদরাসার প্রিন্সিপাল মাওলানা মুহিবুল হক সাহেব, রেঙ্গা মাদরাসার প্রিন্সিপাল মাওলানা বোরহান সাহেব, জামে মসজিদের খতিব মাওলানা মুশতাক খান সাহেব, কানাইঘাটের মাওলানা দুর্লভপুরী সাহেব, মুফতি নুরুল হক জকিগঞ্জি প্রমূখের কাছে গিয়েছি। তারা সবাই আমাদের জন্য দোয়া করেছেন। সুবহানিঘাটের মাওলানা  শফিকুল হক আমকোনি সাহেবের কাছেও গিয়েছিলাম তাঁর মৃত্যুর কিছুদিন আগে। তিনি দোয়া করে শুধু বলেছেন, আমার জন্য তোমরা মানিকপীরের গোরুস্থানে ব্যবস্থা করে দিও। তিনি তো সত্যই চলে গেলেন এবং তাঁর ইচ্ছে অনুযায়ি তাঁকে মানিকপীরে দাফনও করা হয়েছে। জানতে চাইলাম, প্রশাসন কি কোন সমস্যা করেছে? তারা বললেন, প্রশাসন সমস্যা করেনি, উভয়গ্রুপের মধ্যে মধ্যস্থতা করেছে এবং আমাদের এখানে পাহরাদার দিয়েছে। সিলেট সিটি কর্পোরেশ প্রচুর পানির ব্যবস্থা করে দিয়েছে। বিদুৎ অফিস বিদুতের সুব্যবস্থা করে দিয়েছে। জানতে চাইলাম, স্থানীয় মানুষ কেমন সহযোগিতা করছে? তারা আল্লাহর প্রশংসা করে বললেন, স্থানীয় মানুষ একেবারে প্রাণখুলে সহযোগিতা করছেন। আশপাশের সবাই নিজেদের বাড়ির পানির লাইন থেকে পানির ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। জানতে চাইলাম, আপনারা কি এই ইজতেমা নিয়ে সন্তুষ্ট? তারা বললেন, ইজতেমার মূল উদ্দেশ্য হলো তাশকিল করে জামায়াত বের করা, আল্লাহর মেহেরবাণীতে অনেক জামায়াত বের হবে এই ইজতেমা থেকে। পূর্বের ইজতেমা থেকে এই ইজতেমায় লোক সংখ্যা তো কম? এমন প্রশ্নের উত্তরে তারা বলেন, পূর্বের ইজতেমায় তাবলিগী ছাড়াও অনেক মানুষের উপস্থিতি ছিলো। ছিলো বিভিন্ন মাদরাসার ছাত্ররা। তামিশকিরও ছিলো। এবার যারা এসেছেন তারা সবাই তাবলিগে সময় দেনেওয়ালা। তাছাড়া আমাদের প্রচারে ঘাটতি রয়েছে এবং প্রতিপক্ষের অপপ্রচারও রয়েছে। তবু স্বীকার করতে হবে আলহামদুলিল্লাহ। আমরা জানতে চাইলাম, কোন প্রকার প্রচার ছাড়া এত দ্রুত এত বড় একটা আয়োজন করলেন কীভাবে? তারা বলেন, প্রচার তো আমাদের পদ্ধতিতে আমরা করেছি। আমাদের কিছু সরঞ্জাম ছিলো ইজতেমার জন্য, তারা সেগুলো দেননি। আমরা সবকিছু নতুন করে আয়োজন করতে হয়েছে। এখানে যে কিত্তাগুলো দেখছেন সবই প্রত্যেক এলাকার সাথীরা নিজে নিজের খরচে তৈরি করেছেন। শুধু মঞ্চটা তৈরি করেছে মারকাজ। মাইকের সরঞ্জাম একজন ফ্রি দিয়েছে, বিদুৎ দিয়েছে অন্যজন। এই তো হয়েগেলো। জানতে চাইলাম, আলেম কেমন এসেছেন? বললেন, অনেক এসেছেন। তবে আগের মতো মাদরাসা কেন্দ্রিক কেউ আসেননি।’ মাঠে দেখা হলো, মাওলানা সৈয়দ ফাহিম আব্দুল্লাহ, হাফেজ মাওলানা সাদ (দরগাহ মাদরাসায় আমার সাথী ছিলো) ও মাওলানা নুরুল ইসলাম জকিগঞ্জির সাথে। তারা জানালেন, আরও প্রচুর আলেম এসেছেন। অনেক পরীক্ষার জন্য আসতে পারেননি।

তাদের সাথে কথা বলতে বলতে এশার আজান হয়ে যায়। রাত দশটায় এশার জামায়াত হয়। আমরা তাদের সাথে জামায়াতে নামাজ পড়ি। নামাজ শেষে উঠতে উঠতে রাত সাড়ে এগারোটা হয়ে যায়। সাংবাদিক ফায়যুর রহমান বের হয়ে আসতে আসতে বললো, সময়টা যেন খুব শান্তিতে গেলো। কোন হায়-হুতাশ নেই, দুনিয়ার কোন চিন্তা নেই। কারো বিরুদ্ধে কারো কোন অভিযোগও নেই। সবাই ব্যস্ত আল্লাহ, রাসুল আর কিয়ামত নিয়ে।

 

বি. দ্র. সবগুলো ছবির কারিগর স্যাইয়িদ মুজাদ্দিদ।

Facebook Comment





© All rights reserved © 2019 Tablignewsbd.Com
Design & Developed BY PopularServer.Com
error: Content is protected !!