সোমবার, ২০ মে ২০১৯, ০৮:৫২ অপরাহ্ন

মসজিদে বাচ্চাদের উপস্থিতি ইসলাম কি বলে?

মসজিদে বাচ্চাদের উপস্থিতি ইসলাম কি বলে?

মুফতি আব্দুল কাদির মাসুম

১.নামাজ পড়ার সময় যদি পেছনের কাতার থেকে বাচ্চাদের হাসির আওয়াজ না আসে, তাহলে পরবর্তী প্রজন্মের ব্যাপারে ভয় করুন।’

কথাটা নাকি লেখা তুরস্কের অনেক মসজিদের সম্মুখ দেয়ালে। আমার সুপ্রিয় বন্ধু হা. মাও. জাহেদ সারওয়ার এ বছর ওমানের এক মসজিদে তারাবিহ পড়াচ্ছে। সে অামাকে জানিয়েছে, তার মসজিদের সামনের ফটকে লেখা আছে-

কচি মাসুম বাচ্চাদের উপস্থিতি মসজিদ রৌনক এবং ভবিষ্যত মসজিদ আবাদকারীর প্রস্তুত করণ।’

২.

সুন্দর দু’টি উক্তি দিয়ে শুরু করলাম। যাতে সামনের কথাগুলো গ্রহণ করতে সহজ হয়।

লেখার প্রেক্ষাপট হচ্ছে, গতকাল তারাবীহ্’র নামায পড়ার সময় বাচ্চারা মসজিদের বারান্দায় লাফালাফি করছিল। চার রাকাত শেষে সালাম ফিরিয়ে এক লোক লাঠিয়ে নিয়ে ওদের তাড়িয়ে গেল। তারা লুটিপুটি খেয়ে ভেগে গেল। ব্যাপারটা  খুব খারাপ লাগল।

আপনি ফিকহের যে কোন গ্রন্থ খুলুন, দেখবেন ‘সালাতের জামাত’ অধ্যায়ে নামাযের কাতারের ব্যাপারে মাসআলা এভাবে লেখা- ‘প্রথমে দাঁড়াবে পুরুষগণ, পরে হিজড়ারা, পরে বাচ্চারা এবং শেষে মহিলাগণ’।

ফুকাহায়ে কেরামের ভাষ্য থেকে সুস্পষ্ট জানা যাচ্ছে, বাচ্চারাও মসজিদে আসতে পারে।

নবীজী, সাহাবা, তাবেয়ী ও তবয়ে তাবেয়ীনের যুগে বাচ্চারা মসজিদে আসত। তাদের বাচ্চারা দুষ্টুমি করত না, সিদা নলের মত মনযোগসহকারে নামায পড়ত- এমনটা বোধ হয় ভাবছেন আপনি। না, বরং চলুন একটু হাদিসের সবুজ আঙিনায় ঘুরে আসি। দেখিতো জান্নাতের দুই দুলহা হাসান ও হুসাইন (রাযিআল্লাহু আনহুমা) কী কাণ্ড ঘটিয়েছিলেন। হাদিসের আরবী ভাষ্যটা এরূপ-

.

ﺧﺮﺝ ﻋﻠﻴﻨﺎ ﺭﺳﻮﻝ ﺍﻟﻠﻪ ﺻﻠﻰ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻠﻴﻪ ﻭﺳﻠﻢ ﻓﻲ ﺇﺣﺪﻯ ﺻﻼﺗﻲ ﺍﻟﻌﺸﻲ ﻭﻫﻮ ﺣﺎﻣﻞ ﺣﺴﻨﺎً ﺃﻭ ﺣﺴﻴﻨﺎً، ﻓﺘﻘﺪﻡ ﺍﻟﻨﺒﻲ ﺻﻠﻰ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻠﻴﻪ ﻭﺳﻠﻢ ﻓﻮﺿﻌﻪ ﺛﻢ ﻛﺒﺮ ﻟﻠﺼﻼﺓ ﻓﺼﻠﻰ، ﻓﺴﺠﺪ ﺑﻴﻦ ﻇﻬﺮﺍﻧﻲ ﺻﻼﺗﻪ ﺳﺠﺪﺓ ﺃﻃﺎﻟﻬﺎ، ﻗﺎﻝ : ﻓﺮﻓﻌﺖ ﺭﺃﺳﻲ، ﻓﺈﺫﺍ ﺍﻟﺼﺒﻲ ﻋﻠﻰ ﻇﻬﺮ ﺭﺳﻮﻝ ﺍﻟﻠﻪ ﺻﻠﻰ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻠﻴﻪ ﻭﺳﻠﻢ ﻭﻫﻮ ﺳﺎﺟﺪ، ﻓﺮﺟﻌﺖ ﺇﻟﻰ ﺳﺠﻮﺩﻱ، ﻓﻠﻤﺎ ﻗﻀﻰ ﺭﺳﻮﻝ ﺍﻟﻠﻪ ﺻﻠﻰ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻠﻴﻪ ﻭﺳﻠﻢ ﺍﻟﺼﻼﺓ، ﻗﺎﻝ ﺍﻟﻨﺎﺱ : ﻳﺎ ﺭﺳﻮﻝ ﺍﻟﻠﻪ ! ﺇﻧﻚ ﺳﺠﺪﺕ ﺑﻴﻦ ﻇﻬﺮﺍﻧﻲ ﺻﻼﺗﻚ ﺳﺠﺪﺓ ﺃﻃﻠﺘﻬﺎ ﺣﺘﻰ ﻇﻨﻨﺎ ﺃﻧﻪ ﻗﺪ ﺣﺪﺙ ﺃﻣﺮﺍ، ﺃﻭ ﺃﻧﻪ ﻳﻮﺣﻰ ﺇﻟﻴﻚ ! ﻗﺎﻝ ﻛﻞ ﺫﻟﻚ ﻟﻢ ﻳﻜﻦ؛ ﻭﻟﻜﻦ ﺍﺑﻨﻲ ﺍﺭﺗﺤﻠﻨﻲ ﻓﻜﺮﻫﺖ ﺃﻥ ﺃﻋﺠﻠﻪ ﺣﺘﻰ ﻳﻘﻀﻲ ﺣﺎﺟﺘﻪ . ﺃﻭﺭﺩﻩ ﻋﺎﺩﻝ ﺑﻦ ﺳﻌﺪ ﻓﻰ ﺍﻟﺠﺎﻣﻊ ﻷﺣﻜﺎﻡ ﺍﻟﺼﻼﺓ ،ﺹ : ١٧٦و قال المحقق فى تعليقه: رواه أحمد بسند جيد.

.

‘নবীজী সা. মাগরিব অথবা এশার নামাযে হাসান ও হুসাইন (রাযিআল্লাহু আনহুমা) কে সাথে করে নিয়ে আসলেন। নবীজী মুসল্লায় গিয়ে তাদের বসিয়ে নামায পড়ানোর জন্য দাঁড়ালেন। একামত হল। রাসুলুল্লাহ নামায শুরু করলেন। (বর্ণনাকারী বলেন-) নবীজী নামাযের মাঝে এক সেজদায় দীর্ঘসময় কাটালেন। আমি (কোন সমস্যা ভেবে বা কোন কিছু ঘটল কি না দেখার জন্য) সেজদা থেকে মাথা তুললাম। দেখি, তাদের একজন নবীজীর পিঠে ওঠে বসে আছে। আমি আবার সেজদায় চলে গেলাম। পরে নামায শেষ হওয়ার পর লোকেরা জিজ্ঞেস করল, ইয়া রাসুলাল্লাহ! আপনি নামাযের মাঝে এক সেজদায় লম্বা সময় রইলেন, আমরা ধারণা করছি কোন কিছু হল কি না? নাকি কোন ওহী এসেছে? নবীজী জবাব দিলেন, না, এসব কিছুই হয়নি, বরং আমার নাতি আমার পিঠে চড়েছিল। তার তৃপ্তিমত সওয়ার শেষ না হওয়ার আগে সেজদা থেকে ওঠতে মন চায়নি।’

(সূত্র: মুসনাদে আহমদের বরাতে আদিল ইবনু সাদ কৃত ‘আলজামিউ লিআহকামিস সালাহ’ পৃ. ১৭৬)

শুধু নবী-পরিবারের একটি ঘটনা উদ্ধৃত করলাম। লেখা বেশি বড় হলে পাঠক বিরক্তিবোধ করবেন বিধায় আরও হাদিস বা আছার পেশ করলাম না। অন্যথায় সাহাবা, তাবেয়ী, তবয়ে তাবেয়ীন, আইম্মায়ে উম্মতের বাচ্চাদের এমন ঘটনাসমূহের বিরাট দাস্তান রয়েছে।

৩.প্রিয় পাঠক, এবার বলুন, বাচ্চারা মসজিদে এসে দুষ্টুমি, হাসাহাসি, দৌড়াদৌড়ি করলে যারা তাদের ধমকা-ধমকি করেন বা মারপিঠ করেন, তা কতটুকু সঠিক? মনে রাখবেন, এতে তাদের মনে নামাযের প্রতি অনীহা সৃষ্টি হতে পারে। মানসিকভাবে আঘাতপ্রাপ্ত হতে পারে। এমনও ফল হতে পারে সে জীবনভর নামাযকে ঘৃণা করবে। এগুলো শিশুদের কচি মনে গভীর প্রভাব ফেলে। ধর্ম তার কাছে ভয়ংকর কোন বস্তু বলেও মনে হতে পারে। জন্ম নিতে পারে নাস্তিকতার বীজ। বর্তমান পৃথিবীর দিগ-দিগন্তে বস্তুবাদের সয়লাব। আল্লামা আবুল হাসান নদবির ভাষ্যে- ‘বর্তমানে ধেয়ে আসছে নাস্তিক্যবাদের ধ্বংসশীল স্রোত। কোন পরিবার-ই এ থেকে মুক্ত হবে না।’ তিনি পূর্বসতর্ক করে লিখে গেছেন ‘নয়া তুফান কা মুকাবালা’ (নতুন তুফানের প্রতিরোধ)।

গবেষকগণ নাস্তিকতার কারণ অনুসন্ধান করে বলেছেন, অনেকে শিশুকালে মন্দ অভিজ্ঞতা বা পর্যবেক্ষণের কারণেও নাস্তিক হয়।

বাংলাদেশের নাস্তিকগুরু আরজ আলি মাতুব্বর নাস্তিক ও ইসলামবিরোধী হওয়ার পেছনে উল্লেখযোগ্য কারণ ছিল ছোটবেলায় তার দেখা ধর্মের বেশে বিভিন্ন গোঁড়ামি।

শবনম নাদিয়া নামের এক নাস্তিক নারী ‘আমি যে কারণে নাস্তিক থেকে গেলাম’ শিরোনামে তার জীবনকাহিনী উল্লেখ করতে গিয়ে তার বাল্যকালের এক ঘটনার কথা বলেছে এভাবে-

‘প্রত্যহ সকালে আরামের ঘুম হারাম করে প্রচন্ড শীত উপেক্ষা করে আমাকে মকতবে যেতে হত। একদিন ঘুম থেকে ওঠতে দেরী হয়ে যায়। আম্মু তাড়াতাড়ি আমাকে একটা গাউন পরিয়ে মকতবে পাঠিয়ে দেন। সেটি গলা থেকে নিয়ে টাখনু পর্যন্ত লম্বা ছিল। কিন্তু এটা দেখে হুজুর ক্রোধে চিৎকার করে ওঠেন। এবং সেলোয়ার কামিজ কেন পরিধান করি নাই সেজন্য বকাঝকা করে ইহুদী-খৃস্টানদের পোশাক পরা যাবে না বলে সাবধান করে দেন। কারণ তাদের পোশাক অশালীন। সহপাঠীদের সামনে আমার খুব অপমান বোধ হচ্ছিল। আমার বুঝে আসছিল না যে, পুরো শরীর ঢাকার পরেও কেন হুজুর আমাকে এভাবে লজ্জা দিলেন। এরপরে আর আমি মকতবে যাই নাই।

আমার মনে হয় ঐ মকতবের হুজুরের প্রতি আমার কৃতজ্ঞ থাকাই উচিত। কারণ তারই অদূরদর্শিতা এবং শালীন ও অশালীনতার মধ্যকার পার্থক্যের নির্ণয়ে ব্যর্থতার সূত্র ধরে আমি নিজেকে প্রশ্ন করতে শিখেছি। যার ফলশ্রুতিতে ১৪ বছর বয়সেই আমি হয়েছি একজন অজ্ঞেয়বাদী কিশোরী।’

পুনশ্চ: ইফতার বছর কোন একটা প্রসিদ্ধ ফতওয়াগ্রন্থে পড়েছিলাম, নামটা নিশ্চিতভাবে মনে হচ্ছে না। সম্ভবত আহসানুল ফাতাওয়ায় যে, বাচ্চারা যেহেতু মসজিদে এসে দুষ্টুমি করে অন্যান্য মুসল্লীদের নামাযে ব্যাঘাত ঘটাতে পারে তাই তাদেরকে বড়দের কাতারের ফাঁকে ফাঁকে ঢুকিয়ে দিলে সমাধান হয়ে যায়। ফেসবুুুক থেকে…

Facebook Comment





© All rights reserved © 2019 Tablignewsbd.Com
Design & Developed BY PopularServer.Com
error: Content is protected !!