বুধবার, ১৭ Jul ২০১৯, ০৯:০৪ পূর্বাহ্ন

সংবাদ শিরোনাম ::

হযরতজী মাওলানা মোহাম্মদ ইলিয়াস কান্ধালভী রহঃ জীবনী

বংশ পরিচয়: নাম ইলিয়াস। পিতার নাম: তৎকালীন যুগশ্রেষ্ঠ আলেম ও আবেদ মাওলানা ইসমাইল রহ. । ঐতিহাসিক নাম: আখতার ইলিয়াস। জন্মস্থান: ভারতবর্ষের উত্তর প্রদেশের মুযাফ্ফর নগর জেলার অন্তর্গত কান্ধালা নামক শহরে ১৩০৩ হিজরীতে জন্মগ্রহণ করেন।

 

শৈশব: তার শৈশবকাল নিজ নানার বাড়ি কান্ধালায় এবং নিজ পিতা হযরত মাওলানা ইসমাইল সাহেব রহ. এর সান্নিধ্যে দিল্লীর নিজামুদ্দীনে অতিবাহিত করেন। তখন তার পুরো পরিবার কান্ধালায় অবস্থান করছিলো। পরিবারের নারী-পুরুষ সকল সদস্যবৃন্দের মধ্যে ঈর্ষনীয় ধর্মপরায়ণতা ছিল। সদাসর্বদাই তারা অধিক পরিমাণে কুরআন তিলাওয়াত ও যিকিরে মশগুল থাকতেন।

 

প্রাথমিক শিক্ষা: পরিবারের অন্য শিশুদের মতো তাঁরও মকতব থেকে শিক্ষাজীবনের সূচনা হয়। পারিবারিক ঐতিহ্য অনুযায়ী শৈশবেই কুরআন হিফয সম্পন্ন করেন। এই পরিবারের হিফজুল কুরআন এর প্রচলন এতো ব্যাপক ছিল যে মসজিদের দুই কাতার পর্যন্ত মুয়াজ্জিন ছাড়া কোন গাইরে হাফেজ দাঁড়াতো না।

 

মুহতারাম নানীর ভবিষ্যৎবাণী: হযরত ইলিয়াস রহ. এর নানীজান অত্যন্ত উঁচু স্তরের খোদাভীরু নারী ছিলেন। তিনি রাবেয়া বসরী রহ. এর আদর্শ ও গুণে গুণান্বিত পুণ্যবতী এক অনন্য নারী। তার সম্পর্কে হযরত ইলিয়াস রহ. বলেন, “আমার নানী জানের নামাযের দৃষ্টান্ত আমি শুধু হযরত গাঙ্গুহী রহ. এর মধ্যে দেখেছি। সেই মহীয়সী নারী নিজ প্রাণপ্রিয় নাতী হযরত ইলিয়াস রহ. সম্পর্কে ভবিষ্যৎবাণী করতে গিয়ে বলেন, আখতার, আমি তোমার কাছ থেকে সাহাবা কেরাম রা. এর সুঘ্রান পাচ্ছি।” এছাড়াও শৈশবকাল থেকেই হযরত ইলিয়াস রহ. এর মধ্যে সাহাবা সুলভ দ্বীনি ব্যাকুলতার একটা ছাপ বিদ্যমান ছিল, যা দেখে শাইখুল হিন্দ মাওলানা মাহমুদুল হাসান রহ. পর্যন্ত বলতেন, “মৌলবী ইলিয়াস কে দেখলে আমার সাহাবা কেরামের কথা মনে পড়ে যায়।” পরবর্তীকালে তার ব্যক্তিত্বে দ্বীনি জযবা ও আবেগের যে সুসংগঠিত প্রকাশ ঘটেছিল তা তাঁর, স্বভাবের মধ্যেই নিহিত ছিল। পরিবেশ, শিক্ষা ও আল্লাহওয়ালাদের সান্নিধ্য তার সেই সেই স্বভাবে স্ফুলিঙ্গ এর প্রজ্বলন ঘটিয়েছিল মাত্র। তাই দেখা যায় শিশু ইলিয়াস এমন কিছু কাজ করতেন যা সাধারণ শিশুদের স্তর থেকে ভিন্ন হতো । তাঁর সমবয়সী মকতব সাথী রিয়াজুল ইসলাম কান্ধালভী রহ. বলেন, মকতব জীবনে মৌলভী ইলিয়াস একবার লাঠি হাতে বলেন, “মিয়াঁ রিয়াজ চলো বে নামাযীদের বিরুদ্ধে জিহাদ করি।”

 

লেখাপড়ায় গভীর অধ্যবসায়: হজরত ইলিয়াস রহ. ছোটবেলা থেকেই লেখাপড়ায় গভীর মনযোগী ছিলেন। প্রতি দিনের সব পড়া শেষ করে বাকি সময় যিকির ও অন্যান্য অযিফায় কাটিয়ে দিতেন। শেষ রাত্রে নিয়মিত তাহাজ্জুদ, নামাজ, যিকির, দু‘আ ও রোনাজারি-আহাজারিতে নিমগ্ন থাকতেন।

 

গাঙ্গুহে অবস্থান: পরিপূর্ণ মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠার পিছনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময় তথা কৈশোর থেকে যৌবন পর্যন্ত ১০ থেকে ২০ বছর পর্যন্ত দীর্ঘ ১০ বছর সময় তিনি গাঙ্গুহী রহ. এর মতো পরশপাথরের সান্নিধ্যে অতিবাহিত করেন। হজরত ইলিয়াস রহ. বলতেন, যখনই হজরত গাঙ্গুহী রহ. এর সান্নিধ্য ও বরকতপ্রাপ্ত কোন বুজুর্গ গাঙ্গুহে আসতেন তখনই বড়ভাই আমার সবক বন্ধ করে দিয়ে বলতেন, এখন তোমার সবক এটাই যে তুমি তাদের সাহচর্যে থাকবে ও তাদের মূল্যবান কথা হৃদয় দিয়ে গ্রহণ করবে।

 

দেওবন্দ মাদ্রাসায় ভর্তি ও শিক্ষা সমাপন: শাইখুল হাদীস হযরত মাওলানা শাইখুল হিন্দ মাহমুদুল হাসান দেওবন্দী রহ. এর কাছে হাদীস পড়ার জন্য ১৩২৬ হিজরীতে দারুল উলুম দেওবন্দে ভর্তি হন এবং শাইখুল হিন্দ রহ. এর কাছে বুখারী শরীফ ও তিরমিযী শরীফ পড়েন।

 

ইসলাহী সম্পর্ক: হজরত রশিদ আহমাদ গাঙ্গুহী রহ. সাধারণত ছাত্রদের কে বাইআত করাতেন না। কিন্তু ইলিয়াস রহ. এর অবস্থা পর্যবেক্ষণ করে ছাত্র অবস্থায়ই তাকে বাইয়াত করান। হযরত ইলিয়াস রহ. বলেন, যখন আমি যিকির করতাম তখন হৃদয়ের গভীরে এক ধরণের প্রবল চাপ অনুভব করতাম। বিষয়টি হযরত গাঙ্গুহী রহ. কে জানালে তিনি বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে বলেন যে, হযরত কাসেম নানুতুবী রহ. এমন অভিযোগ হাজী ইমদাদুল্লাহ রহ. এর সমীপে উত্থাপন করেছিলেন। তখন হাজী সাহেব তাকে লক্ষ করে বলেছিলেন “আল্লাহ আপনাকে দিয়ে দ্বীনের বড় কোন খেদমত নিবেন” সুতরাং আশা করি তোমাকে দিয়েও আল্লাহ তায়ালা দ্বীনের বড় কোন খেদমত নিবেন।

 

মুবারকময় কর্মজীবন: শিক্ষাজীবন সমাপ্তের পর ১৩২৮ হিজরীতে মাওলানা ইলিয়াস রহ. সাহারানপুর মাযাহিরুল উলুম মাদ্রাসার শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ লাভ করেন। ১৩৩০ হিজরি মোতাবেক ১৭ এপ্রিল ১৯১২ সালে তিনি মামা মৌলভী রওফুল হাসান সাহেবের কন্যাকে বিবাহ করেন। ১৩৩৩ হিজরিতে হজ্ব পালনের জন্য তিনি মক্কা শরীফ গমন করেন। মেঝ ভাই ও বড় ভাইয়ের মৃত্যুর পর তিনি ভক্ত ও অনুরক্তদের অনুরোধে বস্তি নিজামুদ্দীনে অবস্থিত মসজিদ ও মাদ্রাসার সার্বিক দায়িত্ব গ্রহণ করেন। আর ১৯২০ সালে তিনি ভারতের মেওয়াত অঞ্চল থেকে তাবলীগী দাওয়াতের সূচনা করেন।

 

১৩৪৪ হিজরী সনে ইলিয়াস রহ. দ্বিতীয়বার হজে গমন করেন। এই সময় মদীনা মুনাওয়ারায় থাকাকালীন তিনি স্বপ্নযোগে নবী করীম সা. এর সাক্ষাত্ পান। এই সাক্ষাতে তিনি সাধারণ মানুষকে আল্লাহ’র পথে আহ্বানের ইঙ্গিত লাভ করেন। পরবর্তী বছর দেশে ফিরেই তিনি দাওয়াত ও তাবলিগের কাজ আরম্ভ করে দেন। ভারতের পশ্চিম সীমান্তের রাজ্য হরিয়ানার মেওয়াত এলাকায় তিনি সর্বপ্রথম এই দাওয়াত ও তাবলিগের সূচনা করেন। প্রাচীনকালে এই অঞ্চলটি ছিল ‘মেও’ জনগোষ্ঠীর আবাসভূমি। বর্তমানে গোরগাঁও ও মথুরার কিছু অংশ নিয়ে ‘মেওয়াত’ এলাকা গড়ে ওঠেছে। এই অঞ্চলের জনগণ ছিল নামেমাত্র মুসলমান। তাদের আচার-আচরণ ছিল বহুক্ষেত্রে বর্বর আরবদের কাছাকাছি। আর্যদের এ দেশে আগমনের বহু পূর্ব থেকে মেও গোষ্ঠীরা এই এলাকায় বসবাস করতো। দিল্লির মুসলিম শাসনামলে মেওয়াতীরা বনজঙ্গলে আশ্রয় নিয়ে লুটপাট করতো। ১২৬০ সালে গিয়াস উদ্দিন বলবান মেওয়াতী দস্যুদের শায়েস্তা করার জন্য এক বড় অভিযান পরিচালনা করেন। এমন একটি এলাকা থেকেই তাবলিগ জামায়াতের সূচনা সত্যিই বিস্ময়কর।

প্রথমেই ইলিয়াস রহ. মক্তব শিক্ষার মাধ্যমে ব্যক্তিগত পর্যায়ে মানুষের ইসলাহ্ ও সংশোধনের কাজ আরম্ভ করেন। পরে তিনি ধারাবাহিকভাবে দাওয়াত ও তাবলিগের কাজ আরম্ভ করেন। তিনি মানুষের যাতায়াতের পথে বসে অপেক্ষা করতেন। যখনই কোনো গ্রাম্য ব্যক্তি কাজের সন্ধানে বাইরে যেতে চাইত তিনি তাদেরকে মজুরী দিয়ে মসজিদে নিয়ে আসতেন। তাদেরকে তিনি কালেমা শেখাতেন, নামাজ শেখাতেন, দীনের প্রয়োজনীয় মাসআলা-মাসায়েল শেখাতেন। এভাবে তিনি প্রত্যেক দিনই সাধারণ মানুষকে মজুরী দিয়ে ডেকে এনে দীন শেখাতেন। এরকম কিছুদিন করার পরই তারা নামাজের প্রতি অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। একপর্যায়ে মজুরী ছাড়াই লোকজন তাঁর এই কাজের সঙ্গে সংযুক্ত হয়ে যায়। এভাবেই তাবলিগ বিস্তার লাভ করতে থাকে।

জীবনের শেষ দিকে মাওলানা ইলিয়াস রহ. ইলমে দীন শিক্ষা করা ও উম্মতের ফিকিরের প্রতি মানুষকে তাকীদ করতে থাকেন। যারা অশিক্ষিত তাদের প্রতি তিনি বেশি দরদ দেখান। পরিশেষে ১৩৬৩ হিজরী ২১ রজব মোতাবেক ১৯৪৪ খ্রিস্টাব্দের ১৩ জুলাই বৃহস্পতিবার ফজরের আজানের কিছুক্ষণ আগে তিনি এ দুনিয়া ত্যাগ করেন। ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাযিঊন।

Facebook Comment





© All rights reserved © 2019 Tablignewsbd.Com
Design & Developed BY PopularServer.Com
error: Content is protected !!