সোমবার, ২০ মে ২০১৯, ০৯:৫৯ অপরাহ্ন

নিজামুদ্দীন বিশ্ব মার্কাজঃ উম্মাহর বাতিঘর

মাওলানা আশরাফ আলী

হযরতজী মাওঃ ইলিয়াস রঃ যখন নিযামুদ্দিন মারকাজ গড়ে তোলেন তখন দেওবন্দে প্রতিষ্ঠিত মাদ্রাসা ছিল। হাক্কানী পীর হযরত মাওঃ আশরাফ আলী থানভী রঃ এর খানকা ছিল । ছিলেন আব্দুর রহীম রায়পুরীর মত বিশ্বব্যপী সূপরিচিত পীর।

ইলিয়াস রঃ নিজে পীরবংশে জন্মগ্রহণ করেন এবং নিজেও একজন পীর ছিলেন । তাঁর পুরো পরিবারই ছিলো বংশগতভাবে বুজুর্গ । এর প্রতিটি সদস্য , ছেলে হোক বা মেয়ে হোক , হাফেজ । প্রতিটি পুরুষ আলেম। মা, খালা, বোন, ফুফু নির্বিশেষে সবাই হাফেজ , পরহেজগার । মাওঃ ইলিয়াস রঃ নামকরা বুজুর্গ ছিলেন , পীর ছিলেন । সুতরাং দ্বীনের খেদমতের জন্য তিনি কোনো বড় মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করবেন , অথবা কোনো বড় খানকার গোড়াপত্তন করবেন এটাই স্বাভাবিক ছিল । তিনি করেছিলেনও তা।প্রথমে খানকা এবং পরে হেফজখানা খুলেছিলেন।কিন্তু মুরিদ এবং ছাত্রদের আমল আখলাক তাকে সন্তুষ্ট করতে পারেনি।

পরে তিনি দ্বীনের খেদমতের জন্য তৃতীয় ধারার এক মারকাজ প্রতিষ্ঠা করলেন ।

কি ছিলো এর উদ্দেশ্য ?

হযরত ইলিয়াস রঃ দেখেছিলেন যে, এত বড় বড় মাদ্রাসা থাকা সত্ত্বেও , এত বড় বড় বুজুর্গদের খানকা থাকা সত্ত্বেও “আম তৌড় পর” , “আম”ভাবে , উম্মতের দ্বীনী হালত দ্রুতগতিতে খারাপ হয়ে চলেছে । উম্মতের হাত থেকে দ্বীন ছুটে যাচ্ছে , উম্মতের জীবন থেকে দ্বীন হারিয়ে যাচ্ছে ।

হযরতজী মাওলানা ইলিয়াস রহমতুল্লাহি আলাইহি বলেন,
“আমি প্রথমে মাদ্রাসায় শিক্ষকতা করেছি তখন ছাত্রদের ভিড় হয়েছে এবং ভালো ভালো যোগ্যতাসম্পন্ন ছাত্ররা আসতে শুরু করেছে। আমি তখন চিন্তা করলাম তাদেরকে নিয়ে আমার মেহনতের ফল ইহা ছাড়া আর কি হবে যে, যারা আলেম হওয়ার জন্য মাদ্রাসাতে আসে তারা আমার কাছে পড়াশোনা করার পর আলেম বা মৌলভী হবে। অতঃপর তাদের কাজ তাই হবে যা আজকাল সাধারণত গ্রহণ করা হয়ে থাকে। কেহ ডাক্তারি পড়ে ডিসপেন্সারি খুলে বসবে, কেউ ইউনিভার্সিটি তে পরীক্ষা দিয়ে স্কুল কলেজে চাকরি করবে, আবার কেউ মাদ্রাসায় বসে পড়াতে থাকবে। এর চেয়ে অধিক আর কি হবে? এই চিন্তা করে মাদ্রাসায় পড়ানো থেকে আমার অন্তর ফিরে গেল।

এরপর এমন একটি সময় আসলো যে আমার শায়েখ আমাকে খেলাফত দান করে অন্যদেরকে মুরিদ করার অনুমতি দিলেন। আমি তখন মুরিদদের কে জিকিরের তালকীন দিতে শুরু করলাম।আল্লাহ তাআলার মেহেরবানীতে মুরিদদের এত তাড়াতাড়ি হালট পরিবর্তন হতে লাগল এবং এত দ্রুত তাদের তরাক্কি হতে লাগলো তাতে আমি নিজেও আশ্চর্য হলাম। তখন আমি চিন্তা করলাম যে এ কাজে লেগে থাকার ফল কি হবে ?বেশি এর থেকে বেশি কিছু জিকির করনেওয়ালা লোক তৈরি হবে।অতঃপর মানুষের মাঝে তাদের সুনাম ছড়িয়ে পড়বে, কেউ তখন মোকদ্দমায় জিতবার জন্য দোয়ার জন্য আসবে, কেউ সন্তানের জন্য তাবিজ এর আবেদন করবে, কেউ ব্যবসা-বাণিজ্যে উন্নতির জন্য দোয়া করাবে, বেশির থেকে বেশি তাদের দ্বারা ভবিষ্যতে আরও আরও কিছু জাকেরিনদের এর জামাত তৈরি হবে। এই চিন্তা করে সে দিক থেকে আমার মন ফিরে গেল।

তখন আমি এই সিদ্ধান্তে উপনীত হলাম যে, আল্লাহ তা’আলা যাহের বাতেন এর যে শক্তি আমাকে দান করেছেন ,তাকে ব্যয় করার সহিহ জায়গা হল ,তাঁকে ওই কাজে ব্যয় করা যে কাজে স্বয়ং রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজে তার শক্তি-সামর্থ্য ব্যয় করেছেন। আর তা হচ্ছে আল্লাহ তায়ালার বান্দাদেরকে বিশেষভাবে গাফেল এবং বে তলব লোকদেরকে আল্লাহ তালার দিকে নিয়ে আসা এবং আল্লাহ তাআলার বাণী কে সমুন্নত করার জন্য জানকে মূল্যহীন করে দেওয়ার প্রচলন ঘটানো।

ব্যাস, ইহাই আমাদের আন্দোলনের মূল কথা। এবং এ কথাই আমরা সকলকে বলে থাকে। এই কাজ যদি জারি থাকে তাহলে বর্তমানের চেয়ে হাজার গুণ বেশি খানকা এবং মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠিত হয়ে যাবে। বরং তখন প্রত্যেক মুসলমান এই এক একটি মাদ্রাসা এবং খানকা বনে যাবে। তখন রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কর্তৃক আনীত নেয়ামতসমূহ, তার শান মোতাবেক আম ভাবে বন্টন হতে থাকবে ।”(মালফুজাতে হজরতজী রহ)

মেওয়াতের মুসলমান ঐ সময় মাথায় টিকি রাখতো , নামায জানতো না ,কলেমাও ভালো করে বলতে পারতো না । মুসলমান হয়েও ঘরের মধ্যে তাকের উপর ছোট মূর্তি রাখতো। ঘর হতে বের হওয়ার সময়
মূর্তিকে প্রণাম করতো ।

নিযামুদ্দিন মারকাজ প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য ছিলো , উম্মতকে আবার সাহাবীওয়ালা জিন্দেগীর উপর উঠানো । রাস্তার নর্দমার পাশে পলিথিন আর লাকড়ী দিয়ে তৈরী ঝুপড়ি থেকে শুরু করে প্রেসিডেন্টের প্রাসাদ পর্যন্ত — গোটা মুসলিম উম্মাতকে “দ্বীনের দাঈ” উম্মতে পরিনত করা । রসূলুল্লাহ্ সঃ তাঁর উম্মতকে দ্বীনের যে চেহারার উপর ছেড়ে গিয়েছিলেন , দ্বীনের সেই চেহারার উপর উম্মতকে পুনর্বার খাঁড়া করা । প্রতিটি মুসলমান যেন গোটা উম্মতের ফিকির করনেওয়ালা বনে যায় , সাহাবীদের মতই আল্লাহ্‌র রাস্তায় বের হয়ে জান মালের কুরবাণী করাকে জিন্দেগীর মাকসাদ বানিয়ে নেয়।নিযামুদ্দিনের উদ্দেশ্য হলো উম্মতের জীবনকে সাহাবীওয়ালা ছাঁচে ঢেলে সাজানো । আমরা সাহাবীওয়ালা কৃষক চাই , সাহাবীওয়ালা শ্রমিক চাই , সাহাবীওয়ালা আলেম চাই , সাহাবীওয়ালা ব্যবসায়ী চাই….. আমরা চাই সাহাবীওয়ালা সমাজ গড়ে উঠুক । কারণ
জামাত হিসাবে একমাত্র সাহাবীদের জামাতের প্রতিই “আম”ভাবে আল্লাহ্‌র সন্তুষ্টির ঘোষনা আছে ।

আজ সেই ছাহাবীওয়ালা ছিফাতের জামাতকে তছনছ করার জন্য কিছু দূষ্কৃতিকারী,তাবলীগ বিদ্বেষী আর কিছু ওলামায়ে ছূ একজোট হয়েছে।এদের ব্যপারে সজাগ থাকতে হবে, নিজামুদ্দীনের অধীনেই এ কাজকে হযরতজী ইলিয়াছ রহঃ এর মাকসাদে পৌঁছাইতে হবে।
আল্লাহ তৌফিক দিন। আমীন।

Facebook Comment





© All rights reserved © 2019 Tablignewsbd.Com
Design & Developed BY PopularServer.Com
error: Content is protected !!