সোমবার, ০৮ মার্চ ২০২১, ০২:২৬ অপরাহ্ন

মাওলানা সাদ কান্ধালভীর ইমারত নিয়ে অপপ্রচারের জবাব (অনুসন্ধানী বিশ্লেষন)

মাওলানা সাদ কান্ধালভীর ইমারত নিয়ে অপপ্রচারের জবাব (অনুসন্ধানী বিশ্লেষন)

মাওলানা মেহবুব, তাবলীগ নিউজ বিডিডটকম

১. জীবনের একেবারে শেষের দিকে হজরতজী মাওলানা ইনআমুল হাসান রহমাতুল্লাহি আলাইহি প্রায়ই অসুস্থ থাকতেন। এমতবস্থায় কোন এক রায়বেন্ড সফরের সময় হাজী আব্দুল ওয়াহাব সাহেব দামাত বারকাতুহুম পরবর্তী আমীর মনোনয়নের প্রসঙ্গ উঠান। রায়বেন্ডের বিভিন্ন হযরতগণ মাওলানা যুবায়েরুল হাসান সাহেব রহমাতুল্লাহি আলাইহি কে মনোনয়নের পরামর্শ দেন। হজরতজী রহমাতুল্লাহি আলাইহি তাঁদের আশ্বস্ত করেন যে, এখানে নয়, নিজামুদ্দিন ফিরে গিয়ে এ ব্যাপারে মাসোয়ারা করা হবে।
গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টঃ হজরতজী রহমাতুল্লাহি আলাইহির দ্ব্যর্থহীন কথা – এই মাসোয়ারার জন্য মোনাসেব জায়গা নিজামুদ্দিন।

২. নিজামুদ্দিন ফিরে গিয়ে হজরতজী রহমাতুল্লাহি আলাইহি উলামাকেরামদের সাথে পরামর্শ করলে, মাওলানা উবাইদুল্লাহ বালিয়াভি রহমাতুল্লাহি আলাইহি মতামত দেন যে, হজরতজী যেহেতু সারা জীবন সকল কাজে শুধুমাত্র সীরতের অনুসরণই করেছেন, তাই এক্ষেত্রেও নিজে থেকে কিছু না করে বরং সীরতে ফারুকীর অনুসরণে এক জামাত বানিয়ে যেতে পারেন, যাঁরা নিজেদের মধ্যে মাসোয়ারা করে একজন আমীর বানিয়ে নিবেন।
এই পরামর্শ অনুসারে তিনি ১০ জনের একটি জামাত বানান। এই জামাতে ছিলেন –
১. মাওলানা ইজহারুল হাসান সাহেব রহ. ভারত
২. মাওলানা যুবায়েরুল হাসান সাহেব রহ. ভারত
৩. মাওলানা উমার সাহেব রহ. পালানপুরী ভারত
৪. মাওলানা সাঈদ আহমাদ খান সাহেব রহ. মদিনা
৫. মুফতী যাইনুল আবিদীন সাহেব রহ. পাকিস্তান
৬. হাজী আব্দুল ওয়াহাব সাহেব হাফিজহুমুল্লাহ পাকিস্তান
৭. ভাই আফজাল সাহেব রহ. পাকিস্তান
৮. হাজী আব্দুল মুকিত সাহেব রহ. বাংলাদেশ
৯. মিয়াজী মেহরাব সাহেব রহ. ভারত
১০. মাওলানা সাদ সাহেব দামাত বারকাতুহুম
গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টঃ
মাওলানা ইব্রাহীম সাহেব এবং মাওলানা আহমাদ লাট সাহেব তুলনামূলক সিনিয়র ছিলেন। তাঁদের চেয়ে জুনিয়রদেরও হজরতজী মাওলানা ইনআমুল হাসান রহমাতুল্লাহি আলাইহি শূরার অন্তর্ভুক্ত করেছেন। কিন্তু তা সত্ত্বেও তাঁদের দুজনকে হজরতজী পছন্দ করেন নি। এর পিছনে কি হেকমত ছিল তা একমাত্র আল্লাহ তায়ালাই ভালো জানেন।
তাই মাওলানা ইব্রাহীম সাহেব বা মাওলানা আহমাদ লাট সাহেবরা যা দাবি করছেন, অর্থাৎ হজরতজী ইনআমুল হাসান রহমাতুল্লাহি আলাইহি একক আমীরের বদলে একদল শূরার মাধ্যমে এই মেহনত চালানোর ইচ্ছুক ছিলেন বলে যা দাবি করা হচ্ছে, তা ভিত্তিহীন। যেসব মজলিসে এসব আলোচনা হয়েছে তাঁরা ঐসব মজলিসে ছিলেন না।

৩. হজরতজী রহমাতুল্লাহি আলাইহির ইন্তেকালের পরে তাঁর বানানো জামাত পরবর্তী আমীর মনোনীত করার জন্য মাসোয়ারায় বসেন। বেশির ভাগ রায় মাওলানা যুবায়েরুল হাসান সাহেব এবং মাওলানা সাদ সাহেবের দিকে আসে।
গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টঃ
মাওলানা সাদ সাহেবের যোগ্যতার প্রতি লক্ষ্য করুন। তখন পর্যন্ত তাঁর বয়স ত্রিশ পার হয়নি। তা সত্ত্বেও অনেক প্রবীণ ও গ্রহণযোগ্য আলেম ও সাথীগণ তাঁকে ইমারতের জন্য সবচেয়ে উপযোগী বিবেচনা করে তাঁর পক্ষে রায় দিয়েছেন।

৪. তিনদিন যাবৎ মাসোয়ারা করেও একজনের ব্যাপারে একমত হতে না পেরে তিনজনের উপরে মারকাজ ও মেহনতের জিম্মাদারী অর্পণ করা হয়। তাঁরা হলেন মাওলানা ইজহারুল হাসান রহমাতুল্লাহি আলাইহি, মাওলানা যুবায়েরুল হাসান রহমাতুল্লাহি আলাইহি এবং মাওলানা সাদ সাহেব।
এটা কোন শূরা ছিল না। বরং ঐ মাসোয়ারার ফয়সাল মিয়াজী মেহরাব সাহেবের দস্তখত করা ফয়সালা(মিয়াজি মেহরাব সাহেবের ঐ দস্তখত করা ফয়সালা আলোচনার শেষে সংযুক্ত করা আছে, কারো সন্দেহ থাকলে তাহকিক করতে পারেন) অনুসারে তিনজন জিম্মাদারী নিয়ে চলবেন। তিনজনের উপরে জিম্মাদারী কেন দেওয়া হল, উপস্থিত আলেমদের পক্ষ থেকে উত্থাপিত প্রশ্নের জবাবে মিয়াজী মেহরাব রহমাতুল্লাহি আলাইহি মাসোয়ারার সাথী তথা শূরাদের একমত না হতে পারাকে অজুহাত হিসাবে দেখান।
গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টঃ
৪.১. এখানে কোন শূরা বানানোর উমুর ছিল না। ছিল আমীর বানানোর উমুর।
৪.২. একজনকে আমীর বানাতে ব্যর্থ হয়ে তিনজনকে জিম্মাদারী দেয়া হয়।
৪.৩. তিন সদস্য বিশিষ্ট কোন শূরা বানানো হয় নি, বরং তিনজনের উপরে জিম্মাদারী অর্পণ করা হয়েছে।
৪.৪. কোন শূরা বানানো হয়নি বলেই কেউ ইন্তেকালে করলে কি হবে কিভাবে তাঁর স্থলে নতুন শূরা নেয়া হবে এ ব্যাপারে কোন ফয়সালা হয়নি।
৪.৫. মাওলানা ইজহারুল হাসান অল্প কিছুদিন পরই ইন্তেকাল করেন, তখনও বাকি শূরাগণ প্রায় সকলেই জীবিত ছিলেন। বিশেষ করে হাজী সাহেবই হজরতজী রহমাতুল্লাহি আলাইহিকে প্রথম পরবর্তী জিম্মাদার মনোনয়নের তাকীদ দিয়েছিলেন। তখন হাজী সাহেব বা অন্য কেউই শূন্যপদ পূরণের কোন দাবি উঠান নি। কেননা তাঁরা খুব ভালো ভাবেই তাঁদের নিজেদের ঐ মাসোয়ারা সম্পর্কে জানতেন যে, এরপর থেকে বাকি দুইজন জিম্মাদারী নিয়ে চলবেন। বর্তমানে একজন রয়েছেন, সেই একজনই জিম্মাদারী নিয়ে চলবেন।
৪.৬. এটা ইমারত বলেই উপস্থিত উলামাদের থেকে আপত্তি উঠেছে যে তিনজন কেন। শূরা হলে হয়ত অন্য প্রশ্ন উঠত।
৪.৭. হজরতজী রহমাতুল্লাহি আলাইহি ১০ জনের একটি জামাত বানিয়ে জিম্মাদারী দেন নিজেদের মধ্যে একজনকে পরবর্তী আমীর হিসাবে মনোনয়ন করার জন্য। এই ১০ জন মাসোয়ারা করে একজন বেছে নিতে ব্যর্থ হলেও তিনজনের ব্যপারে একমত হন। অর্থাৎ বাকি ৭ জন সর্বসম্মতিক্রমে এই দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি নিয়েছেন। এরপর যদি আবারো আমীর মনোনয়নের ইস্যু উঠে তাহলে তাঁদের এই মাসোয়ারার ফয়সালা অনুসারে তা এই তিনজনের মধ্য থেকেই হতে হবে। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার অমোঘ নিয়মে বর্তমানে শুধু মাওলানা সাদ সাহেবই বাকি আছেন। তিনি ইন্তেকাল করলে এরপরে পরবর্তী আমীরের মাসোয়ারা হতে পারে। আপাততঃ এ ব্যপারে নতুন কোন মাসোয়ারার জরুরত নেই।
৪.৮. বর্তমানে বিভিন্ন সময়ে হাজী সাহেবের নামে যেসব আবেগ ব্যবহার (ইমোশনাল ব্ল্যাকমেইলিং) করে ফায়দা হাসিলের চেষ্টা করা হয় সেগুলো সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন এবং তাঁর অসুস্থতার সুযোগে তাঁর সুনাম ও গ্রহণযোগ্যতা অপব্যবহারের অপচেষ্টা মাত্র। কেননা হাজী সাহেবরাই এই মাসোয়ারাতে ফয়সালা করেছিলেন যে, তাঁরা জিম্মাদারীতে থাকবেন না। এ ব্যাপারে হাজী সাহেবের কোন অভিমত থাকলে আরো আগেই তুলতেন।

পাঠকদের দিলের প্রশান্তির জন্য এই তিন হযরতের কিছু বৈশিষ্ট্য ও কর্মধারা সম্পর্কে জানা জরুরি।
(ক) মাওলানা ইজহারুল হাসান রহমাতুল্লাহি আলাইহি। তিনি ছিলেন বয়োবৃদ্ধ। মাওলানা সাদ সাহেবের মাতামহ। দুর্বলতা সত্ত্বেও তিনি কাশিফুল উলূম মাদ্রাসার জিম্মাদারী সামলাতেন। এছাড়া মারকাজের মসজিদওয়ার জামাতের জিম্মাদারীও তাঁর উপরে ছিল। (এই দায়িত্বকে আমাদের প্রচলিত মসজিদগুলোর সেক্রেটারির সাথে তুলনা করা যায়। অর্থাৎ মারকাজের সার্বিক ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে ছিলেন।) এছাড়া প্রতিদিন রাতে তিনি মিম্বরে হায়াতুস সাহাবাহ পড়তেন। হায়াতের একটা লম্বা সময় ধরে তিনি এই দায়িত্বগুলো সামলিয়েছেন। এবং মৃত্যুর আগ পর্যন্ত এই দায়িত্বসমূহ পালন করেন।
(খ) মাওলানা যুবায়েরুল হাসান সাহেব রহমাতুল্লাহি আলাইহি। তিনি বেশ ভারী ছিলেন। এবং শারীরিক ভাবে খুব একটা সক্ষম ছিলেন না। তিনি মোটামুটি সারাক্ষণ দুআ এবং যিকিরে মশগুল থাকতেন। ১৯৮০ সালের হজ্জ সফরে শায়খুল হাদীস হযরত মাওলানা যাকারিয়া রহমাতুল্লাহি আলাইহি প্রায় বেশির ভাগ সময় তাঁকে সাথে সাথে রাখেন। এবং এক পর্যায়ে তাঁকে খিলাফত দান করেন। যখন তিনি মারকাজে ফেরত আসেন তখন আমি (মাওলানা মেহবুব) সেখানে ছিলাম। আমি তাঁর হাবভাবের মধ্যে অনেক পরিবর্তন লক্ষ্য করলাম। তিনি ঘন্টার পর ঘন্টা দুআ কান্নাকাটিতে মশগুল থাকতেন। ফলশ্রুতিতে তাঁর শরীর ভারী হয়ে যায়। [শায়খুল হাদীস রহমাতুল্লাহি আলাইহির বিশিষ্ট খলিফা মাওলানা ইউসুফ মুত্বলা দামাত বারকাতুহুমের বিভিন্ন মুজাকারায় জানা যায়, শায়খুল হাদীস রহমাতুল্লাহি আলাইহি মাওলানা সাদ সাহেবকে ভবিষ্যতের আমীর হিসাবে দেখতে চেয়েছিলেন। তখনও মাওলানা সাদ সাহেব শিশু মাত্র। শায়খুল হাদীস রহমাতুল্লাহি আলাইহি তৎকালীন মারকাজের জিম্মাদার সাথীদের উদ্দেশ্যে এক চিঠিতে বিশেষ ভাবে নির্দেশ দেন যে, শিশু সাদ সাহেবের যেন এমন তরবীয়ত হয় যাতে তিনি পরবর্তীতে এই কাজের জিম্মাদারী আদায় করতে পারেন। তাই ভবিষ্যৎ ইমারতের অন্যতম দাবিদার মাওলানা যুবায়ের সাহেবের মেহনতের রুখ পাল্টে দিয়ে তিনি যেন মাওলানা সাদ সাহেবকেই ইমারতের একমাত্র উত্তরসূরি মনোনয়ন করলেন।]
(গ) মাওলানা সাদ সাহেব দামাত বারকাতুহুম ছিলেন প্রাণশক্তিতে ভরপুর এক কর্মচঞ্চল তরুণ। হজরতজী রহমাতুল্লাহি আলাইহি তাঁকে শুরু থেকেই বিভিন্ন সফরে নিজের সাথে নিয়ে চলতেন। মূলতঃ হজরতজীর আশীর্বাদেই মাওলানা সাদ সাহেব দাওয়াতে তাবলীগের বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কে একেবারে কচি বয়স থেকেই পরিচিত ছিলেন
তাই ১৯৯৫ সালের পরে এই তিনজনের মধ্যে প্রধানত সাদ সাহেবই জিম্মাদারী পালন করতেন। মাওলানা ইজহারুল হাসান এবং মাওলানা যুবায়েরুল হাসান রহিমাহুমুল্লাহ খুশি মনে তাঁর সিদ্ধান্ত মেনে চলতেন এবং সহযোগিতা করতেন। এভাবেই সাদ সাহেবের নেতৃত্বে সব কিছু সুন্দর ভাবে চলছিল।এর প্রমান পাওয়া যায় বিগত ২২ বছর ধরে টঙ্গি ইযতেমায় গুরুত্ব পূর্ণ বয়ান ও রাওনগি হেদায়েতের মত গুরুত্ব পূর্ণ আমল তিনি করতেন।
২০১৪ সালের ১৪ই জানুয়ারী টঙ্গী ইজতেমা চলাকালীন ফজর বাদ মাসোয়ারায় বিভিন্ন দেশের ১৫০ জন জিম্মাদার সাথীর উপস্থিতিতে উনাকে আমির হিসেবে সব সাথী মেনে নেন। আট দিন ধরে এরই আলছনা, মাসোয়ারা এবং মরাত্তাব করার প্রক্রিয়া ছলতে থাকে।২২শে জানুয়ারী বাদ মাগ্রিব মাওলানা যুবায়ের সাবের কামরায় বাংলাদেশের ১০ জন শুরার উপস্থিতিতে চূড়ান্ত ফায়সালার কাগজে দস্তখত করেন মাওলানা ফারুক সাব। কেউ এর বিরোধিতা করেননি। ২০১৭ সালের সেই ফায়সালার কাগজের কপি আলোচনার শেষে সংযুক্ত করা আছে, কারো সন্দেহ থাকলে তাহকিক করতে পারেন

এ পর্যায়ে তিনটি প্রশ্ন উঠে…
ক) ১৯৯৫ সালে কেন একজন আমীর মনোনীত করা গেল না?
জবাবঃ উম্মতের ঐক্যই সর্বাগ্রে। হায়াতুস সাহাবাহ থেকে আমরা দেখেছি আবু যার রদ্বিয়াল্লাহু আনহুর মত অনেক কট্টর সাহাবীও শুধুমাত্র উম্মতের ঐক্যের খাতিরে ফরজ নামাজেও ব্যত্যয় করেছেন; তিনি মুসাফির হওয়া সত্ত্বেও শুধু আমীরুল মুমিনীনের অনুসরণের খাতিরে কসর আদায় না করে সম্পূর্ণ নামায আদায় করেছেন। আমীরুল মুমিনীন উসমান রদ্বিয়াল্লাহু আনহুর সাথে তাঁর অনেক ইখতিলাফ সত্ত্বেও তিনি মুখালিফাত করেননি। বরং শেষ জীবনে আমীরের ফয়সালা মেনে নিয়ে নির্জনবাস করেছেন। উম্মতের ঐক্য এতই প্রাধান্য রাখে যে, শরীয়তে উম্মতের ঐক্য ধরে রাখার জন্য শরীয়তের সীমার মধ্যে সর্বাত্মক ছাড় দেওয়ার নির্দেশনাও রয়েছে।
১৯৯৫ সালের উল্লিখিত মাসোয়ারাতে মূলতঃ দুজনের পক্ষে রায় আসে। মাওলানা যুবায়ের সাহেব এবং মাওলানা সাদ সাহেব। এর বাইরে শুধুমাত্র মাওলানা ইজহারুল হাসান রহমাতুল্লাহি আলাইহির নাম আলোচনায় আসে। অন্য কারো নাম আলোচনায় আসেনি।
সে সময়ে ভারতের প্রভাবশালী সাথীদের মধ্যে এই দুইজনের ব্যাপারে বেশ জোড়ালো সমর্থন ছিল। আলীগড় ও দিল্লির প্ৰভাবশালী বড় বড় দুনিয়াবী লাইনের সাথীদের একচেটিয়া রায় ছিল যুবায়ের সাহেবের পক্ষে। অন্যদিকে মাওলানা সাদ সাহেবের পক্ষে ছিলেন মেওয়াতী ও দিল্লীর সাধারণ সাথীরা। এতে সাথীদের মধ্যে বিভক্তির আশঙ্কা দেখা দেয়।
হজরতজীর বানানো জামাত তথা শূরাগণ তিনদিন মাসোয়ারা করেও একমত হতে পারেন নি। তাই শেষ পর্যন্ত নিরুপায় হয়ে তিনজনের উপরে জিম্মাদারী ন্যস্ত করেন।
বলাবাহুল্য আজ মাওলানা সাদ সাহেবের একক নেতৃত্বের উপর ফিৎনার প্রেক্ষিতে এ কথাই প্রমাণিত হয় যে, আজকের বাস্তবতা সেই দিনই বুযুর্গদের চোখের সামনে উদ্ভাসিত হয়েছিল।

খ) যদি তিনজনের শূরা বানানো হয়ে থাকে তাহলে মাওলানা ইজহারুল হাসান রহমাতুল্লাহি আলাইহির ইন্তেকালের পর বিশ বছর পার হওয়া সত্ত্বেও কেন তাঁর স্থলাভিষিক্ত কাউকে মনোনয়ন দেয়া হল না?
জবাবঃ হজরতজী রহমাতুল্লাহি আলাইহি সীরতে ফারুকীর অনুসরণে দশ জনের একটি জামাত বা শূরা বানান পরবর্তী আমীর মনোনয়নের জন্য। এই জামাত বা শূরা ১৯৯৫ সালে হজরতজীর ইন্তেকালের পরে পরবর্তী আমীর মনোনয়নের জন্য মাসোয়ারাতে বসেন। কিন্তু তাঁরা পরপর তিনদিন মাসোয়ারা করেও একজনের উপরে একমত হতে ব্যর্থ হন। তাই অপারগতা বসত তিনজনের উপরে এই মেহনত ও মারকাজের জিম্মাদারী অর্পণ করেন। এটা কোন শূরা ছিল না, বরং জিম্মাদারী ছিল। তাঁদের উদ্দেশ্য তিনজন নয় বরং একজনই ছিল। তাই একজনের ইন্তেকালের পরেও শূন্য স্থান পূরণের কোন কথা উঠেনি।
উল্লেখ্য যে, হজরতজী রহমাতুল্লাহি আলাইহির অন্যান্য শূরাদের সকলেই তখন পর্যন্ত হায়াতে ছিলেন, কিন্তু তাঁরা কেউই এই কথিত শূন্যপদ পূরণের দাবি জানান নি। পক্ষান্তরে আজ যারা দাবি উঠাচ্ছেন তারা কেউই হজরতজীর বানানো শূরাতে ছিলেন না। এমনকি মাওলানা যুবায়েরুল হাসান রহমাতুল্লাহি আলাইহি হায়াতে থাকতেও তারা দাবি উঠান নি। এতেই তাদের ভাঁওতাবাজি পরিষ্কার হয়।

গ) কেন মাসোয়ারাতে তিনজন জিম্মাদার বাছাই করে নেয়ার সিদ্ধান্তে মুফতী জয়নুল আবেদীন রহমাতুল্লাহি আলাইহি, হাজী আব্দুল ওয়াহাব সাহেব দামাত বারকাতুহুম আপত্তি করেন? কেনই বা মাওলানা সাঈদ আহমাদ খান সাহেব হতাশা ব্যক্ত করেন। (তবে সকলেই ফয়সালা কবুল করেন।)
জবাবঃ শুধু তাঁরাই নন, উপস্থিত উলামাকেরামদের অনেকেই এই ফয়সালায় অবাক হন এবং হতাশ প্রকাশ করেন। এঁদের মধ্যে মাওলানা আশেকে ইলাহী বুলন্দশহরী রহমাতুল্লাহি আলাইহি অন্যতম। এমন কি ঐ মাসোয়ারার ফয়সাল মিয়াজী মেহরাব সাহেব এবং সে সময়ের প্রধানতম দাঈ মাওলানা উমার পালানপুরী রহমাতুল্লাহি আলাইহিও ফয়সালা ঘোষণার সময় অনেক কান্নাকাটি করেন।
কুরআন, হাদীস ও আসারে সাহাবাতে নির্দেশনা খুবই পরিষ্কার এবং প্রামাণ্য যে, আমীর একজনই হবেন। শরীয়তে সম্মিলিত শূরার ফায়সালা অথবা রোটেশন বা পর্যায়ক্রমিক পদ্ধতির ফয়সালের কোনই অবকাশ নেই।
শরীয়তে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিরও কোন স্থান নেই যে, সংখ্যাগরিষ্ঠ রায়ের উপরে ফয়সালা হবে। বরং শরীয়তের অনুমোদিত পদ্ধতি হল মাসোয়ারা। সেখানে পরামর্শ হবে, বিভিন্ন উমুরের উপরে পরামর্শে উপস্থিত সাথীরা স্বতস্ফূর্ত রায় দিবেন। পরিশেষে আমীর ফয়সালা করবেন। আমীরের উপরে বাধ্যবাধকতা নেই যে, সংখ্যাগরিষ্ঠ মতের উপরে ফয়সালা করতে হবে। বরং সংখ্যাগরিষ্ঠ, সংখ্যালঘিষ্ঠ এমন কি একক রায়ের উপরেও ফয়সালা করতে পারেন। মোনাসেব মনে করলে আমীর সকল রায়ের বিপরীতেও ফয়সালা করতে পারেন। এমনকি আমীর কোন মাসোয়ারা ছাড়া নিজ সিদ্ধান্তে ফয়সালা করবেন, এটাও শরীয়তে নিষিদ্ধ নয়। আমীরকে মাসোয়ারা করে ফয়সালা করার জন্য অনেক তাকীদ দেয়া হয়েছে কিন্তু বাধ্যতামূলক করা হয়নি। সংক্ষেপে আমীরের জন্য মাসোয়ারা জরুরত এবং কর্তব্য কিন্তু জরুরী বা অত্যাবশ্যক নয়। কিন্তু আমীরের ফয়সালা শরীয়ত বিরোধী না হলে মান্য করা সব সময়েই জরুরী।
এখানে আরো লক্ষণীয় হাজী সাহেব দামাত বারকাতুহুম তিনজনকে জিম্মাদারী দেয়ার বিরোধিতা করেছিলেন। এতেই বুঝা যায়, তিনি কোন ক্রমেই শূরার পক্ষপাতী ছিলেন না। আজ কথিত আলমী শূরা গং যে দাবি করছে যে, হাজী সাহেব শূরা বানিয়েছেন, তার কোন সত্যতা নেই।

◆ আমীর মনোনয়নের বিভিন্ন পদ্ধতিঃ
শাহ ওয়ালী উল্লাহ দেহলভী রহমাতুল্লাহি আলাইহি আমীর মনোনয়নের বেশ কয়েকটি পদ্ধতি উল্লেখ করেছেন। এর মধ্যে অন্যতম হল –

১. যদি কোন ব্যক্তি কোন ব্যাপারে জিম্মাদারী গ্রহণ করেন অর্থাৎ কোন একটি দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং ঐ দায়িত্বের সকল কিছু আঞ্জাম দেন, তাহলেই তিনি স্বয়ংক্রিয়ভাবে ঐ দায়িত্বের জিম্মাদার তথা আমীর হন। যেমন, মাওলানা ইলিয়াস রহমাতুল্লাহি আলাইহি এভাবেই এই কাজের আমীর ছিলেন। তাঁর মেহনত তথা দায়িত্ব আদায়ই তাঁকে জিম্মাদার বানিয়েছে। সীরতে এমন অসংখ্য ঘটনা পাওয়া যায়। উম্মতের কঠিন হালতের মধ্যে হযরত আলী রদ্বিয়াল্লাহু আনহু নিজেই উম্মতকে ঐক্যবদ্ধ করার জিম্মাদারী কাঁধে নেন। হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে যুবায়ের রদ্বিয়াল্লাহু আনহুমা নিজেই হিম্মত করে উমাইয়াদের জুলুমের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর জিম্মাদারী নেন। এমন আরো অনেক ঘটনা আছে।
মাওলানা সাদ সাহেব দামাত বারকাতুহুম গত প্রায় দুই দশক ধরে নিজেই দায়িত্ব নিয়ে মারকাজের এবং মেহনতের জিম্মাদারী আদায় করে আসছেন এবং মাওলানা যুবায়েরুল হাসান রহমাতুল্লাহি আলাইহিও কখনো প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেন নি। বরং সব সময় সর্বাত্মক সহযোগিতা করেছেন। এবং সব সময় বড় বড় জিম্মাদারী ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের দায়িত্ব মাওলানা সাদ সাহেবের উপরেই ছেড়ে দিতেন। এখানে উল্লেখ্য হযরত হাসান রদ্বিয়াল্লাহু আনহুও মুআবিউয়া রদ্বিয়াল্লাহু আনহুর অনুকূলে জিম্মাদারী ছেড়ে দিয়েছিলেন। যুবায়েরুল হাসান রহমাতুল্লাহি আলাইহি যেন সেই সীরতে তৈয়্যেবার অনুসরণ করলেন।

২. যদি কোন ব্যক্তির ব্যাপারে লোকজন শলাপরামর্শ করে বায়আত হন, তাহলেও তিনি আমীর হন।
হযরত আবু বকর রদ্বিয়াল্লাহু আনহু এভাবেই খলীফা হয়েছিলেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইন্তেকালের পরে আনসারগণ একত্রিত হয়ে নিজেদের মধ্যে একজন আমীর নিযুক্ত করেন। তখন মুহাজিরগণ সেখানে যান, উমার রদ্বিয়াল্লাহু আনহু আবু বকর রদ্বিয়াল্লাহু আনহুর পক্ষে কিছু কথা রাখেন। এরপর লোকজন আবুবকর রদ্বিয়াল্লাহু আনহুর পক্ষে বায়আত হন। এখানে কোন আনুষ্ঠানিক মাসোয়ারা বা ফয়সাল ছিল না। বরং তাৎক্ষণিক ভাবে উমার রদ্বিয়াল্লাহু আনহু জিম্মাদারী নিয়ে কিছু কথা বললে, (কিছু ব্যতিক্রম বাদে) অন্যান্য সাহাবীগণ প্রভাবিত হন এবং আবু বকর রদ্বিয়াল্লাহু আনহুর অনুকূলে বায়আত হন।
হযরত মাওলানা যুবায়েরুল হাসান রহমাতুল্লাহি আলাইহির ইন্তেকালের পরে মেওয়াত ইজতেমায় কয়েক লক্ষ মানুষ নিজে থেকেই মাওলানা সাদ সাহেব ইমারতের ব্যাপারে বায়আত হন ও সমর্থন ব্যক্ত করেন। নিজামুদ্দিনের জন্য শূরা গঠন করা হয়। শূরাগণও মাওলানা সাদ সাহেবের ইমারতের উপরে একমত হন।

◆ কথিত আলমী শূরা যেভাবে গঠিত হয়ঃ
মাওলানা তারিক জামিল সাহেবের বক্তব্য অনুসারে ২০১৫ সালে এই শূরা গঠন হয় এবং একটি কাগজে লিখে হাজী সাহেবের কাছে পেশ করা হয়। হাজী সাহেব স্বাভাবিক ভাবে এই কাগজে সাইন করেন নি। বরং ১০১ বার ইস্তেখারার দুআ পড়ে সাইন করেন। এরপর মাওলানা সাদ সাহেবের কাছে পাঠানো হয়। তিনি প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি বলেন, “কোন আলমী শূরা নেই। শুধু আলমী মাসোয়ারা আছে।”
কয়েকটি প্রশ্নের উদ্রেক হয়ঃ
১. আলমী শূরা কে গঠন করে?
২. কেন এটা গঠন হল? কি দরকারে গঠন করা হয়েছে?
৩. কেন মাওলানা সাদ সাহেবের সাথে আলোচনা করা হল না? শুধুমাত্র নিজেরা নিজেরা গঠন করে তাঁকে এটা গ্রহণ করতে বলা হয়েছিল।
৪. হাজী সাহেব দামাত বারকাতুহুম নিজেও হজরতজী রহমাতুল্লাহি আলাইহির শূরার সদস্য ছিলেন। কেন তাঁর সাথেও আগে থেকে কোন আলোচনা করা হল না?
৫. হাজী সাহেব কেন স্বাভাবিক ভাবে এই ডকুমেন্টে দস্তখত করেন নি?
৬. বাংলাদেশের কিছু সাথীকে কথিত আলমী শূরার অন্তর্ভুক্ত করা হয়। তাঁরাও দাবি করেছেন তাঁদের কোন মতামত নেয়া নি। তাঁরা কিছুই জানতেন না। কারো কোন মতামত না নিয়ে কেন এভাবে শূরা বানানো হল?
এসব প্রশ্নের উত্তর তাবলীগী মেহনতের প্রায় শত বছর ধরে চলে আসা মোবারক উসূলের মধ্যে পাওয়া যাবে না। উত্তর খুঁজতে হলে এক অশুভ চক্রের পলিটিক্স বুঝতে হবে।
সম্পূর্ণ ব্যাপারটি খোলাসা করতে গেলে এক নোংরা অধ্যায় প্রকাশিত হবে এবং সম্ভাব্য গীবতের সম্ভাবনাও রয়েছে।
তাই সংক্ষেপে শুধু এতটুকুই বলি এই চক্র মাওলানা সাদ সাহেবকে অমর্যাদা করতে চায়। তারা মাওলানা সাদ সাহেবকে আমীর হিসাবে চাচ্ছে না।
কেউই ফিৎনার উর্দ্ধে নয়, বিশেষ করে যখন আমরা কিয়ামতের নিকটবর্তী হচ্ছি। ইতিহাসের পাতায় এসব ঘটনা পরিপূর্ণ আছে যেখানে অনেক বড় বড় আলেম এবং আল্লাহওয়ালা মানুষও আরো বড় বড় ফিৎনায় লিপ্ত হয়েছেন। তাই একথা নিশ্চিত যে, যে কোন যোগ্যতার মানুষই হোক না কেন, কেউই ফিৎনার উর্দ্ধে নয়। উদাহরণের জন্য শেইখ আওওয়ামার আদাবুল ইখতিলাফ দেখা যেতে পারে।
কিয়ামতের অন্যতম একটি আলামত ব্যপক ভাবে মিথ্যাকে সত্য হিসাবে উপস্থাপন করা হবে এবং সত্যকে মিথ্যা।

Facebook Comment





© All rights reserved © 2020 TabligNewsBD.Com
Design & Developed BY PopularServer.Com