মঙ্গলবার, ২৫ Jun ২০১৯, ১০:২১ পূর্বাহ্ন

বদরের জিহাদ ছিল উম্মতের এতেয়াতের প্রথম পরিক্ষা

বদরের জিহাদ ছিল উম্মতের এতেয়াতের প্রথম পরিক্ষা

মাওলানা সৈয়দ আনোয়ার আবদুল্লাহ। তাবলীগ নিউজ বিডিডটকম

১৭ রমজান, হক বাতিলের অসম লড়াইয়ে ইস্পাতের মতো আনুগত্যশীল একটা জামাতের প্রথম আত্মত্যাগ ও বিজয়ের দিন আজ। রাসুলে পাক সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে হাজারে ঘাত-প্রতিঘাতের পর মাত্র ৩১৩জন আনসার আর মুহাজির সাহাবী। সম্পূর্ণ অপ্রস্তুত এক কাফেলা। ঈমানের বলে বলিয়ান তার। ১৩ বছর রাসুল তাদের পেছনে ঈমানের মেহনত করে পাহাড়ের মতো সাহাবিদের ঈমানকে তৈরি করেছেন।

এখন আল্লাহ পাক তাদের ঈমানের পরিক্ষা নিতে চান। নিতে চান এতেয়াত/ আনুগত্যের পরিক্ষা। রাসুলের নির্দেশ পাওয়ার সাথে সাথে সাহা বারা এতেয়াতে একটা নজিরবিহীন নজরানা পেশ করলেন।

ঢাল নেই, তলোয়ার নেই, লোক লস্কর পর্যাপ্ত নেই। পেটে খাবার নেই। পরনে কাপড় নেই। ঘোড়া, কামান, যুদ্ধের বর্ম নেই। নেই বলতে কিছুই নেই। আছে কেবল নবিজী আনুগত্য। রাসুলের ভালবাসা। আমীরের নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে পালনের এক ঈমানী জজবা। এতেয়াতে পাহাড়সম হিম্মত। নবিজীর নির্দেশে যুদ্ধ কেন! আরো বড় কোন পরিক্ষা এলেও এই কাফেলা অবলীলায় প্রস্তুত। আমীরের নির্দেশো তার সাগর ঝাপ দিতে পারেন নিঃসংকোচে, পাহাড়ের চুড়া থেকে চোখের ইশারায় লাফ দিয়ে পড়তে পারবেন কোন প্রশ্ন আর সংশয় ছাড়াই। এমনি এক দুর্বল ক্ষুদ্র এতেয়াতের জামাত তৈরি করেছিলেন ঈমানী মেহনত করে রাসুলে পাক সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম।

বদর দিবসকে স্মরন করে আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে এরশাদ করেন,”নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের সাহায্য করেছেন বদরের যুদ্ধে। অথচ তোমরা ছিলে দুর্বল। অতএব আল্লাহকে ভয় কর যাতে তোমরা কৃতজ্ঞ হ’তে পার’ (আলে ইমরান ৩/১২৩)।

এই কুরবানীর নজরানার ফলেই মুসলমানদের আল্লাহ পাক গায়বী সাহায্য করেছিলেন ফিরিস্তা পাঠিয়ে। এতেয়াত ওয়ালাদের জন্য মহা পুরস্কার ঘোষনা করেছেন সয়ং আল্লাহ তায়ালা। এই তিনশ তেরজন এতেয়াতি জানবাজ কুরবানীওয়ালা সাহাবীর জীবনের আগে ও পরের সকল গোনহকে আল্লাহ মাফ করে দেন।তারা এতোটাই সম্মানীত সাহাবী হন যেন, ৩১৩জনের নাম পড়ে দোয়া করলে তার কবুল হয়। বদরের কঠিন পরিক্ষার সময় যারা রাসুলের আনুগত্য করে কুরবানী দিয়েছিলেন, তাদের ও পরবর্তী সাহাবী দের মর্যাদা ও ফজিলত একটা নেয়। তারা ছিলেন বিশেষ সম্মানী ও মর্যাদাবান।

এই আনুগত্যশীল জামাতের কুরবানীর ফলে সহসা মাথা উঁচু করে ভবিষ্যতের নতুন জগতের দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপের যোগ্যতা অর্জন করেন মুসলমান। তাই কুরআনে বদর যুদ্ধের দিনকে “ইয়াওমুল ফুরকান” তথা ছাটাই বাছাইয়ের কষ্ঠিপাথর বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে এই বদরের অভিযান সাহাবাদের মধ্যে ছাটাই বাছাই হয়েছিল। কারা এতেয়াতের পরীক্ষায় ঠিকবেঠিক আর কারা আমীরের পাশ থেকে পরিক্ষায় ছিটকে পড়বে। আল্লাহ পাক ৩১৩জনকে বাচাইয়া করলেন তার দ্বীন বিজয়ের জন্য। রাসুলের আনুগত্যের জন্য। তাদের কুরবানীর ফলে তাদের সম্মানীতে করার জন্য।

বদর যুদ্ধের পূর্বে রাসুল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আনছার ও মোহাজির সাহাবাদের একত্র করলেন এবং তাদের সামনে পরিস্থিতি পরিষ্কার করে তুলে ধরলেন। তাদের অভিপ্রায় জানতে চাইলেন। তারা সকলেই রাসুলের সিদ্বান্তকে মেনে নিয়ে শেষ সময় পর্যন্ত রাসুলের সাথে থাকার ওয়াদা দিলেন। তখন মুসলমানদের সংখ্যা ছিলো ৩১৩ জন। সাহাবারা আনসার ও মুহাজিরদের পক্ষ থেকে রাসুলের কাছে আনুগত্য ও এতেয়াতের পূনরায় শপতি নিলেন এবং বাইয়াত হলেন।

হযরত মেকদাদ (রাঃ) মুহাজিরদের পক্ষ হতে দাড়িয়ে বললেন, “ইয়া রাসুলুল্লাহ, আল্লাহর নির্দেশে আপনি যেখানে খুশি চলুন, আমরা আপনার সাথে থাকবাে। আমরা বনী ইসরাইলের ন্যায় এমন কথা বলবােনা যে, “হে মুসা তুমি আর তােমার প্রভু গিয়ে যুদ্ধ কর, আমরা এখানে বসে তামাশা দেখি। আমাদের কথা হলাে আপনি আল্লাহর নামে যুদ্ধে চলুন। আমরাও আপনার সাথে যুদ্ধে যাব এবং ততক্ষণ পর্যন্ত লড়তে থাকাবাে যতক্ষণ আমাদের চোখের পলকগুলাে নড়াচড়া করতে থাকবে।”

আনসারদের পক্ষ হতে হযরত সা’দ বিন মা’জ (রাঃ) উঠে বললেন “হে আল্লাহর রাসুল, আমাদের ব্যাপারে কোন চিন্তা করবেন না। জীবনে, মরণে, সুখে, দুঃখে ছায়ার ন্যায় আমরা আপনাকে অনুসরণ করবাে। যেখানে থামতে বলেন সেখানে থামবাে। সাগরে ঝাঁপ দিতে বলেন দেব, ডুবতে বলেন ডুববাে আর মরতেবলেন মরবাে।

এই যুদ্ধে সবচেয়ে বেশি কঠিন পরীক্ষা দিতে হয়েছিল মুহাজিরদেরকে । এদের প্রতিপক্ষ ছিল আপন ভাই,পুত্র, কারো বাবা এবং অন্যান্য নিকট আত্মীয় স্বজন। কারো বাপ , কারো চাচা, কারো মামা আর কারো ভাই ও পুত্র ছিল তার তলোয়ারের লক্ষ্যবস্তু এবং নিজ হাতে তাদের হত্যা করতে হয়েছিল এইসব কলিজার টুকরাকে । বদর যুদ্ধ ছিল আত্মত্যাগের এক বিরাট নিদর্শন।

বদরের যুদ্ধ আরম্ভ হলে দেখা গেল, পিতা-পুত্রের বিরুদ্ধে, ভ্রাতা-ভ্রাতার বিরুদ্ধে, বন্ধু-বন্ধুর বিরুদ্ধে দন্ডায়মান। আল্লাহ পাক কেয়ামত পর্যন্ত রাসুলের আনুগত্য্যশীল উম্মতকে শিক্ষা দিলেন, দ্বীনের জন্য কখনো বাবা ছেলের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে হবে, ভাই, ভাইয়ের বিরোদ্ধে , দীর্ঘদিনের বন্ধু, এতেয়াতের পরিক্ষা দিতে গিয়ে দ্বীনের জন্য তলোয়ারের নিয়ে বন্ধুর বিরোদ্ধে দাড়াতে হবে। এটি ছিল রাসুলের আনুগত্যের সবচেয়ে কঠিনতম পরিক্ষা। সবচেয়ে কঠিনতম কুরবানী আর আত্মত্যাগ্যের নজরানা। যা কেয়ামত পর্যন্ত আনুগত্য্যশীল মুসলমান ও মুমিনদের জন্য একটা মহা শিক্ষা হিসাবে উপস্থাপিত হয়েছে। এতেয়াতের পরিক্ষা কতটা কঠিন হতে পারে, কত নির্দয় ও কুরবানীর হতে পারে আসহাব বদরী নদের দিয়ে আল্লাহ তায়ালা প্রথম পরিক্ষায় তার দেখিয়ে দিলেন।

হজরত আবু বকর রাযিঃ তাঁর পুত্র আব্দুর রহমানের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছেন, হুজায়ফা রাযি তার পিতার উপর তলোয়ার চালিয়েছিলে। এভাবে ৩১৩জনের প্রত্যেকই তার আপনজনদের বিরোদ্ধে দাঁড়িয়েছিলেন ।

এই কঠিন পরীক্ষায় কেবল তারাই টিকে থাকতে পেরেছিল , যারা সাচ্চা দিলে আল্লাহর সঙ্গে ওয়াদা করেছিলঃ যে সব সম্বন্ধকে তিনি বজায় রাখতে বলেছেন,তারা শুধু তাই বজায় রাখবে আর যেগুলোকে তিনি ছিন্ন করার নির্দেশ দিয়েছেন – তা যতোই প্রিয় হোক না কেন – তারা ছিন্ন করে ফেলবে।”

কিন্তু সেই সঙ্গে আনসারদের পরীক্ষাও কোনো দিক দিয়ে সহজ ছিল না। এ যাবত আরবের কাফির এবং মক্কার মুশরিকদের চোখে তাদের ‘অপরাধ’ ছিল এটুকু যে, তারা তাদের দুশমন অর্থাৎ মুসলমানদের কে আশ্রয় দান করেছে। কিন্তু এবার তারা প্রকাশ্যভাবেই ইসলামের সমর্থনে কাফির মুশরিকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে এসেছে। এর অর্থ হচ্ছে এই যে, তারা তাদের জনপদটির (মদিনা) বিরুদ্ধে গোটা আরবদেরকেই দুশমন বানিয়ে নিয়েছে। অথচ মদিনার জনসংখ্যা তখন সাকুল্যে এক হাজারের বেশি ছিল না । এতো বড় দুঃসাহস তারা এজন্যেই করতে পেরেছিল যে, তাদের হৃদয় আল্লাহর ও রাসূলের মুহাব্বত এবং আখিরাতের প্রতি অবিচল ঈমানে পরিপূর্ণ হয়েছিল। নতুবা আপন ধন-দৌলত স্ত্রী-পুত্র-পরিবারকে এভাবে সমগ্র আরব ভূমির শত্রুতার ন্যায় কঠিন বিপদের মুখে কে নিক্ষেপ করতে পারে ?

ইসলামী জীবন ব্যবস্থায় আমীরে আনুগত্য হচ্ছে দেহের ভেতর রুহের সমতুল্য। এতেয়াত হেদায়তের দরজা। ইসলামের রুহ। তাই আমীরের আদর্শের পরিপূর্ণ ও নির্ভেজাল আনুগত্যের জন্যে মনকে প্রস্তত করার নিমিত্ত বারবার মুসলমানদের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলো এই বদর যুদ্ধে। অল্প সাহাবী নবীর নির্দেশে জান দিতে অবলীলায় তৈরি হয়ে গেলেন ইসলামের জন্য। বদরের যুদ্ধ বাহ্যিকভাবে ছিল আত্মঘাতি। কিন্তু এতেয়াতের উপর জমে যেতেই আল্লাহ পাক ফেরেস্তা পাঠিয়ে গায়বী সাহায্য করলেন। যেন যুগে যারা এভাবে দ্বীনের জন্য্য আনুগত্যের কঠিন পরিক্ষা দিতে প্রস্তুত হবে আল্লাহ পাক তাকে আসহাব বদরীনদের মতোই গায়বী সাহায্য করবেন।

Facebook Comment





© All rights reserved © 2019 Tablignewsbd.Com
Design & Developed BY PopularServer.Com
error: Content is protected !!