মঙ্গলবার, ২৫ Jun ২০১৯, ১০:০৬ পূর্বাহ্ন

খোলা চিঠি: ফিরে এসো ভাই অন্ধকার থেকে আলোর পথে…

খোলা চিঠি: ফিরে এসো ভাই অন্ধকার থেকে আলোর পথে…

মাওলানা সৈয়দ আনোয়ার আবদুল্লাহ

প্রিয় সাথী ভাই…
আসসালামু আলাইকুম। আশা করি আল্লাহর মেহেরবানীতে শারিরীকভাবে ভাল আছো।
মনে আছে কি সেদিনের কথা। তোমার যৌবনের শুরুর সেই সময়ের কথা। আমরা তোমার বাসায় বারবার গাশতে যেতাম। তুমি বিরক্ত হতে। নাছোড় বান্দার মতো একটা সময় তোমরা কয়েক বন্ধু আমাদের সাথে তিনদিনের জন্য গেলে। তোমরা তখন জানতে না গোসলের ফরজ কয়টি। জানতে না নামাজ কিভাবে পড়তে। ভুলে গিয়েছিলে কালিমা। আখেরাতে আর দ্বীনের কথা। নিজেদের এই কমি গুলো সামনে এলে চিল্লার জন্য নাম লিখালে। সেই থেকে তোমার সাথে দ্বীনী সম্পর্কে। আল্লাহর জন্য মহব্বত। সেই ভালবাসার অধিকার আর খোদায়ে পাকের কাটগড়া থেকে বাঁচতে ঈমানী জিম্মাদরী হিসাবে তোমাকে এই চিঠি লেখা।

তোমাদের সাথে সেই একযুগ আগের সেই চিল্লার কথা আজো মনে পড়ে। মনে পড়ে তোমার মাসলা -মাসআলা জানার আগ্রহ আর শেষ রাতের রোনাজারি আর দ্বীনের ফিকির নিয়ে বেচাইন গাশতের কথা। সেই একযুগ যুগ থেকে তুমি ব্যাক্তিগত, দ্বীনি সকল সমস্যা নিয়ে কত হাজারবার মাশওয়ারা নিয়েছ আমার কাছ থেকে। এমন করে মানতে যেভাবে একটা ছোট শিশু তার মাকে মানে। আজ এমন কি হল এত বড় মেরুকরণের পথে তুমি চলে গেলে অমুক থমুককে দেখে, যাদের নামও একসময় জানতে না। তাদেরকে আজ দ্বীনী মেহনতের ফায়সালাকারী মেনে তুমি কোন পথে হাঠছ ভাই। কোন অচেনা চোরাবালিতে তুমি আটকে গেলে!

আলেমদের ভালবাসা, মহব্বত করা এসবতো আমাদের কাছ থেকেই শিখা। মহল্লায় পাঁচ কাজ, মাস্তুরাতের মেহনত কতটা মনযোগ দিয়ে করেছ একটা সময়। দুনিয়ার পেরেশানীতে পরে মার্কাজ, পাঁচকাজ, হালকার জোড় ও কাজের সাথীদের সোহবত থেকে একটু দূরে সরে গেলেও মহল্লায় জামাত এলে পাক করে খাওয়ানোর জন্য তুমি বেচাইন হয়ে থাকতে।

প্রিয় অবুঝ সাথী!
আমি জানি, তোমাকে ওরা ভুল বুঝিয়েছে। আলেম উলামার দোহাই দিয়ে তোমাকে বিভ্রান্ত করেছে। আর তুমিই বা কেন এত তাড়াতাড়ি এমন একটা সিদ্ধান্তে পৌঁছে গেলে! তাবলীগের মেহনতের ফলে উলামাদের প্রতি অগাদ শ্রদ্ধা ও বিশ্বাসকে তারা পুঁজি বানিয়ে তোমাকে ব্লেকমেইল করেছে।

আজ এক ফেৎনার সংকটে আবেগের বশে কোন তহকীক না করেই তাড়াতাড়ি সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলছ। ফেৎনা তোমাকে এতো তাড়াতাড়ি গ্রাস করে ফেলল ভাবতেই কষ্ট হয়। আমি জানি না কিভাবে তোমাকে ওরা মিসগাইড করছে। কিভাবে মিথ্যাচার করে তোমাকে তোমার দ্বীনের ব্যাপারে, মোবারক মেহনত, মুল শেকড় ও বিশ্ব মারকাজ আর আমীরের আনুগত্যের বিষয়ে সংশয়ে ফেলেছে। তুমি ভাল ভাবে না বুঝেই অন্যের কথায় প্রলুদ্ধ হয়েছো।

তুমি আজ বিদ্রোহ প্রকাশ করে আল্লাহর রাস্তার জামাতকে মসজিদ থেকে বের করে দিচ্ছ। মসজিদে তালীম বাঁধা দিচ্ছ। মুন্তাখাব হাদীসের কিতাব তুমি মসজিদ থেকে বের করে পুকুরে ফেলে দিয়েছ। তুমি মানুষকে মসজিদে জোড়ানোর যে মেহনত শিখেছিলে আজ তুমি এর বিপরীত মেরুর মেহনত করে কি দ্বীলে শান্তি পাচ্ছ? জামাতের ভুলাবালা সাথীদের চোখের পানি ও বদদোয়ার কথা কি তোমার একটিবার মনে হয়ে না? তুমি বাঁধা প্রদানের মেহনত লেগে কি দ্বীলে শান্তি পাচ্ছ? তুমি দিনভর মূলধারা তাবলীগের সাথীদের ওজাহাতি করে ও মাদরাসার ছাত্রদের নিয়ে মহল্লায় হুমকী ধমকী দিয়ে যাচ্ছ। তাদের চলার পথে বাধা দিচ্ছ। মহল্লা থেকে বের করার চেষ্টা করছ। নানান অপবাদ আর রটনা বলে বেড়াচ্ছ।

প্রিয় সাথী! সারাদিন এসব করে রাতে কি ঘুম হয় ঠিকভাবে। একটিবার কি মিছিল মিটিং আর টেকানোর নব্য তাবলীগে লেগে দ্বীলে দাগ কাটে না? কি করছি আমি? আর কি করার ছিল?? আমার মঞ্জিলই বা কোথায়??? তোমার এসব কাজের বিষয়ে আল্লাহ তায়ালা কুরআনুল করিমের শক্ত ধামকী দিয়েছেন বহু জায়গায়। এমন কোন কাজ করোনা যার দ্বারা আখেরাতে বরবাদ হয়ে। কবর হাশরে আল্লাহর সামনে জালেম হিসাবে দাড়াতে হয়।

প্রিয়! আজ কেবল তোমার সামনে কয়েকটি কুরআনের আয়াত সরাসরি তুলে ধরলাম। আমার ভয় হচ্ছে আজ তোমরা যারা এই কাজগুলোই করছ দ্বীন মনে করে, কেয়ামতের দিন এই আয়াত গুলোর মিসদাক না হয়ে যাও।

আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন-

وَ مَنْ اَظْلَمُ مِمَّنْ مَّنَعَ مَسٰجِدَ اللهِ اَنْ یُّذْكَرَ فِیْهَا اسْمُهٗ وَ سَعٰی فِیْ خَرَابِهَا .
‘আর তার চেয়ে বড় জালেম কে হবে, যে আল্লাহর ঘরে তাঁর নাম স্মরণ করা থেকে মানুষকে বাধা দেয় এবং সেগুলোকে ধ্বংস করার প্রচেষ্টা চালায়, এই ধরনের লোকেরা এসব ইবাদাত গৃহে প্রবেশের যোগ্যতা রাখে না। আর যদি কখনো প্রবেশ করে, তাহলে ভীত-সন্ত্রস্ত অবস্থায় প্রবেশ করতে পারে। তাদের জন্য রয়েছে এ দুনিয়ার লাঞ্ছনা এবং আখিরাতের বিরাট শাস্তি। (সুরা বাক্বারা : আয়াত ১১৪)

মহান আল্লাহ বলেন, إِنَّ الَّذِيْنَ كَفَرُواْ وَصَدُّواْ عيْلِ اللّهِ قَدْ ضَلّاَلاً اً- ‘যারা কুফরী অবলম্বন করেছে এবং আল্লাহর পথে বাধার সৃষ্টি করেছে, তারা সুদূর বিভ্রান্তিতে পতিত হয়েছে’ (নিসা ৪/১৬৭)।

মহান আল্লাহ বলেন, قُلْ يَا أَهْلَ الْكِتَابِ لِمَ تَصُدُّوْنَ عَنْ سَبِيْلِ اللّهِ مَنْ آمَنَ تَبْغُوْنَهَا عِوَجاً وَأَنْتُمْ شُهَدَاءَ وَمَا اللّهُ بِغَافِلٍ عَمَّا تَعْمَلُوْنَ- ‘বলুন, হে কিতাবধারীগণ! কেন তোমরা আল্লাহর পথে ঈমানদারদেরকে বাধা দান কর, তোমরা তাদের দ্বীনের মধ্যে বক্রতা অনুপ্রবেশ করানোর পন্থা অনুসন্ধান কর, অথচ তোমরা এ পথের সত্যতা প্রত্যক্ষ করছ। বস্ত্ততঃ আল্লাহ তোমাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অনবগত নন’ (আলে-ইমরান ৩/৯৯)।

আল্লাহ বলেন, وَلاَ تَقْعُدُوْا بِكُلِّ صِرَاطٍ تُوْعِدُوْنَ وَتَصُدُّوْنَ عَنْ سَبِيْلِ اللّهِ مَنْ آمَنَ بِهِ وَتَبْغُوْنَهَا عِوَجاً وَاذْكُرُوْا إِذْ كُنْتُمْ قَلِيْلاً فَكَثَّرَكُمْ وَانْظُرُوْا كَيْفَ كَانَ عَاقِبَةُ الْمُفْسِدِيْنَ- ‘তোমরা পথে-ঘাটে একারণে বসে থেকো না যে, আল্লাহ বিশ্বাসীদেরকে হুমকি দিবে, আল্লাহর পথে বাধা সৃষ্টি করবে এবং তাতে বক্রতা অনুসন্ধান করবে। স্মরণ কর, যখন তোমরা সংখ্যায় অল্প ছিলে অতঃপর আল্লাহ তোমাদেরকে অধিক করেছেন এবং লক্ষ্য কর কিরূপ অশুভ পরিণতি হয়েছে অনর্থকারীদের’ (আ‘রাফ ৭/৮৬)।

“তারা তােমাকে জিজ্ঞেস করে পবিত্র মাসে যুদ্ধ করা যায়েজ কিনা! বলো পবিত্র মাসে যুদ্ধ করা গুরুতর অন্যায়। কিন্তু আল্লাহকে অস্বীকার করা, আল্লাহর প্রিয় বান্দাদেরকে তার পথে চলতে ও পবিত্র মসজিদে যেতে বাধা দেয়া এবং সেখান হতে ঈমানদারদেরকে তাড়িয়ে দেয়া আল্লাহর নিকট আরাে অধিকতর অন্যায়, এবং হত্যা অপেক্ষা জুলুম আরাে ভয়াবহ।” (আল বাকারা- ২১৭)।

বন্ধু, তোমাকে একটি বিষয় মনে করিয়ে দিচ্ছি, জামে মসজিদে জুম্মার নামাজ হওয়ার জন্য উজানে আম তথা সর্ব সাধারণ মুসলমানের জন্য মসজিদ আমি হওয়া শর্ত। মুসলমানের কোন জামাতকে মসজিদে প্রবেশে বাঁধা দিলে সেই মসজিদে জুমার নামাজ হবে না। (ফতুয়ায়ে শামী এক নাম্বার খণ্ড ৬০১ নাম্বার পৃষ্ঠা)

এখন চিন্তা করো তোমার বাঁধার কারণে মসজিদে আল্লাহর রাস্তার মেহমানরা প্রবেশ করতে পারে নিয়ে। এখন গোটা মহল্লার শত শত মুসল্লীর জুমার নামাজ নাম হওয়ার গোনাহ গলো কি তোমার কাঁধে পড়বে না। এই গোনাহের বোঝা কি বন্ধু তুমি বহন করতে পারবে রোজ হাশরের দিনে? কবরের করুন ঘাঁটিতে কি এ-র জন্য আযাব দেয়া হলে তাকি তুমি সহ্য করতে পারবে ভাই। তুমি একবার ভাব! তোমাকে কি মেহনতের লাগিয়ে দিয়েছেন ওজাহাতি সেই আলমেরা! ভাবতেই গা শিউরে উঠে।

প্রিয় দ্বীনি ভাই…
আজ তোমার আচরণে আমার দ্বীল চূর্ণ বিচূর্ণ হয়ে যাচ্ছে। একদা তুমি প্রতি রাতে মুন্তাখাব হাদীস থেকে সহীহ হাদীস গুলো ৬নাম্বারের আলোকে মুখস্ত করতে। এই রাসুলের হাদীসের কি দোষ। মাওলানা সাদ কান্ধালভীর বিরোধিতা করতে গিয়ে এটি কি রাসুলের বিরোধীতা হয়ে যাচ্ছে না তো?

আর তোমাকে একা দোষ দিয়ে লাভ কি। ইসলামের ইতিহাসে শুরুর জামানা থেকেই অনেক বড় বড় বুজুর্গ ফেৎনার উৎস হয়ে উঠেছেন মোনাফেকদের বিভ্রান্তিতে পড়ে। আমার অনেক গাফলতি ছিল। আমি তোমার প্রতি বড় অবহেলা করেছি। তোমার খবর নিই নি। এই ফেৎনার শুরুতে চুপ থেকেছি। মূখ খুলিনি। এই চুপ থাকার ফাঁকে আজ তুমি বাতিলের টার্গেটের ক্রীড়নক হয়ে গেছ। আমাদের এই নির্লিপ্ততার সুযোগে ওরা হামলে পড়েছে তোমার উপর। তোমার মেহনতের সাজানো বাগানকে মিথ্যার ধারালো চাকু দিয়ে ক্ষত বিক্ষত করে দিয়েছে। ফলে আজ হোক বুঝার যোগ্যতা হারিয়ে ফেলেছ তুমি।

প্রিয় সাথী…
তুমি কত তাড়াতাড়ি এমন এক সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছো, যা অনেক ভেবেচিন্তে নিতে হয়। অনেক জানতে ও বুঝতে হয়। তারা হয়তো তোমার অন্তরে কিছু সন্দেহ ঢুকিয়ে দিয়েছে। তুমি তা যাচাই করে দেখতে। যারা জানে তাদের শরণাপন্ন হতে।
অথচ যাচাই না করেই তুমি এমন কিছুকে ঠিক মনে করছো, যার সপক্ষে মজবুত কোন প্রমাণ নেই।
তুমি কেন ভয় করলে না।

যে করেই হোক আমাদের তোমার সাথে বসতে হবে। তোমার সামনে সত্য তুলে ধরলে আস্তে আস্তে মিথ্যার আবরণ কেটে যাবে। তোমার ক্ষত বিক্ষত দ্বীল আল্লাহ চাহেতো আবার সবুজ সজীব হয়ে উঠতে পারে। আমি জানি সত্যকে তুমি ঠিকই মেনে নেবে। ঠিকই তুমি তাওবা করে ফিরে আসবে।

মাওলার কাছে তোমার এবং তোমার মতো আরও অবুঝদের জন্যে হেদায়াতের আরজি পেশ করেছি। নিজের গাফলতির জন্যে ক্ষমা চেয়েছি।
আলো ছেড়ে কোন অন্ধকারে ছুটছো আমার অবুঝ ভাইটি। তুমি কি আরও ভেবে দেখবে না? ফিরে আসুন ভাই অন্ধকার ছেড়ে আলোর পথে।

মাওলা! আমার এই ভাইদেরকে তুমি আলোর রাস্তা দেখাও। তাদেকে আবার জামাতবদ্ধ জীবনের সাথে চলার তাওফিক দাও। আমীরের আনুগত্যের মতো এই জামানারও মহা নেয়ামত থেকে খোদা তুমি আমার এই ভাইদেরকে বঞ্চিত করো না। যেন হঠাৎ আলোর ঝলকানিতে তাদের কাছে পথ স্পষ্ট হয়ে যায়। হে মাওলা! আলো চাই! অফুরন্ত আলো!

Facebook Comment





© All rights reserved © 2019 Tablignewsbd.Com
Design & Developed BY PopularServer.Com
error: Content is protected !!