মঙ্গলবার, ২৫ Jun ২০১৯, ১০:২৬ পূর্বাহ্ন

প্রসঙ্গ আগুনে পুড়ানো: পশুত্বের কোন স্থরে কথিত জমহুররা আর ইসলাম কি বলে?

প্রসঙ্গ আগুনে পুড়ানো: পশুত্বের কোন স্থরে কথিত জমহুররা আর ইসলাম কি বলে?

প্রচ্ছদ ছবি:প্রতিকী
সৈয়দ আনোয়ার আবদুল্লাহ,তাবলীগ নিউজ বিডিডটকম

গত দুমাসে বাংলাদেশে আলোচিত দুটি আগুনে পুড়ানোর ঘটনা ঘটেছে।  আর বর্বর দুটি ঘটনাই ঘটেছে ইসলামি অঙ্গনে তথা দ্বীনী পরিবেশে।  একটি মাদরাসায় অপরটি তাবলীগে। যারা ঘটনা গঠিয়েছেন মানুষরুপি এই পশুরা আবার নিজেদের দ্বীনের খাদেম ও ইসলামের ধারকবাহক মনে করেন। একজন মাদরাসার প্রেন্সিপাল ও শিক্ষক যিনি নুসরাতকে পুড়িয়ে মারেন। আরেকদল তাবলীগের নামে বাংলাদেশের জমহুর আলেমদের অনুসরণকারী দ্বীনের মহান খাদেম! তাই দ্বীন জিন্দা করার মেহনত হিসাবে  রমজানমাসে তারাবির নামাজ শেষে একজন হাফেজে কুরআন মুবাল্লীগের গায়ে আগুন পেট্টল ঢেলে আগুন লাগিয়ে পুড়িয়ে মারার চেষ্টা করে।এমন নির্মম বর্বরতা, যা আইয়্যামে জাহিলিয়াতকেও হার মানায় এমন ঘটনার পরেও স্বপক্ষের লোকদের বাচাঁতে মিথ্যাচার আর বুদ্ধি প্রতিবন্ধি জমহুর আল্লামাদের নিরবতা! বামপন্থী বুদ্ধিজিবী চাটুকারদের চিন্তা চেতনা ও দর্শনকে হার মানিয়েছে।

হাফজ আব্দুর রহিম রাজন


ফেনীর নুসরাত জীবনের কাছে হার মানে পরাপারে চলে গেলেও এখন কিশোরগঞ্জের হাফেজ আব্দুর রহিম রাজন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতসলের বার্ন ইউনিটে  শরীরের ৭০ভাগ পুড়া অংশ নিয়ে রমজান মাসে জীবন মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে।  নুসরাতকে পুড়িয়ে মারার নায়ক  মাওলানা সিরাজুদ্দৌলার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবীতে সারা দেশ সোচ্চার হলে মাওলানারাও কিছু প্রতিবাদ করেন,  কিন্তু রমজান মাসে একজন হাফেজে কুরআনের গায়ে পেট্টল ঢেলে  আগুন লাগানোর পরেও বাংলাদেশের জমহুর মাওলানারা অফলাইন অনলাইনে নিরব, মুফতী আব্দুল মালেকদের ফতোয়াবাজি আর তুথির জোর যেন ফুরিয়ে গেছে, কারণ তারাও এই বর্বরতার নিরব সমর্থক! জালেমরা, দ্বীনের নামে বর্বর কায়দায় “সাদপন্থী তাবলীগওয়ালা”কে পুড়িয়ে মারতে চেয়েছে তাদের ইন্ধন ও উস্কানীতেই। তাই তাদের সমর্থকরা অপরাধী জালেমকে বাঁচাতে বলছে, “রাজন নিজেই তার শরীরে পেট্টল ঢেলে আগুন দিয়েছে কথিত জমহুর আল্লামাদের ফাঁসাতে। ” কতোটা বিবেক বন্ধক দিয়ে দ্বীন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পশুত্বের কাতারে নেমে গেলে এমন কথা বলা যায়। তবে মনে রাখবেন, গায়ের জোড়ে, তাগুতি শক্তির দাপটে দুনিয়াতে সেন্ডিকেট করলেও আখিরাতে কেয়ামতের দিন ইনসাফের আদালতে কোন সেন্ডিকেট চলবে না।

মানুষ মানুষকে পুড়িয়ে মারছে। পেট্রল মেরে আগুনে জ্বালিয়ে দেওয়া হচ্ছে। দাউ দাউ করে জ্বলে ওঠা আগুনে দগ্ধ হচ্ছে নিরপরাধ মানুষ। সে জানতেও পারছে না কী তার অপরাধ। আজ এদেশের ইসলামী অঙ্গনে এমন নির্মম, বীভৎসতা কিভাবে দেখি। কেঁদে ওঠে মন। হায়রে মানুষ, আর কত নিচে নামবে? আর কত মানুষ পুড়ে মরবে, কবে আসবে শান্তি? মানুষ হত্যা মহাপাপ। ইসলাম কোনো রকম হত্যাকাণ্ডকে সমর্থন করে না।
কেবল মানুষ হত্যা নয়, জমিনে ফ্যাসাদ ও অশান্তি সৃষ্টিও মহাপাপ। যারা এসব কাজ করছে, এসব কাজের সঙ্গে যারা জড়িত, যারা ইন্ধনদাতা, তাদের সবাইকেই আখেরাতে কঠিন আজাবের মুখোমুখি হতে হবে।

কোনো জীবন্ত পশু-পাখি আগুনে পোড়ানো ইসলামে নিষিদ্ধ। আবদুর রহমান বিন আবদুল্লাহ (রা.) তার পিতা থেকে বর্ণনা করেন যে, এক সফরে আমরা রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সঙ্গী ছিলাম। তিনি দেখতে পেলেন, আমরা একটা মৌমাছির বাসা জ্বালিয়ে দিয়েছি। মহানবী (সা.) বললেন, ‘কে এটি জ্বালিয়ে দিয়েছে?’ আমরা নিজেদের কথা বললাম। তিনি বলেন, ‘আগুনের স্রষ্টা ছাড়া কারো জন্য আগুন দিয়ে শাস্তি দেওয়া শোভা পায় না।’ (আবু দাউদ, ‍হাদিস নং : ২৬৭৫)

ফিকাহবিদরা বলেন, পিঁপড়া দংশন না করলে তাদের মেরে ফেলা মাকরুহ। আর এদের পানিতে নিক্ষেপ করা সর্বাবস্থায় নিষিদ্ধ। বিচ্ছুকেও আগুনে পুড়ে ফেলা নাজায়েজ।’ (ফতোয়ায়ে বাজ্জাজিয়া, ৬/৩৭০)

ইসলাম শান্তির ধর্ম, সব ধরনের অশান্তি, বিশৃঙ্খলা, মারামারি, হানাহানি, জুলুম নির্যাতন বন্ধের জন্য এবং নিরীহ ও নিরপরাধ মানুষের জীবনের নিরাপত্তার জন্য ইসলামের আগমন ঘটেছে। জাহেলি যুগে তুচ্ছ একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে খুনোখুনি, হানাহানি এবং রক্তের বদলে রক্ত নিতে গিয়ে অসংখ্য নিরপরাধ মানুষের জীবনহানি ঘটত এবং বছরের পর বছর ধরে যুদ্ধবিগ্রহ চলত। ইসলামের মহান প্রবর্তক বিশ্বশান্তির মূর্ত প্রতীক হজরত মুহাম্মদ (সা.) এসে এ সবকিছু সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ ঘোষণা করলেন। বিদায় হজের ভাষণে তিনি অত্যন্ত কঠোরভাবে ঘোষণা করলেন : হে মানবমণ্ডলী তোমাদের রক্ত, তোমাদের সম্পদ এই দিন ও এই মাসের মতো তোমাদের ওপর নিষিদ্ধ ও পবিত্র তোমাদের প্রভুর সঙ্গে সাক্ষাতের দিন পর্যন্ত।
আগুনে পুড়িয়ে মারা বা মারার চেষ্টা তো আরো বেশি জঘন্য। এতে শিরকের গন্ধ চলে আসে। রাসূল স. কোনো মানুষ, জীব-জন্তু বা কোনো ফসল-গাছ-পালা আগুনে পোড়াতে নিষেধ করেন।

কোনো ক্ষতিকর প্রাণীকেও আগুনে পুড়িয়ে মারা জায়েয নেই। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন,

وَإِنَّ النَّارَ لاَ يُعَذِّبُ بِهَا إِلَّا اللَّهُ

মহান আল্লাহ তাআলা তাঁর সৃষ্টজীবকে পুড়িয়ে মারার অধিকার কাউকে দেননি। আগুনে পুড়িয়ে মারার অধিকার একমাত্র আল্লাহ তাআলারই। আগুনে পুড়িয়ে মারার ফলে একসাথে কয়েকটি অপরাধ সংগঠিত হয়, এর কোনো কোনোটি তো শিরকের পর্যায়ভুক্ত। কাউকে আগুনে পুড়িয়ে মারা বা মারার চেষ্টা জঘন্যতম অপরাধ। যারা এ ধরনের কাজ করবে, আল্লাহর বিধান লঙ্ঘনের কারণে তারা আল্লাহর রহমত থেকে অবশ্যই বঞ্চিত হবে এবং রাসূল (সা.) এর কথা না মানার কারণে তারা কিয়ামতের দিন রাসূল (সা.)- এর শাফায়াত পাবে না।

হাদীস শরীফে আছে, হযরত রাসূলুল্লাহ (সা.) কোনো মানুষ, জীব-জন্তু বা কোনো ফসল-গাছ-পালাকে আগুনে পোড়াতে নিষেধ করেছেন। রাসূলে কারিম (সা.) বলেন, ‘আগুন দ্বারা কেবল আল্লাহই শাস্তি দেবেন, আল্লাহ ছাড়া আর কারো আগুন দ্বারা শাস্তি দেয়ার অধিকার নাই।’ (বোখারি ও আবু দাউদ) তেমনি অন্যায়ভাবে কাউকে হত্যা করা মহা পাপ। আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরআনে ইরশাদ করেন, “যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে মুসলমানকে হত্যা করে, তার শাস্তি জাহান্নাম, তাতেই সে চিরকাল থাকবে। আল্লাহ তার প্রতি ক্রুদ্ধ হয়েছেন, তাকে অভিসম্পাত করেছেন এবং তার জন্যে ভীষণ শাস্তি প্রস্তুত রেখেছেন”। (সূরা আন নিসা : আয়াত নং ৯৩) কিন্তু আজ খুবই দুঃখ-ভারাক্রান্ত হৃদয়ে সবাই লক্ষ্য করছেন যে, আমাদের মুসলিম ভাই-বোনদের অহরহ আগুনে পোড়ানো হচ্ছে এবং অন্যায়ভাবে ধরে নিয়ে আহত ও নিহত করা হচ্ছে। জীবন্ত মানুষকে পেট্রল বোমা, গান পাউডার ইত্যাদি দিয়ে জ্বালানো হচ্ছে। ইসলামের বিধানের তোয়াক্কা না করে, মানবতাকে পায়ে পিষে, পশুত্বের কোন স্তরে পৌঁছলে এমন কাজ করা সম্ভব তা বোধগম্য নয়। এই সব জগণ্যতম কর্ম-কা- দেখলে শয়তানও ঘৃণা ও লজ্জা পায়। আমরা আজ কোথায় বাস করছি? আমরা কি সভ্য জগতের বাসিন্দা, আশরাফুল মাখলুকাত বা সৃষ্টির সেরা জীব? নাকি অন্য কিছু, কিছুই বুঝতেছি না!

রাসূল স. কাফির-মুশরিকদের বিরুদ্ধেও কোনো যুদ্ধে কাউকে আগুনে পোড়ানোর অনুমতি দেন নি। কারণ জাহান্নামে আল্লাহ তায়ালা অপরাধীদের জন্য আগুনের শাস্তি প্রস্তুত রেখেছেন। জাহান্নামকে আরবীতে ‘নার’ বা আগুন বলা হয়েছে। তাই এ শাস্তি কোনো মানুষ দিতে চাইলে এতে আল্লাহর বিশেষ শাস্তি প্রয়োগের ক্ষমতায় যেন তাঁর সমাসীন হওয়ার দাবী চলে আসে।
অথচ এখন আমাদের মুসলিম ভাই-বোনদেরকে অহরহ আগুনে পোড়ানো হচ্ছে। জীবন্ত মানুষের গায়ে পেট্রোল ঢেলে জ্বালানো হচ্ছে। পশুত্বের কোন স্তরেও কি আছি আমরা!?

হযরত ইকরিমা রা. থেকে বর্ণিত। রাসূল সা. ইরশাদ করেছেন তোমরা আল্লাহর শাস্তি আগুন দিয়ে; কাউকে শাস্তি দিও না। আবু দাউদ : ৪৩৫৩

মহান আল্লাহ পবিত্র কোরআনুল কারিমে অন্যায়ভাবে হত্যা এবং বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির অপরাধ সম্পর্কে ইরশাদ করেন- ‘যে ব্যক্তি কাউকে হত্যা করল সে যেন দুনিয়ার সব মানুষকেই হত্যা করল, আর কেউ কারও প্রাণ রক্ষা করলে সে যেন সব মানুষের প্রাণ রক্ষা করল (৫:৩২)। ‘ অন্যায়ভাবে হত্যার শাস্তি সম্পর্কে আল্লাহতায়ালা ইরশাদ করেন- কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে কোনো মুমিনকে হত্যা করলে তার শাস্তি জাহান্নাম সেখানে সে স্থায়ী হবে এবং আল্লাহ তার প্রতি রুষ্ট হবেন, তাকে লা’নত করবেন এবং তার জন্য মহাশাস্তি প্রস্তুত রাখবেন (৪:৯৩)। ইসলাম কোনোভাবেই অন্যের জানমালের ক্ষতিসাধন সমর্থন করে না।

যারা মানুষের জানমালের ক্ষতি করে ইসলাম তাদের প্রকৃত মুমিন বলে স্বীকৃতি দেয় না। রসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন- ‘প্রকৃত মুমিন সে ব্যক্তি যার মুখ ও হাত থেকে অন্য মুসলমান নিরাপদ থাকে। ‘ সুতরাং একজন সত্যিকারের মুসলমান কখনো অন্য মুসলমানের জানমালের ক্ষতি করতে পারে না। বর্তমান পরিস্থিতিতে যেভাবে নিরীহ মানুষ মারা যাচ্ছে, নিরপরাধ মানুষকে বোমার আগুনে পুড়ে মরতে হচ্ছে এটা ইসলাম তো সমর্থন করেই না, কোনো বিবেকবান মানুষও এ হত্যা ও ধ্বংসাত্দক কার্যক্রম সমর্থন করতে পারে না।

ইসলাম জীবের প্রতি দয়া করতে শেখায়। ক্ষতিকর প্রাণিও আগুন দিয়ে পুড়িয়ে মারা কোরআন-সুন্নাহ সমর্থন করে না।

তাই আমরা এ সবকিছুর অবসান চাচ্ছি এবং এসব বন্ধের আহ্বান জানিয়ে সাধারণ ও নিরীহ মানুষের জানমালের নিরাপত্তা বিধানের জন্য দাবি জানাচ্ছি। আসুন এই জালেমদের বিরোদ্ধে সোচ্চার হই। আল্লাহতায়ালা আমাদের সবাইকে হেফাজত করুন।

Facebook Comment





© All rights reserved © 2019 Tablignewsbd.Com
Design & Developed BY PopularServer.Com
error: Content is protected !!