রবিবার, ২৮ ফেব্রুয়ারী ২০২১, ১১:৩৭ অপরাহ্ন

এই জঙ্গীরা এত নির্লজ্জ ও অহংকারী হয়ে হাসছে কেন?

এই জঙ্গীরা এত নির্লজ্জ ও অহংকারী হয়ে হাসছে কেন?

মাওলানা সৈয়দ আনোয়ার আব্দুল্লাহ, তাবলীগ নিউজ বিডিডটকম

মসজিদে তাবলীগ জামাতকে নুসরতের অপরাধে পবিত্র রমজানুল মোবারকে হাফেজ আব্দুর রহিম রাজনের গায়ে পেট্রোল ঢেলে পুড়িয়া হত্যার চেষ্টার বর্বর ঘটনায় এই দুই পাকিস্তানপন্থী জঙ্গিকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। এই নির্লজ্জ আর অহংকারীদের বিষয় ইসলাম কি বলে? সোহেল ও মাহমুদুল নামে হেফাজতে ইসলামের এই দুই নেতাকে পুলিশ গ্রেপ্তার করে। ছবিতে দেখা যায় এই দুই উগপন্থীকে কিশোরগঞ্জের কাটিয়াদী থানার পুলিশ কোমরে রশি বেঁধে হাতে হ্যান্ডকাপ পরিয়ে ধরে নিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু নিলজ্জ ও অহংকারী এই দুই জঙ্গী হাতকড়া ও কোমরে রশি বাঁধা অবস্থায় পাপের অনুশোচনার বদলে হাসছে এবং অহংকার প্রকাশ করছে।
যা দেখে গাটা জাতির বিবেকবান মানুষ বিস্মৃত ও লজ্জিত।

রমজানুল মোবারকে একজন হাফেজে কুরআনের গায়ে আগুন লাগানোর পরেও তাদের মধ্য কোন অনুশোচনা নেই। নেই কোন প্রকার লজ্জাবোধ। লজ্জাশীলতা এমন একটি মানবীয় উত্তম গুণ, যা মানুষকে দ্বীনের উপর অটল ও অবিচল থাকতে উৎসাহিত করে। পক্ষান্তরে লজ্জাহীনতা সৎ আমলের পরিবর্তে অসৎ কাজ করতে, দ্বীনের কাজের স্থলে অন্যান্য গর্হিত কাজ করতে বাধা দেয় না।

নিলজ্জ ও বেহায়া হয়ে গেলে মানুষ পশুর কাতারে নেমে যায়। কুরআনের ভাষায়, তখন সে পশু থেকেও নিকৃষ্ট হয়ে যায়। সে পাপ করেও অনুতপ্ত হয় না বরং অহংকার করে। নিলজ্জের মতো হাসতে পারে অহংকারের সাথে। আমীর থেকে বিচ্ছিন্ন হলে, মূল থেকে ছিটকে পড়লে বা বিদ্রোহী গোষ্ঠির কীড়নক হলে মানুষ তখন পশুর কাতারে নেমে যায়। তাদের দ্বারা সব নিলজ্জ কাজ করাই সম্ভব পর হয়ে উঠে। তাদের অহংকার দেখলেই বুঝা যায়, এটি কতোটা খারাপ গুণ। এটা শয়তানের বৈশিষ্ট্য, আল্লাহতায়ালা যাদের অন্তর আলোহীন করে দিয়েছেন; তাদের অন্তরে অহংকার জায়গা করে নেয়। সর্বপ্রথম আল্লাহতায়ালা ও তাঁর সৃষ্টির ওপর যে অহংকার করেছিল সে হচ্ছে, অভিশপ্ত ইবলিস। তাই অহংকার ইবলিস চরিত্র।

অহংকারীর জানা উচিত যে, সে যতই বড় হোক না কেন- পাহাড় সমান তো আর হতে পারবে না; জমিন ছিদ্র করে তো বেরিয়ে যেতে পারবে না! যেমনটি আল্লাহতায়ালা পবিত্র কোরআনে কারিমে ইরশাদ করেছেন, ‘অহংকারবশে তুমি মানুষকে অবজ্ঞা করো না এবং পৃথিবীতে গর্বভরে পদচারণ করো না। নিশ্চয় আল্লাহ কোনো দাম্ভিক অহংকারীকে পছন্দ করেন না। পদচারণায় মধ্যবর্তিতা অবলম্বন করো এবং কণ্ঠস্বর নীচু করো। নিঃসন্দেহে গাধার স্বরই সর্বাপেক্ষা অপ্রীতিকর।’-সূরা লোকমান : ১৭-১৮

এরা এমন অহংকারী ও নিলজ্জ হয়ে উঠলো দ্বীনের নামে বর্বর প্রস্তর যাহেলী যুগের মতো এই বিষয়টি আমাদের ভাবতক হবে। হাদীছে লাজুকতাকে ঈমানের অঙ্গ, দ্বীনের বিশেষ স্বভাব-প্রকৃতি এবং কোন কোন হাদীছে একে দ্বীন বা দ্বীনের পূর্ণতা বলেও উল্লেখ করা হয়েছে। লাজুকতাই দ্বীন, আর নিলজ্জতাগ বদ্বদ্বীন। নিলজ্জ হলেই মানুষ শত শত মিথ্যা ওজাহাত করতে পারে। ওজাহাতের নামে মানুষকে পুড়াতে পারে। একটি হাদীছে এসেছে,

عَنْ قُرَّةَ بْنِ اِيَاسٍ رضى الله عنه قَالَ كُنَّا مَعَ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم فَذَكَرَ عَنْهُ الْحَيَاءَ فَقَالُوْا يَا رَسُوْلَ اللهِ اَلْحَيَاءُ مِنَ الدِّيْنِ، فَقَالَ رَسُوْلُ اللهِ صلى الله عليه وسلم بَلْ هُوَ الدِّيْنُ كُلُّهُ-

কুররাহ ইবনু ইয়াস (রাঃ) হ’তে বর্ণিত তিনি বলেন, আমরা রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর সাথে ছিলাম। তাঁর নিকটে লজ্জাশীলতার কথা উল্লেখ করা হ’ল। ছাহাবায়ে কেরাম বললেন, হে আল্লাহর রাসূল (ছাঃ)! লজ্জাশীলতা হচ্ছে দ্বীনের অংশ। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বললেন, ‘বরং সেটা (লাজুকতা) হচ্ছে পূর্ণাঙ্গ দ্বীন’।

মানবজীবনে লজ্জার মর্যাদা সর্বোচ্চে অবস্থান করে। লজ্জাশীলতা এমন এক গুণ, যা মানুষকে খোদার নাফরমানি ও অসংখ্য গুনাহর কাজ থেকে বিরত রাখতে পারে। হাদীস শরীফে রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন–

إِنَّ الْحَيَاءَ وَالْإِيمَانَ قُرِنَا جَمِيعًا فَإِذَا رُفِعَ أَحَدُهُمَا رُفِعَ الْآخَرُ

“লজ্জা ও ঈমানকে একত্রে সঙ্গী করা হয়েছে। সুতরাং এ দু’টির যে কোন একটিকে যদি উঠিয়ে নেয়া হয়, অন্যটিকেও উঠিয়ে নেয়া হয়।”
(বুখারী-আল-আদাবুল মুফরাদ, হাদীস নং ১৯৯৩/ বাইহাকী-শু‘আবুল ঈমান, হাদীস নং ৭৮৮৩/ মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবাহ, হাদীস নং ২৮৬২০)
অপর হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সা.) লজ্জাকে ঈমানের অঙ্গ আখ্যায়িত করে বলেন–

الْإِيمَانُ بِضْعٌ وَسِتُّونَ شُعْبَةً وَالْحَيَاءُ شُعْبَةٌ مِنْ الْإِيمَانِ
“ঈমানের ৭০টির অধিক শাখা রয়েছে এবং লজ্জা ঈমানের একটি বিশেষ শাখা।”(সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৯/ সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৩৫ প্রভৃতি)

মূলত মানুষ কোন অন্যায় কাজ করতে গেলে যে দ্বিধাদ্বন্দ্বে পড়ে, লোকে দেখে ফেলার ভয় জাগে এটা লজ্জাশীলতার লক্ষণ। লজ্জা এভাবেই মানুষকে সব ধরনের অনিষ্ট থেকে বাঁচিয়ে রাখে। কিন্তু লজ্জাহীন মানুষ নির্বিঘেœ সব মন্দ কাজ করতে পারে। কোন কিছুই তাকে মন্দ কাজ থেকে নিবৃত্ত করতে পারে না। তাই মহানবী (সা.) বলেছেন–

إِنَّ مِمَّا أَدْرَكَ النَّاسُ مِنْ كَلاَمِ النُّبُوَّةِ الأُولَى إِذَا لَمْ تَسْتَحْيِ فَاصْنَعْ مَا شِئْتَ

“নিঃসন্দেহে মানুষ পূর্ব যমানার নবূওয়াতের কথামালা থেকে যা লাভ করেছে, তার একটি হলো, যখন তুমি লজ্জা না করবে, তখন যা ইচ্ছা তা কর।”
(সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৬১২০)
কথায় বলে, “লজ্জা নারীর ভূষণ।” মূলত লজ্জা নারী-পুরুষ সকলেরই ভূষণ। লজ্জার দ্বারাই তাদের ঈমানের প্রকাশ ঘটবে। এ প্রসঙ্গে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন, “একদা নবী কারীম (সা.) এক আনসার সাহাবীর কাছ দিয়ে যাচ্ছিলেন। তখন তার ভাই তাকে বেশী লজ্জাশীল না হওয়ার জন্য উপদেশ দিচ্ছিলেন। এ কথা শুনে রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন–

دَعْهُ فَإِنَّ الْحَيَاءَ مِنْ الْإِيمَانِ

“তাকে এভাবে থাকতে দাও। কারণ, লজ্জাশীলতা ঈমানের অঙ্গ।”
(সহীহ বুখারী, হাদীস নং ২৪/ সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৩৬)
লজ্জার পরিচয় দিতে গিয়ে ইমাম নববী বলেন, ‘হাকিকাতুল হায়ায়ে খুলুকুন ইয়াবআছু আলা তারকিল কাবিহে’ লজ্জা এমন এক জিনিস যা মানুষকে খারাপ কাজ থেকে ফিরিয়ে রাখে।

আমরা নৈতিকতার কঠিনতম সময়ে জীবনযাপন করছি। শেষ যুগের ভ্রষ্টতা ও বিপর্যয় মাত্রা ছাড়িয়ে গেছে। সর্বত্র সন্দেহ-সংশয় আর ভয়াবহ মিথ্যাচার ও আসাবিয়তের জেহালত বিস্তার লাভ করেছে। আগে যা নন্দিত ছিল, তা কারও কাছে আজ নিন্দিত হয়ে গেছে। যা মন্দ ছিল, তা ভালো মনে হচ্ছে। বদ্বীনকে দ্বীনের নামে চালিয়ে দেয়া হচ্ছে আবলিলায়। সত্যকারের ওরাসাতুল আম্বিয়ার বদলে পোশাকি লোকজনের আধিক্য বেড়েই চলছে। এদের আল খেল্লার ভিতর অহংকার ছাড়া আর কিছুই নেই। এরা নিজেদেরকে দ্বীনের ঠিকাদরা মনপ করে মনগড়া মতো দ্বীনকে চালিয়ে দিয়ক গোনাহ করেও অহংকার করে। উপরের মানুষরুপি এই দুগ জানোয়ার তাদেরই উত্তরসুরী ও আর্দশিক লোক। এরা আইএসের মতো মানুষকে জবাই করে কিংবা পুড়িয়ে বিকৃতি উল্লাস করতে পারে। অহংকার করে নিলজ্জের মত হাসতে পারে। তবপ মনে রাখতে হবে, দুনিয়াতে অহংকারের পরিণতি হ’ল লাঞ্ছনা। আর আখেরাতে এর পরিণতি হ’ল ‘ত্বীনাতুল খাবাল’ অর্থাৎ জাহান্নামীদের পুঁজ-রক্ত পান করা। যার অন্তরে যতটুকু অহংকার সৃষ্টি হবে, তার জ্ঞান ততটুকু হরাস পাবে। যদি কারু অন্তরে অহংকার স্থিতি লাভ করে, তবে তার জ্ঞানচক্ষু অন্ধ হয়ে যায়। বোধশক্তি লোপ পায়। সে অন্যের চাইতে নিজেকে শ্রেষ্ঠ মনে করে। কাম্য সম্মান না পেলে সে মনোকষ্টে মরতে বসে। তার চেহারায় ও আচরণে, যবানে ও কর্মে অহংকারের দুর্গন্ধ বের হতে থাকে। ফলে মানুষ তার থেকে ছিটকে পড়ে। এক সময় সে নিঃসঙ্গ হয়ে যায়। একাকীত্বের যন্ত্রণায় সে ছটফট করতে থাকে। কিন্তু বাইরে ঠাট বজায় রাখে। এভাবেই সে দুনিয়া থেকে বিদায় হয়ে যায়। বদরের যুদ্ধে আবু জাহল মরার সময় বলেছিল, ‘আমার চাইতে বড় কোন মানুষকে তোমরা হত্যা করেছ কি’? অন্য বর্ণনায় এসেছে, ‘মদীনার ঐ চাষারা ব্যতীত যদি অন্য কেউ আমাকে হত্যা করত’?[53]

রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) এরশাদ করেন, أَلاَ أُخْبِرُكُمْ بِأَهْلِ الْجَنَّةِ كُلُّ ضَعِيفٍ مُتَضَعِّفٍ لَوْ أَقْسَمَ عَلَى اللهِ لَأَبَرَّهُ، أَلاَ أُخْبِرُكُمْ بِأَهْلِ النَّارِ كُلُّ عُتُلٍّ جَوَّاظٍ مُسْتَكْبِرٍ ‘আমি কি তোমাদেরকে জান্নাতীদের বিষয়ে খবর দিব না? তারা হ’ল দুর্বল এবং যাদেরকে লোকেরা দুর্বল ভাবে। কিন্তু তারা যদি আল্লাহর নামে কসম দিয়ে কিছু বলে, আল্লাহ তা অবশ্যই কবুল করেন। অতঃপর তিনি বলেন, আমি কি তোমাদেরকে জাহান্নামীদের বিষয়ে খবর দিব না? তারা হ’ল বাতিল কথার উপর ঝগড়াকারী, হঠকারী ও অহংকারী’।[54] অর্থাৎ হকপন্থী মুমিনগণ দুনিয়াবী দৃষ্টিতে দুর্বল হ’লেও আল্লাহর দৃষ্টিতে সবচেয়ে সবল। কেননা তাদের দো‘আ দ্রুত কবুল হয় এবং আল্লাহর গযবে অহংকারী ধ্বংস হয়।

পবিত্র কুরআনে জাহান্নামীদের প্রধান দোষ হিসাবে তাদের অহংকারকে চিহ্নিত করা হয়েছে। যেমন আল্লাহ বলেন, وَسِيقَ الَّذِينَ كَفَرُوا إِلَى جَهَنَّمَ زُمَرًا … قِيلَ ادْخُلُوا أَبْوَابَ جَهَنَّمَ خَالِدِينَ فِيهَا فَبِئْسَ مَثْوَى الْمُتَكَبِّرِينَ- ‘কাফিরদের দলে দলে জাহান্নামের দিকে হাঁকিয়ে নিয়ে যাওয়া হবে’… ‘তখন তাদেরকে বলা হবে তোমরা জাহান্নামের দরজা সমূহে প্রবেশ কর সেখানে চিরস্থায়ীভাবে অবস্থানের জন্য। অতএব অহংকারীদের বাসস্থান কতই না নিকৃষ্ট’ (যুমার ৩৯/৭১-৭২)। এখানে কাফিরদের বাসস্থান না বলে ‘অহংকারীদের বাসস্থান’ বলা হয়েছে। কেননা কাফিরদের কুফরীর মূল কারণ হল তাদের অহংকার।

Facebook Comment





© All rights reserved © 2020 TabligNewsBD.Com
Design & Developed BY PopularServer.Com