মঙ্গলবার, ২৫ Jun ২০১৯, ১০:১৪ পূর্বাহ্ন

ওলীপুরীর ওজাহাতি বয়ান ও একটি তাহকীকী পর্যালোচনা

ওলীপুরীর ওজাহাতি বয়ান ও একটি তাহকীকী পর্যালোচনা

বিশেষ প্রতিনিধি, তাবলীগ নিউজ বিডিডটকম

মাওলানা নুরুল ইসলাম ওলীপুরী দেশের অন্তত ২০টি ওজাহাতি মাহফিলে বলেন, “মাওলানা সাদ সাহেবের বক্তব্য হল এক কথায়; দেহ ব্যবসা দ্বারা যা উপার্জন করে এটা যত নাপাক, কুরআন-হাদীস শিক্ষা দিয়ে উস্তাদগণ যে বেতন-ভাতা গ্রহণ করেন,এটি বেশ্যা নারীর দেহ ব্যবসায় উপার্জনের চেয়ে আরো নাপাক৷ বেশ্যা নারীরা এসকল উস্তাদদের আগে জান্নাতে যাবে৷ মাদরাসায় যারা কুরআন-হাদীস শিক্ষা দেন,তারা হলেন পাপিষ্ট ৷ আর বেশ্যা নারী হয়ে গেল জান্নাতী৷ মাথা খারাপ হলে কী এভাবে হয়? মস্তক গান্ধা হলে কী এভাবে হয়? মগজ পঁচে গেলে কী এভাবে পঁচে?

তিনি আরো বলেন,মাদরাসায় পড়ানো খারাপ কাজ,আর বেশ্যা করা ভালো কাজ৷ ইমামতি করা খারাপ কাজ আর দেহ ব্যবসা করা ভালো কাজ৷ মুওয়াজ্জিনি করা খারাপ কাজ আর নারীদের দেহ ব্যবসা ভালো কাজ৷ এর চেয়ে বড় মস্তিষ্ক বিকৃতি,এর চেয়ে বড় মাতলামি আর কি হতে পারে?

ওলীপুরী বয়ানে বলেন,কিন্তু মাওলানা সাদ সাহেব বলেন,এই জাতীয় কাজের বেতন-ভাতা দেওয়া,নেওয়া বেশ্যা নারীর উপার্জনের চেয়ে খারাপ ৷ নবীর সাথে কত বড় বেআদব হলে এমন বলতে পারে; যেটি রাসুল নিজে করছেন,এটাকে বেশ্যা নারীর দেহ ব্যবসার উপার্জন বলতে পারে ? মস্তিষ্ক বিকৃতির তো সীমা থাকা দরকার,শয়তানিরও একটা সীমা থাকা দরকার…
(বয়ানের রের্আড আমাদের কাছে আছে)

এখন আসুন আমরা তাহকীক করে নেই, মাওলানা সাদ কান্ধালভীর আসল বক্তব্য কি ছিলঃ

মাদ্রাসার শিক্ষকদের বেতন নেওয়ার বিষয়ে হযরতজী মাওলানা সাদ কান্ধালভী প্রকৃত অর্থে যা বলেছিলেন তা হুবহু পাঠকের সামনে নিম্নে তুলে ধরা হল—-

“এজন্য ওমর (রাযিঃ) বলতেন, ” হে কুরআন শিখানেওলারা ! হে দ্বীন শিখানেওয়ালারা ! তোমরা কোরআন শিখিয়ে বিনময় মূল্য গ্রহণ করো না; অন্যথায় কমিনা লোকেরা তোমাদের আগে জান্নাতে প্রবেশ করবে”

এবার লক্ষ্য করুন, বক্তব্যটি মাওলানা সাদ সাহেবের নয় বরং বক্তব্যটি হযরত ওমর ( রাযি:) একটি সতর্ক বার্তা যা তিনি নকল করেছেন মাত্র। আর এখানে কমিনা লোক/ খারাপ লোক বলেছেন।

অথচ এই দুই লাইনের কথাকে জনাব ওলিপুরি মহোদয় কি পরিমাণ নোংরা ভাষা ব্যবহার পূর্বক অজাহাতি মাহফিলগুলোতে বিশ্লেষণ করেছেন!!! একজন বড় মাপের আলেমের দাওয়াতি ভাষা কেমন হওয়া উচিত ছিল। আর করো বক্তব্যকে এভাবে সাত-পাঁচ করে ব্যাখ্যা করা নৈতিক শরীয়া দৃষ্টিকোন ও ঈমানের তাকাযা থেকে কতটুকু অন্যায় তা সবারই জানা। এছাড়া এ ধরণের কুরুচিপূর্ণ ভাষা আমাদের হযরতদের জবানে কিভাবে আসতে পারে তা সত্যিই আশ্চর্যের বিষয়!!! আমরা কি এখন হযরত ওলীপুরী হুজুরের এসব কথাকে মেনে নিয়ে তাদের কথিত জমহুর আলেমদের অনুসরণ করব? করলে এই জঘন্য মিথ্যাচারের অংশিদার কি আমাকেও হতে হবে না এর সমর্থক হিসাবে। বিচারের ভার সচেতন চিন্তাশীল পাঠক সমাজের কাছে।

বিস্তারিতঃ (মাওলানা: সাদ সাহেবের সেই বক্তব্য) এলেমের ফাজায়েল বর্ণনা করার এক পর্যায়ে তিনি উলামাদের মজলিসে বলেন,”এলেম শিখিয়ে উবাই ইবেন কাব রাযিঃ কিছু হাদিয়া গ্রহণ করলে, হুযুর(সঃ) তাকে উদ্দেশ্য করে বললেন, “এটা নিয়ে যদি জাহান্নামে যেতে চাও তবে গ্রহণ কর নয়ত ফেরত দিয়ে দাও।”

যদিও হাদিয়া থেকে প্রাপ্ত সম্পদ সবচেয়ে পবিত্র । আর সেখানে কোন চুক্তিও হয়নি যে, আপনি এলেম শিখাবেন বিনিময়ে আপনাকে এত দেয়া হবে। কেননা যে বস্তু বা আমল যদি কোন বিনিময়ের সাথে শর্ত সাপেক্ষ হয়ে যায় তবে তার ব্যাপকতাও শেষ হয়ে যায়।

হুযুর সঃ প্রত্যেক উম্মতকে শিখানোর দায়িত্ব দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, বাল্লিগু- আন্নি-ওলাউ আয়াহ্ (যদি একটা আয়াতও জান সেটা অন্যকে পৌছাও)

হুযুর (সঃ) এর ঘরে সাহাবা (রাযিঃ) বসা ছিল। হুযুর (সঃ) (তাদের উদ্দেশ্যে) কিছু কথা বললেন আর বললেন, ” যারা ঘরের ভিতরে আছ তারা ঘরের ভিতর যারা আসতে পারেনি তাদের পৌছে দাও।”

এলেমকে সার্বজনীন করার জন্য ও উম্মতের মধ্য থেকে অজ্ঞতা দূর করার জন্য হুযুর(সঃ) সাহাবাদের এমনভাবে তৈরি করেছিলেন যে, তোমরা উম্মতকে এলেম পৌছাও নিজের আগ্রহে ও বিনিময় ছাড়া।

হুযুর (সঃ) এর কাছে দ্বীন শিখার জন্য যারা আসতো তিনি তাদেরকে নিয়ে নিতেন মেহেমানদারীর জন্য সাহাবারাও (রাযি:) নিতেন। এর চাইতে বড় বিষয় হলো, হুযুরের যত শিক্ষার্থী ছিলো তারা বন থেকে কাঠ কেটে সেগুলো বিক্রি করে তারপর বকরি কিনে জবাই করে গোস্ত হুযুর ও সাহাবাদের ঘরে পৌছে দিতেন যারা হুযুর (সঃ) এর ঘরের যিবতীয় খরচ নিজেদের দায়িত্বে নিয়েছিলেন।
তবে সেখানে আবু হুরাইরার মত মুহাদ্দিস কেন তৈরি হবে না ? মুআয বিন জাবালের মত মুফতি কেন তৈরি হবে না ?

এজন্য ওমর (রাযিঃ) বলতেন, ” হে কুরআন শিখানেওলারা ! হে দ্বীন শিখানেওয়ালারা ! তোমরা কোরআন শিখিয়ে বিনময় মূল্য গ্রহণ করো না; অন্যথায় কমিনা লোকেরা তোমাদের আগে জান্নাতে প্রবেশ করবে

(হযরত ওমর (রাযিঃ) এর উপরোক্ত কথাকে হযরতজী মাওলানা সাদ সাহেবের কথা বলে চালিয়ে দিয়েছেন। আগে- পিছের কোন কথা তাহকিক করার প্রয়োজন মনে করেনি। যা দ্বীতিয় হযরতজী মাওলানা ইউসুফ রহ এর লেখা হায়াতুস সাহাবাতেও আছে।)

এরপর হযরতজী বলেন, এজন্য দোস্ত ও আজাজো, এই কথা মনে রেখো, এই যে কোরআন শিখানোর পদ্ধতিতে পাওয়া যে বেতন; এটাতো শিক্ষকদের সময়ের বিনিময় হিসেবে নয় (ইয়ে তো ওয়াক্ত কা বদল হে)।

নয়ত খোদাকি কসম! দ্বীনের তালিমের জন্য তো জান্নাত ব্যতীত কোন বিনিময়ই যথেষ্ট নয়। ইয়ে তো ওয়াক্ত কা বদল হে( এটা তো সময়ের বিনিময় হিসেবে।- (এই কথাটি বুঝানোর জন্যই হযরতজী প্রথম থেকে কতগুলো আলোচনাকে সামনে এনেছেন ! বললেন সাত; মাওলানা ওলীপুরী বানালেন সাত, পাঁচ! মিলিয়ে তের। এটি কতবড় জুলুম !)

তিনি বলেন, কেননা তারা দুনিয়াবি অন্য সকল কাজ থেকে পৃথক হয়ে দ্বীন শিখানোর জন্য আলাদা হয়ে গেছেন।

নয়ত হযরত আবু বকর (রাযি:) খেলাফত পেতেই চাদর নিয়ে বাজারের উদ্দেশ্যে বের হলেন। লোকেরা প্রশ্ন করল, “আমিরুল মু’মিনিন ! কোথায় যাচ্ছেন ?” তিনি বললেন, ” বাচ্চাদের জন্য কিছু উপার্জন করতে যাচ্ছি। লোকেরা বলল, ” না, আপনি খেলাফতের দায়িত্ব সামলান, বিনিময় আমরা দিবো।” আবু বকর রাযি: বললেন, ” না ! খেলেফতের দায়িত্ব পালন করা শুধুমাত্র আখেরাতের জন্য। আমি উপার্জনের উদ্দেশ্যে বের হবো।” লোকেরা বলল,” আমিরুল মু’মিনিন! ব্যবসায় সময় দেবার কারণে খেলাফতের দায়িত্ব পালনে সমস্যা হবে। আপনি ওয়াক্তের বিনিময়ে বায়তুল মাল হতে কিছু পরিমাণ ভাতা গ্রহণ করুন।”

হযরত ওমর রাযি: বলতেন, ” আবু বকর রাযি: তার পরবর্তীদের চিন্তার মধ্যে ফেলে দিয়েছেন। ওয়াক্তের বিনিময় হিসেবে যতটুকু ভাতা তিনি গ্রহণই করেননি যতটুকু সম্পদ তিনি বায়তুল মালে ফেরত দিয়েছিলেন। (হযরতজীর পুরো বয়ানের অডিও আছে)

আসুন তাহকীক করি, আল্লাহ আমাদের তাওফিক দান করুন।

Facebook Comment





© All rights reserved © 2019 Tablignewsbd.Com
Design & Developed BY PopularServer.Com
error: Content is protected !!