মঙ্গলবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ০৮:২৭ পূর্বাহ্ন

অসুস্থ ব্যাক্তির সেবার প্রতিদান

অসুস্থ ব্যাক্তির সেবার প্রতিদান

সৈয়দ আব্দুল্লাহ,উপদেষ্টা,তাবলীগ নিউজ বিডিডটকম

শারীরিক সুস্থতা মহান আল্লাহ তায়ালার বিরাট নিয়ামত। আমরা সবাই সুস্থ থাকতে চাই। এরপরও আমরা অসুস্থ হই। ইসলাম সুস্থ ব্যক্তির কল্যাণ কামনার পাশাপাশি অসুস্থ মানুষের প্রতিও দয়াশীল। অসুস্থ ব্যক্তির সেবা করা থেকে শুরু করে বিভিন্ন প্রকার সহযোগিতা প্রদান করার ব্যাপারে ইসলাম উদার মনোভাব প্রকাশ করেছে এবং এ ক্ষেত্রে সব ধরনের বিভেদ মিটিয়ে দিয়েছে। অসুস্থ ব্যক্তির সেবা ও চিকিৎসার ব্যবস্থা গ্রহণ করতে ইসলাম ব্যাপক গুরুত্ব দিয়েছে।

আমার কঠিন অসুস্থতার সময় যারা খোঁজ খবর নিয়ে, দোয়া করে, সাহস দিয়ে, আর্থিক সহযোগীতা করে আমার পাশে দাঁড়িয়েছেন, আজ লেখাটি তাদের জন্য…

মানুষকে পরীক্ষার জন্য আল্লাহ তায়ালা নানা রোগ-বালা, মসিবত, বিপদ আপদ দিয়ে বান্দার ধৈর্যের পরীক্ষা নেন। এবং অপরদেরও সতর্ক করে থাকেন। সুস্থ্যতার মর্ম বুঝান। অসুস্থ ব্যাক্তির সেবাশুশ্রূষা , সাহায্য, সহযোগীতা, খোজ খবর নেয়া ও রোগীর জন্য দোয়া করার গুরুত্ব ইসলামে অত্যাধিক মর্যাদার। অসুস্থ ব্যাক্তিকে দেখা থেকে শুরু করে সকল সহযোগীতাই একটি উত্তম এবাদত। এর বদলা অনেক বেশি। এর ফাজায়েল ও সওয়াব আল্লাহ তায়ালা বিরাট পুরস্কার রেখেছেন। অসুস্থ ব্যাক্তির সেবাকে বিল্লাহ নিজের সেবা বলেছেন।

হাদিসে বলা হয়েছে, তোমরা রোগী দেখতে যাও এবং জানাজায় অংশগ্রহণ করো, কেননা তা তোমাদেরকে পরকালের কথা স্মরণ করিয়ে দেবে।অসুস্থ ব্যক্তির সেবা-যত্ন করা, তার খোঁজ-খবর নেওয়া, দোয়া করা ও সান্তনার বাণী শোনানো রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর গুরুত্বপূর্ণ সুন্নত।

হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.) রোগীর সেবাযত্ন করাকে সর্বোৎকৃষ্ঠ নেক আমল ও ইবাদত ঘোষণা করেছেন। সাহাবি হজরত আবু সাঈদ খুদরি (রা.) বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘তোমরা রোগী দেখতে যাও এবং জানাজায় অংশগ্রহণ করো, কেননা তা তোমাদেরকে পরকালের কথা স্মরণ করিয়ে দেবে।’ -মুসনাদে আহমদ: ৩/৪৮

একজন অসুস্থ মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে তাকে সান্তনার বাণী শোনালে, খোঁজ-খবর নিলে, একটু সেবাযত্ন করলে তার দুশ্চিন্তা লাঘব হয়। সে অন্তরে অনুভব করবে প্রশান্তি। তাই মানবিক বিচারে রোগীর খোঁজ-খবর নেওয়া, সেবাযত্ন করা উচিত।

পাড়া-প্রতিবেশী, আত্মীয়-স্বজন এবং বন্ধু-বান্ধবদের কেউ অসুস্থ হলে তার খোঁজ-খবর নেওয়া ও সহযোগীতার ব্যাপারে অবহেলা করা উচিত নয়।

হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, এক মুসলমানের ওপর অপর মুসলমানের ৫টি হক রয়েছে। তা হলো- ১. সালামের জবাব দেওয়া, ২. হাঁচির উত্তর দেওয়া, ৩. দাওয়াত কবুল করা, ৪. অসুস্থ হলে সেবা করা ও ৫. জানাজায় অংশগ্রহণ করা। -সহিহ বোখারি: ১২৪০

হাদিসে কুদসিতে বলা হয়েছে, ‘কিয়ামতের দিন আল্লাহ বলবেন, হে আদম সন্তান! আমি অসুস্থ হয়েছিলাম, কিন্তু তুমি আমাকে সেবা করনি। বান্দা বলবে, আপনি তো বিশ্বজাহানের প্রতিপালক- আমি আপনাকে কিভাবে সেবা করতে পারি? আল্লাহ বলবেন, আমার অমুক বান্দা অসুস্থ হয়েছিল। তুমি তার সেবা করলে সেটি আমাকে সেবা করা হত…। -সহিহ মুসলিম: ২১৬২

রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘যে ব্যক্তি তার ভাইয়ের অভাব পূরণ করবে, আল্লাহ তার অভাব পূরণ করবেন। যে ব্যক্তি তার মুসলিম ভাইয়ের বিপদ দূর করবে, আল্লাহ তাআলা কিয়ামতের দিন তার বিপদসমূহ দূর করে দেবেন’ (বুখারি, হাদিস : ২৪৪২)

হজরত আবু মূসা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, তোমরা ক্ষুধার্তদের অন্ন দাও, রোগীদের সেবা করো এবং বন্দিদের মুক্তি দাও। (বোখারি ১০/১১২ হা. ৫৬৪৭

হাদিসে হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘অসুস্থ ব্যক্তিকে দেখতে যাবে এবং জানাযার অনুসরণ করবে (কাফন-দাফনে অংশগ্রহণ করবে) তাহলে তা তোমাকে আখেরাতের কথা স্মরণ করিয়ে দেবে।’ (আল আদাবুল মুফরাদ)

একজন মুসলমানের প্রতি অপর মুসলমানের দায়িত্ব-কর্তব্য (হক) সম্পর্কে যে কয়েকটি হাদিস বর্ণিত হয়েছে, সেগুলোর প্রত্যেকটিতে ‘রোগীর পরিচর্যা’র বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত আছে।

রোগী পরিচর্যার ফজিলত সম্পর্কে অনেক হাদিস বর্ণিত হয়েছে ইবাদতগুলোর মধ্যে রোগী দেখতে যাওয়া একটি উত্তম ইবাদত। এ প্রসঙ্গে হজরত আলী রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন, আমি হজরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি, ‘যে কোনো মুসলমান সকালবেলা যদি কোনো রুগ্ন মুসলমানের খোঁজ নেয়, তার জন্য ৭০ হাজার ফেরেশতা সন্ধ্যা পর্যন্ত দোয়া করতে থাকে। আর যদি সে তাকে সন্ধ্যা বেলায় খোঁজ নেয়, তাহলে তার জন্য ৭০ হাজার ফেরেশতা সকাল পর্যন্ত দোয়া করতে থাকে এবং তার জন্য জান্নাতে একটি ফলের বাগান তৈরি করা হয়। (তিরমিজি ও আবু দাউদ)

হজরত আনাস (রা.) হতে বর্ণিত হয়েছে, হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে উত্তমরূপে অজু করে সওয়াবের উদ্দেশ্যে তার কোনো মুসলমান রুগ্ন ভাইকে দেখতে যাবে, তাকে জাহান্নাম থেকে ৬০ বছরের পথ দূরে রাখা হবে।’ (আবু দাউদ)

হজরত ইবনে আব্বাস (রা.) হতে বর্ণিত হয়েছে, হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যে কোনো মুসলমান কোনো অসুস্থ মুসলমানকে দেখতে যায় এবং ৭ বার বলে, আমি মহান আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করছি, যিনি মহান আরশের অধিকারী, তিনি যেন আপনাকে আরোগ্য দান করেন। এতে তাকে নিশ্চয় আরোগ্য দান করা হয়, যদি না তার মৃত্যু উপস্থিত হয়। -(আবু দাউদ ও তিরমিজি)

হজরত জাবের (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যে অসুস্থ ব্যক্তিকে দেখতে রওয়ানা হলো, সে আল্লাহর রহমতের সাগরে সাঁতার কাটতে থাকলো, যতক্ষণ না সে তথায় গিয়ে বসে। যখন সে গিয়ে বসল, তখন সে রহমতের সাগরে ডুব দিল। -( আহমদ)

রোগীকে দেখতে গেলে, খোঁজ খবর নিলে সামাজিক সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্য বৃদ্ধি পায়। মান-অভিমান থাকলে তাও দূর হয়ে যায়। রাগী দেখার নিয়ম হলো, রোগীর কাছে এত সময় অপেক্ষা করা যাবে না যাতে রোগী বিরক্তিবোধ করে। রোগীকে আশ্বস্ত করতে হবে; তার মনোবল চাঙ্গা করার চেষ্টা করতে হবে।

একজন মহিলা সাহাবী (রা.) বলছেন, একদা আমি অসুস্থ হয়ে পড়লে রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আমার সেবা শুশ্রূষা করতে এসে বলেন, হে উম্মু আলা, তুমি সুসংবাদ গ্রহন করো। কেননা, মুসলমানদের অসুখের কারণে আল্লাহ্‌ তাআলা তাদের গুনাহ্‌ সমূহ এমন ভাবে দূর করে দেন যেমন ভাবে আগুন সোনা-রূপার মধ্যেকার ভেজাল দূর করে দেয়। [আবূ দাউদ, ৩০৭৯]

হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.) শিখিয়েছেন, রোগীর কাছে গিয়ে বলতে হবে, ইনশাআল্লাহ আপনি শিগগির ভালো হয়ে যাবেন। অসুস্থতার কারণে গোনাহ মাফ হয়। এ জন্য রোগীর কাছে নিজের জন্য দোয়া চাইতে হবে। কোনো রোগ বা রোগীকে ঘৃণা করা যাবে না। রোগী দেখলে অন্তর নরম হয়, স্রষ্টার প্রতি কৃতজ্ঞতাবোধ জাগে। এ জন্য বেশি বেশি রোগী দেখা এবং রোগীর সেবা, সহযোগীতা করার কথা বলা হয়েছে। মানুষ তার মানবিক বিবেচনা থেকেই অসুস্থ ব্যক্তির পাশে দাঁড়ানো প্রয়োজন।

আমি আজ এক বছর ধরে কঠিন অসুস্থ। তিন মাস ধরে হাসপাতালে। ক্যানসার আক্রান্ত হয়ে জীবনের সাথে যেন লড়াই করে বাঁচিয়ে রেখেছেন আল্লাহ তার খাছ মেহেরবানীতে তাঁর কুদরত দ্বারা।

আমার অসুস্থতার সময় দুর থেকে কাছে এসে, নানান ভাবে খোঁজ নিয়ে, পরামর্শ, দোয়া দিয়ে, সরাসরি সেবাশুশ্রূষা করে, আর্থিক সহযোগীতা করে, বন্ধু বান্ধব, আত্মীয় স্বজন, গুনগুগ্রাহী,শুভাকাঙ্ক্ষী, সুহৃদ,যারা যেভাবে সহযোগীতা করেছেন, হবে আল্লাহ সবাইকে এই ফজিলতের সওয়াব টুকো দান করে উত্তম বদলা দান করুন এবং আমাকে সুস্থতা দান করে ক্ষমা করে দিন। আমীন

হযরত সৈয়দ আব্দুল্লাহ দা.বা.
ক্যানসার আক্রান্ত ইসলামী লেখক
এনাম মেডিকেল কলেজ সাভার, ঢাকা
কেবিন নং ৪০৬
মোবাইল 01730 961798

বিঃদ্রঃ তিনি তাবলীগ নিউজ বিডিডটকমের সম্পাদক মাওলানা সৈয়দ আনোয়ার আব্দুল্লাহর সম্মানীত পিতা।

Facebook Comment





© All rights reserved © 2019 Tablignewsbd.Com
Design & Developed BY PopularServer.Com
error: Content is protected !!