বৃহস্পতিবার, ১৮ Jul ২০১৯, ০৯:১৫ পূর্বাহ্ন

সংবাদ শিরোনাম ::
স্মরণে ভাস্মর ইফতিখারুল হাসান কান্ধলভী রহ.

স্মরণে ভাস্মর ইফতিখারুল হাসান কান্ধলভী রহ.

ফয়জুল্লাহ আমান

আমার এক বন্ধু ছিল মুহসিন ভাই। বেঙালুরে বাড়ি। খুব ভদ্র। অমায়িক। দাওরায়ে হাদীস ও ইফতায় আমরা একসাথে পড়েছি। ক্লাসে বেঞ্চে পাশাপাশি বসতাম। বার্ষিক পরীক্ষা শেষে কোথাও ঘুরতে যেতে হবে। কোথায় যাওয়া যায় তাই ভাবছি। মাওলানা মুহসিন বললেন, কান্ধলার কথা। কান্ধলা আমি তখনও পর্যন্ত যাইনি। আমাদের অনেক আকাবিরের স্মৃতি বিজড়িত এক পুণ্যময় স্থান কান্ধলা। ইফতায় আমরা বিশ বাইশজন ছাত্র ছিলাম। এদের ভেতর সবচেয়ে ভদ্র ছিলেন মাওলানা মুহসিন। তার কথাবার্তা ও আচরণে আমি মুগ্ধ ছিলাম। তার সঙ্গে প্রায় কথা হতো।

দেখতে দেখতে বৎসর শেষ হয়ে গেল। দু বৎসর এই প্রবাস জীবন কাটালাম শুধু ইলমের জন্য। মুহসিন ভাইকে জিজ্ঞেস করলাম পরীক্ষার পর কী করবেন? তিনি বললেন, কী করব? বাড়িতেই যাব; তবে আমার শাইখের সঙ্গে দেখা করে যাব। সেই প্রথম তার মুখে মাওলানা ইফতিখারুল হাসান কান্ধলভী রহ. এর নাম শুনলাম। তার লেখা কিছু কিতাব মুহসিন ভাইয়ের কাছ থেকে নিয়ে পড়েছিলাম। যতই দিন যাচ্ছিল তাকে দেখার আগ্রহ আমার বাড়ছিল। মুহসিন ভাইকে বললাম, আমি আপনার সঙ্গে কান্ধলা যাব। তিনি হেসে সম্মতি জানালেন। আমি একলা গেলে হয়ত রেলে যেতাম, মাওলানা মুহসিন বেঙলোরের খুবই ধনি পরিবারের সন্তান। দিল্লি টু বেঙালোর বিমানে আসা যাওয়া করে। প্যাসেঞ্জার ট্রেনে চড়ার অভ্যাস তার নাই। তার সাথে ভালো একটি এক্সপ্রেস বাসে চড়তে হলো। টাকা খরচ হোক তবু একজন আল্লাহর ওলিকে দেখতে মন খুব চঞ্চল হয়ে উঠছিল। প্রায় আড়াই তিন ঘণ্টায় কান্ধলা পৌঁছলাম।

খাজা মাইনুদ্দিন চিশতি রহ.-এর কাল থেকেই গঙ্গা যমুনা দোআবা অঞ্চলে বহু ওলি আওলিয়া জন্মেছে। খাজা বখতিয়ার কাখি, নিজামুদ্দিন আওলিয়া, আলাউদ্দিন সাবের কালিয়ারি, আব্দুল কুদ্দুস গাঙ্গুহি, মির্জা মাযহার জানেজানা, শাহ ওয়ালিউল্লাহ, শাহ আব্দুল আযীয, সায়্যিদ আহমাদ শহিদ, হাজি ইমদাদুল্লা মুহাজিরে মাক্কি, কাসিম নানুতুবি আরও বহু বুযুর্গানে দ্বীনের বসবাস ছিল এই দিল্লির আশপাশের অঞ্চলে। এখনও এখানে এই দুই নদীর মাঝের পূণ্যস্থানে বহু জিন্দা ওলি রয়েছেন। সত্যি! পৃথিবীর আর কোথাও এত অধিক ইলমি, রুহানি, আখলাকি ও দ্বীনী রুচির উঁচু পর্যায়ের মনীষী খুঁজে পাওয়া দুস্কর।

মোটামুটি বুঝ হবার পরেই আমি বাইআত হয়ে গিয়েছিলাম ফিদায়ে মিল্লাত মাওলানা আসআদ মাদানী রহ.এর কাছে। তাকমীলুল ইফতার বছরের শুরুতে হযরতের ইন্তিকাল হয়ে যায়। তারপর থেকেই অন্য কোনো শাইখের কাছে বাইআত হবো বলে ভাবছিলাম। কিন্তু বাইআত তো আর যার তার কাছে হওয়া যায় না। বড় শায়েখদের খুঁজে বের করাও সহজ কাজ নয়। আমার পছন্দের এক শাইখের কাছে বাইআত হতে গেলে তিনি বললেন, আমার কাছে বাইআত হবার দরকার নেই; তোমাকে খেলাফত দিয়ে দিচ্ছি। বুঝলাম আমাকে তিনি বাইআত করবেন না। আরও অনেক বুযুর্গের সান্নিধ্যেই গিয়েছি সে বছর। বাইআত হতে তবু দেরি করছিলাম। নতুন কোনো বুযুর্গের সন্ধানে ছিলাম। সে লক্ষ্যেই আজকের কান্ধলা যাত্রা।

দেওবন্দ থেকে এখানে কান্ধলার মৌলভিয়ান মহল্লায় এসে প্রথম দর্শনেই মুগ্ধতায় ভরে গেল মন। অশীতিপর বৃদ্ধ। উজ্জ্বল মুখমণ্ডল। দীপ্তিমান ঠোঁটে বিস্ময়কর সুন্দর হাসি। চুপচাপ। আমলে মশগুল। ধীরপায়ে চলা ফেরা করেন। সঙ্গে কয়েকজন খাদেম। খাদেমদের সাথে কথা বলার সময়েও খুব আস্তে কথা বলেন। কথাবার্তা ও চলা ফেরায় আভিজাত্যের ছাপ স্পষ্ট।

কান্ধলায় কয়েকশ বছর ধরে একটা ইলমি খান্দান বেড়ে উঠেছে। তাবলিগের প্রতিষ্ঠাতা মাওলানা ইলিয়াস রহ. ফাজায়েলে আমালের লেখক মাওলানা যাকারিয়া রহ., সীরাতে মুস্তফার লেখক মাওলানা ইদ্রিস কান্ধলভী, বর্তমান তাবলিগের আমীর মাওলানা সাআদ কান্ধলভী দা.বা.সহ অসংখ্য মনীষী এই মহল্লা মোলভিয়ানের অধিবাসী।

পীর ও মুর্শিদ মাওলানা ইফতিখারুল হাসান কান্ধলভী রহ. ১০৪ বছর বয়সে ইন্তিকাল করেছেন। তার ইন্তিকালের সংবাদটি খুব সাদামাটাভাবেই পেলাম। কয়েক মিনিট আমি কোনো কথা বলতে পারলাম না। কেমন এক নস্টালজিয়ায় আক্রান্ত হলাম। অনেক স্মৃতি চোখের সামনে ভেসে উঠছে। হজরত রহ. কটা দিন আমাকে যে স্নেহ করেছিলেন সেকথা আমার পক্ষে ভুলে যাওয়া আসলে সম্ভব না।

মনে পড়ে, প্রথম যে মজলিসে তাকে দেখেছিলাম, সেখানে মেওয়াত থেকে একটা জামাত এসেছিল। সবাই তাকে হজরতজি বলে সম্বোধন করছিল। পরে জেনেছি, কান্ধলার অধিবাসী সবাই তাকে হজরতজিই বলত। দুপুরে বা বিকালে আমরা তাঁর মসজিদ সংলগ্ন খানকায় বসেছিলাম। আমাদের সাথে আরও কয়েকজন আলেম ছিল। সেই মজলিসে তিনি পবিত্র কুরআন মজিদের সারমর্ম বর্ণনা করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, পুরো কুরআনুল কারীমের খোলাসা হচ্ছে চারটি কথা- ১. আল্লাহ তায়ালার ইবাদাত ২. রাসূলুল্লাহ সা.-এর ইতায়াত ৩. বুযুর্গদের মহব্বত এবং ৪. সাধারণ মানুষের খিদমাত। ইবাদাত, ইতায়াত, মুহাব্বাত ও খিদমাত।

রমজানের একদিন কি দুদিন আগে গিয়েছিলাম। আর পনের ষোল রোজা পর্যন্ত সেখানে সেই রূহানিয়াতে পূর্ণ খানকায় ছিলাম। রমজানের শেষে দেশে ফিরে আসার কথা ছিল, তাই এর বেশি থাকা সম্ভব হয়নি। সামান্য এ কয়েক দিনেই খুব ভাল ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়েছিল। দেশে আসার পরও পত্র দিয়েছি। কান্ধলা থেকে মাওলানা নুরুল হাসান রাশেদ সাহেব আমার জন্য তার ত্রৈ মাসিক আহওয়াল ও আছার নামক পত্রিকা পাঠিয়েছেন।

মাওলানা ইফতিখারুল হাসান কান্ধলভী রহ. প্রতি দিন আমাকে একটি করে কিতাব দিতেন। আমি মুতালা করে ফেরত দিতাম। আবারও কিতাব দিতেন। আমার দ্রুত পাঠ দেখে তিনি খুব বিস্ময় প্রকাশ করতেন। এজন্য খুশিও হয়েছিলেন। বয়ানের সময় আমাকে খুঁজতেন। একদিন ডেকে হিসনে হাসীনের দরস দিলেন। চারজন শায়েখের কাছ থেকে তিনি এর ইযাযত পেয়েছেন। শাইখুল হাদীস যাকারিয়া রহ.। হজরতজী মাওলানা ইলিয়াস রহ.। মাওলানা আব্দুর রহমান কামিলপুরি রহ. এবং হযরত মাওলানা আব্দুল কাদির রায়পুরি রহ.।

তিনি বললেন, আমি তোমাদেরকে সব সনদের ইযাযত দিলাম। আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে আমার জন্য দুআও করেছিলেন। হিসনে হাসীনের সেই বরকতময় দরসে আমার সাথে তাঁর খাদেম শাহেদ ছিল। শাহেদ তখন গাঙ্গুহতে সম্ভবত ইফতা পড়ত। চব্বিশ পরগনা বাড়ি ছিল ছেলেটার। আমার সাথে উর্দুতে কথা বলত। সে আমার প্রতি খুব কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করল। আমার উসিলায় হিসনে হাসীনের সনদ পেল বলে। হিসনে হাসীনের বিরাট একটা নুসখা ছিল হযরতের কাছে। মাওলানা আব্দুল হাই লাখনভী রহ. এর টীকা সহ। পরে আমিও দেওবন্দের রহিমিয়া কুতুবখানা থেকে সেটি সংগ্রহ করেছি। আলহামদুলিল্লাহ!

খানকা শরীফে তুরাছের ১৩১টি হাতে লেখা পুরোনো কিতাব ছিল। শত শত বছর আগে মুছান্নিফ নিজে হাতে যে কিতাব লিখেছেন এমন কিছু হাতে লেখা কিতাবের সংগ্রহ। সেগুলির নাম রেজিস্টারভুক্ত করতে হয়েছিল আমাকে। আমাকে দিয়ে এমন টুকটাক কাজ করিয়েছিলেন হজরত রহ.। মাওলানা নুরুল হাসান কান্ধলভী হজরতের বড় সাহেবজাদা। সারা দিন গবেষণায় ডুবে থাকেন। তার কাছে মাওলানা গাঙ্গুহি রহ.-এর হাতে লেখা ফতওয়া দেখতে পাই।

শাইখুল হাদীস যাকারিয়া রহ.-এর হাতে লেখা ডায়েরিও সেখানে দেখেছিলাম। প্রায় পাঁচশ বছরের পুরোনো একটি কুতুবখানা। অনেক পুরনো দলিল দস্তাবেজ রয়েছে সেখানে। নদওয়াতুল উলামার কিছু ছাত্রকে দেখেছিলাম তার কাছে গবেষণা শিখতে এসেছে। ছোট ছেলের নাম মুফতি রজি। মোট তিন ছেলে মাওলানা ইফতিখার সাহেব রহ.-এর। মেঝ ছেলে সাহারানপুরের মুদাররিস। শেষ দিন রাতে তিন ভাই আমার সাথে অনেক রাত পর্যন্ত গল্প করেছিলেন। তাদের বাড়ির ছাদে চাঁদের আলোয় আমরা তারাবির পর অনেক রাত কথা বলেছিলাম। জোৎস্নালোকিত সে রাতের কথা খুব মনে পড়ে। ঘরে বানানো পিঠা পুলি খেতে দিয়েছিলেন। খুব সুন্দর একটা সম্পর্ক হয়েছিল। ইলমি অনেক কথা হয়েছে তাদের সাথে। মেঝ ছেলের নাম মনে নেই। লাখনৌর মাওলানা আব্দুল আলিম ফারুকির মেয়ের সাথে তার বিয়ের কথা চলছিল। খুবই হাসি খুশি। খুব মিশুক। এবং ইলম দোস্ত।

পরদিন সকালে চলে যাব সেকথা হজরতকে আগেই বলেছিলাম। বাদ ফজর নিজে থেকেই আমাকে তাঁর কাছে ডেকেছিলেন। অনেকক্ষণ কথা বললেন।

আমলের তালকীন করলেন। তারপর বিদায় দিলেন। কখনও ভাবিনি মৃত্যুর আগে এত দীর্ঘ সময় পাওয়া সত্ত্বেও আর যে দেখতে পারব না। মাঝে বহু বছর পর কয়েক দিনের জন্য একবার দেওবন্দ গিয়েছিলাম। কান্ধলায় যাব ভাবছিলাম। কিন্তু কারও সঙ্গে যোগাযোগ করতে না পারায় আর যাওয়া হয়নি। ভেবেছিলাম, সামনে সময় নিয়ে ভারত গেলে আমার প্রিয় এই মহান বুযুর্গের দরবারে একবার হাজিরা দিব। কিছু সময়ের জন্য হলেও তার বরকতে ধন্য হব। কিন্তু হঠাৎ করেই ওয়াটসঅ্যাপে মৃত্যু সংবাদ আমাকে বিমূঢ় করে দিল। অন্য রকম এক কষ্টের অনুভূতিতে মন আচ্ছন্ন হয়ে আছে। সেই তালিবুল ইলমির সময়ের ডায়েরিতে চোখ বুলিয়ে চোখের অশ্রু ফেলছি।

কান্ধলার দিনগুলির স্মৃতিচারণ পড়ে হৃদয়ের চেপে থাকা স্মৃতিগুলি চোখের সামনে ভেসে উঠছে। অতিক্রান্ত সেই সময়ের দিকে তাকিয়ে কেমন এক বিষাদ আর দুঃখে ভারাক্রান্ত হচ্ছি। আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা তাঁকে জান্নাতের আলা মাকাম নসীব করুন। তার কবরকে নূর দিয়ে ভরপুর করুন। তার খান্দানের পূর্বসূরি মহান মনীষীদের সাথে তাঁকে আলা ইল্লিয়্যিনে মিলিত করুন। সন্তান-সন্ততি অনুরাগি ভক্তকুল সবাইকে সবরের তাওফিক দিন। আমিন।

লেখক : সিনিয়র মুহাদ্দিস, জামিআ ইকরা বাংলাদেশ

Facebook Comment





© All rights reserved © 2019 Tablignewsbd.Com
Design & Developed BY PopularServer.Com
error: Content is protected !!