শনিবার, ১৯ অক্টোবর ২০১৯, ০৩:১২ পূর্বাহ্ন

ইলিয়াস রহমাতুল্লাহি আলাইহির নামে ইমোশনাল ব্ল্যাক মেইলিং

ইলিয়াস রহমাতুল্লাহি আলাইহির নামে ইমোশনাল ব্ল্যাক মেইলিং

ইলিয়াস রহমাতুল্লাহি আলাইহির নামে ইমোশনাল ব্ল্যাক মেইলিং।

সারাংশ
* পীর সাহেবদের মজলিসের পূর্বের অবস্থা।
* ইদানীং পীর মহলে মাওলানা ইলিয়াস প্রীতি।
* বিভিন্ন মজলিসে ইলিয়াস রহ. এর মালফুজাতের অপব্যাখ্যা।
* ইলিয়াস রহমাতুল্লাহি আলাইহির ইলমী ও ইসলাহী যোগ্যতা।
* নতুন মেহনতের কারন ও পদ্ধতি।
* উলামাকেরামদের উপর মাওলানা ইলিয়াস রহ. এর মেহনত।
* দাওয়াতের কাজে আলেমদের ভূমিকা কেমন হবে? মারকাজে মেহনত নাকি ময়দানে মেহনত?
* ইলিয়াস রহ. এর মালফুজাতের অপব্যাখ্যার জবাব।
* কাকে অনুরসন করব? বর্তমান জামানার অতি উৎসাহী আলেমদের নাকি সাহাবাদের?
* অতি উৎসাহী আলেমদের সমীপে কিছু প্রশ্ন।
* আমাদের সিদ্ধান্ত।

আমার জন্মস্থানে ছিল পীরের আড্ডা। দুই ধারার দুই পীর এবং এঁদের শাখা পীর। দুইজনেই হক অর্থাৎ বিদআতী মাজার পূজারী নন। তবে তাঁদের দুজনের মজলিসেই দুই জিনিস পাওয়া যেত। নিজ পীরের গুণগান এবং অপর পীরের বদনাম।

যেখানে পড়াশোনা করেছি সেখানেও ছিলেন এক পীর সাহেব। আমাদের ইউনিভার্সিটিরই একজন প্রফেসর। মাশায়েখ মহলে তিনি প্রফেসর হযরত নামে সুপরিচিত। তাঁর ফয়েজ বরকতে আমাদের ভার্সিটির কেন্দ্রীয় মসজিদে প্রায়ই মাশায়েখদের মিলন মেলা বসত। আশে পাশে বড় মাদ্রাসা থাকার কারণে আশে পাশের অনেক মসজিদের খতীব সাহেবই ছিলেন পীর। এখনো হয়ত আছেন। সবই হক্কানী পীর। এখানেও দেখেছি দুই জিনিস। নিজের পীর এবং দাদা পীরের গুণগান। গুন থাকলে গান গাইতেই পারেন। এতে অসুবিধা কিছু নাই। প্রতি মিনিটে প্রায় ৩/৪ বার পীরের নাম, পীরের মালফুজাত, পীরের স্মৃতি চারণ। পুরা বয়ান শুনলে মন হত, কোন ইসলাহী মজলিসে নয় বরং স্মরণ সভাতে এসেছি। তবে এতে অনেক উপকার হত। পীর সাহেবের ব্যাপারে বিস্তারিত জানা যেত। শ্রদ্ধায় দিল ভরে যেত। পীর সাহেবের সাথে নিসবতের কারণে হযরতের প্রতিও শ্রদ্ধা অনেক বেড়ে যেত। মজলিসে বসলেই মনে হত ইসলাহ হচ্ছে।

ইদানীং পীর সাহেবদের মজলিসে মাওলানা ইলিয়াস রহমাতুল্লাহি আলাইহির নাম খুব শোনা যায়। তিনি নাকি সাথীদের পীর সাহেবদের কাছে খুব যেতে বলতেন। এবং তিনি নাকি সব কিছু আলেমদের কাছে জিজ্ঞাসা করে করে কাজ করতেন। আলেমরা অনুমোদন দিলে করতেন নতুবা করতেন না। এভাবে বিভিন্ন বাহানায় মাওলানা ইলিয়াস রহমাতুল্লাহি আলাইহিকে স্মরণ করা হচ্ছে।

সম্প্রতি মুফতী মুনসুরুল হক হাফিজহুমুল্লহ এর নামে একটা লিফলেট বিতরণ হয়েছে। এই লিফলেটে তিনি প্রায় তিন ভাগের এক ভাগ মাওলানা ইলিয়াস রহমাতুল্লহি আলাইহির বিভিন্ন মালফুজাত উল্লেখ করেছেন। পরে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে একটু সামান্য ঘুরিয়ে দিয়ে সম্পূর্ণ মালফুজাতের মোটিভই পাল্টে দিয়েছেন। এছাড়া আলমী শূরার ক্যাম্পেইন করতে গিয়েও আমাদের ক্বারী যুবায়ের সাহেব, রবিউল হক সাহেব, ওমর ফারুক সাহেব হাফিজহুমুল্লাহ একই কায়দায় মাওলানা ইলিয়াস রহমাতুল্লাহি আলাইহির নাম ব্যবহার করে অন্য কথা (!?) বুঝানোর চেষ্টা করে চলেছেন।

মাওলানা ইলিয়াস রহমাতুল্লাহি আলাইহির মালফুজাত ও জীবনীমূলক ‘দ্বীনী দাওয়াত’ কিতাব যারা পড়েছেন তারা জানেন, মাওলানা ইলিয়াস রহমাতুল্লাহি আলাইহি একজন বিদগ্ধ আলেম ছিলেন। খুব অল্প বয়স থেকেই মাদ্রাসায় শিক্ষাকতা করতেন। তিনি একজন কামেল ইসলাহী শায়েখও ছিলেন। তিনি বলতেন, আমি মুরীদ বানানো শুরু করলে কোন পীর সাহেব মুরীদ খুঁজে পেতেন না। কিন্তু তিনি তা করেন নি। বরং এমন কোন মেহনত করতে চাইতেন যাতে এস্তেমায়ি ভাবে উম্মতের ফায়দা হয়। উম্মতের দ্বীনের ছাতা বৃদ্ধি পায়। [ সূত্র ১ ]

মাদ্রাসার খিদমতে তিনি তৃপ্ত হতেন না। তিনি ভাবতেন এখানে কিছু নির্দিষ্ট শ্রেণীর মানুষ আসে। এখান থেকে পাশ করে কিছু আলেম বের হবে। তারা কোন মাদ্রাসার খিদমত করবে বা অন্য কোন পেশায় যাবে। কিন্তু সাধারণ মানুষের কি ফায়দা হবে। এরপর তিনি ইসলাহী মেহনত শুরু করেন। কিন্তু কিছুদিন পরেই তাঁর ফিকির হয় যে এখানে তো শুধু ঐ মানুষ গুলোই আসেন যাদের দ্বীনের তলব আছে। এবং এই মানুষগুলোর খিদমত আঞ্জাম দেয়ার জন্য এক বিরাট জামাত ইতিমধ্যেই মজুদ আছে। এর বাইরে এমন বিশাল জনগোষ্ঠি রয়েছে যাদের তলব নেই। এদের কাছে কারা যাবে! তিনি বেচাইন থাকতেন। সব সময় খুব ফিকির করতেন। বিস্তারিত আলোচনার সুযোগ নেই। মনজুর নোমানী রহমাতুল্লাহি আলাইহির ‘দ্বীনী দাওয়াত’ ও মালফুজাত কিতাব থেকে দেখে নেয়া যেতে পারে। [ সূত্র ২ ]

এক পর্যায়ে আল্লহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা এই মহান কাজের নকশা তাঁর সামনে খুলে দেন। তিনি ব্যাকুল চিত্তে দুআ করতেন। কাবা শরীফের গেলাফ ধরে অনেক দুআ করেছেন। এক পর্যায়ে তাঁর উপরে ইলহাম হয় যে তোমার থেকে কাজ নেয়া হবে।

তাই এক কাজের উপর তাঁর পরিপূর্ণ ইয়াকীন ছিল। আল্লাহ প্রদত্ত তাঁর ইলম ও ইলহাম দ্বারাই তিনি এই কাজের নকশা সাজান। তিনি জানতেন এই কাজের মূল হচ্ছেন সাহাবাগণ। যত বেশী সাহাবাদের অনুকরণ হবে অর্থাৎ রসুলুল্লাহ সল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অনুকরণ হবে তত বেশি ফায়দা পাওয়া যাবে। তাই তিনি বারবার সেই জামানার অনুকরনে দাওয়াত ও তালীমের কথা বলতেন। [ সূত্র ৩ – ৪ ]

তিনি মনে করতেন এই কাজ মূলতঃ উলামা কেরামদের কাজ। যদি উলামাগণ এই কাজ কবুল করে নেন তাহলে এই কাজ খুব দ্রুত ছড়াবে এবং উম্মত খুব দ্রুত ফায়দা পাবে। কেননা তাঁর মূল উদ্দেশ্যই ছিল আপামর উম্মত কিভাবে ফায়দা হাসিল করতে পারে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কোটি কোটি উম্মত প্রতিনিয়ত জাহান্নামের দিকে যাচ্ছে, তিনি সহ্য করতে পারতেন না। মূলতঃ এই তাড়নায় তিনি সে যুগের বড় বড় আলেমদের কাছে যেতেন। তাঁদের এই কাজ বুঝাতেন, এই কাজের নকশা তাঁদের কাছে পেশ করতেন। মূলতঃ এই আশায় যে হয়ত তাঁরা এই কাজ বুঝবেন এবং মদদগার হবেন। এঁদের মধ্যে ছিলেন ঐ যুগের বড় বড় আলেম যেমন ক্বারী তৈয়্যব সাহেব, মাওলানা আশরাফ আলী থানুভি, মাওলানা হুসাইন আহমাদ মাদানী, মাওলানা আবুল হাসান আলী নদভী প্রমুখ। রহিমাহুমুল্লাহ। তাঁদের থেকে শুধু সমর্থন বা বয়ান বক্তৃতা নয় বরং ময়দানের মেহনত অর্থাৎ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জামানার অনুকরনে দুয়ারে দুয়ারে মেহনত কামনা করতেন। [ সূত্র ৫ – ৬ ]

তবে এই কাজ সে জামানার বুজুর্গ আলেমগণের কাছে নতুন এবং অভিনব মনে হত। নবুয়তের এই মহান মেহনত এমন ভাবে মানুষের মধ্য থেকে হারিয়ে গিয়েছিল যে জামানার বড় বড় আলেমদের কাছেও এই কাজ নতুন মনে হয়েছিল। সেই জামানার সাধারণ আলেমদের তো প্রশ্নই নেই, বড় বড় আলেমগণও এই কাজের ব্যাপারে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন যে, ইলিয়াস কোন নতুন ফিৎনা করছে। রহিমাহুমুল্লাহ। তবে ক্বারী তৈয়্যব সাহেব রহমাতুল্লাহি আলাইহি ইলিয়াস রহমাতুল্লাহি আলাইহির দুঃখ বুঝতেন। কেনই বা হবে না? তিনিও তো সিদ্দিকী ছিলেন। উম্মতের আরেক দরদী আল্লামা কাসেম নানুতুবী রহমাতুল্লাহি আলাইহির নাতি ছিলেন। ইলিয়াস রহমাতুল্লাহি আলাইহি তাঁর সাথে এই মেহনতের তরতীব মুজাকারা করতেন। তাঁর নিজের ভাবনা গুলো শেয়ার করতেন। তিনিও মাঝে মাঝে ইলিয়াস রহমাতুল্লাহি আলাইহিকে সান্ত্বনা দিতেন। বিভিন্ন পরামর্শ দিতেন। দুআ করতেন। তিনি এই কাজের প্রশংসা করতেন এবং সমর্থন ব্যক্ত করতেন যে এতেই উম্মতের সর্বোত্তম ফায়দা হবে। কিন্তু এটা বাস্তবায়ন করা যাবে কিনা এটা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করতেন। কিন্তু তিনি সব সময়েই আকুণ্ঠ সমর্থন দিয়ে এসেছেন।

তবে অন্যান্য আলেমদের বেশিরভাগই সংশয় প্রকাশ করেছিলেন। কেউ কেউ ফিৎনার আশঙ্কাও করেছিলেন। যদি পরে ফলাফল দেখে শীর্ষস্থানীয় আলেমগণ এতমিনান হন। কেউ কেউ সহযোগী বনে যান। মাওলানা আশরাফ আলী থানুভি রহমাতুল্লাহি আলাইহি তো বলেই ফেলেন, কোন দলীল দরকার নেই, আমি তো ফলাফল দেখতেই পাচ্ছি। অথচ তিনি শুরুতে ফিৎনার আশঙ্কা করেছিলেন।

আসলে সেই জামানায় গণযোগাযোগ মাধ্যম তেমন উন্নত ছিল না। সে সময়ের ঘটনাবলী খুব বেশি লিপিবদ্ধও করে রাখা হয় নি। তাই আমাদের ধারনা নেই যে, আসলে কতটা কষ্ট করে, বাধার পাহাড় ডিঙিয়ে মাওলানা ইলিয়াস রহমাতুল্লাহি আলাইহি এই মহান মেহনত প্রতিষ্ঠিত গেছেন। আসলে দাঈ’র পথ কখনো কুসুমাস্তীর্ণ হয় না। ইলিয়াস রহমাতুল্লাহি আলাইহির জন্যও হয় নি। বরং তাঁকেও প্রতিকুলতার সাত সমুদ্র তের নদী পাড়ি দিয়েই মেহনত করতে হয়েছে।

তাই যে যাঁকেই মুজাদ্দিদ মনে করুক না কেন, ফলাফল সাক্ষ্য দিচ্ছে সন্দেহাতীত ভাবে মাওলানা ইলিয়াস রহমাতুল্লাহি আলাইহিই বর্তমান জামানার মুজাদ্দিদ। মুজাদ্দিদ কেউ নিজে চেষ্টা মেহনত করে হতে পারে না। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালাই বাছাই করে কাউকে কাউকে সংস্কারের দায়িত্ব দেন। মাওলানা ইলিয়াস রহমাতুল্লাহি আলাইহি ছিলেন এমন একজন মুন্তাখাব ব্যক্তিত্ব। তিনি অন্যদের কাছে দলীল তালাশ কি করবেন বরং তিনি নিজেই ছিলেন সবার জন্য দলীল। তাঁকে দেখে সবাই দাওয়াত শিখত।

তিনি আলেমদের কাছে যেতেন মূলতঃ আলেমদের কাজে লাগানোর জন্য। কারণ তিনি সাধারণ মানুষের সাথে মিশতেন। তিনি জানতেন হাকীকতে উম্মতের অবস্থা কত খারাপ। তাই আলেমদের সাথে আওয়ামদের সম্পর্ক হওয়া কত জরুরী। আওয়াম এবং আলেম আলাদা কেউ নয়। সকলের সম্মিলিত মেহনতই এই উম্মতের উন্নতির বুনিয়াদ। তাই আলেমগণের প্রতি মাওলানা ইলিয়াস রহমাতুল্লাহি আলাইহির বার বার দরখাস্ত ছিল উম্মতের দুয়ারে দুয়ারে যাওয়া। এই মেহনতকে নিজের কাজ বানানো। [ সূত্র ৫ – ৬ ] আল্লহ মাফ করুক, আজ তো কিছু মানুষ উঠে পড়ে লেগেছে উম্মতকে আলেম এবং আওয়াম এই দুই শ্রেণীতে ভাগ করার জন্য।

একেবারে প্রথম দিকে মাওলানা ইলিয়াস রহমাতুল্লাহি আলাইহি নিজেই জামাত নিয়ে যেতেন। জামাতের সাথীদের অবস্থার উপরে ভিত্তি করে প্রয়োজনীয় মুজাকারা করতেন। পরবর্তীতে মেহনত বেড়ে যায়, জামাতের সংখ্যা বেড়ে যায়। প্রত্যেক জামাতের সাথে তার নিজের যাওয়া অসম্ভব হয়ে পড়ে। তখন চাইতেন প্রত্যেক জামাতের সাথে একজন করে আলেম দিতে। এ ব্যাপারে তাঁর একটি মালফুজাতও রয়েছে যে, আমার দিল চায় প্রত্যেক জামাতের সাথে একজন করে আলেম দিই। মূলতঃ এজন্যই আলেমদের কাছে যেতেন।
পরবর্তীতে জামাত আরো বেড়ে যায়। সেভাবে আলেমদের থেকে সাড়া না পাওয়ায় প্রত্যেক জামাতে আলেম দেয়া যেত না। তাই প্রত্যেক জামাতে পড়নেওয়ালা দিতে চাইতেন, সাথে কিতাব। তখন এখানকার মত অক্ষরজ্ঞান সম্পন্ন মানুষ খুব বেশি ছিল না। আলেম না থাকায় তিনি শুধুমাত্র ফাজায়েলের কিতাব দিতেন। আমি বেশ কয়েকজন আকাবিরদের কাছে শুনেছি প্রথম দিকে ফাযায়েলের অপ্রতিদ্বন্দ্বী কিতাব ‘রিয়াদুস সলেহীন’ তালীমের জন্য নির্ধারণ ছিল। কিন্তু এই কিতাবও সেই সোনালী যুগে লেখা হয়েছিল সেই জামানার সাধারণ মানুষের জন্য। মেওয়াতের সাদাসিধা মানুষ গুলোর জন্য এই কিতাব ছিল অতি উচ্চমার্গীয়। তাই তিনি নিজ ভাতিজা শায়খুল হাদীস মাওলানা যাকারিয়া রহমাতুল্লাহি আলাইহিকে নির্দেশ সাধারণ মানুষদের জন্য কিছু বিষয়ের উপরে সহজ ভাষায় ফাজায়েলের কিছু কিতাব লিখতে। এভাবেই জন্ম হয় কোটি মানুষের হেদায়েতের অসীলা ‘ফাজায়েলে আমল’।

তো, যারা সম্পূর্ণ মালফুজাত ঘেঁটে মাত্র কয়েকটি বাণীই পেলেন যে, আমার মনে চায় আমাদের তালীম থানুভি রহমাতুল্লাহি আলাইহির তরীকায় হোক, তাদের কাছে আমার প্রশ্ন আমাদের তালিমের কোন তরীকা থানুভি রহমাতুল্লাহি আলাইহির থেকে নেয়া হয়েছে? তখন থানুভি রহমাতুল্লাহি আলাইহির ‘জাযাউল আমল’ থাকতেও তিনি কেন নতুন কিতাব লেখালেন?

ইলিয়াস রহমাতুল্লাহি আলাইহি নিজেই ইসলাহের লাইনে অতি উঁচু মানের শায়েখ ছিলেন। তিনি কেন সাথীদের অন্য পীরের কাছে যেতে বলবেন! বরং তিনি বিভিন্ন শায়েখদের ও কাজে সময় দেয়ার জন্য ব্যাকুল ভাবে অনুরোধ করতেন। যেই তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করতে আসত তাঁকেই তিনি অনুরোধ করতেন সময় লাগানোর জন্য। এমন কি মৃত্যুশয্যাতেও তিনি কাউকে তাশকিল করার সুযোগ হাত ছাড়া করেন নি। তাঁর মারাত্মক অসুস্থতার খবর পেয়ে অনেক আকাবির আসতেন তাঁর সাথে দেখা করতে। তিনি এই অসুস্থতা নিয়ামত মনে করে তাঁদের তাশকিল করতেন। এমনকি যখন তাঁর জবান থেকে কথা বের হত না, তখনও খুব চেষ্টা করতেন কথা বলতে। কেউ দুআ নিতে আসলেও তাশকিল করতেন, দাওয়াই নিতে আসলেও তাশকিল করতেন। কেননা এই কাজকেই উম্মতের সকল ধরনের এস্তেমায়ি ইসলাহের আসবাব মনে করতেন। [ সূত্র – ৭ ] কখনো কখনো তিনি এই কাজকে জিহাদের সাথে তুলনা করতেন। [ সূত্র ৮ ] এ ব্যাপারে তাঁকে সমর্থন করে ক্বারী তৈয়্যব সাহেব এবং মুফতি কেফায়েতুল্লাহ সাহেবের পক্ষ থেকে বাণী রয়েছে। তাঁকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, আপনি কি মুজাদ্দিদ? তিনি বলেন, না। এই কাজ মুজাদ্দিদ। জিজ্ঞাসা করা হয়, আপনি কি ওলী? তিনি বলতেন, না। তবে এই জামাত আউলিয়াদের জামাত। কেউ তাঁর কাছে দুআ নিতে আসলেও তাকে তাশকীল করতেন। তাঁর কাছে এই কাজ ছিল সকল মুশকিলের আসান।

মানুষের আত্মিক উন্নতির জন্য যিকিরের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। এর জন্য কামেল শায়েখের প্রয়োজন আছে। মাওলানা ইলিয়াস রহমাতুল্লাহি আলাইহি নিজেও শায়েখের কাছে যেতেন। কিন্তু এটাকে দলীল বানিয়ে তাবলীগে ইসলাহ নাই, ইসলাহের জন্য পীরের মুরীদ হতে হবে, তাবলীগের সাথীরা ইলিয়াস রহমাতুল্লাহি আলাইহির মাসলাক থেকে সরে গেছে কারণ তারা পীরের মুরীদ হয় না, এগুলো সত্যের অপলাপ। সত্য গোপন করে নিজের মতাদর্শ উঁচু করার অপপ্রয়াস। ইলিয়াস রহমাতুল্লাহি আলাইহির মালফুজাত তো অনেক, এই মাত্র কয়েকটি নয়। তিনি তো আল্লাহর রাস্তায় সফর করার জন্যও বলেছেন। তিনি বড় বড় আলেমদের, বড় বড় শায়েখদের বার বার অনুরোধ করেছেন ময়দানে মেহনতের। বড় বড় আলেমগন যখন আল্লাহর রাস্তায় সফর করবেন একেকজন উম্মত আলেম বনবে। বড় বড় শায়েখগন যখন উম্মতকে নিয়ে আল্লহর রাস্তায় সফর করবেন তখন উম্মতের মধ্যে আম ভাবে জাকেরীন পয়দা হবে। আমার উপদেশদাতা এই কামেল শায়েখগণ নিজেরাই কেন অন্যান্য মালফুজাতসমূহের উপর আমল করে দেখাচ্ছেন না? ইলিয়াস রহমাতুল্লাহি আলাইহির আমরণ মাকসাদ ছিল প্রত্যেক জামাতে অন্তত একজন করে হলেও আলেম দেয়া, সেই আশা তো আজও পুরণ হয় নি। তাহলে ময়দানে মেহনত না করে শুধুই মারকাজে মেহনত করার জন্য ইলিয়াস রহমাতুল্লাহি আলাহির নামে এই ব্ল্যাক মেইলিং কেন?

ইলিয়াস রহমাতুল্লাহি আলাইহি তো ঐ জামানার বড় বড় শায়েখদেরও আল্লহর রাস্তায় সফর করতে অনুরোধ করতেন। শায়েখদের থেকে অনুমোদিত নয় বলে যারা একাজ এড়িয়ে যেতেন তাঁদের তিনি কঠোর ভাবে ধমক লাগান যে, শায়েখ তো আল্লাহ নন। [ সূত্র ৯ ] মেহনত না করে মারকাজে এসে কাউকে শূরা হওয়া বা মিম্বরে গিয়ে বয়ান করার কোন মালফুজাত তো কোনো দিন দেখিনি।

আলহামদুলিল্লাহ মাওলানা ইলিয়াস রহমাতুল্লাহি আলাইহির প্রচেষ্টায় এরপরে অনেক আলেমই কাজে লেগেছেন। অনেক এলেমের চর্চা হয়েছে। বিভিন্ন উসূল ইলমের উপরে উঠে গেছে। আগের হজরতদের মালফুজাত ও বয়ানাত লিপিবদ্ধ হয়েছে। তাবলীগের উসূল হিসাবে হায়াতুস সাহাবাহ এবং মুন্তাখাব আহাদীস লিপিবদ্ধ হয়েছে। এগুলো পূর্ববর্তী আকাবিরদের এলেমের নির্যাস। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জামানা থেকে যত দূরে যাবে তত দ্বীন ফিকে হয়ে যাবে। আজ থেকে একশ বছর আগের এলেমের নূর এবং আজকের নূর এক হবে না। আজ থেকে একশ বছর আগের আলেমদের বুজুর্গী আর আজকের আলেমদের বুজুর্গী এক হবে না। তাই সম্ভব হলে আগের বুযুর্গদের অনুসরণ করা এটাই ইসলামের সহীহ নির্দেশনা। যত বেশি পুরানোদের অনুসরণ হবে তত বেশি নূর হাসিল হবে। তাই পুরনোদের থেকে সুস্পষ্ট নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও নতুনদের থেকে নির্দেশনা নেয়ার জরুরত নেই। বরং নতুন আলেমগণও পুরাতন বুযুর্গদের ফয়েজ হাসিল করতে এই মহান মেহনতের সাথে শরীক হতে পারেন।

দুঃখজনক হল একসময় আমরা যাঁদের থেকে রাহবারী নিয়েছি, সেই ক্বারী যুবায়ের সাহেব, রবিউল হক সাহেব, ওমর ফারুক সাহেব তাঁরাই আজ ইলিয়াস রহমাতুল্লাহি আলাইহির নামে ব্ল্যাক মেইলিং করে যাচ্ছেন। হাফিজহুমুল্লাহ। ইলিয়াস রহমাতুল্লাহি আলাইহির বিভিন্ন উলামাকেরামদের কাছে মেহনতের কারগুজারী শুনিয়ে প্রমাণ করতে চেয়েছেন যে তিনি সকল কাজ উলামাদের পরামর্শ মোতাবেক করতেন। বর্তমানে নাকি তা হচ্ছে না। তাঁরা ২০১৬ সালের পাকিস্তান ইজতেমার পর থেকে নিজামুদ্দিনকে প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা করে চলেছেন। অথচ এর আগ পর্যন্ত এমন কথা কোনদিন শুনিনি। বিশেষ করে ২০১৬ সালের জুন মাসেও ত্রৈমাসিক জোড়ে মাওলানা ওমর ফারুক সাহেব হাফিজহুমুল্লাহ বেশ জোরের সাথে তারগীব দিয়েছেন নিজামুদ্দিন সফর করার জন্য। যার অডিও রেকর্ড পাওয়া যাচ্ছে।

হজরতদের কাছে আমার বিনয়ের সাথে প্রশ্ন…

১. ২০১৬ এর নভেম্বরের পর এমন কি হল? এর আগ পর্যন্ত কি সব ঠিকঠাক ছিল? তখন কি মাওলানা সাদ সাহেব উলামাদের সাথে পরামর্শ করে চলতেন? দেওবন্দে গিয়ে পরামর্শ নিয়ে আসতেন যে কাজ কিভাবে কাজ করবেন? তখন আপনারা এ ব্যাপারে কথা বলেন নি কেন?

২. ২০১৬ এর পরে নিজামুদ্দিন থেকে মাত্র দুই জন আলেম চলে গেছেন। মাওলানা আহমাদ লাট সাহেব এবং মাওলানা ইব্রাহীম দেউলা হাফিজহুমুল্লাহ। তাহলে কি নিজামুদ্দিনে আর কোন আলেম এতদিন ছিলেন না? এই দুজন চলে গেছেন বলেই বলা হচ্ছে যে বর্তমানে কাজ আলেমদের নিগরানীতে চলছে না!

৩. নিজামুদ্দিন থেকে আলেমদের চলে যাওয়ার ইতিহাস তো আজকের নয়। আগেও অনেকে চলে গেছেন। তাহলে এখন এই ফিৎনা কেন?

সব কিছুই আলমী শূরা নামক নতুন বিদআতের কুফল। যৌথ নেতৃত্ব শরীয়ত সম্মত নয়, বরং কুফরী কমিউনিষ্টদের তরীকা। মুফতি মুনসুরুল হক সাহেব নিজেই বলেছেন এমন কথা। হাফিজহুমুল্লাহ। এই কুফরী তরীকা বাস্তবায়নের জন্য মহান মকবুল দাঈ মাওলানা ইলিয়াস রহমাতুল্লাহি আলাইহির নামে ব্ল্যাক মেইলিং করা হচ্ছে। এই যৌথ নেতৃত্বের দাবি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দুনিয়া থেকে পর্দা ফরমাবার পড়েও একবার উঠেছিল। কিন্তু সিদ্দীকে আকবার আবু বাকর রদ্বিয়াল্লাহু আনহুর দৃঢ়তায় এই প্রচেষ্টা বাতিল হয়ে যায়। অথচ আজ ১৪০০ বছর পরে আবারো সেই সুন্নতের খেলাপ তরীকার প্রচেষ্টা? আলহামদুলিল্লাহ আজ আরেক সিদ্দিকী এই অপচেষ্টা বাতিল করে দিয়েছেন।

মুহতারাম মুফতী সাহেবের কাছে আমার সবিনয় আরজ, শরীয়তে তো যৌথ নেতৃত্ব নেই। আমীরের দায়িত্বে সব সময়ে যোগ্যতম ব্যক্তি দিতে হবে এমন বাধ্যবাধকতাও নেই। যদি থাকে তাহলে হযরত মুয়াবিয়া রদিয়াল্লহু আনহুর পক্ষে আমাদের কন যুক্তি থাকে না। একথা আপনার বয়ান থেকেই শোনা। যেখানে হাকীমুল উম্মত মাওলানা আশরাফ আলজ থানুভি রহমাতুল্লাহি আলাইহির থেকে সুস্পষ্ট বাণী রয়েছে উম্মত অযোগ্য কাউকে আমীরকে মেনে নিলেও সেখানে খায়েরের সম্ভাবনা আছে। [ সূত্র ১০ ] তাহলে আপনি কেন নিজ সিলিসিলার মাশায়েখের নির্দেশনার খেলাপ হয়ে উম্মতের আমীরের বিরুদ্ধে এমন একটা কুফরী তরীকা সমর্থন করছেন।

আমরা এই ব্ল্যাক মেইলিং এ বিভ্রান্ত নই। কেননা ইলিয়াস রহমাতুল্লাহি আলাইহির জীবনী এবং মালফুজাত আমাদের সামনে রয়েছে। আমাদের বক্তব্য তাই অতি পরিষ্কার।

১. তাবলীগের কাজ উলামা কেরামদের নিগরানীতেই চলে এসেছে, এখনও চলছে। ভবিষ্যতেও উলামাদের নিগরানীতেই চলবে। ইনশাআল্লাহ। নিজামুদ্দিন মারকাজে এবং মারকাজের বাইরেও অসংখ্য আলেম এই কাজ নিগরানী করছেন। এর বাইরে কিছু দক্ষ অভিজ্ঞ দাঈ পরামর্শ দেন মাত্র। নিগরানী করেন না।

২. সকল আলেমদেরই দাওয়াতের কাজের জন্য জরুরী। এবং সকল আলেমদের জন্যও দাওয়াতের এই মেহনত জরুরী। তবে এই কাজ নিগরানী করার জন্য যথাযথ উসূল মেনেই নিগরানী করতে হবে। শুধুমাত্র মারকাজের বয়ান বা শূরাতে নয়, আমরা তাঁদের সাহচর্যে মানুষের ময়দানে কাজ করতে চাই। [ সূত্র ৫ – ৬ ]

৩. মুফতি মুনসুরুল হক সাহেব হাফিজহুমুল্লাহ একটা কথা তাঁর লিফলেটে লিখেছেন, জীবিতদের অনুসরণ করা নিরাপদ নয়। তাই পূর্ববর্তীদের অনুসরণ করা উচিৎ। এ কারণেই আমাদের পূর্ববর্তী উলামাগণ ইতিমধ্যেই কুরবানী ও মেহনতের দ্বারা এই কাজের একটি নকশা দাঁড়া করিয়ে গেছেন। এবং পরবর্তী যে কোন হালতে সহীহ রাহবারী নেয়ার জন্য হায়াতুস সাহাবাহ, মুন্তাখাব আহাদীস এবং তাঁদের অসংখ্য মালফুজাত ও বয়ানাত রেখে গেছেন। তাই এগুলো অনুসরণ করলেই বলা যাবে এই কাজ সহীহ তরতিবে উলামা কেরামদের নিগরানীতে চলছে।

৪. মাওলানা ইলিয়াস রহমাতুল্লাহি আলাইহি ইন্তেকালের আগে মাওলানা ইউসুফ রহমাতুল্লাহি আলাইহিকে জিজ্ঞাসা করেন যে তাঁর মৃত্যুর পর ইউসুফ রহমাতুল্লাহি আলাইহি কি তাঁর তরীকা সামনে রেখে মেহনত করবেন নাকি সাহাবাদের তরীকায়। তখন ইলিয়াস রহমাতুল্লাহি আলাইহি খুশী এবং নিশ্চিন্ত হয়ে যান। তাই বিনা তরতীবে উলামাদের তত্ত্বাবধায়ন নয়, বরং হায়াতুস সাহাবার অনুসরণেই উলামা কেরাম মাসোয়ারা দিবেন। এটাই ইলিয়াস রহমাতুল্লাহি আলাইহির মাসলাক। উম্মতের আমীর মাওলানা সাদ সাহেব দামাত বারকাতুহুম এভাবেই কাজ করে যাচ্ছেন।

আর সাথি ভাইদের কাছে আরজ এই ফেতনার জামানায় অবশ্যই মাওলানা ‘ইলিয়াস রহমাতুল্লাহি আলাইহির দ্বীনী দাওয়াত’ এবং ‘মালফুজাত’ এই দুই কিতাব আবার মুতালাআ করুন। বরং বারবার করুন। ইনশা আল্লাহ সহিহ নাহাজ সামনে আসবে। এবং এ কথাও পরিষ্কার হবে যে মাওলানা সাদ সাহেব দামাত বারকাতুহুম নিরলস প্রচেষ্টা চালাচ্ছেন সকল ফিতনার বিপরীতে এই মহান মেহনতকে সহিহ নাহাজের উপরে ধরে রাখার। আর সেই নাহাজ – হায়াতুস সাহাবাহ।

Facebook Comment





© All rights reserved © 2019 Tablignewsbd.Com
Design & Developed BY PopularServer.Com
error: Content is protected !!