শনিবার, ১৭ অগাস্ট ২০১৯, ০১:৪১ অপরাহ্ন

এক মহিয়সী মায়ের বুকে আগলে রাখা সন্তানের কাহিনী

এক মহিয়সী মায়ের বুকে আগলে রাখা সন্তানের কাহিনী

মাওলানা সৈয়দ আনোয়ার আব্দুল্লাহ

এবার এক মহীয়সী নারীর চোখের পানিতে জিহাদের ইতিহাস শুনাই। সাদ সাহেবের আম্মা খুব অল্প বয়সে বিধবা হন। হযরতজী মাওলানা ইলিয়াস রহ এর খান্দানকে দুনিয়া থেকে মুছে দিতে কি না করা হয়েছে? এই খান্দানকে যারাই বুকে আগলে রেখেছেন তাদের উপরও নির্যাতনের স্টিমরোলার চালানো হয়েছিল।

হুজুর আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের রক্তধারা আহলে বাইত ও হুসাইনি খান্দানকে দুনিয়া থেকে নিশ্চিহ্ন করতে যে নির্মমভাবে শিশু মাসুম বাচ্ছা আসগরকে পর্যন্ত হত্যা করা হয়েছিল। একইভাবে হযরত সিদ্দীকে আকবর রাখা এর খান্দানকে দুনিয়া থেকে মুছে দিতে স্বপরিবারে হত্যা করা হয়েছিল। ভাগ্যগুনে দুই খান্দানের রক্ত ধারার কোন না কোন উত্তর পুরুষকেই আল্লাহ বাঁচিয়ে রেখেছিলেন নিজ কুদরতদ্বারা। এবং এই দুই খান্দান থেকেই আল্লাহ তায়ালা উম্মতের সবচেয়ে বড়বড় কাজগুলো নিয়েছেন। ইতিহাস তাই বলে। ইলিয়াস রহ এর সিদ্দিকী খান্দানকে দুনিয়া থেকে নিশ্চিহ্ন করতে এহেন কোন কাজ নেই যা,ওরা করেনি।

এই মহিয়সী নারীর জীবনযুদ্ধের কাহিনী পড়লে আপনি আৎকে উঠবেন। চোখে অশ্রু ধরে রাখতে পারবেন না। বিগত ৭০ বছর ধরে তার সম্পূর্ণ জীবনই কেটে গেছে চোখের পানিতে। ভয় আরও শংকাই তার জীবনের পরতে পরতে। স্লাইকোনের মতো ঝড় জীবনভর তার উপর বয়ে গেছে। একমাত্র পুত্র, হযরতজী ইলিয়াস রহ, ও হযরতজী ইউসুফ রহ এর খান্দানের একমাত্র চেরাগ এই আমানতকে তিনি জ্বালিয়ে রেখেছেন চোখের পানিতে।

মসজিদ-ই-যাকারিয়া, বোল্টন ইংল্যান্ডে ২৫ মার্চ ও ১লা এপ্রিল, ২০১৮ তারিখ বয়ানে শায়খুল হাদীস জাকারিয়া রহ এর জিবীত খলিফা মাওলানা ইউসুফ মোত্বালা জামাত বারাকাতুহুম বলেন, মাওলানা সাদ সাহেবের পিতার অল্প বয়সে অপ্রত্যাশিত মৃত্যুর পর সাদ সাহেবের মুহতারামা আম্মা হজরত শায়খুল হাদীস রহমাতুল্লাহি আলাইহির নিকটে লিখেন, মহান আল্লাহর ফজলে আপনি নিশ্চয়ই এই ব্যাপারে অবগত আছেন আমার স্বামীর সাথে কি কি হয়েছে এবং কারা এর সাথে জড়িত। মেহেরবানী করে আপনি তাদের নামগুলো আমাকে জানান, যাতে আমি আমার প্রত্যেক দুআতে তাদের বিরুদ্ধে অভিশাপ এবং বদদুআ করতে পারি।
প্রত্যুত্তরে হযরত শায়খুল হাদীস রহমাতুল্লাহি আলাইহি লিখেন,
স্নেহের বেটি!
কারা কি করেছে এ নিয়ে আর কখনো মন খারাপ করিস না।
এরপর তিনি ঐ চিঠিতে মূহতারামাকে সান্ত্বনা দেন এবং কিভাবে তাঁর মরহুম স্বামীর (রহিমাহুমুল্লাহ) উপকার হয় সে ব্যাপারে উপদেশ দেন।
হযরত শায়খুল হাদীস রহমাতুল্লাহি আলাইহি এরপর মুহতারামার পিতা (মাওলানা সাদ সাহেবের নানা) মাওলানা ইজহারুল হাসান রহমাতুল্লাহি আলাইহির নিকট এক পত্র পাঠান। যাতে তিনি লিখেন, মৌলভী ইনআমুল হাসানের পর তুমিই। এ সময় তুমিই এ দায়িত্ব নাও যে, সাদ এর এমন তরবীয়ত করবে, যাতে তার এমন যোগ্যতা হাসিল হয়, যেন সে এই মেহনতে তার দাদা এবং পরদাদার মত দূরদর্শিতা হাসিল করতে পারেন।

এভাবেই ইলিয়াস রহ এর খান্দানের সাথে এদের শত্রুরা বহু পুরাতন। সুযোগ পাওয়া মাত্র এরা ছোবল মেরেছে। খুবই অল্প বয়সেই মাওলানা ইউসুফ এবং হারুন রহিমাহুমুল্লাহ দুজনকেই দুনিয়া থেকে সরিয়ে দিয়েছে। মাওলানা সাদ সাহেবকেও একই কায়দায় সরাতে বহুবার চেষ্টা করেছে। কিন্তু হযরত শায়খুল হাদীস রহমাতুল্লাহি আলাইহি, ইনআমুল হাসান, ওবায়দুল্লাহ বায়লভী, ইজহারুল হাসান ও যুবায়েরুল হাসান রহিমাহুমুল্লাহ আগলে আগলে রাখার কারণে ওরা তেমন সুবিধা করতে পারেনি। আজ সাদ সাহেবের পুরানো বিশ্বস্ত সুহৃদগণ একে একে দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়ে গেছেন। সাদ সাহেব একা হয়ে গেছেন। তাই ওরা আবারো পুরাতন শত্রুতা নিয়ে সর্বশক্তিতে ঝাঁপিয়ে পড়েছে।

এই মহীয়সী নারীর চোখের পানি আরও তরবিয়ত ও হিকমতের কারণে বারবার আক্রমণ করেও এরা ব্যার্থ হয়েছে। তাঁর চোখের পানির কিছু নমুনা দেখতে পাই মাওলানা ইউসুফ মুত্বলা দামাত বারকাতুহুম এর বয়ানে। সেখানে তিনি এই মহিয়সী মহিলার একটি চিঠি এবং শায়খুল হাদীস রহমাতুল্লাহি আলাইহির দুটি চিঠির বর্ণনা দিয়েছেন। শায়খুল হাদীস রহমাতুল্লাহি আলাইহির একটি চিঠিতে দেখা যায় তিনি মাওলানা সাদ সাহেবের তরবীয়তের জন্য কত ব্যাকুল ছিলেন। এবং কত আলা দরজার তরবীয়ত কামনা করতেন।

শিশু মাওলানা সাদ সাহেবই তখন পর্যন্ত মাওলানা ইলিয়াস রহমাতুল্লাহি আলাইহির একমাত্র জীবিত বংশধর। ইলিয়াস রহমাতুল্লাহি আলাইহির মুহিব্বীনদের কাছে সাত রাজার ধন। মাওলানা সাদ সাহেবের প্রতি নেক তায়াজ্জুহ ও দুআ যাঁদের ছিল তাঁদের মধ্যে শায়খুল হাদীস রহমাতুল্লাহি আলাইহি ছাড়াও ছিলেন হজরতজী মাওলানা ইনআমুল হাসান রহমাতুল্লাহি আলাইহি, নানা মাওলানা ইজহারুল হাসান রহমাতুল্লাহি আলাইহি, মাওলানা আবুল হাসান আলী নদভী রহমাতুল্লাহি আলাইহি, মাওলানা সাঈদ আহমদ খান, মাওলানা ওবায়দুল্লাহ বায়লভী, মাওলানা উমর পালনপুরী রহমাতুল্লাহি আলাইহি প্রমুখ এবং আরো অনেকে। এবং সর্বশেষ মাওলানা যুবায়েরুল হাসান রহমাতুল্লাহি আলাইহি। তিনি ছিলেন মাওলানা সাদ সাহেবের অকৃত্রিম সুহৃদ ও শুভাখাঙ্খী। তিনি অভেদ্য পর্বতের মত মাওলানা সাদ সাহেবকে এতদিন আগলে আগলে রেখেছেন বলেই কেউ ফিৎনা করার সাহস পায় নি। তাঁর ইন্তেকালের পরে এই অশুভ চক্র ফিৎনার ঝাঁপি খুলে বসেছে।

মাওলানা ইজহারুল হাসান রহমাতুল্লাহি আলাইহি মাওলানা সাদ সাহেবের নানা ছিলেন। এবং হজরতজী রহমাতুল্লাহি আলাইহিও কয়েক তরফ থেকে আত্মীয় ছিলেন। তাঁরা যোগ্য অভিভাবকের মতোই মাওলানা সাদ সাহেবকে এই কাজের জিম্মাদারীর উপযোগী করে গড়ে তুলেছেন।

নিজামুদ্দিন মারকাজের ভিতরে মাওলানা সাদ সাহেবের আম্মা নিরাপদ বোধ করছিলেন না। কেন করছিলেন না, সে এক দীর্ঘ দুঃখজনক ইতিহাস। তাই তিনি শিশু সাদ সাহেবকে নিয়ে সহীহ তালীম তরবীয়তের জন্য কান্ধালায় তাঁর আত্মীয় স্বজনের মাঝে ফিরে যেতে চেয়েছিলেন। কিন্তু একটি বিশেষ চক্র তাঁকে নিজামুদ্দিনেই আটকে রাখে। তারা চায়নি শিশু সাদ সাহেবের সহীহ তালীম তরবীয়ত হোক। এই চক্রটিই আজও বলে বেড়াচ্ছে যে মাওলানা সাদ সাহেবের সহীহ তরবীয়ত হয়নি। সেই সময় মাওলানা ওবায়দুল্লাহ বায়লভী রহ এ-র পরিবার ছায়ার মতো নিজামুদ্দিন মারকাজে শিশু সাদ ও তার পরিবারকে আগলে রাখতেন রাতদিন পাহারা দিয়ে। তখন এই চাক্রটি মারকাজের ভিতরেই মাওলানা ওবায়দুল্লাহ বায়লভী রহ বড় ছেলে মাওলানা আব্দুর রহমান সাহেবকে নির্মমভাবে খুন করে। এমনকি তার লাশকে রাতের আধারে তুন্দল রুটির চুলায় ফেলে জ্বালিয়ে দিতে চেষ্টা করা হয়।

কিন্তু এই চক্রের চক্রান্ত মাওলানা ইলিয়াস রহমাতুল্লাহি আলাইহির দুআ অতিক্রম করতে পারেনি। শিশু সাদের বিধবা মায়ের দুআ এবং চোখের পানির বিপরীতেও এরা টিকতে পারেনি। এই কঠিন পরিস্থিতে তাদের জীবন নাশের আশংকায় মাওলানা ইনআমুল হাসান ও মাওলানা ইজহারুল হাসান রহমাতুল্লাহি আলাইহি পরামর্শ করে শিশু সাদকে মুফাক্কিরুল ইসলাম মাওলানা আবুল হাসান আলী মিয়া নদীর হাতে তুলে দিয়ে হাজার হাজার মাইল দূরে মাদীনা মুনাওয়ারাতে পাঠিয়ে দেন মাওলানা সাঈদ আহমাদ খান সাহেবের কাছে। সেই পাক জমিনে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের রওজার কাছেই তাঁর প্রথম সবক হয় মাওলানা আবুল হাসান আলী মিয়া নদভী রহমাতুল্লাহি আলাইহির মাধ্যমে। সেদিন আবুল হাসান আলী মিয়া নদভী বেহুশ হয়ে কেঁদেছিলে, তখন নিকটজনদের আবেগে বললেন, হযরতজী মাওলানা মোহাম্মদ ইলিয়াস রহ নিজামুদ্দিনের এ-ই ভরা মজমা। সাধারণ শত সহস্র মানুষের দৈনিক আনাগোনা, নুরী পরিবেশ,এই যে আধ্যাত্মিকতার বসন্ত বাহার। কতটা শত মানুষ আজ তার দস্তারখানার মেহমান। অথচ কতটা কতটা অনাহার আরও উপবাসে তিলে তিলে সাজিয়েছেন এ মাহফিল। আজ এই কোলাহল পরিবেশে জীবনের নিরাপত্তা নেই খোদ তার খান্দানের একমাত্র শিশুপুত্রের। তাকে জীবনের শংকা নিয়ে আজ পারি দিতে হলো দূর বহু দূর। নবিজী দরগাহে। আল্লাহ চাহেতো রাসুলে আরাবি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের তোফায়েল এই শিশুর তরবিয়ত হবে আল্লাহর নিজ কুদরতেই। মদীনায়ে সেদিনের মজলিসের মাওলানা সাঈদ খান রহ, মাওলানা ইউসুফ মোত্বালা, হাফেজ আহমদ পাটকেল সাহেব সহজ অনেক আরবের জিম্মাদারগন ছিলেন।

এরপরে কয়েকবছর পর পরিস্থিতি অনুকূলে আসলে তৃতীয় হজরতজী রহমাতুল্লাহি আলাইহি মা ও সন্তানকে আবার নিজামুদ্দিনে ফিরেয়ে নিয়ে আসেন। নিজামুদ্দিনেই তাঁর জন্য পড়াশোনার ব্যবস্থা করেন।তার তরবিয়ত ও এলেমের উন্নতির জন্য্য হিন্দুস্থানের অনেক বিদগ্ধ আলেমদের নিজামুদ্দিনে নিয়ে আসেন। নিয়মিত নিজামুদ্দিন মারকাজে এসে আজীবন তাকে তরবিয়ত ও বুকে আগলে রেখেছেন আলী মিয়া নদী রহ। ছায়ার মতো সাথে সাথে রাখতেন আকাবিরে দেওবন্দের উজ্জল নক্ষত্র বিদগ্ধ আলেমদ্বীন মাওলানা ওবায়দুল্লাহ বায়লভী রহ। মাওলানা সাদ কান্ধালভী নিজামুদ্দিনের কাশিফুল উলূম মাদ্রাসা থেকে বরেণ্য দাঈ আলেমদের তত্ত্বাবধায়নে ১৯৮৭ সালে তকমিল সম্পন্ন করেন। মাত্র ১৮বছর বয়েসে এই কৈশোর ফেরানো বালকের এলেম ও তরবিয়ত দেখে আল্লামা আবুল হাসান আলী মিয়া নদী রহ তার মাথায় খেলাফতের মহান তাজ পরিয়ে দেন।

দাওয়াতের কাজের চিরকালীন অভিভাবক শায়খুল হাদীস যাকারিয়া রহমাতুল্লাহি আলাইহি ততদিনে ইন্তেকাল করেন। তার জীবনের আশংকায় ও অন্যান্য বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতার কারণে হজরতজী এনামুল হাসান রহমাতুল্লাহি আলাইহি তাঁকে সাহারানপুর,দেওবন্দ কিংবা নদওয়াতে পাঠানোকে নিরাপদ বোধ করেন নি। তাই নিজামুদ্দিনেই তার পড়ালেখা ও তরবিয়তের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা করেন। অপরদিকে সেই চক্রকে আস্তে আস্তে নিজামুদ্দনের সকল দ্বায়িত্ব থেকে সড়িয়ে দিয়ে, মারকাজের পরিবেশকে অনুকুল নিয়ে আসেন। তখন তৃতীয় হযরতজীর বিষয়ে এরা আপত্তি তুলে এবং আমীর হিসাবে মানতে বিদ্রোহ করার চেষ্টা করে। মদীনা মনোয়ারা থেকে আমীরকে মানার তরগিব দিয়ে তখন তাদের কাছে একের পরে একটা চিঠি লিখে মাওলানা সাঈদ আহমদ খন রহ. পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার চেষ্টা করেন। আজীবন এই খান্দানের চেরাগকে দুনিয়া থেকে মিটিয়ে দিয়ে দাওয়াতের কাজকে ছন্ন বিচ্ছিন্ন করে দিতে খুনিরা তার পেছনে লেগে থাকত। মাওলানা সাদ কান্ধালভীকে হত্যাত করার জন্য বিষ প্রয়োগসহ এপর্যন্ত খুনিরা ১৩বার আক্রমণ করেও তার মা মুরুব্বিদের দোয়ার বরকতে আল্লাহ কুদরতদ্বারা হেফাজত করেছেন। আজো মাওলানা সাদ কান্ধালভীর সেই মহীয়সী আম্মা জীবিত আছেন। প্রতিদিন আছরের পর হযরতজী জামাত বারাকাতুহুম মায়ের পাশে বসে কাজের কারগুজারী শুনান, হায়াতুস সাহাবায়ে পড়ে শুনান দাদা পরদা দার মালফুজাত ও জীবনী পাঠ করেন এবং মহীয়সী রত্নগর্ভা মায়ের দোয়া ও পরামর্শ নেন। আল্লাহ তুমি তাদের নেক হায়াত দান কর।

Facebook Comment





© All rights reserved © 2019 Tablignewsbd.Com
Design & Developed BY PopularServer.Com
error: Content is protected !!