রবিবার, ১৭ নভেম্বর ২০১৯, ০১:৪৩ পূর্বাহ্ন

মাওলানা সাদ সাহেব কেন উম্মতের ঐক্যের স্বার্থে ইমারত ত্যাগ করলেন না?

মাওলানা সাদ সাহেব কেন উম্মতের ঐক্যের স্বার্থে ইমারত ত্যাগ করলেন না?

মাওলানা সাদ সাহেব কেন উম্মতের ঐক্যের স্বার্থে ইমারত ত্যাগ করলেন না?

মাওলানা মেহবুব

ইসলামের দৃষ্টিতে ইমারত কোন পদ নয়। বরং একটি বিশেষ দায়িত্ব বা জিম্মাদারী। বিশেষ পরিস্থিতিতে কখনো কখনো জিম্মাদারী নিজে থেকেই গ্রহণ করা যায়, কিন্তু সাধারণ ভাবে কেউ নিজে থেকে জিম্মাদারী চেয়ে নিতে পারেন না। তেমনি কারো উপরে জিম্মাদারী আসলে তিনি নিজে থেকে জিম্মাদারী ত্যাগ করতেও পারেন না। শরীয়তে জিম্মাদারী ত্যাগ করারও কিছু আদব ও উসূল রয়েছে।

উম্মতের শীর্ষস্থানীয় উলামা কেরাম এ সম্পর্কে বিভিন্ন মত ব্যক্ত করেছেন। এটা সাধারণ মুসলমান দূরে থাক, সাধারণ আলেমদেরও বিচাৰ্য্য কোন ব্যাপার নয়। ইমারতের ব্যাপারে অভিজ্ঞ ও বিশেষজ্ঞ আলেমগণই এ ব্যাপারে সঠিক নির্দেশনা দিতে পারেন।

ক) একজন আমীর শুধুমাত্র আরেকজন যোগ্য আমীরের কাছেই দায়িত্ব হস্তান্তর করতে পারেন। তাই মাওলানা সাদ সাহেব কোন শূরা বা পর্যক্রমিক কোন ফয়সালের হাতে দায়িত্ব ছেড়ে দিলে সেটা নিঃসন্দেহে কুরআন হাদীস এবং সীরতের খেলাপ হবে।

খ) যখন কেউ কোন দায়িত্বপ্রাপ্ত হন, সেই দায়িত্ব সম্পূর্ণ না করা পর্যন্ত তিনি পিছু হটতে পারেন না। এই অধিকার শরীয়ত দেয় নি। উসমান রদ্বিয়াল্লাহু আনহু এজন্যই জীবনের হুমকি সত্ত্বেও দায়িত্ব ত্যাগ করেন নি। বর্তমানের চেয়ে তখনই উম্মতের ঐক্যের জরুরত বেশি ছিল। তবুও তিনি ঐক্যের দোহাই দিয়ে অর্পিত দায়িত্ব থেকে পিছু হটেন নি।

মূল কথা হল, শরীয়ত সম্মত কারণ ব্যতীত দায়িত্ব থেকে সরে যাওয়ার অনুমতি নেই। কেউ বিদ্রোহ করেছে বা কেউ কেউ বিরোধিতা করছে এগুলো যথেষ্ট কারণ নয়। যদি হত তাহলে উসমান রদ্বিয়াল্লাহু আনহু অথবা আলী রদ্বিয়াল্লাহু আনহুও ফিৎনার জামানায় দায়িত্ব ত্যাগ করতেন। বরং এসময়ে করণীয় হল মূল দায়িত্বের পাশাপাশি বিদ্রোহ বা বিরোধিতা প্রশমন বা দমনের জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করা। যেমন হযরত উসমান ও আলী রদ্বিয়াল্লাহু আনহু জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত চেষ্টা করেছেন, কিন্তু দায়িত্ব ছাড়েন নি। আলী রদ্বিয়াল্লাহু আনহুর তো সম্পূর্ণ খিলাফত জামানাই কেটেছে বিদ্রোহ সামলাতে সামলাতে।

গ) উলামা কেরাম লিখেছেন যে, ফিৎনার জামানায় ইমারতের দায়িত্ব ত্যাগ করার দ্বারা ফিৎনা কমে না বরং বাড়ে।

ইমারতের দায়িত্বরত অবস্থায় দায়িত্ব ত্যাগ করা যারা আমীরের উপরে আস্থা রেখেছিল বা বায়আত হয়েছিল তাদের সাথে প্রতারণার সামিল। বরং এসময়ে কর্তব্য হল, জীবন দিয়ে হলেও তিনি দায়িত্ব পালন করে যাবেন। আব্দুল্লাহ ইবনে যুবায়ের অথবা হযরত হুসাইন রদ্বিয়াল্লাহু আনহুম লোকবল ও শক্তি কম হওয়া সত্ত্বেও বায়আত গ্রহণকারীদের বায়আত ফিরিয়ে দেন নি। বরং নিজেরা জীবন দিয়ে হলেও তাদের বায়আতের মর্যাদা রক্ষা করেছেন।

◆ আরো কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয়:
• নিজে আমীর হওয়া সত্ত্বেও হযরতজী রহমাতুল্লাহি আলাইহি আমীরের সুন্নাত বিলুপ্ত করেছেন, এসব দাবি আষাঢ়ে গল্পকেও হার মানায়। কোন আমীর বা খলীফাই শরীয়তের সামান্য একটা বিষয়ও পরিবর্তন করার অধিকার রাখেন না। তাই এমন পরিবর্তন কেউ করে থাকলেও তা দ্রুত বাতিল করাই শরীয়তের বিধান।

হজরতজী রহমাতুল্লাহি আলাইহি জীবনের প্রতিটি কাজ সীরতের অনুসরণেই করেছেন। জীবনের শেষ মুহূর্তে এসে তিনি শরীয়তের খেলাপ কাজ করবেন, এমন দাবি তাঁর শানে জঘন্যতম অপবাদ। বরং হাজী সাহেব দামাত বারকাতুহুম পরবর্তী উত্তরসূরি মনোনয়ন করার পরামর্শ দিলে তিনি নিজামুদ্দিন ফিরে শীর্ষ আলেমদের সাথে পরামর্শ করে সীরতে ফারুকীর অনুসরণে পরবর্তী আমীর মনোনয়নের জন্য ১০ জনের একটি জামাত বানান। এভাবে তিনি জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত সমস্ত কাজে সীরতে তৈয়্যেবার অনুসরণ করার উপরেই অটল থেকেছেন।

• তিনজনের উপরে জিম্মাদারী অর্পণ করা এটা হজরতজীর প্রকৃত মানসা নির্দেশ করে না। বরং এটা ছিল শূরাদের অপারগতা।

হজরতজীর মানসা যদি এমনই হত, তাহলে হাজী আব্দুল ওয়াহাব সাহেব দামাত বারকাতুহুম বা মুফতী জয়নুল আবেদীন রহমাতুল্লাহি বিরোধিতা করতেন না। মাওলানা সাঈদ আহমাদ খান সাহেবও দুঃখপ্রকাশ করতেন না। একই ভাবে অন্যান্য শূরাগণও কান্নাকাটি করতেন না।

• যদি শূরাই প্রকৃত মানসা হত, তাহলে শূরায়ী নেজামের অন্যান্য বিষয় নিয়েও পরিষ্কার নির্দেশনা থাকত। হজরতজী না উঠালেও অন্যান্যরা উঠাতেন। যেমন শূন্যপদ কিভাবে পূরণ হবে বা নতুন শূরা কিভাবে নেয়া হবে ইত্যাদি। বিশেষ করে হজরতজীর বানানো জামাতের অনেকেই ছিলেন বেশ বয়স্ক এবং অসুস্থ। তাই এমন দাবি উঠাই স্বাভাবিক ছিল।

• ১৯৯৫ সালের মাসোয়ারায় যা ঘটে ছিল সেটা একটা ব্যতিক্রম এবং জরুরত। বিশেষ অবস্থার প্রেক্ষিতে অপারগতা বশত তিনজনের উপরে জিম্মাদারী দেয়া হয়েছিল। এটাকে দলীল বানানো নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির একটা অজুহাত মাত্র।

• আমাদের দ্বীন পরিপূর্ণ। কিয়ামত পর্যন্ত পাকিজী মুকাম্মেল দ্বীনের ভিতরে নতুন কিছু সংযোজন বিয়োজনের কোন জরুরত নেই। শরীয়তে কুরআন হাদীস ও সীরতে তৈয়্যেবার বাইরে কোন ব্যক্তির নামে অজুহাত পেশ করার কোন অবকাশ নেই।

• আমরা কিয়ামতের অনেক আলামতের কথা জানি, যেমন এক জামানা আসবে যখন এমন প্রাচুর্য হবে যে, যাকাত নেওয়ার কেউ থাকবে না। এমন আরো অনেক আলামতের কথা আছে। কিন্তু এমন কোন জামানা কি আসবে যখন কোন আমীরের প্রয়োজন পড়বে না? বরং এটাই আছে যে মুসলমান আমীরের সন্ধানে হন্য হয়ে ঘুরবে।

• আলমী শূরা গং এবং তাদের সহযোগীরা যেভাবে পর্যক্রমিক ফয়সাল চাচ্ছেন, এটা কি ইসলামী জীবনের সর্ব ক্ষেত্রেই বাস্তবায়ন করতে পারবেন? যেমন বিভিন্ন মাদ্রাসায় মুহতামিমের বদলে শূরা, বা বিভিন্ন ইসলামী দলে আমীরের বদলে পর্যায়ক্রমিক শূরা অথবা কোন খানকায় একজন হযরতের বদলে সমমর্যাদার একাধিক মুসলেহ?

• আলমী শূরাদের আরো একটি দাবি ছিল দুই তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা সক্রান্ত। এটা কি শরীয়তে প্রমাণিত যে, আমীর সাহেবকে সংখ্যাগরিষ্ঠ মত মানতেই হবে? উম্মতের বিজ্ঞ অভিজ্ঞগণ সংখ্যালঘিষ্ঠ হবেন এটাই স্বাভাবিক। অনেক সময় কারো ফিকির বা অন্তরের ব্যাকুলতার কারণে একজন সাধারণ মুসলমানের অন্তরেও আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা সর্বোত্তম রায় ঢালতে পারেন। যেমন একটি মশহুর উদাহরণ হল, নামাজে ডাকার পদ্ধতি নির্ধারণের জন্য মাসোয়ারা।

• মুসনাদে আহমাদে একটি হাদীস নকল করা হয়েছে, আল্লাহর আনুগত্যের বাইরে কোন মাখলুকের আনুগত্য নয়। কিন্তু আলমী শূরা গং কম্যুনিস্ট ও গণতন্ত্রীদের থেকে এমন এক পদ্ধতি আমদানী করেছে যা শরীয়তের প্রতিষ্ঠিত পদ্ধতির সুস্পষ্ট খেলাপ।

এ কথা আজ দিবালোকের মতই পরিষ্কার যে, মাওলানা সাদ সাহেবের ইমারত শরীয়তের শক্তিশালী দলীল এবং তাবলীগের উসূলের দ্বারা খুবই যথাযথ ভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এরপরও যারা বিরোধিতা করছেন তারা যে অন্য কোন দুরভিসন্ধি দ্বারা প্রভাবিত এটা বুঝতে খুব বেশি জ্ঞানী হওয়া লাগে না। এঁদের জন্য দুআই একমাত্র ভরসা। কেননা তাঁরা ইচ্ছাকৃতভাবে নিজেদের দিলের দরজা বন্ধ করে রেখেছেন। তাই তাদের দিলে এখন হাজারো দলীলও ঢুকবে না।

Facebook Comment





© All rights reserved © 2019 Tablignewsbd.Com
Design & Developed BY PopularServer.Com
error: Content is protected !!