শুক্রবার, ১৬ অগাস্ট ২০১৯, ১২:২১ অপরাহ্ন

কে ছিলেন হাজী আব্দুল ওয়াহাব রহ. | বিস্তারিত জীবনী

কে ছিলেন হাজী আব্দুল ওয়াহাব রহ. | বিস্তারিত জীবনী

সৈয়দ আনোয়ার আবদুল্লাহ এডিটর তাবলীগ নিউজ বিডিডটকম।
হযরতজি ভাই হাজি আব্দুল ওয়াহাব ছাহেব দাঃ বাঃ আকাবিরদের নূরে জ্বলমল আকাশের সিতারা ছিলেন। তাবলীগের দুনিয়া বিখ্যাত ১০জন মমীষীর একজন ছিলেন।

হযরত জী এনামুল হাসান রহ আমির নির্ধারনের জন্য ১৯৯৫সালে যে দশজন তাবলীগের দুনিয়াবিখ্যাত সেরা মনীষীকে নির্বাচিত করে শুরা বানিয়েছিলেন তাদের মাঝে দুজন মমীষী দুমিয়াতে আমাদের মাথার উপর ছায়া হয়ে ছিলেন। একজন হাজী আব্দুল ওয়াহাব সাহেব অপরজন হযরত জী মাওলানা সাদ কান্ধলভী দা.বা। এখন কেবল ১০জনের একজন মাওলানা সাদ সাহেব জীবিত আছেন। আর আমাদেরকে শোকের সাগরে ভাসিয়ে মাহবুবে হাকীকীর দরবারে হাজী সাহেব চলে গেলেন।

কে এই হাজী সাহেব? হযরতের জীবনী অনেকেরই অজানা। বিশ্ববিখ্যাত এই মনীষীর জীবনী তাবলীগ নিউজ বিডিডটকম এর পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হল। উম্মাহর এক কিংবদন্তির মনীষা ছিলেন তিনি। আন্তর্জাতিক এক জরিপে দেখা গেছে বর্তমান বিশ্বের প্রভাবশালী ধর্মীয় ব্যক্তিত্বদের অন্যতম একজন হলেন হযরত হাজী আব্দুল ওয়াহাব ছাহেব রহ।

হাজি আবদুল ওয়াহাব রহ. ১৯২২ সালে তৎকালীন হিন্দুস্তানের রাজধানী দিল্লিতে জন্মগ্রহণ করেন। দেশ বিভাগের সময় তার পরিবার পাকিস্তানে হিজরত করে। তিনি লাহোর ইসলামিয়া কলেজ থেকে গ্রাজুয়েশন সম্পন্ন করেন এবং সরকারি কালেক্টর পদে যোগদান করেন।

তিনি তার জীবনের প্রায় পুরোটা সময় তাবলিগের মেহনতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিলেন। তাবলিগি মেহনতের অসামান্য ত্যাগ তাকে প্রথমে পাকিস্তান তাবলিগ জামাতের আমিরের মর্যাদা এনে দেয় এবং পরবর্তীতে তিনি তাবলিগ জামাতের আলমি শুরার আমির নির্বাচিত হন।

তাকে বলা হয় পাকিস্তান তাবলিগ জামাতের তৃতীয় আমির। তার পূর্বের দুজন আমির হলেন মুহাম্মদ শফী কুরাইশি এবং হাজি মুহাম্মদ বশির।

হাজি আবদুল ওয়াহাব রহ. ১৯৪৪ সালে তাবলিগ জামাতের সাথে সম্পৃক্ত হন। যুবক বয়সে হাজি আবদুল ওয়াহাব রহ. আহরারে ইসলাম-এর কর্মী ছিলেন। দেশবিভাগের পর তিনি এই দলের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বও পালন করেন।

১৯৪৪ সালে তাবলিগ জামাতের প্রতিষ্ঠাতা ও আমির মাওলানা ইলিয়াস কান্ধলভি রহ.-এর সঙ্গে তার সাক্ষাৎ হয়। তার সঙ্গে তিনি তাবলিগের মেহনতে দীর্ঘ সময় ব্যয় করেন।

মাওলানা ইলিয়াস কান্ধলভি রহ.-এর সাক্ষাৎলাভের পর হাজি আবদুল ওয়াহাব রহ. তাবলিগের কাজে পূর্ণ মনোযোগ দেন এবং তার জীবন উৎসর্গ করেন কালেমার দাওয়াতের জন্য।

একসময় তাবলিগের কাজের স্বার্থে কালেক্টরের চাকরি ছেড়ে দেন এবং আল্লাহর উপর ভরসা করে জীবনযাপন শুরু করেন। আল্লাহ তার তাওয়াক্কুলে এমন বরকত দেন যে সারা দুনিয়া তার সুবাস ছড়িয়ে যায়।

হাজি আবদুল ওয়াহাব রহ. মাওলানা ইলিয়াস কান্ধলভি রহ.-এর সেই প্রথম পাঁচ সাথীর একজন ছিলেন যারা তাদের পুরো জীবন ইসলামের জন্য ওয়াকফ করেছিলেন।

সারা জীবন তাবলিগ জামাতের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকলেও যে কোনো দ্বীনি আন্দোলনে তার প্রচ্ছন্ন সমর্থন থাকতো। বিশেষত তিনি পাকিস্তানে খতমে নবুওয়াত আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণে করেন।

এছাড়াও ২০১৩ সালে সরকার ও পাকিস্তান তালেবানের সঙ্গে শান্তি আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। তার অংশগ্রহণে একাধিকবার পাকিস্তান বড় ধরনের জাতীয় সংকটের হাত থেকে রক্ষা পায়

তিনি পাকিস্তানে প্রথম পাঁচজন ব্যক্তির মধ্যে একজন ছিলেন, যিনি তার সমগ্র জীবন তবলিগের কাজ করার জন্য উৎসর্গ করেছিলেন। হযরত মওলানা মুহম্মদ ইলিয়াস কন্দলভী, হযরতজী মাওলানা ইউসুফ কান্দলভী এবং হযরতজী মাওলানা ইনামুল হাসান কান্দলভী রাহ এর নৈকট্য লাভ করে ছিলেন।

তিনি তাবলীগের মে হন তের পাশাপাশি একজন যুগ সচেতন ব্যাক্তিত্ব ছিলেন।
কারো অভিযোগ তাবলীগ রাজনীতি, বা কোন প্রকার আন্দোলন করে না। মানুষের বৈশিক বিষয়ে চিন্তা বা উন্নায়নেও কোন কাজ করে না। কেবল পরকালিন মুক্তির চিন্তা করে।কিন্তু ইতিহাস প্রমানিত বিশ্বব্যাপি রাজনৈতিক দন্ধ সমস্যা যেখানে চরম ব্যার্থ রাষ্টবিজ্ঞানী ও পলিটিকালস লিডাররা, সেখানে তাবলীগের দা’য়ীরা শেষ ভরসা হিসাবে সফলতার সাক্ষর রেখেছেন। দাওয়াত ও তাবলীগ বিশ্বকে কি দিয়েছে? এর একজন জীবন্ত মনীষার বাস্তব জীবনের একটি চিত্রপট তুলে ধরছি এই প্রবন্ধে।

দাওয়াত ও তাবলীগের মিম্বর ভাই আর অধ্যাপকদের দখলে বলে যারা নাক সিটকানোর চেষ্টা করেন, তাদের জন্য এই মনীষা হতে পারে চোখের সামনে উদাহরনের এক অনন্য নজীর। ভাই আব্দুল ওয়াহাব ছাহেব যিনি তাবলীগের মিম্বরে এক শতাব্দির আলোকিত মূখ। তিনি ভাই অধ্যাপক হয়েও কি হাজারো আলেম আর নায়বে নবীদের পথ পর্দশক আর শায়েখ নন? এই চির সত্য কে অস্বীকার করতে পারে। দাওয়াত ও তাকলীগের মেহনত একজন আধুনিক উচ্চ শিক্ষিত মানুষকে কোন মাকাম ও অনন্য মর্যাদায় পৌছে দিতে পারে ভাই হাজী আব্দুল ওয়াহাব ছাহেব তার উৎকৃষ্ট প্রমান।

দাওয়াত ও তাবলীগের সবচেয়ে প্রবীন মনীষা তিনি। রায়বেন্ড মার্কাজের আমীর। গিনেস ওয়াল্ডে লম্বা বয়ান রেকর্ডধারী ব্যক্তিত্ব। হাজার হাজার আলেম উলামা দা’য়ীদের আধ্যাত্বিক পীর। এজামানার হাজি এমদাদুল্লাহ মুহাজিরে মক্কির রহ প্রতিচ্ছবি। আল্লামা মন্জুর নুমানী রহ এর মত যুগ শ্রেষ্ট আলেম যার সম্পর্কে লিখেছেন, “আমার উস্তাদ, শায়েখ ও পরম শ্রদ্ধেয় মুরুব্বী।”

আকাবিরে দেওবন্দের সর্বজন শ্রদ্ধেয় প্রবীণ বুর্যুগদের মাঝে এযুগের তিনিই সবচয়ে বিশ্বব্যাপি পরিচিত ব্যক্তিত্ব। হযরতজী মমমাওলানা মোহহাম্মদ ইলিয়াছ রহ এর শিষ্য হলেও তিনি সোহবত লাভ করেছেন হাকীমুল উম্মত মাওলানা আশরাফ আলী থানভী রহ,শায়েখ আব্দুল কাদির রায়পুরী রহ, শায়খুল ইসলাম সৈয়দ হুসাইন আহমদ মদনী রহ এর। দিল্লি কলেজ থেকে ইন্জিনিয়রিং সমাপ্ত করেই যৌবন বয়েস কেটেছে নিযামুদ্দীনের মার্কাজ আর বড় বড় শায়েখদের দরবারে। উম্মতের হেদায়তের ফিকির নিয়ে ঘুরেছেন দুনিয়ার প্রতিটি দেশে।
.
উপমহাদেশ ও গোটা মুসলিম বিশ্বর গভীর সংকট আর সমস্যা সমাধানে সবার কাছে এই মুহুর্তে একমাত্র আস্থা ও বিশ্বাসের শেষ স্থানটি তিনি দখল করে আছেন এই কিংবদন্তির দা’য়ী ইলাল্লাহ। পাকিস্তান তালেবান ও সেনাবাহিনীর মধ্য চলতে থাকা বিগত কয়েক বছরের ভয়াবহ সংঘর্ষ মিমাংসায় যখন বিজ্ঞানী আব্দুল কাদির সহ সে দেশের শীর্ষ লেখক বুদ্ধিজীবী ও রাজনৈতিকরা শান্তি প্রস্তাবেরর চেষ্টা করে ব্যার্থ হন তখন মোবাল্লীগে ইসলাম হাজী আব্দুল ওয়াহাব ছাহেব রহ ছিলেনশেষ ভরসা।

এই ঘটনাটি – Wikipedia তথ্য মতে
“Negotiations with Pakistani Taliban In October 2013 it was reported that the name of Haji Abdul Wahhab was suggested to head a Loya Jirga in preparation for peace talks with the Pakistani Taliban . [4] In February 2014 it was reported that during consultations with a committee, TTP commanders of different factions recommended that the names of Haji Abdul Wahhab, Maulana Sami’ul Haq , Dr. Abdul Qadeer Khan , and other leaders be added in the”.

সে দেশের সকল ঐক্যত প্রচেষ্টা ও রাজনৈতিক চেষ্টা তখন তালেবান ও সেনাকর্মকর্তারা তা নাচক করে দেন । পরে সবাই দাঈ ইলাল্লাহ হাজী আব্দুল ওয়াহাব ছাহেব রহ দ্বারস্ত হন। জাতীর পক্ষ থেকে তাকে সবিনয় অনুরোধ করেন এই ভয়াবহ সংকট নিরসনে কথা বলার জন্য। মাওলানা তারিখ জামিল ছাহেব তখন হাজি ছাহেবের পা টিপে দিতে দিতে বলেন ,হযরত এই কাজটি আল্লাহ আপনারদ্বার করাতে চাচ্ছেন। এই দেশ ছেড়ে আমরা কোথায় যাব? সমস্যা হবে, সমাধান তো আমাদেরকেই বের করতে হবে।

হাজি ছাহেব স্নেহের শিষ্য তারিক জামিলের অনুরোধ রাখলেন। হাজী সাহেব তালেবান প্রধান ও সেনা প্রধানকে ফোন করলেন । উভয় এক বাক্যে রাজি হয়ে যান। বলছেন হযরত আপনি যেখানে চান , যখন চান আমরা তৈরি । পুরো দেশে শান্তির নিশ্বাঃস ফেলল মানুষ। এটা মাত্র কয়েক বছর পূর্বের পুরো বিশ্বের আলোচিত শান্তি মিশন।

তার নুরানী অবয়ব জুড়ে জলমল করে রাসুলে পাক সাঃ এর চিন্তা ও ফিকিরের প্রতিচ্ছবি। চলন বলনে ছিলেন এক জীবন্ত ছাহাবীর প্রতিবিম্ভ। আমি অধম হহযরতের সসোহবত লাভ করার এবং মমতার থাপ্পর লাভ করার সৌভাগ্য অর্জন করেছি। মাদনী , থানভী . বড় হযরতজী, মাওলানা ইউসুফ, এনামুল হাসান, মুফতি শফি , কারী তাইয়্যিব , মুফতি মাহমুদ, রায়পুরী , শায়েখ জাকারিয় রহ সহ সকল আকাবিরদের সাথে কাজ করেছেন। দীর্ঘ সময় কাটিয়েছেন হযরতজি ইলিয়াছ রহ এর সাথে। আকাবিরদের তাঁরা ঝলমল হাটের তিনি ছিলেন এক ঝলমল বাতি। (জীবনীর শেষাংশ আগামী কাল দেয়া হবে)

দীর্ঘদিন ধরে বার্ধক্যতার কারনে নানান জটিল রোগে আকান্ত হয়ে রায়বেন্ড মার্কাজে শয্যাশায়ী ছিলেন। আজ ১৮নভেম্বর ভোর ৬টায় রায়বেন্ড মার্কাজে এই মহান মনীষী ইন্তেকাল করেন।

হে আল্লাহ ভাই হাজি আব্দুল ছাহেব রহ কবর কে নুর দিয়ে ভরে দাও,তাকে জান্নাতের উচা মা কাম দান কর।

.লেখক, সম্পাদক চিকিৎসক ও আলেম

Facebook Comment





© All rights reserved © 2019 Tablignewsbd.Com
Design & Developed BY PopularServer.Com
error: Content is protected !!