রবিবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ১২:০৫ পূর্বাহ্ন

সম্পাদকীয়: কলমি খেদমত এই মুহুর্তে কেন জরুরী

মাওলানা সৈয়দ আনোয়ার আবদুল্লাহ

এক.সীরাত থেকে:আমরা যদি সীরাতে রাসুল সা. ও সিরাতে সাহাবা রাযি. এর দিকে লক্ষ্য করি তাহলে বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে উঠবে। নবিজীর মূল মেহনত ছিল কদম ফেলে উম্মতের দ্বারে দ্বারে গিয়ে দাওয়াত দেয়া। আল্লাহ ভুলা মানুষকে আল্লাহর সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়া।  কিন্তু মুশরিকরা যখন রাসুল সা. এর বিরোদ্ধে কুৎসা রটনা ও মিথ্যা অপপ্রচার চালানোর জন্য লেখনি ও  কবিতাকে বেঁচে নিল। তখন রাসুল সা. ঠিকই চুপ ছিলেন।

সাহাবীদের মাঝে তখন শক্তিমান কবি ছিলেন হযরত হাসান বিন সাবিত রাযি:। রাসুল নিজে জবাব না দিয়ে সাহাবী হাসসান বিন সাবিতকে পাশে ডাকলেন। লেখনির জবাব লেখা দিয়ে দিতে বললেন। কবিতার জবাব কবিতার মাধ্যমে দেয়ার নির্দেশ দিলেন।

তিরমিজি শরিফে এসেছে, কবি হাসসান ইবনে সাবেত (রা.) এর জন্য রাসুল (সা.) এর মিম্বরে বসে কবিতার মাধ্যমে নবিজীকে নিয়ে কুৎসা রটনাকারীদের অপপ্রচারের জবাব দিতেন। তিনি একমাত্র সম্মানীত সাহাবী যিনি রাসুল সা.এর জীবদ্দশায় নবীজীর মিম্বরে বসার সৌভাগ্য লাভ করেছেন। নবীজি হাসান বিন সাবিতের কবিতা শুনে নিজের গায়ের চাদর তাঁর গায়ে জড়িয়ে দিয়ে বিরল সম্মানে ভূষিত করেন। যা আর কারো সৌভাগ্যে হয় নি। রাসুল (সা.) তার কবিতা শুনে বলতেন, হে আল্লাহ রুহুল কুদুস (জিবরাঈল) কে দিয়ে হাসসানকে সাহায্য করো।

 

আজকের পেপার/পত্রিকা,বই ও অনলাইনের মতো তখনকার কবিতায় প্রকাশিত দুর্নামের প্রভাবত খনকার আরব সমাজে ছিল সুদূরপ্রসারী। লোকমুখে এসব কবিতা সারা আরবে ছড়িয়ে পড়ত, আর নিন্দিত গোত্রের অবস্থা হতো খুবই করুণ। হাসান বিন সাবিত জিহাদের ময়াদানে না গেলেও রাসুল সা. তাঁর জন্য গনিমতের মালের অংশ রাখতেন। বিষয়টি নিয়ে সাহাবা রা.আলোচনা করলে, রাসুল (সা.) বলেন, ‘আশাদ্দু আলাইহিম মিন ওয়াকয়িন নাবলি।’ অর্থাৎ তার কবিতা কাফেরদের জন্য তীরের আঘাতের চেয়েও সাংঘাতিক। আরো বলেছেন, রাসুল যখন কবিতা লিখে তখন হযরত জিব্রাইল এসে তাকে সাহায্য করেন।

 

কবি হাসসান ইসলামের আগে পরিচিত ছিলেন খাজরাজের কবি হিসেবে; কিন্তু রাসুল (সা.) তাকে শাইরুর রাসুল তথা রাসুলের কবি হিসেবে উপাধি দিয়েছিলেন। সাহাবাদের মধ্য এছাড়া হযরত উমর রা.হযরত আলী রা. আম্মাজান আয়শা রা. হযরত ফাতেমা রা. সহ বহু সাহাবির কাব্য চর্চার কথা পাওয়া যায়। হযরত আলী রা এর রচিত বিখ্যাত কাব্য গ্রন্থ “দেওয়ানে আলী” আজো সারা দুনিয়ায় বিখ্যাত।

 

একদিকে সাহাবায়ে কেরাম কবিতা ও লেখনির মাধ্যমে নবিজীর বিরোদ্ধে অপপ্রচারের জবাব দিতেন। অপর দিকে রাসুল সা.যা বলতেন তা তারা স্বযতনে লিখে রাখতেন। ফলে আজ লক্ষ লক্ষ হাদীস আমাদের কাছে এসে পৌছেছে। তাই সিরাত থেকে কলমি দাওয়াত ও কলমি জিহাদের অপরীসীম গুরুত্ব বুঝা যায়।

 

দুই. তাবলীগ থেকে: হযরতজী মাওলানা মোহাম্মদ ইলিয়াস রহ যখন দ্বীতিয়বারের মতো এই নবীওয়ালা মেহনত শুরু করলেন তখন খোদ দেওবন্দি ধারার উলামায়ে কেরামের পক্ষ থেকেই এই কাজকে বেদাত বলে আখ্যায়িত করে নানান অপপ্রচার ও এশকাল শুরু হয়। এমনকি আহলে হক উলামায়ে কেরামের কারো পক্ষ থেকে হযরতজী মাওলানা ইলিয়াস রহ.কে গুমরাহ বলে গায়ে হাত তুলা হয়। এই পরিস্থিতিতে হযরতজী রহ চুপ ছিলেন। কিন্তু পাশে থেকে সাহরানপুর মাদরাসার উলামায়ে কেরাম ঠিকই হযরতজীর পক্ষে কলম ধরেন। শায়খুল হাদীস রহ সাহরানপুর থেকে ” তাবলীগ জামাত পর এতেরাজ কি জওয়াবাত” গ্রন্থ লিখে জবাব দেন।  আল্লামা মনজুর নোমানী রহ একের পর এক তার প্রকাশিত মাসিক তরজমাতুল কুরআন পত্রিকায় জবাব দিতে থাকেন। পাশাপাশি হযরতজীর জীবদ্দশায়ই মাওলানা স্যাইয়িদ আবুল হাসান আলী মিয়া নদভী ও মনজুর নোমানী রহ  হযরতজীর মালফুজাত, বয়ানাত ও জীবন কর্ম লিখা শুরু করেন। পুরোটাই ছিল উপরোক্ত সিরাতের নকশায়। আজ এই লেখাগুলো এই কাজকে সহী নেহাজে পরিচালনার জন্য কতোটা ফলপ্রসূ হচ্ছে তা সবার চোখের সামনেই।

হযরতজী ইলিয়াস রহ কখনো এসব লেখালেখি নিয়ে বিরক্তি বা আপত্তি প্রকাশ করেন নি। বরং যে তিনজন মানুষ এই কলমি খেদমত করেছেন, শায়খুল হাদীস জাকারিয়া কান্ধালভী রহ. আল্লামা মনজুর নোমানী, আল্লামা আবুল হাসান আলী মিয়া নদভী রহ.।  এই তিনজনই ছিলেন হযরতজীর একান্ত কাছের মানুষ। বলা চলে এই মেহনত ও হযরতজীর ছায়াসঙ্গী। পরবর্তীতে তাদের তত্বাবধানে ও নিগরানীতে হযরতজী মাওলানা ইউসুফ রহ বয়ানাত, মালফুজাত, সাওহানাতে ইউসুফের মতো বৃহৎ সুবিখ্যাত গ্রন্থ রচিত হয়েছে।

তিন. হযরতজী থেকে: শায়খুল হাদীস, শায়খুদ দাওয়াত হযরতজী মাওলানা সাদ কান্ধালভী হাফিজাল্লাহু আজ যখন মেহনতকে তিন হযরতজীর মানহাজের আলোকে সীরাতের উপর কাজ পরিচালনার জন্য আবার চেষ্টা করছেন। হযরতজী ইলিয়াস রহ যে কাজ শুরু করতে চেয়েছিলেন, তা শুরুর পূর্ব পরিকল্পনা কেবল হযরতজী ইউসুফ রহ এর বয়ানাতের আলোকে শুরু করেছেন। ইমারত ভিত্তিক দাওয়াতী মেহনতকে সীরাত ও তিন হযরতজীর মানহাজের আলোকে প্রতিষ্টিত করতে চেয়েছেন, ঠিক তখনি ইমারত বিরোধী অপ শক্তি তার বিরোদ্ধে ও এই মেহনতকে লক্ষ্যচ্যুত করাতে আবার দাওয়াতের মেহনত ও মেহনতের আমীরেরের বিরোদ্ধ কুৎসা রটনা ও নানান অপপ্রচার শুরু করেছে। ঠিক এই মুহুর্তেও শাঈরে রাসুল হযরত হাসান বিন সাবিত রাযি, শায়খুল হাদীস জাকারিয়া রহ ও আল্লামা মনজুর নোমানীর মতো হযরতজীর পাশে এসে কলমি জেহাদে সর্ব প্রথম অবর্তীন হন , পাকিস্তানের উস্তাদুল উলামা শায়খুল হাদীস মাওলানা সলিমুল্লাহ খান রহ.।  তার প্রতিষ্ঠিত জামেয়া ফারুকীয়ার মুখপত্র “মাসিক আল ফারুকে” হযরতজী সাদ কান্ধালভীর বয়ানাত, মালফুজাত ও ইমারত নিয়ে লেখালেখি শুরু করেন। ফলে যে ফেতনার উৎপত্তি সেই পাকিস্তানের আলেমগন আলমি শুরার পক্ষে দাড়ান নি।

 

হযরতজি মাওলানা সাদ কান্ধালভী হাফিজাহুলাহর  বয়ান থেকে  দারুল উলুম দেওবন্দ যখন ৭টি বিষয়ের উপর আপত্তি করে তখন হযরতজী প্রথম  রুজুনামা প্রেরণ করেন তাতে লিখেন, “গত পাকিস্তান ইজতেমায় আমার প্রদত্ত বয়ান করাচির জামেয়া ফারুকীয়ার মুখপত্র “মাসিক আল ফারুক”(যা তিন ভাষায় প্রকাশিত হয়)….. সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছে। যদিও আমার বয়ান প্রকাশের যোগ্য নিজেকে মনে করি না। এছাড়া আমার বয়ানগুলো মুহুর্তে ওয়াটসপ, টুইটার,  ইউটিভ ও ফেসবুকের মাধ্যমে সারা দুনিয়ায় ছড়িয়ে পরে। এলেম ও উলামা সম্পর্কে আমার এই বয়ানগুলো সেখান পাওয়া যাবে, আমি এই বিষয়ে কী পরিমান গুরুত্ব দিয়ে থাকি।”

 

হযরতজীর এই বয়ান থেকে মাসিক ধর্মীয় পত্রিকার গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা এবং তাঁর সমর্থন সহযে অনুমেয়। এছাড়া সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচারের ক্ষেত্রে প্রয়োজনে ব্যাবহারকেও সমর্থন বুঝায়। তবে মূল মেহনতকে বাঁধ দিয়ে কেবল এসব রোওয়াজী তরীকাকে মূল মেহনত বানানো, এটি হযরতজীর মানসার খেলাফ।

 

এছাড়া এই ফেতনা ও অপপ্রচারের শুরুতেই হিন্দুস্তানে হযরতজীর পক্ষে কলম ধরেন মুফাররিখুল হিন্দ আল্লামা রাশেদ হাসান কান্ধালভী, মুফতী মেহবুব কাসেমী, মুফতী মতিউর রহমান, মুফতী মুহাম্মদ নাদিম হাফিজাল্লাহু। ভারতে চলমান ওজাহাতি ও আলমী শুরার নব্য ফেতনার বিরোদ্ধে গ্রন্থ লেখা হয়েছে।  কিন্তু বাংলাদেশে ওজাহাতিরা ৪৮টি অপপ্রচার মূলক বিভ্রান্তকর চটি বই প্রকাশ করে উম্মতকে বিভ্রান্ত করলেও আমরা তেমন কোন কলমি খেদমত করতে পারিনি দু’চারটি কাজ ছাড়া। উর্দুু সকল কিতাবের তরজমা প্রকাশিত হওয়া দরকার। মারকাজুল উলুম আশ শরীয়্যাহর মূখপাত্র “মাসিক আত তাহকীক” কে নিয়মিত করতে পাশে দাড়ানো দরকার। পর্যাপ্ত লেখক সংকটের পাশাপাশি বড় ধরণের অর্থ সংকট রয়েছে এই কাজগুলো ফলপ্রসূ  করতে। আল্লাহ আমাদের এখলাসের সাথে কবুল করুণ আমীন।

Facebook Comment





© All rights reserved © 2019 Tablignewsbd.Com
Design & Developed BY PopularServer.Com
error: Content is protected !!